এবারেও লোকসভা নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসি মুখ দেখবে তৃণমূল কংগ্রেস। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভোটের আগে পর্যন্ত গেরুয়া পালে হাওয়া ছিল বলে অনেকেই মনে করেছিলেন। কিন্তু ভোটের দিনের চিত্র বদলে দিয়েছে হিসেবনিকেশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন যেভাবে ২০ মে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা, তাতে আরামবাগ কার দখলে থাকবে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চুলচেড়া বিশ্লেষণ চলছে। মহিলা ভোটের অঙ্কেই আরামবাগে জয় নিয়ে আশাবাদী তৃণমূল। ঘাসফুল শিবিরের দাবি, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা মহিলারা পাচ্ছেন। তাঁরা ভোট বাক্সে তৃণমূলকেই বেছে নিয়েছেন। যদিও এই লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি বিধানসভার মধ্যে পাঁচটিতেই এগিয়ে থাকার দাবি করছে গেরুয়া শিবির।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আরামবাগ লোকসভায় মোট ভোটার ১৮ লক্ষ ৮৩ হাজার ২২৬ জন। তার মধ্যে ১৫ লক্ষ ৫৫ হাজার ৮৮৬ জন ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ, ৮২.৬২ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিজেপি একুশের বিধানসভা নির্বাচনে আরামবাগ, পুরশুড়া, খানাকুল ও গোঘাট জয়লাভ করেছিল। তৃণমূলের দখলে ছিল তারকেশ্বর, হরিপাল ও চন্দ্রকোণা। এবার এখানে লড়াই যে হাড্ডাহাড্ডি, তা ভোটপর্বে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর একাধিক সভার মধ্যেই বোঝা গিয়েছে। মহিলা ভোটই এখানে এক্স ফ্যাক্টর হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
প্রসঙ্গত, গত বিধানসভা নির্বাচনে জেতা কেন্দ্রগুলিতে তৃণমূল এবারও ভালো ফল করার আশা করছে। আরামবাগের গ্রামীণ এলাকাতেও ব্যাপক লিড পাবে বলে তৃণমূল নেতৃত্ব দাবি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুরশুড়া, খানাকুল ও গোঘাটের ফলাফলের উপর প্রার্থীদের ভাগ্য অনেকটাই এবার নির্ধারণ হবে। আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের এক প্রবীণ নেতা বলেন, তারকেশ্বর, হরিপাল ও চন্দ্রকোণা থেকে নিশ্চিত লিড পাব। আরামবাগের গ্রামীণ এলাকাগুলিতেও ভালো ফল হবে। খানাকুল ও পুরশুড়ায় বিজেপি ভোটারদের বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবু মানুষ ভোট দিয়েছে। আশা করি তারা উন্নয়নের লক্ষ্যে তৃণমূলকেই ভোট দিয়েছে। তাছাড়া মহিলারা যেভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, তাতে বিজেপির নেতারা ভালোই বুঝতে পারছেন, এবারও আরামবাগ জয় তাদের অধরাই থেকে যাবে। তৃণমূলের জয় ১০০ শতাংশ নিশ্চিত।
তৃণমূল প্রার্থী মিতালি বাগ বলেন, মানুষ যেভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। মহিলাদের উৎসাহ উদ্দীপনা চোখে পাড়ার মতো ছিল। উন্নয়নমূলক কাজ, জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের নিরিখে মহিলারা ‘তৃণমূলকেই বেছে নিয়েছেন। এখানে জয় ১০০ শতাংশ নিশ্চিত। ৪ জুন বিজেপি চোখে সর্ষে ফুল দেখবে।
বিজেপির হুগলি ও হাওড়ার বিভাগীয় কনভেনর সুশান্ত বেরা বলেন, আরামবাগ মহকুমার চারটে বিধানসভার সঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় বিজেপি ভালো ফল করবে। মানুষ এবার ভোট দিতে পেরেছে যা আমাদের কাছে আশাব্যাঞ্জক। বিজেপি এখানে নিশ্চিতভাবে জয় লাভ করবে।
আরামবাগ শহরের বাসিন্দা সেখ শামসুল আলম বলেন, উনিশের লোকসভ্য ও গত বিধানসভা ভোটে বিজেপির দিকে হাওয়া ছিল। সেই হাওয়া এবার সেভাবে দেখা যায়নি। মনে হচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
গোঘাটের চাতরা গ্রামের বাসিন্দা নিলয় ব্যানার্জী বলেন, আবাস যোজনার তালিকায় আমার নাম ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার টাকা আটকে দেওয়ায় ঘর পাইনি। আমার মতো এই এলাকার অনেক মানুষ ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। গত বিধানসভা ভোটে এলাকার মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল। তবে এবার আর ভুল করবে না বলেই মনে হয়।
এদিকে আরামবাগে পঞ্চম দফার ভোটদান পর্ব শেষ। ভোটপর্ব চলাকালীন আরামবাগের ভূমিকন্যা মিতালী চাষিদের সঙ্গে খেত থেকে আলু ও বাদাম তুলেছেন। কারও বাড়িতে গিয়ে পান্তা গেছেন, আবার রাস্তার ধারে দোকানে চপও ভেজেছেন। এ যেন আরামবাগের প্রতিটি বাড়ির আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। এই ভূমিকন্যাকে স্নেহভরে ভোটও দিয়েছেন। যা পর্যবেক্ষকদের কাছেও নজর কেড়েছে। এখন মিতালীর দিকেই জয়ের পাল্লা ভারী হয়ে উঠেছে। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
উল্লেখ্য, ভোট পর্ব মিটতেই তৃণমূল প্রার্থী মিতালি বাগ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের কাজে ফিরলেন। গত বুধবার থেকেই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের কাজে যোগ দেন। শিশুদের খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে কি না তার দেখভাল করেন। এছাড়াও দলীয় কর্মীদের উপর আক্রমণের ঘটনার খোঁজখবর নেন। মিতালিদেবী বলেন, ভোটের জন্য ছুটি নিয়েছিলাম। ভোট মিটতেই হাজিপুর এলাকার যে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে কর্মরত আছি, সেখানে কাজে যোগ দিয়েছি। মঙ্গলবার সকালে কালীপুর নেতাজি মহাবিদ্যালয়ের স্ট্রং রুম পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। দিনভর দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। এদিন অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে গিয়ে বাকি থাকা কাজ শেষ করেছি। অনেকদিন পর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে।
তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার রাতে খানাকুলের বালিপুরে আমাদের দলের কর্মীদের উপর হামলা চালানো হয়। জখম কর্মীরা কেমন আছেন, তার খোঁজখবর নিয়েছি। কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিস প্রশাসনকে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।