জাতিসংঘ শান্তিমিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণে শুভসূচনা :
জেনারেল আতিকের সময়ের অন্যতম একটি সাফল্য হলো, প্রথম বারের মতো জাতিসংঘ শান্তিমিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কিছু বিরোধিতা সত্ত্বেও সেনাপ্রধান জেঃ আতিক ১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দলকে মিশনে পাঠানোর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সম্মতি ও উৎসাহ অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই আলোকেই, ১৯৮৮ সালের আগষ্টে তৎকালীন লেঃ কর্ণেল ফজলে এলাহি আকবর (পরে মেজর জেনারেল) এর নেতৃত্বে ১৫ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা ‘‘ইউনাইটেড নেশানস ইরান-ইরাক মিলিটারী অবজারভার গ্রুপ’’ বা ইউনিমগ মিশনের আওতায় ইরাক গমন করেন।
১৯৯০ সালে ইরাক সফরকালে জাতিসংঘের ইউনিমগ সদরদপ্তরে ভিজিট করেছিলেন জেঃ আতিক। এই সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহেদুল আনাম খান সেখানে সহকারী প্রধান সামরিক পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইউনিমগ সদরদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সেদিন বাংলাদেশী সেনাকর্মকর্তাদের (সামরিক পর্যবেক্ষক) কর্মদক্ষতার ভূয়সী প্রসংশা করেন। আবেগ আক্রান্ত সেনাপ্রধান ভাবলেন, সেনাবাহিনীকে পেশাদার করার মেহনত তাহলে ব্যর্থ হয়নি।
যখন চীনের আকাশে
১৯৮৮ সালে ১৫ দিনের জন্য সস্ত্রীক চীন সফরে গিয়েছিলেন এই সেনাপ্রধান। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গাইডেড মিসাইল স্কুলে প্রশিক্ষনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু চীন তাকে আরো অভিভূত করে। চীন শুধু দেশ নয়, এ যেন এক ভিন্ন সভ্যতা। বাংলাদেশ ডেলিগেশনের যাতায়াতের জন্য দেয়া হয়েছে একটি বিশেষ বিমান। তাদের সফরসূচিতে রয়েছে: অস্ত্র কারখানা, সেনানিবাস, শিল্প কারখানা, আর্টিলারি গান, সামরিক স্থাপনা, ঐতিহাসিক প্রাসাদ, পর্যটন কেন্দ্র…। তারা গতকাল সফর করেছেন চীনের সবচেয়ে সুন্দর স্থান শহর গুইলিন। সেই শহরের সৌন্দর্য্য এখনো চোখে লেগে আছে।
আজ বিশেষ বিমানে যাচ্ছেন চীনের ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন রাজধানী চংকিং, যা অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এরপরের গন্তব্য শিয়ান, যা টেরাকোটা যোদ্ধাদের সমাধি মন্দিরের জন্য মশহুর। চংকিং শহরটি, বেজিং এর ১৫০০ কিলোমিটার দক্ষিন পশ্চিমে বিখ্যাত ইয়াংসি নদীর তীরে অবস্থিত। চীনের গ্রেট ওয়াল, ইয়েলো রিভার, সঙ পর্বতমালা, উপত্যকা, অরন্য পেরিয়ে উড়ে চলছে বিমান। জেনারেলের পাশে বসে আছেন বেগম মুনিরা আতিক। পেছনের সীটে দুই জন স্মার্ট ষ্টাফ অফিসারঃ এডিসি ক্যাপটেন মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) ও এপিএস মেজর মোঃ শহীদুল ইসলাম (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) ।
তিনি বিমানের জানালার পাশে বসে মেঘ, পাহাড়, অরন্য, নদীর দৃশ্য দেখার পাশাপাশি ভাবছেন চীন-বাংলাদেশ বিনিময়ের বিষয়গুলো। গত ১০/১২ বছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চীনের পিএলএ বা পিপলস লিবারেশন আর্মির পেশাদারিত্ব, রনকৌশল, অস্ত্র সম্ভার দেখে সেনাপ্রধান মুগ্ধ হয়েছেন। জেনারেল আতিক লক্ষ্য করেছেন — চীনের অস্ত্র সরঞ্জামাদি পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় কম মূল্যের, সহজ লভ্য, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতে মানানসই, শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সরবরাহ বেশ নির্বিঘ্ন। চীন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর “টেক এওয়ে” কি কি তা ভাবতে থাকেন এই সেনাপ্রধান…।
সেনাবাহিনী একটি চমৎকার ফাইটিং ফোর্স
জেনারেল আতিকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি ভালো ‘‘ফাইটিং ফোর্স’’ এ পরিনত হয়। সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্র সরঞ্জামাদি যুক্ত হয়। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল কার্যকর ও সৌহার্দপূর্ণ সামরিক সম্পর্ক। ১৯৮৬-৮৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শান্তিবাহিনী, দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হলেও সেনাবাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। ১৯৮৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় অনেকটা জেলা পরিষদের এই কাঠামোকে মূলস্তম্ভ বিবেচনা করে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
একটি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষনের উৎকর্ষতার মধ্যদিয়েই তাঁর আভিযানিক প্রস্তুতিও চলতে থাকে। জেঃ আতিকের সময় প্রশিক্ষন ও অভিযানের বেশ নতুন কিছু ধারণা প্রবর্তন ও আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত যুদ্ধের সঙ্গে অপ্রচলিত যুদ্ধের মিশ্রন, সর্বাত্মক জনযুদ্ধ, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় অসামরিক ব্যক্তিদের ইন্টিগ্রেশন, সেকেন্ড লাইন ডিফেন্স ফোর্স এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা, নাগরিক ব্যাটালিয়ন… এই সব বিষয় আলোচনা, চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা ও অনুশীলনের গুরুত্ব দেওয়া হতো। ওই সময়ে বাংলাদেশ আর্মি জার্নালে প্রকাশিত উন্নত মানের লেখাগুলোতে এই সব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন রয়েছে।
সেনাবাহিনী কর্মকর্তাদের মনোজগতে পরিবর্তন
জেনারেল আতিকের সময়টি (১৯৮৬-৯০) ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনের শেষ ৫ বছর। তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে তখন বিরোধী দলগুলোর সর্বাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন চলছিল। অন্যদিকে, এই সময়কালেই সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছিল। সেনাবাহিনীতে মার্শাল ল ডিউটি বা এই সংক্রান্ত কর্মকান্ড থেকে প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ ঘটছিল। সেনা কর্মকর্তাদের মনোজগতেও বেশ পরিবর্তন আসছিল। এই সব ঘটছিল উচ্চাভিলাষহীন, নির্ভেজাল পেশাদার জেঃ আতিকের অনুপ্রেরণা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তায়। এর সঙ্গে এটাও বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট এরশাদও তখন চেয়েছিলেন সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সেনাবাহিনীর মধ্যকার এই পরিবর্তনটি অসামরিক পরিসরে বেশ অনালোচিতই থেকে যায়। লেখক ও গবেষক এস. মাহমুদ আলী, এ পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁর ‘‘আন্ডারষ্ট্যান্ডিং বাংলাদেশ’’ বইতে সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন।
সেনাকুঞ্জ- আইকনিক এক স্থাপনা
সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে জেঃ আতিকের সময়ে নির্মিত আইকনিক স্থাপনা হলো সেনাকুঞ্জ। অত্যন্ত উন্নতমানের এই ‘‘বহুমুখী মিলনায়তন ও সিভিল কমপ্লেক্সটি’’ নির্মিত হয়েছিল জেঃ আতিকের অসাধারণ উদ্যোগে। ১৯৮৯ সালের ২১ নভেম্বর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ‘‘সেনাকুঞ্জে কিছুক্ষণ’’ বইতে কবি নির্মলেন্দু গুণ সেনাকুঞ্জ নির্মাণে ও জেঃ আতিকের অবদান ও আবেগ ঘনিল সম্পূক্ততার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
অত্যন্ত পেশাদার সেনাকর্মকর্তা ও লেখক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ হোসেন (অবঃ) ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘‘যুগ্ম সচিব’’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘‘জীবনের খন্ড চিত্র, শান্তিতে ও সমরে একজন সৈনিকের স্মৃতিচারণ ‘’ বইতে তিনি জেঃ আতিকের সময় নেয়া সেনাবাহিনীর উন্নয়ন কর্মকান্ড, প্রকল্প উল্লেখ করেছেন নির্মোহভাবে। অনেকটা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ‘‘ইনসাইডার‘’ হিসেবে। সেনাকুঞ্জ নির্মাণ নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ লিখেছেন ‘‘এই সুন্দর প্রকল্পটির ভাবনা এবং বাস্তবায়ন করেছেন তৎকালীন সেনা প্রধান লেঃ জেঃ আতিকুর রহমান। আমরা সবাই তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ’’।
মহান মুক্তিযুদ্ধ বক্তৃতামালা ফরমেশন পর্যায়ে উপস্থাপন
১৯৮৮ সালে সেনাসদর মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিযান, ঘটনাবলী সামরিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোন থেকে লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে সকল ফরমেশনকে (ডিভিশন) তাদের এলাকার সংঘটিত ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে বস্তুতামালা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেয়। তাঁর উপর ভিত্তি করে ৪ আগষ্ট ১৯৮৮ থেকে ০৮ নভেম্বর ১৯৮৮ পর্যন্ত সমস্ত ফর্মেশন কতৃক সেনাসদরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি ধারাবাহিক বক্তৃতামালা (প্রেজেনটেশন) উপস্থাপন করা হয়। এই বক্তৃতামালার মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিশ্লেষন ভিত্তিক বিবরনী তুলে ধরা হয়েছিল। বলা যায় যে, এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বিভিন্ন সেনাপ্রধানের নির্দেশে অঞ্চল ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী ‘‘জাদুঘর’’ গড়ে ওঠে এবং মুক্তিযুদ্ধের অঞ্চল ভিত্তিক আভিযানিক কার্যক্রম বই আকারে প্রকাশিত হয়।
ব্যক্তিগত জীবন ও ‘‘গুলজারে রহমত’’
পেশাগত জীবনে তিনি যেমন সফলতা অর্জন করেছেন, পারিবারিক জীবনেও তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুন্দর-শান্তিময় সাবলীল একটি জীবন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি। শান্তিপ্রিয়, নিরহংকার, অমায়িক এক ব্যক্তি। তাঁর রসবোধ ছিল অসাধারন। তিনি ‘‘প্লেইন লিভিং এন্ড হাই থিংকি‘’ এ বিশ্বাস করতেন। তিনি গান খুব ভালোবাসতেন। তাঁর শখ ছিল বাগান করা। তাঁর প্রিয় ফুল ছিল গোলাপ। বনানিতে বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘‘গুলজারে রহমত’’ (রহমতের বাগান)। [ক্রমশ]