জন্মসূত্রে পোলিশ, শিল্পী মিচেল এলভিরো অ্যান্ড্রিওলি। তাঁর আঁকা ছবি বা ইলাস্ট্রেশন জীবন্ত করে তুলেছিল পোল্যান্ডের বিখ্যাত কবিতা Mickiewicz’s Pan Tadeusz (পোলিস উচ্চারণ: মিচকিউইচ পান তাভেউজ)।
পোল্যান্ড বাসীরা খুব সঙ্গত কারণেই চিত্রকর হিসেবে তাঁকে দিয়েছেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অনন্য স্থান। জন্ম ২রা নভেম্বর ১৮৩৬ সালে, সম্ভ্রান্ত এক পোলিশ পরিবারে, ইতালির ভিলনিয়াসে। মা ছিলেন অভিজাত পোলিশ বংশভূত, যদিও তিনি মূলত ছিলেন একজন ইতালীয় ইমিগ্রান্ট। বাবার জন্ম ইতালির দক্ষিণ তিরোলে। তিনি ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের গ্র্যান্ড আর্মির অফিসার। পরে তিনি রাশিয়ানদের হাতে বন্দী হন। বন্দীদশার থেকে মুক্ত হয়ে, শেষ জীবন এই শহরেই অতিবাহিত করেন তিনি।

মিচেল এলভিরো ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। তাঁর পড়াশোনা শুরু মস্কোতে। পরে ‘পিটার্সবার্গে ইম্পেরিয়াল একাডেমি অফ আর্ট’-এ শুরু হয় তাঁর শিল্প শিক্ষা। ১৮৬১ সালে তিনি বৃত্তি লাভ করেন রোমে, ‘অ্যাকাদেমিয়া ডি সান লুকা’-তে, পরে সেখানেই চলে তাঁর পাঠক্রম।
শৈশব থেকে আজীবন কেটে গেছে দেশে বিদেশে নানান জায়গায়। কিন্তু মনে প্রানে তিনি ছিলেন একজন আদ্যপান্ত পোলিশ। ১৮৬৩ সালে রাশিয়ান সাম্রাজ্যেবাদের বিরুদ্ধে ‘জানুয়ারী বিদ্রোহ’-এ অংশ নেন। সে সময় পোল্যান্ডের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করত রাশিয়া। প্রথমে গ্রেফতার হন জারিস্ট কারাগারে, সেখান থেকে পালিয়ে প্রথমে যান লন্ডনে এবং পরে পৌঁছন প্যারিসে।

মাতৃভূমির প্রতি অমোঘ টানে, পোল্যান্ডে প্রবেশ করতে গিয়ে, আবার ধরা পড়ে যান রাশিয়ানদের হাতে।
মুক্তি পান ১৮৭১ সালে, সরাসরি চলে আসেন পোল্যান্ডের রাজধানী ‘ওয়ারশ’-তে। আর এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর শিল্প জীবন। যা তাঁকে মর্যাদা এনে দেয় পোল্যান্ডের একজন অগ্রগণ্য শিল্পীর।
বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হতে শুরু করে তাঁর শিল্প সম্ভার। সেই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর খ্যাতি। এইসময় তিনি হাত দেন ‘অ্যাডাম মিকিউইচস’-এর ‘প্যান টেডিউস’ (ইংরেজি উচ্চারণ: Sir Thaddeus)-এর প্রথম সংস্করণের জন্য ছবি আঁকতে। পোল্যান্ডের সাহিত্য জগতে এই লেখার গুরুত্ব অপরিসীম। ফলত, এটি তাঁর মুকুটে জুড়ে দেয় আরো একটি পালক।
১৮৮০ সালে আন্দ্রিয়োলি ওয়ারস-র দক্ষিণ-পূর্বে, ভিস্তুলার উপনদী, ওয়াইডার নদীর কাছে, আনিয়েলিনে একটি কাঠের স্থাপত্য বা বাড়ি বানান। কিন্তু ব্যবসার কথা আগাম আন্দাজ করে, আরো বেশ কয়েকটি বাড়িসহ, বানিয়ে ফেলেন একটি ছোটোখাটো অঞ্চল।

তাঁর সৃষ্ট স্থাপত্য বা বাড়ি-ঘরের মধ্যে যেমন আছে মাজোভিয়ার (Majovia) কাঠের স্থাপত্য অর্থাৎ রাশিয়ান এবং সুইজারল্যান্ডের প্রভাব, তেমনই অনুকরণীয় ভাবে উপস্থিত দক্ষিণ পোল্যান্ডের পাহাড়ের থেকে পাওয়া কুঁড়েঘরের অনুপ্রেরণা।
এই শিল্পশৈলী এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো যে স্থানীয়রা শুরু করে এর অনুকরন। শুধু তাই নয়, এটা হয়ে ওঠে ঐ অঞ্চলের একটা ট্রেডমার্ক। পরবর্তীকালে এই শিল্পশৈলীর নাম দেওয়া হয় ‘সিডারমারিয়া’ (Świdermajer)। যে নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে, সুইডার (Świder), আবার পোলিশ Biedermeier (বিডেরমার)-এর সংমিশ্রণ।
১৮৮৩ সাল থেকে ১৮৮৬ সালের মধ্যে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিপুল ভাবে সমগ্র ইতালি তথা বিশ্বে। এই সময়ে বিখ্যাত ফরাসি প্রকশনার মারফত তাঁর হাতে চিত্রিত হতে থাকে একের পর এক বিশ্ব সাহিত্য, উইলিয়াম শেক্সপীয়ার থেকে জেমস ফেনিমোর কুপারের মত স্বনামধন্য সাহিত্যিকের সাহিত্য।
“মরণরে, তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান”। ২৩শে অগাস্ট ১৮৯৩ সাল। পোল্যান্ডের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিল্পীর অমূল্য কাজ থেমে যায় চিরকালের মতো।
কভারের ছবিটি ‘সিডারমারিয়া’ (Świdermajer)