ভীষণ গরমে মনোরম ঠান্ডা পানীয়, বৃষ্টিভেজা ঠান্ডায় ধুম্রায়িত চা বা কফি, উৎসব অনুষ্ঠানে মিষ্টি মুখ আর সন্ধ্যা নামলে মুড়ি-চপ তো হামেশাই লেগে আছে বাঙালির যাপনে। তাই বাংলা জুড়ে রয়েছে জিভে জল আনা ঐতিহ্যবাহী নানান ধরণের খাবার। এই যেমন ধরুন বর্ধমানের সীতাভোগ মিহিদানা, নবদ্বীপের লালদই, চন্দননগরের জলভরা, গোলবাড়ির মটন কষা, মিত্র কাফের ব্রেন চপ…।
শোনা যায় ব্রিটিশরা ভেড়া, শুয়োরের মাংস দিয়ে চপ-কাটলেট বানাতো। ইংরেজীতে চপ বা chopping মানে শুয়োর, ভেড়া, বাছুরের থেকে কর্তনকৃত মাংসকে প্রায়ই চপ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বাঙালির রান্নাঘরে সহজে প্রবেশ করেনি এহেন বস্তু। তাই বেগুন, কুমড়ো, আলুর ফালি কেটে চপ বানানো। এরপর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা খেতে শুরু করে মটন চপ। পরিবর্তন আসে বাঙালির জীবনে। আর বাঙালি সবসময় নতুনকে সৃষ্টি করতে সিদ্ধহস্ত। কেবলমাত্র মাংস কেটে চপ তৈরি হলোনা, ব্রেন দিয়েও তৈরি করা হলো ‘ব্রেন চপ’।

এখন ব্রেন চপ অনেক জায়গায় পাওয়া গেলেও, ভোজনবিলাসিদের বিশেষ করে উত্তর কলকাতার মানুষের একটি দোকানের কথাই মনে পড়ে ‘মিত্র কাফে’।
সালটা ১৯১০, শোভাবাজার মোড়ে গণেশ মিত্র একটি চপ, কাটলেটের দোকান খোলেন। সন্ধ্যা নামলেই মানুষজনের যাতায়াত শুরু হতো ‘মিত্র কাফে’ নামের এই রেস্টুরেন্টে। গ্রে স্ট্রিটে থাকতেন সুশীল রায়। প্রায়ই আসতেন এই দোকানে। আসা-যাওয়ায় আড্ডার মধ্যে মানুষ দুটির মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। কথায় কথায় একদিন গণেশবাবু সুশীলবাবুকে তার দোকানটি চালানোর জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু দোকান কেনার মতো এত টাকা কোথায় সুশীল বাবুর! সে কথা শুনে গণেশবাবু হেসে বলেছিলেন, সে নয় তুমি আমাকে খাইয়ে টাকা শোধ করে দিও।

দোকান নিলেন সুশীলবাবু তবে নাম পাল্টালেন না। তখনকার সেই মানুষগুলোর মধ্যে মূল্যবোধ আর বন্ধুত্বের ক্ষমতা ছিলো অসীম। সন্ধ্যে হলে যে মানুষগুলো চপের দোকানে এসে উপস্থিত হতো, তারা কী আসতো শুধুমাত্র খাবারের টানে! না, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের টান ছিলো অপরিসীম। আর বন্ধু মানেই তো মিত্র। তাই ‘মিত্র কাফে’— ‘মিত্র কাফে’ই রয়ে গেলো।
সুশীলবাবু ছিলেন স্বল্পায়ু। কয়েক বছরের মধ্যে মারা যান তিনি। ছেলে তখন ছোট। দোকানের হাল ধরলেন স্ত্রী গীতা রায়। তখন পরাধীন দেশে ঘরের বউরা গেরস্থালির কাজ ছাড়া ব্যবসা সামলানোর সাহস জোটাতে অভ্যস্ত হননি। সেইরকম একটা সময়ে গীতাদেবী নিজের হাতে মাথা উঁচু করে মিত্র কাফের দায়িত্ব তুলে নেন। নিজে বাজার করতে যেতেন। ভালো কোয়ালিটির মাছ, মাংস না পেলে রিলেটেড আইটেম সেদিন তৈরি করা হতো না। ব্রেন চপ সুশীলবাবুর আমলে চালু হয়। এরপর গীতা দেবীর আমল থেকে আজ অবধি এই সিগনেচার ডিশটির চাহিদা অক্ষুন্ন রয়েছে। এখনো মানুষরা তারিয়ে তারিয়ে খান মিত্র কাফের ব্রেন চপ।
ব্রেন চপ আদতে পাঁঠার মাথার ঘিলু দিয়ে বানানো চপ।

আগের দিন রাত্রে পাঁঠার মগজ আদা-রসুন পেস্ট, কুচানো লঙ্কা, দারচিনির গুঁড়ো, স্পেশাল মসলা দিয়ে ম্যারিনেট করা হয়। মিত্র কাফের স্পেশাল মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে চপের স্বাদের আসল রহস্য। পরের দিন বিকালে হাঁসের ডিমকে বিশেষভাবে ফেটিয়ে সাদা বিস্কুটের গুঁড়ো, কিছু নিজস্ব মশলা দিয়ে বাটারে চুবিয়ে গরম গরম ভেজে স্যালাড, কাসুন্দি, সস দিয়ে পরিবেশন করা হয় ব্রেন চপ।
এই ব্রেনের মধ্যে থাকে দৈনিক প্রয়োজনের থেকে একটু বেশি আয়রন, প্রোটিন, BDNF, নিয়াসিন, ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন সি, কপার, ফসফরাস, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি acid, phosphatidylcholine and phosphatidylserine ইত্যাদি। প্রতিটি চপের দাম ৭০/৮০ টাকা। এখন শোভাবাজার ছাড়া মিত্র কাফের অন্য কোন আউটলেটে ব্রেন চপ পাওয়া যায় কিনা সঠিক জানা নেই।

মাছের মাথা ডাল, শাক, তরকারি ইত্যাদি নানান পদ খাওয়া হয়, এছাড়া রোজ রোজ ঘরের মানুষগুলোর মাথা চিবনোর টেস্ট নেওয়া হয়ে গেলে এবার ট্রাই করা যায় ছাগলের ভেজা ফ্রাই।।
Source : adapted from various journals and articles.
পাঠকদের ভেজা ফ্রাই করে ছাড়লি, মিত্র কাফের সেল বাড়বে, কিন্ত এতো ব্রেন রোজ পাওয়ার আশা কম,নতুন বছরের আগমনে দারুণ মেনু, লেখাটাও ওয়েল ম্যারিনেটেড।
তোমার মতামতে আমি ঋদ্ধ হই.. উৎসাহ পাই।
থ্যাংক ইউ ????????
*ব্রেন চপের সম্মোহন*অপূর্ব তথ্য সহকারে
পরিবেশন ধন্যবাদের অপেক্ষা রাখে।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।