ব্রিটিশ শাসক ১৮৯১ সালে একটি বাংলা পত্রিকার সম্পাদক যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ান পিনাল কোড তথা ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে অভিযোগ এনে বলে যে তিনি ও তাঁর পত্রিকা সরকার বিরোধী কাজ করছেন। পরাধীন ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে সেটাই ছিল প্রথম অভিযোগ। এরপর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিরুদ্ধ করতে ব্রিটিশ সরকার বাল গঙ্গাধর তিলক থেকে মহাত্মা গান্ধী প্রমুখের বিরুদ্ধে বহুবার এই আইন কার্যকর করেছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ১৯৫১ সালে সিং গোপী চাঁদের বিরুদ্ধে এই আইনে অভিযোগ করা হয়। এরপর ১৯৫১ সালে ভারতীয় সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বাক স্বাধীনতার মতো গুরত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা মাথায় রেখেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের পরিধি বাড়ানো হয়। এরপর ১৯৫৪ সালে আদিবাসী নেতা দেবী সরেন কিংবা কেদার নাথ সিংয়ের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের বেশ কয়েকটি দিক উঠে আসে। পরবর্তীতে বিনায়ক সেন, প্রবীণ তোগাদিয়া, আকবরউদ্দিন ওয়াইসি, অসীম ত্রিবেদী, অরুন্ধতী রায়, হার্দিক প্যাটেল, দিশা রবি, কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ, সাংবাদিক বিনোদ দুয়া, সিদ্দিকী কাপ্পান-সহ অনেকের বিরুদ্ধেই ১২৪এ রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে অনেক মামলার শুনানি এখনো চলছে।
রাষ্ট্রদ্রোহ আইন সংবিধানের ১৯(১)(এ), ১৪ এবং ২১ এই তিন অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কারণ ১২৪এ-র ফলে সংবিধানে যে মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে, মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের প্রতি অনাস্থা মানেই যদি অপরাধ হয় তাহলে তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই হস্তক্ষেপ করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ আইনকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক। ২০২১ সালের জুলাই মাসে সেই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনকে “ঔপনিবেশিক” হিসাবে বর্ণনা করেছিল। একই সঙ্গে কেন্দ্রের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেছিল, “স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কি এই আইনের প্রয়োজন রয়েছে”? দেশের উচ্চ আদালত রাষ্ট্রদ্রোহের আইনটিকে ছুতোরের করাতের সঙ্গে তুলনা করেছিল। যে ছুতোর কাঠের টুকরো কাটতে তার করাতটিকে পুরো বন কাটতে ব্যবহার করেছিল। কেবল উচ্চ আদালত নয়, কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল কেকে বেণুগোপালও সেদিন উচ্চ আদালতের সঙ্গে সহমত পোষণ করে আবেদন জানান যাতে এই বিষয়ে কেন্দ্রকে নির্দেশিকা দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, মোদী জমানার শুরু থেকেই ১২৪এ ধারায় মামলার সংখ্যা বাড়ছে। ৩৭০ ধারা বিলোপ থেকে শুরু করে এনআরসি-এনপিআর বা সিএএ-র বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রতিবাদে বহু জায়গায় বহু বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ১২৪ ধারা অর্থাৎ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন জেলে রয়েছে। মোদী সরকার এই আইনের অপব্যবহার করছে এই অভিযোগে এবং রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা হয়। আদালত কেন্দ্রকে এই আইনের পুনর্বিবেচনা নিয়ে জানালেও আগ্রহ দেখায়নি কেন্দ্র। পরিস্থিতি বুঝে প্রথমে শীর্ষ আদালত রাজ্যগুলিকে এই আইনে করা মামলাগুলির শুনানি স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়; অন্তত যতদিন না আইন পুনর্বিবেচনা হচ্ছে ততদিন এই ধারায় করা মামলার স্থগিত রাখার কথাও বলে। কিন্তু তাতে কোনও কাজ হবে না বুঝতে পেরেই এই ধারায় আপাতত কোনও মামালা করা যাবে না বলে নির্দেশিকা জারি করে। বলাই বাহুল্য মোদী সরকার এতে বড় ধাক্কা খেল। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে কোনও এফআইআর বা মামলা করা যাবে না বলেও জানিয়েছে উচ্চ আদালত। এমনকি যাঁদের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা হয়েছে তাঁরা জামিনের আবেদন করতে পারবে বলেও জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।
ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা আন্দোলন দমান করতেই রাষ্ট্রদ্রোহ আইন করেছিল। প্রশ্ন; স্বাধীন দেশে এই আইনের প্রয়োজনীয়তা কি এবং কতটা? কিন্তু কেন্দ্রে যে দলই শাসন করুক, বিরোধীরা রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের অপব্যবহার নিয়ে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই ধারায় ১০ হাজার ৯৩৮ জনের বিরুদ্ধে ৮১৬টি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ৬৫ শতাংশ মামলা হয়েছে ২০১৪ সালের পর। কিন্তু দোষী সাব্যস্তের হার মাত্র আড়াই শতাংশ। আমাদের দেশ ছাড়া এই আইন রয়েছে সৌদি আরব, সুদান, ইরানে। উচ্চ আদালত তাই প্রশ্ন তুলেছে যে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কেন ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন এখনও কেন কার্যকর রয়েছে। কেন্দ্র সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকার যে এই আইনটিকে অন্য মত দমন করতে কাজে লাগাচ্ছে সেকথাও জানিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।
দেশের উচ্চ আদালত মোদী সরকার ও অন্য রাজ্যের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে যেভাবে খোলাখুলি তীব্র সমালোচনা করেছে তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তার দল তথা সরকারের যে মুখ পুড়েছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। উচ্চ আদালতের আচরণে বোঝা যাচ্ছে ১২৪এ ধারার বিষয়টিতে তারা কেন্দ্রকে যথেষ্ট চাপেই রাখবে।
যোগেন বসুর কি সাজা হয়েছিল? আমার ধারণা ছিল প্রথম সাজা হয় বাল গঙ্গাধর তিলকের ,১৮৯৭ সালে।