অয়ন আজ বেশ তেতে আছে। একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। সন্ধ্যে হয়ে এল অথচ মিতুন এখনো ঘরে ঢোকেনি। আগেও মাঝে মাঝেই এমন করেছে কিন্তু এতটা দেরী আগে কখনো করেনি। নিশ্চয়ই কোথাও ব্যাট বল পেটাচ্ছে। বাড়ীর লোকগুলোর যে চিন্তা হতে পারে, সেই ব্যাপারে ছেলের কোন হুশ আছে? অয়ন পাড়ার মাঠে খোঁজ করে এসেছে। সেখানে নেই। শ্রীরূপার ওপরেও আজ অয়নের রাগ হল। বাবারা অফিস কাছারিতে থাকে। কতটা সময় দিতে পারে? মা হিসেবে শ্রীরূপার ছেলেকে আরও বেশী ডাক দেওয়া উচিত নয় কি? সারাদিন খেটে খুটে এসে কাঁহাতক ভাল লাগে এসব ঝামেলা?
কী যে ক্রিকেট পাগল একটা ছেলে হয়েছে। ক্রিকেট ওর একমাত্র ধ্যান জ্ঞান। পড়াশুনায় মন নেই, খালি ক্রিকেট। অনেক সময় ঘরের মধ্যেও ব্যাট নিয়ে একবার এদিকে ঘোরাচ্ছে, আর একবার অন্য দিকে। কত রকমের ভাব ভঙ্গি ব্যাট নিয়ে। সৌরভ গাঙ্গুলির অন্ধ ভক্ত। “দাদার” বিভিন্ন বয়েসের, বিভিন্ন ভঙ্গিমার ছবি বই খাতার ভেতরে। এমনকি লর্ডসে সৌরভের সেই খালি গায়ের ছবিও ঘরের দেওয়ালে সেলোটেপ দিয়ে লাগানো।
মিতুন ক্লাস সেভেনে উঠল। রেজাল্ট খুব সাধারণ অথচ ওর ছোট বোন তিতিনের কী ঝকঝকে রেজাল্ট। প্রাইভেট টিচারও রেখেছে। বার দুই তিন শ্রীরূপাই অয়নকে স্কুলে ঠেলে পাঠিয়েছিল এই ব্যাপারে কথা বলার জন্য। স্কুলের টিচাররাও তেমনি। বলে কিনা “সচিন তেন্ডুলকার পড়াশুনায় ভালো ছিল বলে তো শুনিনি কোনদিন। ও কিন্তু ক্রিকেটটা ভালই খেলে। একটা ভালো কোচের আন্ডারে যদি দিতে পারেন তাহলে খুব উন্নতি করবে। পড়াশুনার দিকটা আমরা নজর রাখছি তো”। যাদের পড়াশুনা দেখার কথা, তারাই যদি এই কথা বলে, তাহলে আর কী বলার আছে। প্রাইভেট টিচারকে আরও চাপ দিতে বলেছে। সে বেচারাও অসহায়ের মতো তাকায়। উনি যে চেষ্টা করেন না, বকা ঝকা করেন না — সেটা তো অয়ন, শ্রীরূপা অস্বীকার করতে পারে না।
“দাভাই! দাভাই এসেছে” — তিতিনের উল্লসিত চিৎকারে সম্বিত ফিরল অয়নের। আজ আর কোন ছাড়ন ছোড়ন নেই হতচ্ছাড়াটার।
ওই ঢুকল চোরের মতো। সারা পায়ে ধুলো, ঘেমে একশা। হাতে অয়নেরই কিনে দেওয়া পুরনো ক্রিকেট ব্যাট।
“কী ব্যাপার তোর? হুম। কটা বাজে? হাতির পাঁচ পা দেখেছিস তুই? এবার থেকে খেলা বন্ধ। ওই ব্যাট, বল সব আমি ফেলে দেব”।
অয়নের চিৎকারে শ্রীরূপা ছুটে আসে। ছেলের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ায়। ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে মিতুন বলল, “ বাপি, আজ ম্যাচ ছিল, তাই….”।
“ম্যাচ তো আগেও ছিল, এতো দেরী তো করিসনি আগে। কাল থেকে খেলা বন্ধ” —
“বাপি, ফাইনাল ম্যাচের শেষে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন প্রোগ্রাম ছিল। আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সৌরভ গাঙ্গুলি এসেছিলেন” —
সৌরভ গাঙ্গুলির নাম আর চ্যাম্পিয়ন হবার কথা শুনে একটু থমকালেও শাসনের রাশ আলগা করতে চাইল না অয়ন। চেঁচিয়েই বলল, “সে না হয় বুঝলাম। মাকে বলে যাসনি কেন?”
শ্রীরূপা তখন বলল, “খেলা আছে আমাকে বলেছে কিন্তু এতো দেরী হবে …”—
“মা ঠিকই বলেছে। আসলে ভেবেছিলাম হেরে যাব। ফাইনালে উঠতে পারব না। বালিগঞ্জ বয়েজ তো অনেক বেশী ভালো টিম। গতবারের চ্যাম্পিয়ন” —
অয়ন বেশ বুঝতে পারছে ওর ভেতরের তেজটা কমে আসছে। হঠাৎ ছেলের জামার পকেটের দিকে ওর দৃষ্টি পড়ল। লাল ফিতের মতো কিছু একটা বেরিয়ে আছে।
“পকেট থেকে ওটা কী ঝুলছে, লাল ফিতের মতো…কী ওটা অ্যাঁ?”
ভয়ে ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে একটা ইয়া বড় সুদৃশ্য সোনার জল করা মেডেল বার করে বাবার সামনে ধরল। তাতে বেস্ট প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ খোদাই করা। ইন্টার স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। অয়ন কেমন যেন চুপসে গেল। ছেলের চোখে চোখ রাখতে দেখতে পেল শান্ত ঝিলের মায়া জড়ানো দৃষ্টি। অয়নের বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। বড় আদর করতে ইচ্ছা করল ছেলেটাকে। কিন্তু সদ্য পালন করা শাসকের ভূমিকা থেকে চট করে স্নেহশীল বাবার ভুমিকায় নিজেকে বদলে ফেলা সমীচীন মনে করল না। শুধু গলা খাঁকারি দিয়ে গলার কাছে উঠে আসা স্নেহমাখা ভেজা আবেগটাকে চাপা দিয়ে কোন মতে বলল, “তোর ব্যাটটা পুরনো হয়ে গেছে, তাই না রে মিতুন?
“হুউ। বাপি, তোমাকে কিন্তু একটু বাইরে যেতে হবে। সবাই অপেক্ষা করছে”
অয়ন, শ্রীরূপা দুজনেই অবাক হল। “কারা অপেক্ষা করছে?”
“সৌরভ গাঙ্গুলি। তোমার সাথে কথা বলবেন”
অয়ন লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
“হোয়াট? কে ডাকছে? কী বলেরে ছেলেটা। বাপের সাথে ইয়ার্কি?”
“না, বাবা উনি তোমার সাথে কথা বলবেন বলে বাইরে গাড়ীতে অপেক্ষা করছেন” —
অয়ন আর শ্রীরূপা পলকে মুখ চাওয়া চায়ি করে। বিহ্বলতা কাটিয়ে তারপরে দুজনেই ঘরের বাইরে ছুটে গেল। তিতিন আর মিতুনও পিছু নিল। ওদের অবাক হবার আরও অনেক বাকী ছিল। একটা ঝকঝকে গাড়ী ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। গাড়ীর মধ্যে মিতুনের স্কুলের হেড মাষ্টারমশাই আর গেমস টিচারও আছেন।
ওরা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই, সৌরভ গাড়ীর দরজা খুলে নেমে এলেন। সেই সাথে মিতুনের স্যাররাও।
“একটা ব্যাপারে আপনার অনুমতি চাইতে এসেছি। আমি একটা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি খুলতে চলেছি। অনেকটা কাজ এগিয়ে গেছে। আপনার ছেলেকে আমি চাই। ভীষণ প্রমিসিং ও। ভাল ট্রেনিং পেলে ও অনেক দূর যাবে। ওইটুকু ছেলে আজ যে ভাবে হারা ম্যাচ জিতিয়েছে দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। কিন্তু লেখাপড়ার মতো ক্রিকেটেও অনেক কিছু শিখতে হয়” —
কোন মতে ঢোঁক গিলে অয়ন বলল, “আজ্ঞে, ওর স্কুলের স্যাররাও বলেছিলেন একজন ভাল কোচের আন্ডারে ওকে দিতে। এর জন্যে কিরকম খরচ পড়বে?”
সৌরভ মুচকি হাসেন। তারপরে হেড মাষ্টারমশাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, “এক পয়সাও না। সব কিছু আমরা দেব। ব্যাট বল, ড্রেস, প্যাড, জুতো সব কিছু। প্রথম কদিন একটু আপনাকে পৌঁছে দিতে হবে। তারপরে আমরা গাড়ীর ব্যাবস্থা করব। আমি হেড স্যারকে সব বলেছি। আপনি একটা কনসেন্ট লেটার স্যারকে দিয়ে দেবেন। এটা জাস্ট একটা ফর্মালিটি। আপত্তি নেই তো? অবশ্য আপত্তি করলেও আমি শুনছি না।
“না, না আপত্তি কেন? তবে, একদম পড়াশুনা করে না। পড়তে বসেও…”
“বাই দ্য বাই, আর একটা কথা। ভবিষ্যতে ছেলেদের মাসে মাসে একটা স্টাইপেন্ড দেওয়া যায় কিনা ভাবনা চিন্তা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর সাথে প্রাথমিক কথা হয়েছে। উনি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। কিছু ইন্ডাস্ট্রি হাউসের সাথেও কথা হয়েছে। লেট’স সি”
অয়নকে এই কথাগুলো বলে মিতুনের দিকে ফিরে বলল, “বাবা মার কথা শুনবে। পড়ার সময় মন দিয়ে পড়াশুনা করতে হবে। খেলার সময় মন দিয়ে খেলা। দুটোই কিন্তু দরকার, মিতুন বাবু”।
চলে গেলেন ক্রিকেটের রাজপুত্র। তার পক্ষীরাজ করে। ভিড়ও সরে গেল। চলে গেল যে যার মতো। শুধু চারটে প্রাণী যেন একটা ঘোরের মধ্যে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। এতক্ষণ যেন ওরা একটা স্বপ্নের জগতে ছিল। শ্রীরূপাই প্রথম নীরবতা ভাঙ্গল। ছেলের কাঁধে স্নেহের হাত রেখে বলল, “মেডেল দিয়ে কি পেট ভরবে মিতুন সোনা? ভালো করে হাত পা ধুয়ে আয়, তাড়াতাড়ি। তোর প্রিয় কিমা ঘুগনি করেছি’’।
হৈ হৈ করতে করতে চারজনে বাড়ীর দিকে ছুটল।
যাঁরা কিশোর উপযোগী এই গল্পটা পড়েছেন তাঁদের অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।