উপলক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ। পাশাপাশি কোয়াড (কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ। এই জোটে ভারত ছাড়াও রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান) বৈঠক ও মার্কিন নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচিও ছিল। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এহেন সফরটি নিয়ে বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার দারুণ হইচই শুরু করে দেয়। যেন রাষ্ট্রসংঘে প্রধান বক্তা ভারতেরই প্রধানমন্ত্রী, এমন প্রচার চলেছিল। মার্কিন নেতাদের সঙ্গে মোদির কয়েকটি ছবি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, ভাবখানা এমন যেন, তাঁরাই মোদির সঙ্গে বৈঠকের জন্য মুখিয়ে আছেন। ঠিক এই সময়েই দেশে কৃষক সংগ্রাম, সারা ভারত বন্ধ সহ নানা ঘটনা ঘটছে। সে সব যেন কিছুই নয়, এমন ভাব করে মোদিজি মার্কিন মুলুক জয় করতে চললেন। প্রচারের ধোঁয়াশা কাটিয়ে সত্যি কী কী হয়েছে, সেই খবর এখন আসতে শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মার্কিন মুলুকে যে ভাবে হিমশীতল এবং তাচ্ছিল্যের অভ্যর্থনা দেওয়া হয়েছে, ভারতবাসী হিসেবে সেটা বেশ লজ্জার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, এমনকী কোনো দেশের এমন সরকার, যা যে-কোনো সময় পড়ে যেতে পারে, অথবা মার্কিনিদের বসানো পুতুল সরকার, তেমন সরকারের রাষ্ট্রপ্রধানকেও আমেরিকায় আরও গুরুত্বের সঙ্গে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।
সে দেশে পৌঁছবার ঘটনা দিয়েই শুরু করা যাক। মার্কিন সরকারের কোনো শীর্ষ কর্তা মোদিজিকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যাননি। যেটা প্রায় সব সময়েই করা হয়, সেই লাল কার্পেট বিছনোও হয়নি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে। এ থেকে স্পষ্ট, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কাছে তিনি মোটেই গুরুত্ব পাচ্ছেন না। মার্কিন দেশের মেরিল্যান্ডে অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে যখন মোদি বিমান থেকে নামছেন, একটু বৃষ্টি হচ্ছিল সে সময়ে। ওই সময়ে বিমানবন্দরে কয়েকজন ভারতীয় উপস্থিত ছিলেন, খুব সম্ভবত তাঁদের ওখানে জমায়েত থাকার আয়োজনটা ভারত সরকারই করেছিল। এই ছোট্ট ভিড়টির প্রত্যেকের ছাতা খোলা ছিল। বিমান থেকে বেরিয়ে এসে মোদিজি তাঁর ছাতা খোলেন, অভ্যাস মতোই আশা করেন, পাশের কোনো সহায়তাকারী ছাতাটা তাঁর মাথায় ধরবেন এবং তিনি জমে থাকা ডজনখানেক ভারতীয়দের প্রতি হাত নাড়বেন। কিন্তু কোনো সাহায্যকারীই দেয়নি মার্কিন সরকার। তাছাড়া, ওই মুলুকে এমন ছাতা ধরার সহায়তা প্রায় দেওয়াই হয় না। উপায় না দেখে মোদি তাঁর সফরসঙ্গী ভারতীয় অফিসারদের একজনকে ছাতাটা ধরতে বলেন। সে বেচারা অপ্রস্তুত হলেও প্রধানমন্ত্রী বলে কথা, ছাতাটি তিনি মোদির মাথায় ধরেন। এই সুযোগে মোদি হাত নাড়তে থাকেন।

পুরনোদের মনে পড়বে রাজীব গান্ধির মার্কিন সফরের কথা। সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন রোনাল্ড রেগান। রাজীব গান্ধিকে অভ্যর্থনা জানাতে নজির ভেঙে বিমানবন্দরে হাজির হয়ে যান খোদ রাষ্ট্রপতি রেগান। বিমান থেকে নেমে রাষ্ট্রপতি রেগানের সঙ্গে তিনি যখন গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, তখন খানিকটা বৃষ্টি পড়ছিল। রাজীবকে ছাতা খোলার সুযোগ না দিয়েই উপস্থিত এক মার্কিন মহিলা ছাতা খুলে রাষ্ট্রপতি রেগানের হাতে দেন। সবাইকে বেশ অবাক করে দিয়ে খোদ রেগান প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির মাথায় ছাতা ধরে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান, গাড়িতে বসিয়ে দেন।
মেরিল্যান্ডে অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে যে ডজনখানেক ভারতীয় জড়ো হয়েছিলেন, তাঁরা শেখানো চিত্রনাট্য মতোই মোদি-মোদি বলে দারুণ চিৎকার জুড়ে দেন, ঠেলাঠেলি করে প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে করমর্দন করতে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন। হাস্যকর অবস্থাটা কয়েক মিনিট চলার পর মোদি গাড়িতে উঠে যান।
মোদিকে অভ্যর্থনার ব্যাপারটা এতই তাচ্ছিল্যপূর্ণ হয় যে ভদ্রতার খাতিরে মার্কিন প্রশাসন অবশেষে তাঁকে একটা লাল-কার্পেট স্বাগত জানাতে মনস্থ করেন। পরের দিন মোদি যখন নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে পৌঁছন তাঁকে লাল-কার্পেট বিছিয়ে স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, কার্পেটটা এত ছোটো ছিল, এবং এতই সস্তা যে সেটাকে একটা দরজার সামনে রাখার পাপোশ বলাই ঠিক হবে। কূটনৈতিক জগতের মানুষেরা বলছেন, এমন আকারের ও মানের একটা কার্পেট বিছিয়েই বরং তাচ্ছিল্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল মার্কিন প্রশাসন। বিশ্বের সবথেকে বড় গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রীকে এহেন অবজ্ঞা ভাবাই যেত না, যদি অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যেতেন। কূটনীতিকরা বলছেন, স্কুলে দুষ্টু ছাত্রকে যে ভাবে শাস্তি দেওয়া হয়, প্রথমে শ্রেণি শিক্ষক খুব তিরস্কার করলেন, পরে প্রধান শিক্ষক এসে বললেন, আহা দোষ না-হয় করেছে, কিন্তু আর বকাঝাকা করবেন না! তেমন ভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে মোদির সঙ্গে।
ভারতে গণতন্ত্র যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, বিভেদমূলক রাজনীতি চালানো হচ্ছে, সেটাই যে মার্কিন প্রশাসনের মূল আপত্তির বিষয়, সেটা ও দেশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দু’জন রাষ্ট্রপ্রধান স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন। প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিস। তিনি তাঁর বক্তব্যে খুব জোরের সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রশ্নটি তুলে বলেন, গণতন্ত্র আমাদের রক্ষা করতেই হবে। তিনি বারবার গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা তোলেন। মোদি চুপচাপ শুনে যান। স্কুলে শিক্ষকের কাছে বকা খাবার মতোই প্রায়। মনে রাখা দরকার, মোদি সরকারের নানা কাজ সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে মার্কিন মুলুকে। বিশেষ করে বিজেপি সরকারের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, কাশ্মীর নীতি এবং বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা নিয়ে সরব বড় অংশের মানুষ। এঁরা মোদির মার্কিন সফরের সময়ে নানা জায়গায় বিক্ষোভও দেখান। এই পরিস্থিতিতে তাঁর বক্তৃতার সময় মোদি পকেট থেকে তৈরি করা ভাষণের কাগজ বের করেন। সবাই আশা করেছিলেন, আগে থেকে প্রস্তুত করা বক্তৃতা পড়ার পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন উফরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসের গণতন্ত্র বিষয়ক কথার জবাব দেবেন, অন্তত ভারতে গণতন্ত্র সুরক্ষিত, এমন দাবি করবেন। কিন্তু মোদিজি সে সবের ধারপাশ দিয়ে গেলেন না। এমন সব কথা লিখিত ভাষণ দেখে পড়ে গেলেন, যা অপ্রাসঙ্গিক ও তুলনামূলক ভাবে কম প্রয়োজনীয়। সংবাদমাধ্যমও মোদির বক্তৃতাকে একটুও জায়গা দেয়নি।
এরপর মোদিজি মার্কিন রাষ্ট্রপতি বাইডেন-এর সঙ্গে দেখা করেন। হোয়াইট হাউসে মিটিংয়ের স্থানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পৌঁছলে তাঁকে স্বাগত জানাতে আসেন একজন অফিসার। ওই মহিলা অফিসার তাঁকে ভিজিটারস বুকে মন্তব্য লিখতে বলেন। এর পরে ওই অফিসার মোদিজিকে রাষ্ট্রপতির অফিসে নিয়ে যান। সাধারণত ভারতের মতো মাপের দেশের প্রধানমন্ত্রীকে হোয়াইট হাউজে ঢোকবার জায়গাতেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি অভ্যর্থনা করেন। কিন্তু তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বাইডেন নিজের অফিসেই বসে থাকেন। বক্তৃতায় বাইডেন বলেন, মার্কিনিরা মহাত্মা গান্ধিকে শ্রদ্ধা করেন, তাঁর আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, এমন ভঙ্গিতে বাইডেন কথাগুলি বলেন, যাতে ভারতে সাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রের উপর আক্রমণকে পরোক্ষে উল্লেখ করা হয়। মোদি ভালোই বুঝতে পারেন, বাইডেন ঠিক কী বলছেন। নিজের বক্তৃতার সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেবল সাধারণ ভাবে উল্লেখ করেন, ভারতে মহাত্মার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে মোদির আচরণ আরও মজার। সেখানে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে তিনি হঠাৎ বলতে থাকেন, কী ভাবে তিনি চা-বিক্রেতা থেকে উঠে এসেছেন। তিনি রেল স্টেশনে চা বিক্রি করে বাল্যকাল কাটিয়েছেন, সে প্রসঙ্গে কথা বলতে থাকেন। এর পরে তিনি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে বলতে থাকেন, তিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তিনিই ওই রাজ্যের দীর্ঘতম কাল শাসন করা মুখ্যমন্ত্রী। পাঠক ভাববেন, সেখানে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরা শুনছেন। এমনকী, হাস্যকর ভাবে মোদিজি ওই বক্তৃতায় দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জীবন সম্পর্কে নানা প্রশংসামুলক কথা বলতে থাকেন। নিজের ঢাক পেটাতে এতই আনন্দ পান মোদিজি, যে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদেও আত্মপ্রশংসায় মেতে ওঠেন। এই ধরনের মনোভাব বোঝাতে ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে, নার্সিসিজম, বাংলায় কাছাকাছি অনুবাদ হতে পারে আত্মরতি।
বিজেপি এবং মোদি অনুগামীরা দারুণ প্রচার চালাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর মার্কিন সফর দুর্দান্ত সফল। সে জন্যই, ক’দিন পরে হলেও এই প্রবন্ধটি লিখতে হলো। অন্য কোনো অ-বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে এমন ঠান্ডা অভ্যর্থনা পেলে বিজেপি দারুণ সমালোচনা শুরু করে দিত। প্রচার করা হতো, দেশের সম্মান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু মোদির ক্ষেত্রে এমন হিমশীতল অভ্যর্থনার ঘটনাটি কীভাবে সামলাবেন তাঁরা? এবার মোদি-ভক্তদের কৌশল, কী ঠিক হয়েছে, তার কোনো উল্লেখ এড়িয়ে স্রেফ প্রচার করা, সফর দারুণ সফল।
শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না, অর্জন করতে হয়। সেটা মোদি অর্জন করতে পারেননি। নিজের দেশে জোর করে শ্রদ্ধার ভাব আদায় করা যায়, দেশের বাইরে তা হয় না। মোদিও সম্ভবত সবই বুঝেছেন। তাই, তাঁকে সাধারণত যেমন খুশি-খুশি দেখা যায়, তেমন মুখচোখ তাঁর এই সফরে ছিল না।
শেষে একটা কথা না বললেই নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম মোদির মার্কিন সফরকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছে। বরং কয়েকটি সংবাদমাধ্যম মোদি বিরোধী বিক্ষোভের রিপোর্ট বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে।
ঠিক, ভারতসরকারের আয়ু, ইমেজ- দুই-ই ক্ষীয়মাণ। লেখাটি চমৎকার। ভালো লাগল।