কিছুদিন আগে আচমকাই সংসদের বিশেষ অধিবেশনের ঘোষণা হয়েছিল। জরুরি প্রয়োজনে সংসদের বিশেষ অধিবেশন হয় বইকি কিন্তু সেটা নিতান্তই বিরল। তবে কেন বিশেষ অধিবেশন তা দেশবাসীকে জানিয়েই ডাকা হয়। কিন্তু সে সব নিয়মের তোয়াক্কা করা হল না বরং গোপনীয়তার বেড়াজালে সেই নিয়ম ভাঙা হল। বিরোধীদের তরফে বারবার আলোচ্য সূচি জানানোর দাবি উঠেছে কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কেন্দ্রীয় সরকার নীরবতা পালন করেছে। কী কী হতে পারে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা জল্পনা চালিয়েছেন। শেষমেষ এক দেশ এক নির্বাচন, ভারত বদলে ইন্ডিয়া ইত্যাদি সরিয়ে পেশ হলো মহিলা সংরক্ষণ বিল। যদিও ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বছরে দু’কোটি চাকরি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করানোরও প্রতিশ্রুতি ছিল। ভোট পরবর্তীকালে শাসক দলের তরফেই দু’কোটি চাকরি প্রতিশ্রুতি জুমলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু ২০১৪ পরবর্তী ন’বছরের মধ্যে মহিলাদের ক্ষমতায়ন বা নারী শক্তির উত্থানের কথা এক বারের জন্যও মনে পড়েনি। তারপর মনে পড়ল, কখন? যখন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে এবং নির্বাচন জিতে ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে কপালের ভাঁজগুলি গভীর থেকে আরও গভীরতর হচ্ছে তখন।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে এই বিলেরই বিপক্ষে ছিল সমাজবাদী পার্টি। তারা এবার অবস্থান বদল করে লোকসভায় বিলটিকে সমর্থন করেছে। অথচ ১৩ বছর আগে রাজ্যসভায় যখন একই রকমের একটি বিল পাস হয়েছিল, তখন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ নন্দকিশোর যাদব এবং কামাল আখতার চেয়ারম্যান হামিদ আনসারির টেবিলের উপরে উঠে পড়েছিলেন। নন্দ কিশোর যাদব তো একটি মাইক্রোফোন উপড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। সাসপেন্ড হয়েছিলেন সমাজবাদি দলের সাংসদ বীরপাল সিং যাদব-সহ অনেকেই। কেবল সমাজবাদী পার্টি নয় ১৩ বছর আগে লোকসভায় এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিন যাদব, মূলায়ম সিং, তৎকালীন জেডিইউ প্রধান শরদ যাদব এবং লালুপ্রসাদ। বিলের বিরোধিতা করে এই ২০১০ সালে জোরালো অবস্থান জেডিইউ প্রধান বলেছিলেন, এই বিল পাশ করানো হলে তিনি লোকসভার মধ্যেই বিষ খাবেন। ১৩ বছর পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। তাই সবকটি রাজনৈতিক দল এই বিলটিকে সমর্থন করেছে। কারণ তারা দেখেছেন গত বিশ বছরে এ দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মহিলারা সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেছেন। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছে, সংসদ এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলা প্রতিনিধিত্বকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
বিহারের মতো রাজ্যে দেখা গিয়েছে মহিলা ভোটাররা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, বিশেষ করে নীতীশ কুমারের সাফল্যের পরে সেই ছবিটা স্পষ্ট। যদিও এই মুহূর্তে মহিলা প্রতিনিধির সংখ্যা দুঃখজনকভাবে কম কিন্তু রাজ্যসভায় মহিলা প্রতিনিধিত্ব সামান্য বেড়েছে। বর্তমানে রাজ্যসভায় মহিলা প্রতিনিধির সংখ্যা ১৩.০২। ২০০৮ থেকে ২০১০-এর মধ্যে যা ৯.৭৯ শতাংশ থেকে ১১.১৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। সিএসডিএস-এর তথ্য ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ যত ভোট পেয়েছিল তার মধ্যে ২৯% মহিলা ভোট। এরপরে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপির প্রাপ্য ভোটের মধ্যে ৩৬% ছিল মহিলা ভোট। বিজেপি ২০২২ সালে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনেও জিতেছিল ৪৬% মহিলা ভোট পেয়ে। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের তথ্য আরও জানাচ্ছে, পুরুষদের তুলনায় মহিলারা বেশি ভোট দিয়েছেন। ২০১৯ সালের নির্বাচনে যেখানে ৬৭.০১ শতাংশ পুরুষ ভোটার ভোট দিয়েছেন সেখানে মহিলাদের ভোটের হার ছিল ৬৭.১৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিচ্ছে যে মহিলারা তাদের ভোট সম্পর্কে সচেতন। তাছাড়া দুটি লোকসভা এবং একটি বিধানসভা নির্বাচনের প্রবণতা দেখাচ্ছে যে সবথেকে বেশি সংখ্যক মহিলা ভোট বিজেপির পক্ষে গিয়েছে এবং বিজেপি তার থেকে সরাসরি ফায়দা পেয়েছে। এই সব দিক ভেবেই বিজেপি ২৪-এর নির্বাচনের আগে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করিয়েছে এবং এটিকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ দাবি করছে। পাশাপাশি একথা বলাই যায় মোদী ও তাঁর দল ২৪-এর নির্বাচনের আগেই মহিলা সংরক্ষণ বিলের মাধ্যমে, নির্বাচনী ময়দানে একটি মাস্টার স্ট্রোক খেলেছে।
যদিও এই বিল কবে আইনে পরিণত হবে এবং কবে সেই আইন লাগু হবে তার কোনও নিশ্চয়তা মোদী সরকার দিতে পারেনি। তাই ২৪-এর লোকসভা নির্বাচন তো বহু দুরের কথা, তার পরের লোকসভা নির্বাচনেও এই আইন চালু হবে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ আগে জনগণনার কাজ শেষ করতে হবে। ২০২১ সালে জনগণনার কথা ছিল কিন্তু মোদী সরকার জনগণনা করেনি। তারপর জনগণনার রিপোর্টের ভিত্তিতে লোকসভা ও বিধানসভা আসনের পুনর্বিন্যাস হবে। সেই পুনর্বিন্যস্ত আসনে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত হবে। অর্থাৎ এক দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়া। তাছাড়া লোকসভায় সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় বিল দেশের অন্তত ৫০ শতাংশ রাজ্যে পাশ করাতে হবে। তার মানে খুব কম করে হলেও ছ’বছরের আগে এই বিল কোনো কাজে আসবে না।