চোত মাস প্রায় শেষের দিকে। সুজানগরের গাজনার বিলের বিস্তীর্ণ নাবাল অঞ্চল এ সময়টাতে সাহারা মরুভূমির মতো শুষ্ক ও উষ্ণ। অথচ ভরা বর্ষায় এর প্রমত্ত উত্তাল ঢেউ ও জলরাশি দেখে কেউ হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না, গ্রীষ্মে এ বিলের কী এক হাল তৈরি হয়।
যদিও চোত-বোশেখের খরতাপে অনেক ধনী কৃষক সাধারণত গভীর নলকূপ গেড়ে বোরো ধান জন্মানোর জন্য সেচ ব্যবস্থাটি চালু রাখেন বটে; কিন্তু তারপরও পেঁয়াজ ও অন্যান্য রবিশস্যের ভুঁইগুলো বেশিরভাগই বিরান, আবাদহীন ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে বর্ষা নামার পূর্ব পর্যন্ত।
তবে এটা দেখে আশান্বিত হতে হয়, বিরান এ মরুভূমির মধ্যেও মরূদ্যানের মতো এক টুকরা দ্বীপের অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে। ঈষৎ টিলার মতো উঁচু এই দ্বীপটিকে আশপাশের গ্রামের লোকজন বলে ‘ঘোড়ার ভিটে’। যতদূর চোখ যায় শুধু ধুধু শুষ্ক মাঠ ব্যতিক্রম শুধু এই ঘোড়ার ভিটে। সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা এই দ্বীপটিকে ঘিরে অনুগত ও বিশ্বস্ত সৈনিকের মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশ-পঁচিশটি বাবলা গাছ। সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দু-তিনটি বকুল, তাল আর নাম না জানা কতক বৃক্ষ।
গ্রীষ্মের নির্জন দুপুরগুলো বড়ই ফাঁকা। চারদিক খাঁ খাঁ শূন্য। মাঝে মধ্যে দমকা বাতাস এসে ভিটের শুকনো খড়কুটো, পেঁয়াজের শুকনো খোসা, সিগারেটের খোলের রুপালি রাঙতা কাগজ সঙ্গে ধুলোবালিগুলো ঘূর্ণির মতো পাক খেতে খেতে উঠে যায় উপরের দিকে।
নিজের পিঠটি একটি বাবলা গাছে ঠেস দিয়ে সেই ঘূর্ণায়মান বাতাসের দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকে জানে আলম। এ বাতাস জানে আলমের খুব চেনা। প্রচণ্ড দাবদাহে যেদিন গরম হাওয়া পাক খেতে খেতে উপরের দিকে উঠে যায়, বিশেষ করে সেদিন বিকালে সন্ধ্যা নামার আগে কিংবা রাতে কালবৈশাখীর ভীষণ ঝড় বয়ে যায় গ্রামগুলোর উপর দিয়ে। তার বেশ ভয় হয়, না জানি ঝড়-জলের কী তাণ্ডবলীলা চলে আজ। ঝড়ের কথা ভেবেই যে জানে আলমের ভয় হয় তা কিন্তু নয়। কাঠফাটা রোদের নির্জন ও জনমানুষ শূন্য এ ঘোড়ার ভিটে জায়গাটিতেও তার বেজায় ডর। ঘোড়ার ভিটে নামটি তো আর এমনি এমনি হয়নি। গহিন নিরান্ধ্র অন্ধকার রাতে অলৌকিক সব ঘোড়া নাকি চড়ে বেড়ায় এই ভিটেতে। তখন তাদের খুরের ঠক-ঠক…ঠক-ঠক… ঠক-ঠক শব্দ শোনা যায় বহুদূর থেকে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী অবশ্য দাবি করেছে, ফুটফুটে জ্যোৎস্না রাতেও নাকি তারা দেখেছে সেখানে অনেক ঘোড়ার অবাধ বিচরণ।
কালো-সাদা-লাল-খয়েরি নানা রঙের ঘোড়া। ঘোড়ার ভিটের এসব ভৌতিক ও অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপারগুলো অবশ্য গ্রামের দু’চারজন ছাড়া সবাই বিশ্বাস করে। যে দু’চারজন বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে একজন হলেন চরদুলাই বি আর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম। জানে আলমের বুঝে আসে না আবুল কাশেম কেন বিশ্বাস করতে নারাজ, সেখানে রাতেরবেলা নানা রঙের সব ঘোড়ারা চড়ে বেড়ায়, ঘাস খায়, এলোপাতাড়ি ঘোরাঘুরি করে। তাদের নিজেদেরও তো চার-পাঁচটি গরু আছে। যে গরুটা সাদা সেটাকে তারা ডাকে ধবলা বলে, যেটা কালো সেটার নাম কালু আর যে গরুটা লাল সেটাকে তাদের পরিবারের সবাই ডাকে লালী বলে। গরুদের মধ্যে যদি সাদা-কালো-লাল থাকতে পারে তাহলে ঘোড়াদের মধ্যেও তো সেরকম থাকবে নিশ্চয়ই। আর এতদিন ধরে এতগুলো মানুষের বিবৃতি কী মিথ্যে হতে পারে।
ঘোড়ার ভিটেতে যখন অন্য কোনো রাখাল-বাখালের উৎপাত থাকে না তখন চারদিক বেশ সুনসান ও নিস্তব্ধ। রৌদ্রতপ্ত দুপুরগুলো তাই প্রায়ই উদাস হয়ে ওঠে জানে আলমের। একটু আগেই বাড়ি থেকে নিয়ে আসা মাঝারি সাইজের একটি গামলায় পেঁয়াজ সহযোগে হরিদ্রা রঙের বোরো চালের এক গামলা খিচুড়ি উদরপূর্তি করেছে সে। জানে আলমের মা জুলেখা বিবি পরম যত্ন করে ফিনফিনে জীর্ণ একটি গামছায় বেঁধে দিয়েছিল খিচুড়ির ডিশটি। একপাশে অল্প একটু সরিষার তেল ও গোটা কয়েক পেঁয়াজ। পেট ভর্তি করে খেয়ে ওঠার পর কেমন জানি আলস্যে ভরে যায় সম্পূর্ণ শরীরটি। নিজের অলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি ঢেঁকুর তোলে জানে আলম। চোখ দুটি যেন বুজে আসতে চায় নিজেরই অজান্তেই।
হঠাৎ করেই জানে আলম দেখল দশ-বিশটা ঘোড়া উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে। প্রত্যেকটি ঘোড়ার পিঠেই দুটি করে পাখা। ঠিক যেন একেবারে পক্ষিরাজ ঘোড়ার মতো। তারপর এক সময় আকাশ থেকে উড়তে উড়তে ঘোড়াগুলো নেমে এলো ভিটেতে। দ্রুত গতিতে উড়ছিল বলে নিজেদের ভারসাম্য রক্ষার জন্য নেমেই সবুজ ঘাসের জমিতে বেশ খানিকটা দৌড়াতে হল তাদের। তারপর গতি শ্ল¬থ করে একটু দূরে গিয়ে থামতে হল তাদের। কুচকুচে কালো রঙের একটি ঘোড়া তো শূন্য থেকে ভূমিতে নেমে রীতিমতো দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এলো একেবারে জানে আলমের মুখের সামনে। তারপর জানে আলমকে উদ্দেশ করে বলল- কী, আলম মিয়া এখানে তুমি গরু চরাচ্ছ! সাহস তো তোমার কম নয় হে। জানো না এটা ঘোড়াদের ভিটে। মানে আমাদের ভিটে। এখানে মানুষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ!
জানে আলম ভয়ার্ত কণ্ঠে বিপন্নের মতো বলল- সে তো রাতের বেলায় তোমরা আসো। তখন তো আর আমরা ভিটের ত্রিসীমানার মধ্যেও আসিনে; কিন্তু এখন তো দিন। দিনের বেলা সবসময়ই তো আমরা গরুগুলোকে ঘাস খাওয়াবের নিয়ে আসি এহানে।
– দিন হোক আর রাত হোক কখনোই আসতে পারবি না তোরা। তোদের উপস্থিতি আমাদের নির্বিঘ্ন ও অবাধ চলাফেরায় অসুবিধা তৈরি করে।
– ঠিক আছে আর আসব না কখনও। কসম করে বললাম। এই তো এখনই চলে যাচ্ছি।
– এখানে এসে যে ভুল করেছিস তার খেসারত কে দেবে শুনি! এর জন্য তোকে দণ্ড পেতে হবে।
এসব বলে কালো রঙের ঘোড়াটি মস্ত বড় চোয়াল দুটো হাঁ করে আস্ত মুণ্ডুটি যেন গিলে নিতে এলো জানে আলমের। আর ঠিক তখনই সব শরীর ঘাম ছেড়ে মুদিত চোখ দুটো খুলে গেল তার। হঠাৎ জানে আলমের খেয়াল হল আরে লালী, ধবলা, ভুলু (ভোলা ভোলা চোখ বলে নাম ভুলু) আর একটা এঁড়ে বাছুর ঘোড়ার ভিটেতে ঘাস খাচ্ছে। কিন্তু কালুটাও তো এখানেই ছিল ওটা গেল কোথায়? চারদিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখল জানে আলম। নাহ্ কোথাও তো দেখা যাচ্ছে না। বদমাশটা নিশ্চয়ই পুঁটিগাড়া নয়তো মাসকাটির ভুঁইয়ে গৃহস্থ কৃষক ছাদেক মোল্লা যে বীজতলা তৈরি করেছে সেখানের কচি কচি সব চারা ধানগাছে মুখ দিয়েছে। জানে আলম ফিতেহীন তাপ্পিমারা পেন্টুলটি নাভির ওপর টানতে টানতে দৌড়াতে লাগল সেদিকে। মনে মনে যা ভেবেছিল হয়েছে আসলে তা-ই। ঘোড়ার ভিটে থেকে সাত-আটশ’ গজ দূরে মাসকাটির বীজতলায় সদ্য গজিয়ে ওঠা টিয়া রঙের চারাগুলো সাবাড় করায় ব্যস্ত কালু।
কালুটা ছোট থেকেই ডানপিটে ও বেপরোয়া। ওটাকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময়ই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কত মানুষের ধানক্ষেত, লাউক্ষেত, পুঁইয়ের মাচা ও খড়ের গাদা যে সাবাড় করেছে তার কোনো লেখাঝোকা নেই।
কালুর অত্যাচারেই হয়তো একবার প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ খড়ের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দেয় কালুকে। জানে আলমের ধারণা যে, নুরু মণ্ডলই এ কাজটি করে থাকতে পারে। কারণ বিষ খাওয়ার পর কালুর মুখ দিয়ে যখন অজস্র বুদবুদের মতো সাদা ফেনা উঠছিল তখন নুরু মণ্ডলই প্রথম দৌড়ে এসে বলেছিল ‘তোয়ারে গরু মনে হয় ভুল কইরে ধুতরা পাতা খাইয়ে ফেলেছে রে আলম। তাড়াতাড়ি হারেন ডাক্তারকে ডাইকে নিয়ে আয়’। এত বড় বিপদের মধ্যেও হাসি চেপে রাখতে পারেনি জানে আলম। নুরু মণ্ডলের এতটুকু জ্ঞানও নেই যে গরু, গরু হলেও কখনও বিষজাতীয় কিছু খায় না। কোনো কিছু খাওয়ার আগে গরু সব সময় শোঁক শোঁক করে শুঁকে নিয়ে তারপর সেটা খায়। জং ধরা মরচে পরা পুরনো একটা সাইকেলে চেপে রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে তালপাতার টোকা মাথায় হারান ডাক্তার এসে হাজির হয়। নানা রকম ওষুধপত্র ইনজেক্শন ইত্যাদি করে কালুকে সে যাত্রা সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়। গ্রাম-গঞ্জে হরহামেশাই প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করে শত্র“তার জের হিসেবে বোবা গৃহপালিত জীবজন্তুদের খাবারের সঙ্গে অনেকে বিষ খাইয়ে তাদের হত্যার চেষ্টা করে। আবার কখনো-সখনো মাছভর্তি পুকুরে গ্যালন-গ্যালন বিষ ঢেলে দেয়। সকালে দেখা যায় পুকুরের সব মাছ মরে ভেসে উঠেছে। মানুষ কেন যে নিরপরাধ, নির্বাক এই প্রাণীগুলোর সঙ্গে এমন করে, জানে আলমের সেটা মাথায় ধরে না। এ কারণেই বোধকরি গ্রাম্য ডাক্তারগুলোও বেশ অভিজ্ঞ হয়। তাদের জানা থাকে কোন ওষুধ প্রয়োগ করে সাধারণত তাদের কোনো মতে বাঁচিয়ে তোলা যায়।
ক্ষুদ্র শরীরের সব শক্তি দিয়ে জানে আলম গরুর দড়িটি জোরে টানতে থাকে- ‘কালু তোর ভালর জন্যিই কচ্ছি তাড়াতাড়ি বীজ তলাতিন উইটে আয়, সাদেক মোল্লা দেখলি পরে তোর পিটি পাঁচখান লড়ি ভাঙবিনি’। জানে আলমের হ্যাঁচকা টানে অবশেষে কালু বীজতলা থেকে উঠে আসে। এখন ওখান থেকে না সরে পড়লে সাদেক মোল্লা তার পিঠে লাঠি না ভাঙলেও জানে আলম যে তাকে এতটুকুও খাতির করবে না এতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে কালু সেটা ভালো করেই জেনে গেছে।
পূর্ব-দক্ষিণ কোনে এক পাঁজা কুচকুচে কালো মেঘ। ভাবে মনে হচ্ছে বড় ধরনের ঝড় উঠে আসবে শিগগিরই। এক পাল সাদা বক পূর্ব দিক থেকে উড়ে যায় পশ্চিমে। পূর্ব দিকের কোন অঞ্চলে ঝড় হয়তো ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর সেজন্য পাখ-পাখিরা দল বেঁধে সব পালিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে। আসন্ন বিপদের আঁচ পেয়ে গরুগুলোকে নিয়ে জানে আলম বাড়ির পথে পা চালায় দ্রুত। জানে আলম তার গরুগুলোকে উঠোনের শেষ প্রান্তে খড়ের গাদার পাশে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেয় শক্ত করে। বাড়ির ভেতর থেকে জানে আলমের বাবা মাজেদ শেখ চিৎকার করে ওঠে- ‘তোর কী কোনো জ্ঞান কাণ্ড নেইরে আলম, গরুগুলেক তুই উটোনে বাঁধলি। ঝড়-সাপট উইটে আসতিছে। গরু গুলেক গোয়ালে নিয়ে বাঁইদে দে। পয়দা কইরেছি এক আহাম্মক’। বাবার চিৎকার-চেঁচামেচিতে তড়িঘড়ি করে গুরুগুলোকে নিয়ে গোয়ালঘরে বেঁধে দেয়, তারপর কলপাড়ে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে গিয়ে পড়তে বসে জানে আলম।
অনেক ভাইবোনের সমাহার তাদের পরিবারে। বড় বোন হাফিজার বিয়ে হয়ে গেছে অল্প বয়সে, পাশের গ্রাম নদ্দিপুরে। হাফিজার পরের বোন নাফিজা, দু-দু’বার মেট্রিক ফেল করে এখন মায়ের সঙ্গে ঘরদোরের কাজকর্মে হাত লাগায়। নাফিজার জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে। বাবা মাজেদ শেখ গ্রামের পেশাদার ঘটক আলিমুদ্দিকে পারিতোষিক হিসেবে কিছু টাকা-পয়সাও তুলে দিয়েছে তার হাতে। এখন মোটামুটি ধরনের যে কোনো একটি ভালো গেরস্থ ঘরের ছেলে পেলেই নাফিজাকে শিগগিরই জামাইয়ের ঘরে পাঠানো যায়। ভাইবোনদের মধ্যে জানে আলম তৃতীয়। ভাই দু’জনের মধ্যে অবশ্য সে সবার বড়। জানে আলমের পর যে বোনটি, তার নাম রাহেলা। জানে আলমের চেয়ে বছরখানেক ছোট হবে; কিন্তু ও পড়ে জানে আলমেরও দু’ক্লাস নিচে। তারপরের বোনের নাম হালিমা। হালিমার মাথাটা বেশ পরিষ্কার। ক্লাস ফাইভে ও ট্যালেন্ট ফুলে বৃত্তি পেয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত একবারের জন্যও হালিমা দ্বিতীয় হয়নি। প্রত্যেক ক্লাসেই ও প্রথম। স্কুলের অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাই হালিমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, পড়াশোনাটা ও ঠিকঠাক মতো চালিয়ে যেতে পারলে জীবনে হয়তো অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারবে হালিমা। আর সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের নাম রঞ্জু। ওর বয়স মাত্র তিন বছর। যদিও কথাবার্তা কিছু বলে বটে; কিন্তু সম্পূর্ণরূপে মুখের আড় ভাঙেনি এখনও।
এতগুলো ভাইবোন সঙ্গে মা-বাবা নিয়ে দু’রুমের একটি ঘরে বসবাস তাদের। মাজেদ শেখ নিতান্তই গরিব কৃষক। অনেক কায়ক্লেশে শুধু মুখের আহার জোটে কোনো মতে। পরিবারের সবার জন্য পড়াশোনা সেজন্যই বলতে গেলে বলতে হয় বিলাসিতা পর্যায়ের। দুটি কামরার কোনো একটির এক কোণে পড়ার জন্য স্থান খুঁজে নিতে হয় জানে আলমের। আশপাশের প্রায় সব বাড়িতেই ইলেক্ট্রিসিটির বাতি জ্বলে। কিন্তু তাদের ঘরে আজও জ্বলে হারিকেন। এজন্য পরিবারের প্রায় সব ভাইবোনেরা আক্ষেপ ও উষ্মা প্রকাশ করলেও মাজেদ শেখের সাফ জবাব- যেখানে বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি নিয়েই বা কী লাভ। মোটের ওপর মাসে মাসে কিছু অতিরিক্ত বিল চুকানোর উটকো দায়ে নিজেকে আবদ্ধ করা।
জানে আলমের মতো দরিদ্র পরিবারে রাতের আহার পর্বটি চুকে যায় সন্ধ্যা নামার পরপরই। তারপর কিছু সময় ঘরের এক কোণে বই নিয়ে কিছুক্ষণ ঝিমুনি এরপর শুতে যাওয়া বিছানায়। বিছানা বলতে মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে টানা বিছানা। রঞ্জুকে নিয়ে মাজেদ শেখ ও জুলেখা বিবি শোয় একটি কামরায় আর অন্যটিতে থাকে জানে আলম ও তার তিন বোন। সকাল সকাল স্কুলে যেতে হয় বলে জানে আলমকে শুয়ে পড়তে হয় তাড়াতাড়ি। মাজেদ শেখও ভোরে উঠে চলে যায় জমিতে আবাদ করতে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানে আলম ভাবে- আজ এতগুলো পক্ষিরাজ ঘোড়া কী সত্যি সত্যি আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ভিটেতে! না কী ওগুলো সবই ছিল স্বপ্ন। না.. না… এত জীবন্ত দৃশ্য স্বপ্ন হয় কী করে।
হঠাৎ পাশের কামরা থেকে মাজেদ শেখ আর জুলেখা বিবির কথা শোনা যায়। যদিও তারা কথা বলছিল নিচু স্বরে তারপরও তাদের কথাগুলো শোনা যাচ্ছিল অবলীলায়। জুলেখা বিবি ফিসফিস করে বলল- ‘আরে কী করতিছো। ছাওয়াল, মিয়াগুলেতো এহনো ঘুমায়নি’।
মাজেদ শেখের কণ্ঠে উষ্মা- ‘না ঘুমালি আমি কী করবো। আমার বুঝি আর কোন কাম কাইজ নাই। আমার তাড়াতাড়ি ঘুমান লাগবি। ভোরে উইটে ক্ষেতে যাওয়া লাগবি। দুই বিঘে ভূঁই চষা লাগবি। এত কতা বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি কর মাগী’। জুলেখা বিবি মাজেদ শেখকে প্রাণপণ থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেও অবশেষে রণেভঙ্গ দিতেই হয় তাকে।
জানে আলম পাশের ঘরের উদ্ভূত পরিস্থিতি ভিন্ন পথে চালিত করার জন্য নাফিজাকে উদ্দেশ্য করে আজকের ঘোড়ার ভিটেতে পক্ষিরাজ ঘোড়া দেখার ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতাটি হয়তো বলতে যাচ্ছিল, আর অমনি আচমকা জানে আলমের মুখটি শক্ত করে চেপে ধরল নাফিজা।
পাশের ঘর থেকে মিনিট তিনেকের মতো চাপা গোংড়ানির শব্দ ভেসে এলো। তারপর চারদিক সুনসান নিস্তব্ধ।
চরদুলাই বি.আর উচ্চবিদ্যালয়টি জানে আলমের বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়। মিনিটি দশ-বারোর হাঁটা পথ। বেশিরভাগ দিন জানে আলমই স্কুলে পৌঁছায় সবার আগে। তারপর অন্য ছাত্ররাও আসে এক এক করে। নবম শ্রেণীর ছাত্র জানে আলম। বছর দুয়েক পরেই মেট্রিক পরীক্ষায় বসতে হবে তাকে; কিন্তু পড়াশোনায় একেবারেই মন নেই তার। ভালো লাগে শুধু গল্প-গুজব করতে। এজন্য ক্লাসের সবাই তার নাম দিয়েছে ‘গল্পবাজ’। গল্প বলায় এমন ওস্তাদ বালক বোধকরি অত্র গ্রামে আর দ্বিতীয়টি নেই। যে কোনো তুচ্ছ ঘটনা সে এমন জীবন্ত, প্রাণবন্ত ও নিপুণ শৈলীতে বয়ান করে যে সেগুলো শোনার পর মনে হবে যেন এর চেয়ে সত্য বুঝি আল্লার জমিনে আর কিছু হতে পারে না। জানে আলম যখন কোনো ঘটনার গুণ-কীর্তনে মত্ত হয় তখন মনে হয় যেন সেটি একটি মধুতীর্থ। আবার যখন সেই একই জানে আলম কোনো কিছুর নিন্দাচর্চা শুরু করে দেয় তখন সেটা হয়ে ওঠে কেউটে সাপের বিষের চেয়েও বিষাক্ত।
ময়রার দোকানে ঝুলন্ত সন্দেশের চারপাশে মাছি যেভাবে ভন ভন করে, জানে আলমের গল্পের আসরেও সেরকম নিয়মিত ও মজ্জামান কিছু শ্রোতা সবসময় তার পিছু করে। যে কোনো গল্প বলার সময় বিশেষ করে মতি, বিশু, ফয়েজ, ছানা, নিরাল সবসময়ই তার গল্পের নিত্যসঙ্গী শুধু তা-ই নয়, ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররাও তাকে ঘিরে থাকে বেষ্টনীর মতো করে। জানে আলমের বয়ানকৃত বেশিরভাগ গল্পই হয়তো তাদের মধ্যে কেউ বিশ্বাস করে না, তবে নিঃসন্দেহে সবাই যে তার গল্পের বিশেষ অনুরাগী ও উপভোগী সেটা ছেলেগুলোর চোখ-মুখ দেখলে সহজেই বোঝা যায়।
যথারীতি আজও জানে আলম ক্লাসে এসেছে সবার আগে। অপেক্ষার প্রহর যেন আর কিছুতেই শেষ হয় না। কখন আসবে তার গুণমুগ্ধ সব সঙ্গী। তারা একে একে সবাই যখন এসে উপস্থিত হয় ক্লাসে, জানে আলমও তখন উন্মুক্ত করে দেয় তার গল্পের ঝাঁপি। ঘোড়ার ভিটেয় গতকালের সব অলৌকিক ও অদ্ভুতুড়ে ঘটনাগুলো বর্ণনা করে সবিস্তারে। এসব গল্প শুনে জানে আলমের সতীর্থ বন্ধুরা সব হতভম্ব। এও কী হতে পারে! জানে আলমের এসব কল্পকাহিনী তাদের কিছুতেই বিশ্বাস হয় না।
গল্পের রেশ কাটতে না কাটতেই ক্লাসে প্রবেশ করে ইংরেজির শিক্ষক আবুল কাশেম। মিড টার্মের পরীক্ষা প্রায় আসন্ন। আর সেজন্যই বোধকরি তিনি রোল কল শেষ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন।
পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার বেশ কয়েকদিন পর যথারীতি রেজাল্ট বেরুল। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেল জানে আলম শুধু বাংলা ছাড়া আর সব বিষয়েই ফেল করেছে। স্কুলের হেডমাস্টার আবুল কাশেম জানে আলমের বাবা মাজেদ শেখকে স্কুলে ডেকে পাঠালেন। মাজেদ শেখকে উদ্দেশ করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন- ‘ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দিকে নজর দিতে পার না তো ওদের স্কুলে পাঠাও কেন মাজেদ মিয়া। ক্ষেত-খামারে কাজে লাগালেও তো এর চেয়ে বেশি লাভবান হতে’। কথাগুলো যে প্রধান শিক্ষক বিদ্রূপাত্মক সুরে বলছেন মাজেদ শেখের সেটাও সম্ভবত মাথায় ঢোকে না।
-ঠিকই কয়ছেন মাস্টার সাব। আমিও তাই ভাবতিছি ওক আমি মাটেই লাগা দেবো। ক্ষেত-জমি চাষ করুক। ফসল ফলাক। নয়তো গরু রাহুক। লেহাপড়া ওর হবি নানে এ আমি বুঝি ফালাইছি।
আবুল কাশেম মাজেদ শেখকে কষে ধমক দিয়ে বললেন- যাও মিয়া বাড়ি যেয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দিকে নজর দাও। তোমাকে আর ওকে মাঠে পাঠাতে হবে না। ওদের লেখাপড়ার ভালো পরিবেশ দাও। প্রতি বছর জমি না কিনে সে টাকা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার পেছনে বিনিয়োগ করো। পরে পাছে ভালো ফল পাবা। ওরাই তোমার আসল সম্পত্তি। মাঠের জমি আজ আছেতো কাল নাই কিন্তু ছেলেপুলেগুলো মানুষ হলে সারা জীবন কাজে লাগবে। তোমার সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসবে। বুঝলানি কিছু মিয়া। দু’একটা গৃহশিক্ষক রাখতে হলে রাখো। এভাবে চললে আলম কিন্তু মেট্রিক পাস করতে পারবে না। এ আমি আগে ভাগেই বলে দিচ্ছি।
হেডমাস্টার আবুল কাশেমের মুখে এসব কথা শুনে বিরস বদনে বাড়ি ফেরেন মাজেদ শেখ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার মুখে জানে আলমকে হাতের কাছে পেয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি- কী রে আলম আমি কী টাহা-পয়সা কম খরচ করতিছি। তুই বাংলা ছাড়া আর সব বিষয়ে ফেল করলু ক্যা। পড়লি ভালো কইরে পড়। না হলি পড়া ছাড়ান দিয়ে মাটে যা, ক্ষেত চাষ কর গরু রাখ। আইজ তোর জন্যি মাস্টারের মুখতিন এতোগুলো কতা আমার শুনা লাগলি।
জানে আলমও চেঁচিয়ে উত্তর দেয়- আমি কী করবো। স্যারেরা পার্সিয়াল্টি করেছে। আমাক ইচ্ছে করে ফেল করাইছে।
-তোক ইচ্ছে কইরে ফেল করাইলো। সেইডে ক্যামন কইরে আমাক ইটু বুঝা কতো দেহি।
-কী আর কব, অংকের টিচার বদিউর স্যার শান্তিপুরতিন স্কুল করে রোজ সাইকেল কইরে। প্রত্যেকদিনই আমাক ডাইকে কয় ওরে আলম দেখতো দেহি বাবা আমার সাইকেলের চাকা দুইডে ক্যাঁদো লাইগে এহেবারে নষ্ট হয়য়া রইছে। হালটের (রাস্তা) পাশে মাইটেলতিন (পুকুর) আমার সাইকেলখান ভালো কইরে ধুয়ে নিয়ে আয় তো বাপ। জানে আলম, মাজেদ শেখের দিকে তাকিয়ে অপ্রসন্ন ও উষ্মা মিশেল কণ্ঠে বলে- আব্বা আপনেই কন রোজ রোজ কী এসব করতি ভালো লাগে। দুই তিন দিন করার পর একদিন আমি কলাম- রোজ রোজ আমি এইসব কইরবের পারবোনা স্যার। আমাক আপনি মাপ করেন। এহন আপনি কন আব্বা আমাক উনি পাস করাবি না কী ফেল করাবি।
ধর্মের স্যার ওবায়দুর দুই তিন মাস আগে একদিন আমাক ডাইকে কলো ওরে আলম ক্লাস শেষ হলি আমার বাড়ি আসিস তো ইট্টু বাবা। ছাগল দুইডের জন্যি মাটতিন কিছু ঘাস কাটা লাগবি। উনার ছাগলের জন্যি ঘাস কাইটে দিছি পাঁচ-সাত দিন। তারপর দেহি রোজই আমাক ডাহে। আমি একদিন কলাম, স্যার আমার কী আর কোন কাজকম্ম নেই। আপনি ক্লাসের অন্য কাউকে ডাকেন। আমি রোজ রোজ আপনার ছাগলের জন্যি ঘাস কাইটপের পারবো না। আমি শিওর যে, উনি এই জন্যি আমাক ফেল করায়ছে। আমি যত খারাপ ছাত্রই হই, ধর্মে ফেল করা ছাত্র এই জানে আলম না। এ আমি জোর গলায় কবের পারি।
এভাবে জানে আলম প্রায় প্রত্যেকটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে কিছু না কিছু অভিযোগ আনলো। যে কারণে জানে আলম মনে করে শিক্ষকগণ তাকে ইচ্ছে করেই ফেল করিয়েছে। মাজেদ শেখ এবার তার ছেলের দিকে তাকিয়ে সন্দিগ্ধ চোখে জিজ্ঞেস করলো ইংরেজি সাবজেক্টটা যেন কে নেয় রে আলম?
-কে আবার, আমারে হেড স্যার আবুল কাশেম। সব ক্লাসে ইংরেজি উনিই তো পড়ান।
-আবুল কাশেম মানুষ হিসেবে অনেক ভালো। তাছাড়া উনি তো দেহি সবসময় তোর ভালো চায়। তয় তুই ইংরেজিতে ফেল করলি ক্যান। জানে আলম কস্মিনকালেও ভাবেনি তার পিতা মাজেদ শেখ এরকম একটি ব্রহ্মাস্ত্র তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করবে। বাবার মুখ থেকে কথাগুলো শোনার পর কিছু সময় চুপ করে রইলো জানে আলম। শুধুমাত্র এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উঠোনের বেলে মাটিগুলো সব তুলতে লাগলো।
-কী রে আলম কতা কইসনে ক্যা এহন। কতা কী সব ফুইরে গেলো এতো তাড়াতাড়ি।
-ইংরেজিত আমি ছোট বেলাতিনই দুর্বল। আপনাক আমি অনেকবার কইছি আমাক একটা ইংরেজির টিচার রাহি দেন। আপনি তো কোনোদিনও এটা প্রাইভেট টিচার রাহি দিলেন না। ফেল করবো না তো কী করবো।
মাজেদ শেখ আশ্বস্ত হলেন এই ভেবে যে, যাক ছেলেটি তাহলে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নিলো যে তারও লেখাপড়ায় গাফিলতি আছে। প্রথম দিকে অবশ্য তার ইচ্ছে হয়েছিল জানে আলমের গালে কষে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু কী ভেবে পরক্ষণেই সেই ইচ্ছে ত্যাগ করতে পেরেছিল মাজেদ শেখ। ঘণ্টাখানেক সময় ধরে ছেলেকে ওয়াজ নসিয়ত করলেন লেখাপড়ায় মন দিতে। আর ভালো করে লেখাপড়া না করলে তার শেষ পরিণতি যে গরুর রাখাল হিসেবে সেটাও তিনি তার পুত্র জানে আলমকে মনে করিয়ে দিলেন বারবার।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের দু’চার দিনের মধ্যেই পুনরায় ক্লাস শুরু হয়ে গেল পুরোদমে। ইংরেজির শিক্ষক আবুল কাশেম পরপর দু’তিন দিন খেয়াল করে দেখলেন- জানে আলম ক্লাসে অনুপস্থিত। প্রথম ক্লাসটি যেহেতু আবুল কাশেমই নেন সেহেতু রেজিস্টার খাতাটি তিনি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন- হ্যাঁ এই তো, তার তো ভুল হওয়ার কথা নয়। খাতাটিতে অ্যাবসেন্টের তিনটি ‘এ’ যুক্ত মার্ক জ্বলজ্বল করছে। তিনি ভেবে পেলেন না, ক্লাসে আসছে না কেন ছেলেটি। অসুখ-বিসুখ করেনি তো আবার। গ্রীষ্মের এই সময়টাতে চারদিকে জ্বর-সর্দির ব্যাপক প্রকোপ। আবুল কাশেম মনে মনে ভাবলেন মাজেদ শেখকে আবার তলব করতে হবে মনে হয়।
পরদিন আবুল কাশেম যথারীতি ক্লাসে ঢুকে রোল কল প্রায় শেষ করে এনেছেন, ঠিক সে সময় জানে আলম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল- ‘মে আই কাম ইন স্যার’। আবুল কাশেম মাথা ঘুরিয়ে জানে আলমের দিকে তাকিয়ে মাথাটি ঈষৎ নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। রোল কল শেষে আবুল কাশেম রেজিস্টার খাতাটি বন্ধ করে সেটা সরিয়ে রাখলেন টেবিলের একপাশে। তারপর জানে আলমের দিকে তাকিয়ে অনেকটা ঝাঁজালো কণ্ঠে বললেন- ‘আলম এগিয়ে আয় একটু তোর সঙ্গে আমার বিশেষ কিছু কথা আছে।’
জানে আলম কল দেয়া যান্ত্রিক পুতুলের মতো আবুল কাশেমের চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তোকে কতবার করে বলেছি লেখাপড়ায় ভালো করে মন দে। তোকে বলে বলে যখন কোন ফল পেলাম না তখন তোর বাবাকে ধরে কতটা অনুনয়-বিনয় করে বললাম ছেলেটাকে ভালো করে লেখাপড়া করাও। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তুই দু’তিন দিন ক্লাসে অনুপস্থিত এর কারণ কী? কেন আসিসনি ক্লাসে?
জানে আলম মেঝের দিকে তাকিয়ে শোকার্ত কণ্ঠে বলল- আমাদের একটি ভাই হয়েছিল তিন দিন আগে, লাল রঙের। ক্লাসে একেবারে সামনের বেঞ্চে একটি টকটকে লাল রঙের শার্ট গায়ে বসেছিল ছালেক, জানে আলম সেদিকে আঙুল তুলে বলল- এহাবারে ওই রহম লাল। কিন্তু জানেন স্যার ভাইডে আমার মইরে গেল। ভাই মারা গেলি বাড়ির অবস্থা যা হয়। মা তো উঠোনে গড়াগড়ি কইরে কান্না। সেই কান্না আর থামে না। বাবা বেলতলা বইসে ঝিমায়। রান্না-খাওয়া নাই, গা-গোসল নাই। আর স্কুলি আসি ক্যামন কইরে।
আবুল কাশেম কৌতূহলী কণ্ঠে বললেন- তোর তাহলে একটা লাল রঙের ভাই হয়েছিল তাই তো। কিন্তু মাস সাতেক কি আটেক আগে তুই যে একদিন বললি তোর একটা নীল রঙের ভাই হয়েছিলো। সেটাও কী বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে।
জানে আলম আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলে- আমার নীল রঙের ভাইডাও মারা গেছিলো এক দিন পর। তহনও মা কাঁদতি কাঁদতি অজ্ঞান হয়া গেছিলো। তিন চার দিন মুহি কোন দানা পানি দেয় নাই। সাথে আমরাও ম্যালা কান্নাকাটি কইরেছিলাম আমারে ভাইডের জন্যি।
তো এরপর তোদের যে ভাই হবে সেটা কী সবুজ রঙের হবে না কী হলুদ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জানে আলমের কথাগুলো বিমিশ্র ও পরস্পরবিরোধী। তাই শুধু জানে আলমের ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরাই নয় গ্রামের মুরব্বি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিরাও ওর কথায় ভরসা রাখতে পারেন না।
আবুল কাশেম জানে আলমকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন- কী রে আলম বললি না যে এরপর তোদের যে ভাইটি হবে সেটা সবুজ না হলুদ হবে।
জানে আলম এবার ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল- আমি কী কইরে কব কী রঙের ভাই হবে। ইডা তো আল্লা জানে। আপনি কী আমার কথা বিশ্বেস করতিছেন না।
জানে আলমের ঝাঁজালো কণ্ঠের কারণেই হবে হয়তো, আবুল কাশেমের মাথায় রাগ চেপে গেল। তিনি জানে আলমের ডান কানটি বাঁহাতে হির হির করে তার নাগালের মধ্যে নিয়ে এলেন। এবার বল দেখি তোর কত গাল-গপ্প আছে শুনি। লাল রঙের ভাই, নীল রঙের ভাই। আমাদেরকে তোর উল্লু মনে হয় তাই না?
আহ্ কী করতিছেন, কানে ব্যথা পাচ্ছি তো। এই বলে জানে আলম এক ঝটকায় আবুল কাশেমের হাতটি সরিয়ে দিল তার কান থেকে। আর যায় কোথায়? জানে আলমের এহেন বেয়াদবিতে আবুল কাশেমের ব্রহ্মতালুতে যেন অগ্নিসংযোগ ঘটল। ‘এ্য কেয়া বেততারিয়ত’। আবুল কাশেম অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললেন- ‘এই ফয়েজ লাইব্রেরি রুম থেকে ভালো দেখে দুটো বেত নিয়ে আয় তো জলদি’।
ফয়েজ সঙ্গে সঙ্গে লাইব্রেরি ঘর থেকে দুটো বেত নিয়ে এসে তুলে দেয় আবুল কাশেমের হাতে। আর ওমনি আবুল কাশেমও বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে জানে আলমের ক্ষুদ্র শরীরটির ওপর। বেত্রাঘাতের এই তাণ্ডবলীলা চলে বেশ কিছু সময় ধরে। মার খেতে খেতে জানে আলম এক সময় মূর্ছিত হয়ে লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। ইতোমধ্যে আবুল কাশেমও যেন কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পান। এ কী করছেন তিনি। রাগে অগ্নিগর্ভ হয়ে তিনি যেন অন্য কোন এক দুনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হয়েছিল তার। নিজেকে নিবৃত্ত করে, গিয়ে বসলেন চেয়ারটাতে। দু’এক জন বিদ্যার্থীর দিকে আঙুল তুলে ইশারা করলেন জানে আলমকে তুলে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে।
চেয়ারে বসে আবুল কাশেম টের পেলেন ছাত্রছাত্রীদের পেটানোটাও কতটা পরিশ্রমের কাজ। জানে আলমকে পেটাতে গিয়ে আজ কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। অথচ যখন তার যৌবন ছিল তখন নিদেনপক্ষে সপ্তাহে দু’চারটি বেত ছাত্রদের পিঠে ভেঙে হাতের সুখ করতেন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় আজ জানে আলমের কাতরানিতে তিনি যেন একটু ব্যথিত হলেন। মনের কোনো এক কোণে কিঞ্চিৎ অনুশোচনা উঁকি দিয়ে গেল। নাহ্ আজ আর তিনি ক্লাস নেবেন না। ছাত্রছাত্রীদের কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলেন শ্রেণীকক্ষ থেকে।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে জ্বর উঠলো জানে আলমের শরীরে। রাত যত গভীর হতে লাগলো জ্বরও ততটাই প্রকট আকার ধারণ করতে লাগল। সকালবেলা দেখা গেল জ্বরের প্রকোপে জানে আলম সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। মাজেদ শেখ ছেলের শরীরে হাত দিয়ে দেখলেন ভয়ানক তাপে শরীর যেন একেবারে পুড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এই উত্তাপে অনায়াসে মুড়ি কিংবা খৈ ভেজে নেয়া যায়। পাশ থেকে জুলেখা বিবি, মাজেদ শেখকে উদ্দেশ করে আর্তনাদ করে বললেন- দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া তামশা না দেইখে টপ কইরে ডাক্তার ডাইকে নিয়ে আসেন। আমার ছেলেডার জ্বরে সারা শরীর পুইড়ে যাচ্ছে।
মাজেদ শেখ ছুটলেন ডাক্তার আনতে। হাতেম আলী পাস করা ডাক্তার না হলেও তার হাতযশ বেশ ভালো। বিপদ-আপদে গ্রামের লোকজন তার শরণাপন্নই প্রথমে হয়। জানে আলমের নাড়ি পরীক্ষা করে অসুখের সব বৃত্তান্ত দেখে ওষুধপত্র দিলেন হাতেম ডাক্তার সঙ্গে এও বললেন- চিন্তার কিছু নাই ঠিকমতো ওষুধ খেলে জানে আলম সেরে উঠবে দ্রুত।
পাঁচ সাত দিন কেটে গেলেও জ্বর নামার কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হল না। উপরন্তু অবস্থা আরও খারাপের দিকে এগুলো।
গ্রামের সবাই মাজেদ শেখকে বুদ্ধি পরামর্শ দিল পাবনা সদর হাসপাতালে আর নয়তো ঢাকার বড় কোনো হাসপাতালে নিয়ে যেতে। মাজেদ শেখের মাথায় কিছুই যেন আর খেলছে না। কী করবেন তিনি। মনে মনে ভাবলেন নাহ আর দেরি করা চলে না। ঢাকাতেই নিয়ে যাবেন তিনি ছেলেকে, বড় কোনো ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাবেন সেখানে।
যথাশিগগিরই জানে আলমকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে লাগলেন মাজেদ শেখ। প্রতিদিনই একবার পালা করে দেখতে আসে হাতেম ডাক্তার। প্রতিবারই ভিজিট নেন দু’শত টাকা। আর বলে যান এইবার যে ওষুধ দিয়েছি এর নাম হল এন্টিবায়োটিক। এবার জ্বর বাপ বাপ করে পালাবে। কিন্তু জ্বর বাপ বাপ করা তো দূরের কথা কিঞ্চিৎ পরিমাণও কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
রাতে মনে হয় জানে আলমের জ্বর আরও একটু বাড়ল। পানি খেতে চাইল মায়ের কাছে। জুলেখা বিবি গেলাসে করে ছেলের মুখে পানি একটু তুলে দিলেন বটে; কিন্তু সে পানি জানে আলম খেতে পারল না। কাশি উঠে মুখ থেকে প্রায় সব পানি গড়িয়ে পড়ে গেল বিছানায়। সঙ্গে ঈষৎ রক্তও দেখা গেল। এর পরপরই জানে আলম একেবারে চিরদিনের জন্য শান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ল বিছানায়। আর চোখ খুলল না সে। সবকিছু যেন শেষ হয়ে গেল নিমিষে। মাজেদ শেখ ঘুমিয়ে ছিলেন। আর জুলেখা বিবি ছেলের শিয়রের পাশে থেকেও কিছু বুঝলেন না। সকালে হাতেম ডাক্তারকে ডাকা হলে তিনিই প্রথম মৃত্যুর সংবাদটি দিলেন। জানে আলম এ দুনিয়াতে আর নেই। শুধু দেহটি পড়ে আছে বিছানায়। এবার হাতেম ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন; কিন্তু কোনো ভিজিট নিলেন না। আর জানে আলম যে পুনরায় সুস্থ হয়ে আবার উঠে দাঁড়াবে সেরকম কোনো আশার বাণীও শোনালেন না। শুধু ডেথ সার্টিফিকেটের কাগজটি বিছানায় রেখে চলে গেলেন সবার অজান্তে।
জুলেখা বিবি কান্নাকাটি করে উঠোনে গড়াগড়ি খেতে লাগল। মাজেদ শেখ শোকে পাথর। বোনদের চোখে-মুখে ক্রমাগত আহাজারি। শুধু ছোট ভাই রঞ্জু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সবার দিকে।
হেডমাস্টার আবুল কাশেমের কাছে জানে আলমের মৃত্যুর সংবাদটি যেন বিনা মেঘে বজ পাতের মতো। এ কী করে সম্ভব। বেত্রাঘাতে জ্বর এবং অবশেষে একেবারে মৃত্যু। এ তো অবিশ্বাস্য। কিন্তু এটি আজ চরম সত্য যে জানে আলম আর এ দুনিয়াতে নেই। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না আবুল কাশেম। তার কী মরা বাড়িতে যাওয়া উচিত। নাকি আবার অপ্রীতিকর কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। নানা সাত-পাঁচ ভেবে শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন অবশ্যই যাবেন তিনি। তিনি তো আর জানে আলমকে হত্যার উদ্দেশে প্রহার করেননি। তাছাড়া মাজেদ শেখেরও এ বিষয়টি নিশ্চয়ই জানা আছে যে তার ছেলের কত হিতৈষী সে।
মরা বাড়িতে যা হয়, চারদিকে কান্নার রোল। জানে আলমদের বাড়ি পৌঁছে সেখানে আবসার শেখকে দেখে আবুল কাশেম কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। আবসার শেখ পণ্ডিত প্রবর ব্যক্তি সেই সঙ্গে জানে আলমদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করে। তার পাশে গিয়ে বসলেন আবুল কাশেম। আবসার শেখ আবুল কাশেমকে উদ্দেশ করে বললেন- এটা তুমি কী কাজ করলে কাশেম। ছোট মানুষদের কেউ এভাবে পেটায়।
-কিন্তু আমি কী করব আবসার ভাই। জানে আলমের মুখ থেকে মিথ্যা কথা শুনে ভয়ানক রাগ চেপে গিয়েছিল মাথায়। নিজেকে আর সংবরণ করতে পারিনি। কিন্তু কাজটি যে খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে এটা আমি এখন বুঝতে পারছি।
-আমি সবই শুনেছি। কিন্তু এখন বুঝতে পেরে আর কী লাভ হবে বলো। শোন কাশেম একটা কথা বলি- পৃথিবীতে অনেক কিসিমের মানুষ থাকে। জানে আলম হয়তো একটু বাড়িয়ে কিংবা অতিরঞ্জন করে অনেক সময় অনেক কিছু বলতো। তার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের চেয়ে অন্যরকম। তার মানে এই নয় যে সে মিথ্যা বলছে। জানে আলম যে তোমাকে বলেছে ওর একটা লাল রঙের ভাই হয়েছে এর পেছনের কারণটা হল, ডেলিভারি হওয়ার সময় শিশুটির সব শরীর রক্তে ভিজে লাল হয়েছিল এই জন্য জানে আলম তোমাকে বলেছে যে তার একটি লাল রঙের ভাই হয়েছে। কিন্তু তুমি বুঝেছ ভুল।
-কিন্তু সাত-আট মাস আগে যে জানে আলম একদিন বলল ওর একটি নীল রঙের ভাই হয়েছে সেটা কীভাবে সম্ভব।
-আরে বেওকুফ তখন যে শিশুটি জন্মেছিল তার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা ছিল। কারণ শিশুটির জন্ম হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের আগে। একদিনের বাচ্চা ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না বলে ব্যথায় শিশুটির সব শরীর নীল রং ধারণ করেছিল। একদিন পরেই অবশ্য বাচ্চাটি মারা যায়। সেজন্যই তো ক্লাসে তোমাদের জানে আলম বলেছিল যে ওর নীল রঙের একটি ভাই হয়েছে।
এসব শুনে আবুল কাশেম নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল চেয়ারটিতে। জানে আলম নামক ছোট একটি ছেলের মধ্যে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতিচ্ছবিই যেন দেখতে পেল আবুল কাশেম। বিন্দুর মধ্যে বিশালত্বের সন্ধান পেয়ে স্থানু হয়ে গেল সে। তার দু’চোখ উপচে পানি এলো।
লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী