কয়েক মাস আগে দেশের রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে দেখা যেত বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষকরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। সোমবার সেই ছবিটাই ফের দেখা গেল দেশের রাজধানীতে। পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে কৃষকরা এসে বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান। কৃষকরা দিল্লির যন্তর-মন্তরে আসার জন্য বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে দিল্লির পথে রওনা হন। সেই কারণে টিকরি, সিংগু, গাজিপুর-সহ দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দিল্লি পুলিশ সাধারণ যাত্রীদের এই সব পথ এড়ানোরও পরামর্শ দেয়। পুলিশের ধারণা, ৫,০০০-রও বেশি কৃষক দিল্লিতে ঢোকার চেষ্টা করে। এঁরা মূলত পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসতে থাকে। কৃষক নেতারা অবশ্য অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীদের বহনকারী যানবাহন দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, যাচাই করেই বিক্ষোভকারীদের এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
কিন্তু কেন্দ্র সরকার বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করার ন’মাস পরে কেন কৃষকরা ফের দিল্লিত ফিরছে? ঘটনা হল কৃষক সংগঠনগুলি তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। একইসঙ্গে কৃষকরা চেয়েছিল যাতে মোদী সরকার এমএসপি বাধ্যতামূলক করে। এজন্য আইন আনে। কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের সেই দাবি মেনে নিলে এমএসপি আর কেবল সরকারের ইচ্ছেমতো সহায়ক মূল্য থাকত না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর, তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছিলেন, তখন এমএসপিকে বাধ্যতামূলক এবং আইনি রূপ দেওয়ার কথা জানায়নি। গত মাসে, সংসদে একটি প্রশ্নের জবাবে, সরকার স্পষ্ট জানায় যে তারা এই নিয়ে প্রতিবাদী কৃষকদের কোনও আশ্বাসও দেয়নি। উলটে বলেছে যে এমএসপি বিষয়টিকে আরও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
এমএসপি অর্থাৎ কেন্দ্র সাতটি শস্য যেমন ধান, গম, ভুট্টা, বাজরা, জোয়ার, রাগি এবং বার্লি, এছাড়া পাঁচটি ডাল যেমন ছানা, তুর/অড়হর, মুগ, উরদ এবং মুসুর, সাতটি তেলবীজ, যেমন সরিষা-রেপিসিড সহ ২৩টি ফসলের জন্য এমএসপি ঘোষণা করেছে। এছাড়াও চিনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিল, কুসুম এবং নাইজারসিড এবং চারটি বাণিজ্যিক ফসল আখ, তুলা, কোপরা এবং কাঁচা পাট-এর ক্ষেত্রেও এমএসপি জারি হয়েছে।
এবার জানতে হবে এমএসপি কী? এমএসপি হল ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। যার কোনও আইনি বিধি নেই। কৃষকরা অধিকার হিসেবে এমএসপি দাবিও করতে পারেন না। ভারতের বেশিরভাগ অংশে উৎপাদিত বেশিরভাগ ফসলে কৃষকরা যে দাম পান, বিশেষ করে ফসল কাটার পর, তা সরকারিভাবে ঘোষিত এমএসপির চেয়ে অনেক কম। বিক্ষোভকারী কৃষকরা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ন্যূনতম মূল্যের (এমএসপি) আইনি গ্যারান্টির দাবি জানাচ্ছেন। একইসঙ্গে তাঁদের দাবি, কয়েক মাস আগে বিক্ষোভ চলাকালীন জেলে আটক কৃষকদের মুক্তি দিতে হবে। যাদের দিল্লি পুলিশ গ্রেফতার করেছিল।
কৃষক সংগঠনগুলির দাবি তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার ছাড়াও যাতে মোদী সরকার এমএসপি বাধ্যতামূলক করে এবং এজন্য আইন আনে। কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের এই দাবি মেনে নিলে এমএসপি আর কেবল সরকারের ইচ্ছেমতো সহায়ক মূল্য থাকত না। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী যখন ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর, তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করে, তখন এমএসপিকে বাধ্যতামূলক এবং আইনি রূপ দেওয়ার কথা জানায়নি। গত মাসে, সংসদে একটি প্রশ্নের জবাবে, সরকার স্পষ্ট জানায় যে তারা এনিয়ে প্রতিবাদী কৃষকদের কোনও আশ্বাসও দেয়নি। উলটে বলেছে যে এমএসপি বিষয়টিকে আরও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
কৃষকদের দাবি, প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকারের দেওয়া কোনও প্রতিশ্রুতি এওখনও রক্ষা করা হয়নি। এই অভিযোগে সোমবার সংযুক্ত কৃষাণ মোর্চার নেতৃত্বাধীন দেশের প্রায় ৪২টি কৃষক সংগঠন দিল্লির যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়। কৃষকদের দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার ফসলের ন্যায্যমূল্য এখনো নিশ্চিত করেনি। লখিমপুর খেরি কাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় কুমার মিশ্রকেও অপসারণ করা হয়নি। কৃষক আন্দোলনে যে সমস্ত কৃষকরা মারা গিয়েছেন, তাদেরও শহীদ সম্মান দেওয়া হয়নি। কৃষকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্য়াহার, বিদ্যুতের বিল মকওকুফ-সহ একাধিক দাবি থাকলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
কৃষকনেতাদের অভিযোগ, তিন কৃষি আইন বাতিল করা হলেও এখন পর্যন্ত সরকার তাঁদের অন্য দাবিগুলো মেনে নেয়নি। যেমন ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে (এমএসপি) আইনি বৈধতা দেওয়া হয়নি; আন্দোলনকারী কৃষকদের বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয়নি; প্রত্যাহার করা হয়নি বিদ্যুৎ বিলও। প্রসঙ্গত, দু’বছর আগে দিল্লি সীমান্তে কৃষকদের অবস্থান ঘিরে এক অসহনীয় অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি এড়াতে এদিনের সমাবেশের জন্য দিল্লি পুলিশ আগেই অনুমতি দিয়েছিল। সমাবেশে নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্ব নিয়েও কৃষকেরা সরব হন। কৃষকনেতারা বলেছেন, এমএসপির আইনি বৈধতা পেতে তাঁরা শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে যাবেন। গত বছর নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নিলেও আইন করে বিভিন্ন ফসলের এমএসপি নির্ধারণের পথে এগোয়নি। কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং টোমারের দাবি, সরকার এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবে কৃষকেরা বলছেন, তাঁদের সঙ্গে বৈঠকে সরকার ওই দাবি বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।