কী ভয়ংকর! কী বীভৎস! এই মূর্তির পূজা করো তোমরা? কী রুচি তোমাদের!
এই ধরনের আতঙ্কিত ও বিতৃষ্ণ প্রশ্ন বিদেশিরা করেই থাকেন কালীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁদের অনুগত হয়ে কিছু কিছু এদেশিও এমন জিজ্ঞাসায় কাতর হন।
শ্রীরামকৃষ্ণ অপূর্ব উত্তর দিলেন :
কালী কি কালো? দূর থেকে দেখলে কালো—নিকট থেকে দেখলে তা নয়। আকাশ দূর থেকে নীলবর্ণ, কাছে যাও, রং নেই।
অর্থাৎ অনন্তের রূপপ্রতীক—কালী।
বর্ণতত্ত্ব তো বুঝলাম। কিন্তু কালীর আকারের তাৎপর্য কী? ওই রক্তবসনা ভয়ংকরী কেন তিনি?
এবার উত্তর দিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। সৃষ্টি ও ধ্বংস—এই দুই নিয়ে চরম সত্য। তাই মৌল বর্ণও দুই—শ্বেত ও কৃষ্ণ। কালী চরম ধ্বংস অর্থাৎ প্রলয়ের রূপ। সেই প্রলয়ে সব একাকার। যখন দেখি সৃষ্টি, তখন দেখি ভেদ-রূপকে। তখন একের সঙ্গে অন্য পৃথক। অভেদে কোনও রূপ নেই। তখন সকল রূপের বিনাশ। তাই হলো মৃত্যু। কালী সেই সত্যকেই প্রকাশ করেন। সেই প্রলয়রূপকে দর্শন করার সাধ্য সাধারণ মানুষের থাকে না। অর্জুন পর্যন্ত তার দর্শনে আতঙ্কিত হয়েছিলেন। বিবেকানন্দ কিন্তু পরমোল্লাসে তার বর্ণনা করেছেন; নিঃশেষে নিভে যায় তারাদল; মেঘের পর মেঘের তরঙ্গ আছড়ে পড়ে; সমুদ্র হানা দেয় মহাসংগ্রামে; লক্ষ লক্ষ ছায়ার শরীর বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে এসে উন্মাদ তাণ্ডবে নৃত্য করে; তারি মাঝখানে নৃত্য করেন মৃত্যুরূপা মাতা; তাঁর পদাঘাতে চূর্ণ হয়ে যায় ব্রহ্মাণ্ড। সে রূপ দেখতে সমর্থতাঁরা—যাঁরা এ জগতে সাহসী, বীর, যোদ্ধা। ‘সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মৃত্যুরে সে বাঁধে বাহুপাশে, কালনৃত্য করে উপভোগ, মৃত্যুরূপা তারি কাছে আসে।’

বিবেকানন্দ বললেন, ‘সত্য তুমি মৃত্যুরূপা কালী।’
আরও বললেন, ‘পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার।’
না, অসহ্য। বিবেকানন্দ যা দেখেছেন তা সহ্য করার ক্ষমতা কম মানুষেরই হয়। আমরা চাই ভালোবাসা। আমরা চাই ভালোবাসতে। আমরা মায়ের সন্তান। আমাদের জন্য জ্বলে উঠুক ‘নিবিড় আঁধারে… ও-রূপরাশি।’
সেই ছবিটি আমাদের জন্য এঁকে দিয়েছেন বিবেকানন্দের সেরা এক সন্তান—সুভাষচন্দ্র :
‘মনে পড়ে একটি চিত্র—কালীমন্দির দক্ষিণেশ্বরে। সম্মুখে খড়্গহস্তা মা কালী—আনন্দময়ী—শিবের আসনের উপর অধিষ্ঠিতা—শতদলবাসিনী—তাঁর সম্মুখে একটি বালক—বালক হইতেও বালপ্রকৃতি—আধ-আধ স্বরে কাঁদিতেছে এবং কাকে যেন ডেকে ডেকে বলিতেছে, ‘মা, এই নাও তোমার ভালো, এই নাও তোমার মন্দ। এই নাও তোমার পাপ, এই নাও তোমার পুণ্য।’ করালমুখী ভীষণদংস্ট্রা মা অল্পেতে সন্তুষ্ট নয়—সব গ্রাস করিতে চায়—তাই ভালোও চাই, মন্দও চাই—পুণ্যও চাই, পাপও চাই। বালককে সবই দিতে হইবে—না দিলে শান্তি নাই—মাও ছাড়িবে না।
বড় কষ্ট—মাকে সবই দিতে হইবে। মা কিছুতেই সন্তুষ্ট না—বালক তাই কাঁদিতেছে এবং বলিতেছে—‘এই নাও, এই নাও।’ দেখিতে দেখিতে অশ্রুধারা বন্ধ হইল—গণ্ডস্থল ও বক্ষ শুকাইল—হৃদয় জুড়াইল—হৃদয়ে আর কিছু নাই—যেখানে ভীষণ কণ্টক যন্ত্রণা দিতেছিল, তার চিহ্নও নাই—সবই শান্তিময়। হৃদয় মধুতে ভরিয়া গেল—বালক উঠিল।’
‘বালকটি রামকৃষ্ণ।’