সম্পাদক — যেন জাহাজের নাবিক। জাহাজকে তিনি সঠিক পথে, সঠিক লক্ষ্যে পরিচালিত করেন। পথের ঝড়-ঝঞ্ঝা, উত্তাল-তরঙ্গ-বিক্ষেপ সব কিছু অতিক্রম ক’রে তাঁর দায়িত্ব জাহাজের যাত্রীদের সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া।
ভারত তখন পরাধীন। দেশবাসীর মধ্যে তখন অশিক্ষা, কুসংস্কার, চিন্তার দৈন্য প্রকট। তেমনি একটা সময়ে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ভাবছিলেন কিভাবে দেশবাসীর বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের চিত্তরাজ্যের চিন্তার দৈন্য দূর করা যায়।
শিক্ষার হার হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের মধ্যে কম। সে কারণে কুসংস্কারের অন্ধকার মুসলিম সমাজে আরো অনেক বেশি গভীর। স্বাধীনতার আবেগ ঠিক সেই কারণে মুসলিম সমাজে কম। মুসলিম মেয়েরা তখন স্কুল কলেজে শিক্ষা লাভের কথা ভাবতেই পারত না। জীবন কাটতো বোরখার আড়ালে, অন্তঃপুরের নিশ্চিদ্র বন্দীত্বে।
এমনই একটা সময় আমরা পেলাম মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে। মুক্তমনা, শিক্ষিত, সংস্কারবিহীন স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। স্বপ্ন দেখেন, মুসলিম সমাজে সংস্কার মুক্ত সচেতন একটা শ্রেণি গড়ে উঠবে। শুধু পুরুষেরা নয় মুসলিম মেয়েরাও এগিয়ে আসবে, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে, কলম ধরবে, আধুনিক ভাবনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করবে।
প্রচারবিমুখ, নিঃস্বার্থ এই মানুষটি চেয়েছিলেন সেই মহোত্তম লক্ষ্যে একটা আধুনিক পত্রিকা প্রকাশ করতে। পরিকল্পনা ছিল সম্পাদক হিসাবে মুসলিম সমাজে সুপরিচিত আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ এর নামে পত্রিকাটি প্রকাশ করবেন। এতে পত্রিকাটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। যাই হোক আব্দুল করিমসাহেব অসম্মত হওয়াতে তাঁর নিজের নামেই প্রকাশিত হলো সেই সময়ের এক যুগান্তকারী পত্রিকা — সওগাত।
সবে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। উন্নতমানের প্রত্যাশিত কাগজ না পেয়ে নিউজপ্রিন্টেই সওগাতের প্রথম সংখ্যা ছাপা শুরু হল জোড়াসাঁকোর বারানসি ঘোষ স্ট্রিটে ফাইন আর্ট প্রিন্টিং সিন্ডিকেটে। সময়টা ১৯১৮সাল। ডিসেম্বর মাস।
প্রসিদ্ধ হিন্দু লেখক লেখিকাদের লেখা সহ প্রচুর মুসলিম লেখক লেখিকারা লেখা ঠাঁই পেল তাঁর পত্রিকায়। প্রতিষ্ঠিত হিন্দু রচনাকারদের মধ্যে যেমন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জলধর সেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, নবকৃষ্ণ ঘোষ,মানকুমারী বসু, স্বর্ণকুমারী বসু, হেমনলিনী বসু প্রমুখ,, তেমনি মুসলমান লেখকদের মধ্যে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কবি মোজাম্মেল হক, সৈয়দ এমদাদ আলী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। তেমনি লেখিকাদের মধ্যে ছিলেন মিসেস বেগম রোকেয়া, আশরাফুন নেসা, রাবেয়া খাতুন, সৈয়দা মোতাহেরা বানু, নুরুন্নাহার খাতুন প্রমূখ৷।
অপরিসীম উৎসাহে পত্রিকাটির প্রকাশ ঘটলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে যখন কাগজ ও অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে গেল, তখন অর্থনৈতিক কারণে নাসিরুদ্দিন সাহেব বাধ্য হলেন পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করতে।
কিন্তু, যে মানুষটির মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদার সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিসমন্বিত একদল মানুষ সৃষ্টি করা, যারা ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে নিজেদের মুক্ত করবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে যুক্তিবাদী চেতনা সঞ্চারিত করবে, তিনি থেমে থাকতে পারলেন না। তাই নতুন উদ্যোগ নিয়ে ১৯২৬ সালে আবার শুরু হলো সওগাতের প্রকাশ।

মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন তখন সওগাতের সম্পাদক, আর কবি নজরুল ইসলাম তখন সওগাতের অভিভাবক। সে এক অলৌকিক যুগলবন্দী। দুজনের আদর্শের মধ্যে কোন তফাৎ ছিল না। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আর নারী মুক্তির স্বপক্ষে একের পর এক লেখা ছাপা হতে লাগলো সওগাতর পাতায় পাতায়।
সওগাতের লেখার গুনে ক্রমশ বাড়তে লাগলো সওগাতের পাঠক সংখ্যা।একটা পত্রিকার পাঠক সংখ্যা ৫০০ হলেই সম্পাদকেরা যখন স্বস্তি বোধ করতেন, তখন সওগাতের পাঠক সংখ্যা সতের হাজারে গিয়ে থামলো। কমতে লাগলো অন্যান্য পত্রিকার সদস্য সংখ্যা। ফলে আসতে লাগলে সওগাতের ওপর নানা রকমের আক্রমন। এই আক্রমনের কাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিল “মোহাম্মদী” পত্রিকা। “মোহাম্মদী” পত্রিকার মধ্যমনি ছিলেন গোলাম মোস্তফা। তারা সওগাতকে এবং সওগাতের দুই কর্ণধারকে ইসলামবিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করল। শুধু তাই নয়, শারীরিক আক্রমনও শুরু হলো সওগাতের কণ্ঠ রোধ করার জন্য।
তবুও “সওগাত”কে থামানো যায়নি। এই পর্বে “সওগাতে” যোগ দিয়েছিলেন এক ঝাঁক মুক্তমনা তরুন। এদের মধ্যে ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ,কবি শাহাদাত হোসেন,মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ, ব্যারিস্টার এস ওয়াজেদ আলী প্রমুখ। এদের প্রতিটি লেখাই ছিল অভিনব ও চিত্তস্পর্শী। এই তরুণদের প্রকৃত স্বপ্ন ছিল ইসলামের নামে ভন্ডামি, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। পবিত্র কোরআন-হাদিসের সঠিক তথ্য মুসলমান সমাজের মধ্যে প্রচার করা। যা আধুনিক সমাজের পক্ষে দরকারি নয় তা নিয়ে অহেতুক মাতামাতি না করা।
এই প্রচেষ্টায় সুফল এসেছিল। ঘুমন্ত মুসলমান সমাজে এই পত্রিকা আঘাত হানতে পেরেছিল। তার প্রমাণই ছিল পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি।
এছাড়াও সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন “সওগাত সাহিত্য মজলিস” গঠন করেছিলেন সাহিত্যিকদের একত্রিত করার উদ্দেশ্যে। মাঝে মাঝে আবার সাহিত্যিকদের নিয়ে ভ্রমনেও যেতেন সম্পাদক মহাশয়। আরো উল্লেখ্য, মুসলিম সমাজে প্রথম চিত্রবহুল আধুনিক সাহিত্য “বার্ষিকী সওগাত” প্রকাশিত হয়েছিল নাসিরউদ্দিন সাহেবের পরিকল্পনায়।
এখানেই শেষ নয়, তরুণ সওগাত দলের মুখপাত্র “হিসেবে সচিত্র” সাপ্তাহিক সওগাত “প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন এই দুঃসাহসী সম্পাদক। দায়িত্বে রইলেন কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন প্রভৃতি বিদ্বজনেরা।
সম্পাদকের ব্যবস্থাপনায় কবি নজরুল ইসলামের সম্বর্ধনা সভারও আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে যোগদান করেছিলেন সুভাষ চন্দ্র বোস, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জলধর সেন, এস ওয়াজেদ আলীর মত স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বেরা।
শনিবারের চিঠি “”তখন সওগাত ও নজরুলের বিরুদ্ধে খুবই তীব্র ভাষায় কলম ধরেছে। কিন্তু নজরুল এবং মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন তাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে এগিয়ে গেছেন আপন গতিতে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, সওগাতের সম্পাদক বেশ কিছু মুসলমান লেখিকার লেখা নিয়মিত ছাপতে লাগলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামাল, মিসেস এম রহমান ইত্যাদি। এমন কি মহিলা লেখিকাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত মানে পৌঁছায়নি এমন কবিতাও ছাপার ব্যবস্থা করেছেন নিজের দায়িত্বে।
সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিনের আর এক উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব মুসলিম মহিলাদের জন্য “মহিলা সওগাত” প্রকাশ করা। পত্রিকাটির প্রকাশকাল ১৯২৯ সালের আগস্ট -সেপ্টেম্বর। আর্ট পেপারে ছাপা হয়েছিল এর প্রচ্ছদ। হাফটোন ছবি ছাপা হয়েছিল। দামও তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছিল যাতে পত্রিকাটির চাহিদা বেশি হয়। সমগ্র ভারতে সম্ভবত শুধু মহিলাদের জন্য পত্রিকার প্রকাশ এই প্রথম। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের এই প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয়ভাবে সফল হয়েছিল। রক্ষণশীল মহিলারাও এই পত্রিকা সংগ্রহ করতে এগিয়ে এসেছিলেন। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায় ২৮ জন মহিলার লেখা ছাপা হয়। এদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন মুসলমান।
এরপর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন উদ্যোগ নিলেন মেয়েদের জন্য আলাদা একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের। সে সময় এমন একটা পরিকল্পনা ছিল নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক।কাজটা যত কঠিনই হোক না কেন নাসিরউদ্দিন সাহেবের উদ্যোগে প্রকাশিত হলো নারী সাপ্তাহিক — “বেগম।” প্রকাশের সাথে সাথে পাঠিকামহলে পত্রিকাটি তুলল ব্যাপক আলোড়ন। পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন — বেগম সুফিয়া কামাল। কঠোর পর্দা প্রথার আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভে বঞ্চিত এই নারী লুকিয়ে লুকিয়ে বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক জীবনের পথপ্রদর্শক ছিলেন নাসিরউদ্দিন সাহেব। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই “বেগম” আত্মপ্রকাশের পর থেকে বেশ কয়েক বছর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন বেগম সুফিয়া কামাল। তার পরবর্তীকালে সম্পাদনার দায়িত্ব এসে পড়ে নাসিরউদ্দিন সাহেবের মেয়ে নুরজাহান বেগমের উপর। তিনি প্রায় ৭০ বছর ধরে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
সওগাত প্রকাশের পর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন মৌলবাদীদের কাছ থেকে হুমকিপত্র পেয়েছিলেন। সে কথা স্মরণ করে তিনি জানিয়েছিলেন — “বেগম” কলকাতায় প্রথম প্রকাশের পর প্রশংসা ভর্তি চিঠি যতটা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি পেয়েছি হুমকি দেখানো চিঠি। একটা চিঠিতে লেখা হয়েছিল, “আপনি মুসলমান সমাজের কুলাঙ্গার এবং পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননাকারী”। “আপনি মুসলমান মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করছেন। তাদের বেআব্রু ছবি ছেপে মুসলমান পরিবারের ইজ্জত ও সম্ভ্রম নষ্ট করছেন “।
যখন হিন্দু প্রকাশকরা নাটক, সিনেমা এবং অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে আধুনিকমনস্ক পত্রিকার প্রকাশ করছেন তখন নাসিরউদ্দিন সাহেবকে কি তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল ভাবলে কষ্ট হয়। তবুও সমস্ত প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে “বেগম” ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে বেগম ঢাকায় প্রকাশিত হতে থাকে।
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সম্পর্কে নজরুল — বন্ধু ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন মন্তব্য করেছিলেন — “নাসিরউদ্দিন সাহেব লেখক নন, কিন্তু ত্রিশের দশক থেকে লেখক সৃষ্টি করছেন। বিশের ও ত্রিশের দশক থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত তিনি অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান লেখক সৃষ্টি করেছেন। বিশ ও ত্রিশের দশকে তিনি বুদ্ধিজীবী ছিলেন না, কিন্তু বুদ্ধির আন্দোলনে তাঁর সাহসী নেতৃত্বের কোন তুলনা নেই। তিনি নিজে নারী নন, আবার কোন নারীবাদী আন্দোলনের নেতাও নন, কিন্তু বাঙালি মুসলিম সমাজে নারী জাগরণে, নারী সমাজের প্রতিভা বিকাশে তিনি এক অনন্য অগ্রপথিক। আমাদের বর্তমান সমাজ তাঁর কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁকে স্মরণ করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য।
লেখক : রতন কুমার নাথ, ষষ্ঠীতলা, দীনবন্ধু মিত্র লেন, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।
খুব ভাল লাগল। অনেক কিছু জানতে পারলাম। লেখার styleও অনবদ্য। ধন্যবাদ এরকম একটি লেখার জন্য।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।। ভালো থাকুন
পড়ে খুব ভালো লাগলো। জানলাম অনেককিছু। ধন্যবাদ।
অনেক অনেক ধন্যবাদ।
বাঃ, রতনদার স্টাডির বহুমুখনীতা দেখে বিস্মিত এবং আনন্দিত বোধ করছি।
অল্পের উপর অনেক কিছু চিত্রায়িত হয়েছে। আসলে লেখককে মানুষ মনে রাখে, পিছনের কারিগর সম্পাদককে ভুলে যায়।
মহম্মদ নাসিরুদ্দিন সম্বন্ধে, তাঁর মুসলিম নারীশিক্ষা আন্দোলন সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরে খুব সমৃদ্ধ হ’লাম, রতনবাবু..