আজ, ১৫ আগস্ট ভারতে মহা-ধুমধামের সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু একটু খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা বুঝছেন, এ দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের মাথায় ধীরে ধীরে চেপে বসছে এক নতুন আশঙ্কা — আফগানিস্তান। ভারতের বিদেশনীতির এমন অপ্রস্তুত অবস্থা গত ৭৪ বছরে দেখেনি দেশবাসী। এখন রাত সাড়ে বারোটা, যতদূর খবর মিলছে, আফগানিস্তান দখলে নিয়ে নিয়েছে তালিবান বাহিনী, চোখের উপর ঘটে যাচ্ছে এমন এক পরিবর্তন, যার অভিঘাত ভারত কতটা এড়াতে পারবে, সেটা ভবিষ্যতই বলতে পারবে। হয়তো সে দেশের সরকার পড়েই গেছে, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে। ভারতীয় দূতাবাসের কর্মীগণ সহ ভারতীয় নাগরিকদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফেরার বার্তা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু জানা যাচ্ছে, আফগানিস্তানের নানা প্রান্তে আটকে রয়েছেন বহু ভারতীয় নাগরিক। তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই ভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশেরও বহু মানুষ আটকে পড়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকি-কে হত্যা করা হয়েছে আফগানিস্তানে। সেরকম আরও ঘটনা ঘটবে বা ঘটছে কি-না, এই মুহূর্তে তা জানা দুস্কর।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে এমন বিদ্যুৎ গতিতে সে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারে, এটা কি ভেবেছিল ভারত? এ দেশের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলা ডোভাল কী করলেন? মাস দুয়েক আগেও ভারত জানিয়েছিল, তালিবানের সঙ্গেও শান্তি আলোচনা চালানো হচ্ছে। তার যে এমন করুণ পরিণতি হতে পারে, সেটা বিশ্বাস করাই কঠিন। এমনকী মাসখানেক আগেও ভারতের কর্তাদের হাবভাবে এমন আশঙ্কার আভাসটুকুও ছিল না। ভারতের সীমান্তবর্তী আফগান রাজনীতিতে এই মৌলবাদী পরিবর্তন প্রায় নীরব দর্শকের মতো দেখা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।

মধ্যবয়স্ক তথা বৃদ্ধদের মনে পড়বে বাংলাদেশ যুদ্ধের কথা। ১৯৭০-৭১ সালে যখন সে দেশকে প্লাবিত করে দেয় পাকিস্তান বাহিনী ও রাজাকার খুনীরা, ভারতের সে সময়ের সরকার কিন্তু মুখ বুজে বসে থাকেনি। ক্রমশই বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এ ভারতীয় সেনা সরাসরি ঢুকেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে। ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর প্রায় এক লক্ষ পাক বাহিনী ভারতের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি হয়ে উঠেছিলেন এশিয়ার মুক্তিসূর্য। সেদিনের সঙ্গে আজকের ভারতের কতই না ফারাক।
আফগান রাজনীতি ১৯১৯-২০২১
ভারত স্বাধীন হবার তিন দশক আগেই আফগানিস্তান ব্রিটিশ কবলমুক্ত হয়েছিল। ১৯১৯ সালের ৩ মে শুরু হয়েছিল তৃতীয় ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে এই যুদ্ধে কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী সুবিধা করতে পারেনি। কয়েক মাস যুদ্ধের পরে একটা চুক্তি হয়েছিল। এর পরে আফগান এলাকায় ব্রিটিশ কর্তৃত্ব ক্রমশই কমতে থাকে, ১৯২১ সাল নাগাদ সে দেশ পুরোপুরি স্বাধীন বলেই গণ্য হতে থাকে। তবে একটানা শান্তি আফগান জনতা পায়নি। পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, খাদ, ভয়ংকর সুন্দর উচ্ছল নদী আর হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাসে লাগাতার চলেছে ভাঙা-গড়া। গত শতকের মাঝামাঝি সেই ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়াতেই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়েছিল। সে সময়ে ঠান্ডা যুদ্ধের পরিবেশে সোভিয়েতকে কোনঠাসা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমি দেশগুলি দেশগুলি মদত দিয়েছিল মুসলিম মৌলবাদী শক্তি মুজাহিদিনকে। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন আফগান শাসক দাউদ খানকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা হয়, সে দেশের দখল নেয় কর্নেল আব্দুল কাদিরের নেতৃত্বাধীন আর্মড ফোর্সেস রেভলিউশনারি কাউন্সিল। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নুর মহম্মদ তারাকি। এই তারাকি সে সময়ের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আফগানিস্তানের মৈত্রী দৃঢ় করেছিলেন। তারাকিকে ক্ষমতা থেকে হটাতে মার্কিন-ব্রিটিশ মদতপুষ্ট মুজাহিদিনরা বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহ ঠেকাতে সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগান সরকারকে মদত দিয়েছিল।
১৯৭৯ সালে তারাকি খুন হয়ে যান, তাঁরই সরকারের বিদেশমন্ত্রী হাফিজুল্লা আমিন ক্ষমতা দখল করেন। হাফিজুল্লাকেও অল্পদিনের মধ্যে খুন করা হয় এবং বাবরাক কামাল ক্ষমতায় বসেন। ওই সময় থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সহ পশ্চিমি শক্তি মুজাহিদিনকে সবরকম সমর্থন, টাকা-পয়সা জোগানো, অস্ত্র সরবরাহ করা শুরু করে। পাকিস্তান, ইরান প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশগুলিতে মুজাহিদিনরা ঘাঁটি গেড়ে সোভিয়েতপন্থী সরকারের তথা সোভিয়েত সেনাদের উপর হামলা চালাতে থাকে। এহেন অবস্থা চলে প্রায় এক দশক জুড়ে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে চলে যায়। পাঠকের হয়তো মনে পড়বে, ওই ১৯৮৯ সালেই খোদ রাশিয়ার অভ্যন্তরে চলছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ভেঙে পড়ছে কমিউনিস্ট শাসন। তৎকালীন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গোর্বাচভের হাত ধরে সে দেশে বইছিল উদারবাদী মুক্তির তাজা বাতাস।
আফগান মাটি থেকে সোভিয়েত বাহিনী চলে যাবার পর শেষ সোভিয়েতপন্থী আফগান রাষ্ট্রনেতা নাজিবুল্লাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে মুজাহিদিনরা। তীব্র লড়াই চলে প্রায় দু’বছর। অবশেষে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে নাজিবুল্লা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন, কয়েক বছর পরে তাঁকে প্রকাশ্যে হত্যাও করা হয়। এভাবেই আফগান মাটিকে সোভিয়েত প্রভাব-মুক্ত করার মার্কিন প্রকল্পটি সাফল্যের মুখ দেখেছিল। কিন্তু মূল্য হিসেবে দিতে হয়েছিল মৌলবাদীদের অবাধ বাড়বাড়ন্তকে মেনে নেবার লাইসেন্স।
মুজাহিদিনরা সোভিয়েত পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের তালিবান হিসেবে পুনঃসংগঠিত করে। তালিবানরা অবশ্য মার্কিন খবরদারি বেশিদিন সহ্য করেনি। নিজেদের মতো করে মধ্যযুগীয় বর্বরতার শৃঙ্খলে তারা বেঁধেছিল আফগান জনতাকে, যেমন, মহিলাদের শিক্ষা, বাড়ির বাইরে কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, পুরুষ সঙ্গী ছাড়া মহিলাদের বাড়ির বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ করা, এক বিশেষ ধরনের অত্যন্ত গোঁড়ামিপূর্ণ ইসলামি মত ছাড়া অন্য ধর্মমতকে গ্রাহ্য না করা, মূর্তি গড়া তথা শিল্পকর্ম ও আধুনিক শিল্পের তীব্র বিরোধিতা করা ইত্যাদি। এমনকী হাজার বছরের পুরনো ভাস্কর্য কামান দেগে উড়িয়ে দেওয়া, যেমন বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি। পশ্চিমি সভ্যতার গণতন্ত্রকামী আধুনিকতাবাদী মনোভাব তালিবানিরা সহ্য করতে পারেনি। এরই পরিণতিতে আফগান মাটিতে গেড়ে বসা তালিবানিদের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৫-৯৬ সাল নাগাদ এক সুদর্শন, শ্মশ্রু-গুম্ফ-ধারী দীর্ঘদেহী যুবক আফগান-তালিবানদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই মানুষটির নাম ওসামা বিন লাদেন।

বছর পাঁচেক পরে ২০০১ সালে লাদেনের অনুগামীরা মার্কিন দেশের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটাই ছিল মার্কিন মাটিতে বৃহত্তম হামলার ঘটনা। এই সময় থেকে আফগান রাজনীতি এক নয়া পর্বে প্রবেশ করে। সেটা ছিল আফগান মাটিতে সরাসরি মার্কিন-ব্রিটিশ সেনাদের ঘাঁটি গাড়া, এবং সে দেশ জুড়ে তালিবান বনাম মার্কিন সেনার তথা মার্কিন মদতপুষ্ট আফগান সরকারের সেনাদের সংঘর্ষ। ওসামা বিন লাদেনকে হত্য করে মার্কিনিরা। এই সংঘর্ষে প্রায় ১৫ বছর তালিবানিরা তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। কিন্তু ২০১৪-১৫ সাল থেকে পরিস্থিতির মধ্যে ধীর পরিবর্তন দেখা যায়। কাকতালীয় হলেও এই সময়টাতেই ভারতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি। তালিবানদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায় প্রতিদিন নিহত মার্কিন সেনাদের কফিন উড়ে যেত নানা মার্কিন শহর ও গ্রামে। একটানা এই মৃত্যু মার্কিন নাগরিকদের আফগান যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাব তৈরি করে। মার্কিন-ব্রিটিশ সেনা আফগান মাটি ছাড়লে যে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা বুঝতে বড় বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন হয় না। প্রশ্নটা ভারতের পক্ষেও যথেষ্ট অস্বস্তির হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মোদি সরকার সে বিষয়ে কিছুই করতে পারেনি। এর প্রাধান কারণ হলো, ভারতে ক্ষমতাসীন এই হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির নৈতিক প্রভাব ছিল না আফগান জনগণের উপর। অনেকেই মনে করেন, এই পর্বে যদি কংগ্রেস ভারত সরকারের নেতৃত্বে থাকত, তাহলে এই পরিস্থিতি তৈরি না-ও হতে পারত। সেক্ষেত্রে আফগান রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব অনেক বেশি হতে পারত।
কেবলমাত্র আফগানিস্তান নয়, এই দেশটির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ছাপ ফেলবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে। ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, পাকিস্তান অবৈধভাবে কাশ্মীরের যে অংশ দখল করে রেখেছে, ভারতের কাশ্মীর সহ পুরো দেশ, চিন, রাশিয়া, এই সব দেশকেই ভাবতে হবে নতুন করে। নয়া চিন্তার দরকার হবে পশ্চিমি শক্তিগুলিরও। আফগান রাজনীতিতে বহির্দেশীয় সামরিক হস্তক্ষেপ ব্যর্থতায় ডুবেছে বারবার। গণতন্ত্র বা প্রগতি, কোনো কিছুর নামেই বাইরের হস্তক্ষেপ যে আফগানরা মানবেন না, সেটা স্পষ্ট। মনে করা হচ্ছে, আফগানিস্তানের পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামি মৌলবাদী শক্তির কিছুটা বাড়বাড়ন্ত হতে পারে। তার ছাপ পড়তে পারে কাশ্মীর সহ ভারতের নানা জায়গায়। এরকম একটা অবস্থায় সাম্প্রদায়িকতাকে খুঁচিয়ে তুলে রাজনৈতিক জ্যাকপট পাবার চিন্তা আসতে পারে মোদি-শাহ-র মাথায়।
পরিস্থিতি যথেষ্ট আশঙ্কাজনক, ভবিষ্যৎ বেশ ধোঁয়াশায়। ভারত এখানে সবথেকে নিরাপদ থাকতে পারে একটা নীতিসম্মত রাস্তা অবলম্বন করে। তা হলো, আফগান রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ না করার নীতি, আর এ দেশের অভ্যন্তরে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের নীতি। মোদি-শাহ কি এভাবেই ভাবছেন?