প্যারীচাঁদ মিত্র
মদ খাওয়া বড় বাড়িতেছে মাতাল নানারূপী। কলিকাতায় যেখানে যাওয়া যায় সেইখানেই মদ খাইবার ঘটা। কি দুঃখী, কি বড় মানুষ, কি বৃদ্ধ সকলেই মদ্য পাইলে অন্ন ত্যাগ করে। কথিত আছে, কোন ভদ্রলোক একগ্রামে কিছু দিবস অবস্থিতি করিয়াছিলেন; তথায় দেখিলেন, প্রায় সকল লোক অহোরাত্র অবিশ্রান্ত গাঁজা খাইতেছে। এই ব্যাপার দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এ-গ্রামে কত লোক গাঁজা খায়।
গাঁজাখোরের মধ্যে একজন উত্তর করিল, আমরা সকলেই গাঁজা খাইয়া থাকি, গ্রামের শালগ্রাম ঠাকুর ও আমাদিগের টেপি পিসি যাহার বয়স ৯৯ বৎসর কেবল তাহারাই খারিজ আছেন। কলিকাতা এক্ষণে প্রায় তদ্রূপ।
মদ্যপানে কি শরীর ভাল থাকে? কোন কোন মদ্য পরিমিত রূপে পান করিলে ধাতু বিষয়ে উপকার হয় বটে, ডাক্তারও এরূপ বিধি দেন, কিন্তু নিরন্তর পেয়ালা বাজিতে শরীর ত্বরায় নষ্ট হয়। কত কত লোক মদ্য পান করিয়া অধোপাতে গিয়াছে । যাহারা বিয়ার কি শেরি অথবা অন্য বিধি নরম গোছের মদ্যের নামও সহ্য করেন না, জল না মিশাইয়া কেবল ব্রান্ডি বোতল বোতল পান করেন- তাহারা প্লীহা, পক্ষাঘাত ও অন্যান্য রোগে যে শীঘ্র আক্রান্ত হবেন, তাহাতে আশ্চর্য কি?
মদ্যপানে যে কেবল শরীর নষ্ট হয় এমত নহে, শরীরের সঙ্গে বুদ্ধি ও ধনও যায়। জ্ঞানশূন্য হইয়া ভোঁ অথবা টুপ ভুজঙ্গ রূপে থাকিলে কি ফল? জ্ঞানকে একেবারে ডুবাইয়া আমোদ করিলে যে আমোদে আমোদ হইতে পারে না, মনকে নির্মল রাখিলে সৎকর্ম করিলেই প্রকৃত আমোদ হয় । মদের জোরে লম্ফ ঝম্ফ হইতে পারে বটে, কিন্তু সে কতক্ষণে বাকি? অনেক ব্যক্তি মদে আসক্ত হইয়া বুদ্ধিকে একেবারে বিসর্জন দিয়াছে- তাহাদিগের মান সম্ভ্রমও অন্তর্ধান হইয়াছে।
মদের অদ্ভুত শক্তি। যে ব্যক্তি পান করে, সে দুধকে জল বলে। কলিকাতায় কোন বুনিয়াদি মাতালের বাটিতে চাকর প্রস্রাব করিতেছিল, মাতাল বাবুর মস্তকে পড়িলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন আমার মাথায় কি পড়িল? পরে শুনিলেন প্রস্রাব, তখন আপনি কহিলেন তবে ভাল, আমি বোধ করিয়াছিলাম জল।
কথিত আছে, অন্য এক বুনিয়াদি মাতাল বাবু মদে মত্ত হইয়া দশমীর দিবস প্রতিমা বিসর্জনকালীন নৌকায় দাঁড়াইয়া রোদন করিতে করিতে বলিয়াছিলেন–
“আরে! মা চললেন— মার সঙ্গে কি কেহ যাবে না, আর বেটা ঢাকী তুই যা” এই বলিয়া ঢাকীকে ধাক্কা দিয়া জলে ফেলিয়া দেন। ঢাকী ভাসিতে ভাসিতে বহু ক্লেশে বাঁচিয়াছিল, আর তাঁর বাটীর দিক দিয়াও যাইত না।
আবার শুনা আছে, কোন মাতাল ভোজন করিতে বসিয়াছিলেন, তাহার পার্শ্বে জলের ঘটি ছিল না — ত একটা বিড়াল বসিয়া ছিল। মাতাল জলের ঘটি মনে করিয়া বিড়ালকে ধরিলেন। বিড়াল মেও মেও করিতে আরম্ভ করিলে— বলিলেন শালা জলের ঘটা—! তুই মেঁও মেঁও করিয়া কি বাঁচবি? তোকে এখনে খাব। পরে বিড়ালকে মুখের কাছে তুলিলে বিড়াল আঁচর কামড় করিয়া পলায়ন করিল।
আর এক ভক্ত মাতালের কথা বড় অদ্ভুত। সেই মাতালের নাম সিংহ। তাহার বাটীতে পূজা হইবে, ষষ্ঠীর রাত্রে উঠিয়া প্রতিমার নিকট বসিয়া কোণে পরিপূর্ণ হইয়া সিংহকে বলিলেন— আরে বেটা সিংহ। তুই নকল সিংহ, আমি আসল সিংহ, তুই মার পদতলে কেন? এই বলিয়া সিংহকে ভাঙ্গিয়া আপনি চাদর মুড়ি দিয়া সিংহ হইলেন। প্রাতঃকালে পুরোহিত আসিয়া দেখিলেন বাটির কর্তা স্বয়ং সিংহ হইয়া রহিয়াছেন। তিনি আস্তে আস্তে বলিলেন, মহাশয় ওখানে কেন- মহাশয় ওখানে কেন? কর্তার নেশা ছুটিয়া ছিল, সে স্থান হইতে আস্তে উঠিয়া আধোমুখে বৈঠক খানায় গিয়া বসিলেন। গুরু পুরোহিত সকলে বলিতে লাগিলেন কর্তা— বড় ভক্ত, না হবে কেন? সিদূ বংশ! এরূপ কর্ম কটা লোক করিতে পারে— কায়মনোচিত্তে দেবীর উপাসনা করিতে পারিলেই মোক্ষপদ প্রাপ্ত হয় ও সাধু লোক এই প্রকারেই সিদ্ধ হন। নিকটে একজন স্পষ্ট বক্তা বসিয়াছিলেন, খোসামুদে কথা সহ্য করিতে না পারিয়া বলিল— “সিদ্ধি পূর্বে হইত, এক্ষণে সিদ্ধিও হয় না বস্তুও হয় না, কেবল — অ ! আ ! হয়”।
প্যারীচাঁদ মিত্র (২২শে জুলাই, ১৮১৪- ২৩শে নভেম্বর, ১৮৮৩) বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক, ছদ্মনাম টেকচাঁদ ঠাকুর। আজ তাঁর জন্মদিন। আমাদের বাংলার মা-মাটি-মানুষ পোর্টালের পক্ষ থেকে তাঁকে শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানাই।