২ কোটি বেকারের চাকরি, দেশের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ২ কোটি মহিলাদের লাখপতি ইত্যাদি প্রতিশ্রুতির কথা শুনতে মন্দ লাগেনা। তাছাড়া ভোটের আগে এই ধরণের প্রতিশ্রুতি বিতরণ করে ফায়দা তোলা যায়। লোকসভা ভোটের আগে মোদী ও তাঁর দল যে এরকম প্রতিশ্রুতিকেই পাখির চোখ করেছে তা বলাই বাহুল্য। কেবল ভোট নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ সালে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন, ২০২৪-এর মধ্যে ভারতের অর্থনীতি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। সেই সময় দেশের অর্থনীতি ছিল ২.৬ লক্ষ কোটি ডলারের। বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিল, কী ভাবে? স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। কারণ, সেটা সম্ভব নয়। এবারের লোকসভার আগে মোদী বা তাঁর সরকার নিশ্চয় দেশবাসীকে সাত ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন দেখানোর কথাই ভেবেছিল কিন্তু ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব’-এর একটি সমীক্ষা গেরুয়া শিবিরের ওই প্রতিশ্রুতির বেলুন চুপসে দিয়ে জানাচ্ছে, গত একশো বছরের মধ্যে মোদীর আমলেই দেশের আর্থিক বৈষম্য পৌঁছে গিয়েছে সর্বোচ্চ স্তরে। সহজ হিসাবে ভারতের মোট আয়ের ২২.৬ শতাংশ এবং মোট সম্পদের ৪০ শতাংশেরও বেশিটা গিয়েছে ১ শতাংশ সবথেকে ধনী মানুষের হাতে। আর আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ এসেছে সবথেকে গরিব ৫০ শতাংশ মানুষের কাছে। সবথেকে ধনী ১ শতাংশ মানুষের সারা বছরের আয় গড়ে ৫৩ লক্ষ টাকা, অর্থাৎ বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের গড় আয়ের ২৩ গুণ। এদের মধ্যে কয়েকজনের আয় ঘন্টায় কয়েকশো কোটি টাকা। ধনী-গরিবের আর্থিক এই বৈষম্য চূড়ান্ত আকার নিয়েছে ২০১৪-১৫ সাল থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে, অর্থাৎ কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের জমানায়।
অথচ লোকসভা ভোটের মুখে গান্ধীনগরে দশম ভাইব্র্যান্ট গুজরাট গ্লোবাল সামিটের উদ্বোধনে ফের একবার প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখে শোনা গিয়েছে সেই কথা, ভারত কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বের তিন নম্বর অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কেন্দ্রের সরকার তথা বিজেপি লোকসভা ভোটের আগে থেকেই গেয়ে চলেছে, ২০১৪ সালে তারা আসার পর থেকে দেশ ‘মোদী গিয়ারে’ চলায় দেশের উন্নয়নের গতি তরান্বিত হয়েছে। কিরকম উন্নয়ন? কংগ্রেস আমলে শিলান্যাস হয়া সর্দার সরোবর যোজনা, মহারাষ্ট্রের কৃষ্ণা-কোয়েনা যোজনা, অটল টানেল, অসমের বোদি ব্রিল ব্রিজ, ইস্টার্ণ ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডর ইত্যাদির উদ্বোধন হয় মোদী সরকারের আমলে। এছাড়া গ্রাম ও শহরের মধ্যে যোগাযোগ উন্নত হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মহিলাদের আয় বেড়েছে। জাতীয় স্বার্থে ৩৭০ ধারা বাতিল হয়েছে, রাম মন্দির নির্মাণ হয়েছে, তিন তালাক আইনের অবসান, মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ, ওয়ান ব়্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন চালু হয়েছে ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, অনেকদিন ধরেই অর্থনীতিবিদরা বলছিলেন, ভারতের সরকারি জিডিপি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের শেষ আদমশুমারিতে জনগণের মধ্যে উচ্চমাত্রার অপুষ্টি এবং রক্তস্বল্পতাকে বড় করে দেখানোর পুরস্কার স্বরূপ পরিচালককে চাকরি খোয়াতে হয়েছিল। ২০১২ সালের ভোগ-ব্যয় সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের ২২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এই হার আরও বাড়তে পারে — এরকম তথ্য দেওয়ার পর সরকার ২০১৮ সালে একটি সমীক্ষা বাতিল করে। আইএমএফ-এ ভারতের প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক সুরজিত ভল্লা ও অর্থনীতিবিদ করণ ভাসিন তাড়াহুড়া করে ঘোষণা করেন, ভারত থেকে চরম দারিদ্র্য ‘দূরীভূত হয়েছে’। আসলে ভোটের ভারতের কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে পড়ে থাকলেও ভোটের আগে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্যের বিষয়টি চেপে যাওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগে নীতি আয়োগের রিপোর্ট-এ বলা হয়েছিল, ৪৫ বছরের মধ্যে ভারতের বেকারত্ব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই রিপোর্টকে ধামাচাপা দিয়ে গত অক্টোবর মাসে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের প্রচারে বেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রচার করে বেরান, ভারতে বেকারত্বের হার গত ছ’বছরে সব থেকে নীচে। কারণ, দেশে কর্মসংস্থানে জোয়ার এসেছে। মোদীর ওই মিথ্যা পরিসংখ্যানকে মানদণ্ড ধরে নিয়েই যে গেরুয়া শিবিরের নেতা-মন্ত্রীরা এবারের লোকসভা ভোটে প্রচারের সুর বাঁধবেন সে কথা বলাই বাহুল্য। যদিও এই পরিসংখ্যানকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা (আইএলও) এবং ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের যৌথ সমীক্ষা রিপোর্ট। ‘দি ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’-এ জানানো হয়েছে, ভারতের বেকারত্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশের মোট বেকারদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ যুবক-যুবতী।
বহুদিনের অভিযোগ ভারতীয় অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করতেই মোদী আমলে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান চেপে দেওয়া হয়।‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব’-এর এই সমীক্ষাটিও চেপে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া ভারতে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মান এমন যে তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত অর্থনৈতিক ছবি কখনোই সঠিক ভাবে ধরা পড়েনা। তার ওপর মোদী সরকার গত কয়েক বছর যাবৎ ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত যাবতীয় আন্তর্জাতিক মূল্যায়নকে ধর্তব্যের মধ্যেও আনতে চায়নি। এর আগেও খিদে কিংবা অপুষ্টি সংক্রান্ত সমীক্ষাকেও তারা ‘বিদেশিদের চক্রান্ত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোদীর আমলে ভারতে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য এতটাই বেড়েছে যে তা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালকেও হার মানিয়েছে। যে কারণে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষায় মোদীর সময়কে ‘কোটিপতি-রাজ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কারণ, ২০১৪-১৫ সালের পর থেকে ভারতে সবচেয়ে বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে মুষ্টিমেয়র হাতে। এর কারণ ভারতে জাতীয় সম্পদ লুট করছে কর্পোরেট-গেরুয়া আঁতাত। যার ফলে ধনী আরও ধনী হচ্ছে এবং গরিব আরও গরিব হচ্ছে। আশ্চর্যেরে বিষোয় হল এই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতকে ‘তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে’ পরিণত করার স্বপ্ন ফেরী করেন।