কল্যাণ সেনগুপ্ত
ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে পিএম মোদি ঘোষণা করলেন আর্থিক প্যাকেজ বিশ লক্ষ কোটির। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। অনেক দিন ধরেই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা নানা যুক্তি সাজিয়ে বিভিন্ন অংকের দাবি রেখেছেন। সেখানে সর্বোচ্চ দাবি ছিল আট/নয় লক্ষ কোটি টাকা, গরিবের জন্য মুফত খাদ্য এফসিআইএর গোডাউন থেকে। এই ঘোষণার কদিন আগেই রাহুল গান্ধীর সাথে আলোচনায় প্রাক্তন আরবিআই এর গভর্নর রঘুরাম রাজন দাবি করেছিলেন মাত্র নগদ ৬৫ হাজার কোটি টাকা সরাসরি গরিবের ব্যাংক খাতে জমা করে স্বল্পকালীন সংকট ঠেকাতে। এইসব দাবিকে যৌক্তিকরূপ দিতে আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নত দেশগুলির এই সংকট মোচনে জিডিপির ১০% বা ততোধিক শতাংশের অর্থ অনুমোদনের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছিল মাত্র। কিন্তু বোধকরি কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি যে মোদীজি বিশ লক্ষ কোটির আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করবেন!
প্রথমে সবাই কেমন থ মেরে গেলেও ধীরে ধীরে সবাই ধাতস্থ হলেন এবং বোঝা গেল যে, ইতিমধ্যেই রিজার্ভ ব্যাংক বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে দফায় দফায় সর্বমোট ৮.০৪ লক্ষ কোটি টাকা ঢেলেছে। আবার লকডাউন ঘোষনার পরে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ফের ১.৭ লক্ষ কোটির আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেন। ফলে এই দুটি অঙ্ক মেলালে হয় ৯.৭৪, যা ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়ে গেছে। সুতরাং বাকি রইলো ১০.২৬ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় বা প্রকৃত ঘটনা হোল কেন্দ্র আগেই ৪.২ লক্ষ কোটি টাকা চলতি বছরে বাজার থেকে ধার করার সর্বোচ্চ সীমা ধার্য করেছে, যা জিডিপির ২% এবং আদতে ওটুকুই খরচ করছে কেন্দ্র, এমনটাই মত রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের। অতীতেও তিনি বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে অতি নাটকীয় ভঙ্গীতে ঘোষণা করেছিলেন ১.২৫ লক্ষ কোটির বিহার প্যাকেজ এবং পরে দেখা গেল সবই ‘ভো ভা’, ভাবুন!
প্রধানমন্ত্রী মোদীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাজনৈতিক চমকসৃষ্টি। লক্ষ্য করা গেছে নোটবন্দি, মধ্যরাতে জিএসটি ঘোষণা থেকে সদ্য বিশ লক্ষ কোটির ঘোষণায় অনেকটা ‘মারিতো গন্ডার আর লুটিতো ভান্ডার’ জাতীয় চমকে। যদিও দুর্মুখেরা বলছে- সবই ফাঁকা আওয়াজ। আবার কেউ বলছেন, মাছের তেলেই মাছভাজা। মোদির সমালোচকরা বলেন, তিনি এমন এমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নির্দ্বিধায় নিয়ে ফেলেন যার পরিণাম ভেবে অন্য কেউ এগোতেই সাহস পেতেন না জনপ্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে। যেমন, দুম করে লকডাউন ঘোষণা করে দেওয়া। মানছি, করোনা সংকট মোকাবিলায় লকডাউন ঘোষণা করতেই হোত। কিন্তু এর পরিণামে কি কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, সেটা ভেবে তার প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্হা নেওয়া উচিৎ ছিল যে কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তির। কিন্তু উনি বেপরোয়া ভাবনার মালিক, ‘জো হোগা দেখা জায়েগা’। সে কারণেই, শত সহস্র শ্রমিক পরিবারকে পায়ে হেটে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিতে গিয়ে কত মানুষের যে প্রাণ গেল তার ইয়ত্বা নেই। সারা বিশ্বজুড়ে করোনা সংকটের মুখোমুখী হতে হয়েছে কমবেশি সবদেশকেই, কিন্তু এরকম নৃশংস অবহেলার শিকার হতে হয়নি আর কোন দেশের শ্রমিকদেরকে। এমন দুর্বিসহ উদাসীনতা সম্পুর্ন বেনজির কোন গণতান্ত্রিক দেশে। এই দুঃসাহসিক আচরণ ও বেপরোয়া মনোভাব কি গণতন্ত্রের সংগে আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ?