গান্ধী নিয়ে বেজায় মুশকিলে পড়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। না-পারছে গিলতে, না-পারছে ফেলতে। একদিকে গান্ধী নিয়ে বই উদ্বোধন করে সঙ্ঘ-প্রধান বলছেন গান্ধী মহান। অন্য দিকে আরেক দল হিন্দুত্ববাদী ঠিক তখনই গোয়ালিয়রে খুলে বসলেন ‘গডসে লাইব্রেরি’।
গান্ধীকে খুন করতে নাথুরাম গডসে যে রিভলভার ব্যবহার করেছিলেন, সেটা তিনি কিনেছিলেন গোয়ালিয়র থেকে। তাই গোয়ালিয়র নাকি হিন্দুত্ববাদীদের কাছে খুব পবিত্র শহর, গর্বের শহর। তাই যে শহর থেকে গান্ধী হত্যার অস্ত্র কেনা হয়েছিল, সেই স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে গোয়ালিয়র শহরে ‘গডসে লাইব্রেরি’ খুলল অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা। ১১ জানুয়ারির ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর। অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁদের দলীয় কার্যালয়ে খোলা এই লাইব্রেরির নাম ‘গডসে জ্ঞানশালা’। গডসে লাইব্রেরিতে রাখা হবে গডসের চিঠি-পত্র, গডসেকে নিয়ে লেখা হিন্দুত্বাদীদের বই ইত্যাদি। যার মাধ্যমে প্রমাণ করা হবে গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসে কত বড় জাতীয়তাবাদী ছিলেন, সাংবাদিকদের জানিয়েছেন হিন্দু মহাসভার সহ সভাপতি জয়বীর ভরদ্বাজ।
আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত এই ঘটনার নিন্দে করেছেন, এমন খবর আমরা এখনও পাইনি। তবে এটা আমরা জানি, সঙ্ঘ-প্রধান এই ঘটনার মাত্র দিন কয়েক আগে গান্ধীর উপর একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেছিলেন গান্ধী মহান, গান্ধীর শিক্ষা হল, হিন্দু মাত্রই দেশপ্রেমিক।
ঘটনাটি এরকম। দিল্লিতে গান্ধী নিয়ে নতুন বই উদ্বোধন করলেন আরএসএস প্রধান। বইয়ের নাম, ‘THE MAKING OF A TRUE PATRIOT: BACKGROUND OF GANDHIJI’S HIND SWARAJ’। বইয়ের লেখক জে কে বাজাজ এবং এম ডি শ্রীনিবাস। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বললেন, হিন্দু মাত্রই দেশপ্রেমিক। যদি কেউ হিন্দু হয়, দেশপ্রেম তার চরিত্রে থাকবে, এটাই নাকি গান্ধীর শিক্ষা। সঙ্ঘ-প্রধান বলেন, দেশাত্মবোধ এবং হিন্দু ধর্মের নধ্যে ফারাক করতেন না মহাত্মা গান্ধী। তাঁর কথায় কেউ হিন্দু হলে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি দেশপ্রেমী হবেন। সম্ভবত এই শিক্ষা থেকেই সঙ্ঘ নাথুরাম গডসেকে দেশপ্রেমিক মনে করে। কারণ গডসে হিন্দু ছিলেন, ফলে দেশপ্রেমিক না-হয়ে যাবে কোথায়!
সে যাই হোক। এক ঝলক দেখে নিই গান্ধীর যে লেখার কথা বলা হচ্ছে সেই ‘হিন্দ-স্বরাজে’ কী বলতে চেয়েছেন গান্ধী। ১৯০৮ সালে লন্ডন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার সময় জাহাজে বসে এই লেখা গান্ধী লিখেছিলেন গুজরাটি ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় ধারাবাহিক ভাবে সেটা প্রকাশিত হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধী সম্পদিত ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ খবরের কাগজে। সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের করা বাংলা অনুবাদ হিন্দ স্বরাজ বইয়ের ভূমিকায় আমরা দেখতে পাই, গান্ধী এই বই লেখার কারণ হিসেবে লিখেছেন, ‘সেই সময় ভারতবর্ষের মধ্যে যে দল, বলপ্রয়োগ করিয়া ভারতে শাসন বদলানো যায় বলিয়া বিশ্বাস করিত, তাহাদিগকে বুঝাইবার জন্য ইহা লেখা হয়’। যখন গান্ধী এই বই লিখছেন তখনও গান্ধী ‘গান্ধী’ হয়ে ওঠেননি। এই বইয়ের যে ভাবনা, তা অহিংসায় বিশ্বাসী একজন দেশপ্রেমিকের কিছুটা ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্রের ভাবনার কাছাকাছি। ১৯০৮ সালে, অর্থাৎ যখন তিনি এই লেখা লিখছেন, তখন তাঁর বয়স ৩৯ বছর। তিনি ভাব্ছেন ভারতে সুদূর ভবিষ্যতে এমন সমাজ তৈরি হোক, যেখানে শাসনের জন্য ভোটের দরকার নেই। মানুষ এতই ভাল হবে যে সেখানে আদালতের প্রয়োজন হবে না, কল কারখানা, বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর সেই সমাজ নির্ভরশীল হবে না। তার পর নিজেই লিখছেন, এসব এখনই হবে না, কারণ যতটা সদাসিধে এবং ত্যাগী হলে এসব মেনে নেওয়া যায়, তার জন্য ভারতের মানুষ প্রস্তুত নয় এখনও। তিনি লাভ এবং লোভ নির্ভর ধনতন্ত্রের বিপরীতে এক সরল সোজা মানবিক সমাজের কথা কল্পনা করছেন। তিনি লিখেছেন, ‘যদি ভারত, প্রেমের সঙ্গে কাজ করাকে ধর্মের অঙ্গ বলিয়া মানিয়া লইত- আর রাজনীতিতে উহা প্রয়োগ করিত, তাহা হইলে আকাশ ফুঁড়িয়া স্বরাজ আমাদের হাতে আসিয়া পড়িত। খেয়াল রাখতে হবে, তিনি ধর্ম বলেছেন, হিন্দু ধর্ম বলেননি। তিনি ভালবাসা, ধর্ম আর কর্মকে মেলানোর চেষ্টা করছেন। কাজ তখন হয়ে উঠবে ভালবাসার অঙ্গ। মার্কসবাদীরা বলেন, কমিউনিস্ট সমাজের উচ্চস্তরে, রাষ্ট্র মিলিয়ে যাবে, কারণ, শাসনের প্রয়োজন থাকবে না, মানুষ স্বশাসিত হবে, আর তখন কাজ হয়ে উঠবে ভালবাসার অঙ্গ। এই বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে গান্ধী প্রশ্ন করছেন, যদি আমরা যা যা চাই তার সবটাই ইংরেজরা মেনে নেয়, দিয়ে দেয়, তাহলেও কি ইংরেজদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলা হবে? অর্থাৎ তিনি সমাজে ন্যয় প্রতিষ্ঠা চাইছেন, ইংরেজ চলে যাওয়াটা যার একমাত্র শর্ত হতে পারে না। ইংরেজ চলে যাবে আর ইংরেজের ভূমিকায় নতুন ভারতীয় শ্রেণি ক্ষমতায় বসবে, এটাকেই প্রশ্ন করছিলেন ৩৯ বছরের গান্ধী।

গান্ধী বলছেন, প্রেমের সঙ্গে কাজ করাকে ধর্মের অঙ্গ হিসেবে মেনে নিতে। এনআরসি করে ১৯ লক্ষ লোককে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি কি প্রেমের সঙ্গে কাজ করা? সিএএ দিয়ে সাড়া দেশে মানুষের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করা কি প্রেমের সঙ্গে কাজ? মব-লিঞ্চিংয়ের ঘটনায় নীরব থাকা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদের ‘গোলিমারো শালোকো’ বলা কি প্রেমের সঙ্গে কাজ করা? পোশাকের রকম-সকম বা দামের দিক থেকে দেখলে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মহাত্মা গান্থীর কোনও মিল নেই, বরং ফারাক আকাশ-পাতাল, তবু নরেন্দ্র মোদি যে কখনও কখনও গান্ধীকে অনুকরণের চেষ্টা করেন, তা তাঁর আচার আচরণ, চরকা কাটার ভঙ্গীমা এবং কখনও কখনও ভাষা ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। লকডাউনের শুরুর দিকে মানুষের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি প্রায় গান্ধীর ভাষায় ‘ত্যাগ’ এবং ‘তপস্যা’র কথা বলেছিলেন। তার পর এই নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন গান্ধীর পৌত্র রাজমোহন গান্ধী। রাজমোহনের মূল বক্তব্য হল, গান্ধী তো নিজের ভুল কাজের দায়িত্ব নিতেন। ভুল স্বীকার করতেন। গান্ধীর কাছে অহিংসা কোনও কৌশল ছিল না। অহিংসা তাঁর নীতি এবং ধর্ম ছিল। ১৯২২ সালে গান্ধীর ডাকে পথে নামা আন্দোলনকারীরা যখন গোরক্ষপুরের চৌরিচৌরায় থানার ভিতরে ঢুকে ইংরেজসেবক ২২ জন পুলিশকে খুন করেছিল, গান্ধী আন্দোলন তুলে নিয়ে তাঁর পত্রিকা ‘নবজীবন’-এ লিখলেন, গোরক্ষপুরের চৌরিচৌরার ওই ঘটনার জন্য আমিই সব থেকে বেশি দায়ী।
২০২০-এর ২৪ মার্চ রাতে নরেন্দ্র মোদি ৪ ঘণ্টার নোটিসে লকডাউন ঘোষণা করে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে ফেলে দিলেন। বাড়ি ফেরার পথে প্রায় দু’শো জনের মৃত্যু হল রাস্তায়, রেললাইনে ট্রেনে কাটা পড়ে, পথ দুর্ঘটনায়, পথে অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায়। খাবার, পানীয় জলের অভাবে তারা ধুকতে ধুকতে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে, ভ্যানে চেপে রওনা দিয়েছিলেন বাড়ির পথে। তার পরও বহুবার নানান বাহারি পোশাকে নরেন্দ্র মোদি সরকারি ক্যামেরার সামনে এসেছেন। একবারও কিন্তু স্বীকার করলেন না যে তাঁরই ভুলে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনন্ত দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। নরেন্দ্র মোদি ভুল করেছেন এইভাবে আচমকা লকডাউন ঘোষণা করে, সঙ্ঘ-প্রধানও কখনও এমন মন্তব্য করেননি সেই সময়। তাহলে গান্ধীর থেকে তাঁরা কী শিখবেন? কী করে শিখবেন? কারণ গান্ধীর দর্শন দম্ভ-নির্ভর নয়।
তারও আগে, আচমকা নোট বাতিল করে গোটা দেশকে তিনি বিপাকে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন সব কালো টাকা বেরিয়ে পড়বে। দেখা গেল তা হল না। সব টাকাই ব্যাঙ্কে ফেরত এল। বলেছিলেন, কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ কমবে। যার কোনও লক্ষণই নেই। ওই সময় টাকার জন্য ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনও নরেন্দ্র মোদি বলেননি যে তিনি মানুষের এই দুর্ভোগের দায় নিচ্ছেন! তিনি এই ঘটনার জন্য দুঃখিত।
১৯৪৬ সাল। কলকাতায় ভয়ঙ্কর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ঘটে গেছে। তার পর নোয়াখালিতে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। গান্ধী পৌঁছলেন নোয়াখালিতে। তিনি ঠিক করলেন খালি পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে যাবেন। প্রথম প্রথম তাঁর যাও্য়ার পথে ভাঙা কাচ আর মল ফেলে রাখা হত। কিন্তু তাঁকে থামানো যায়নি। তিনি পায়ে হেঁটে মানুষের মনে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। অভিযোগ ছিল নোয়াখালির এসপি, ই এস এম আবদুল্লা দঙ্গায় উসকানি দিয়েছেন। তাকে দেখে গান্ধী বলেছিলেন, ওহ্, তুমিই তা হলে সেই আবদুল্লা! তোমার কথা আমাকে অনেকে বলেছে। নোয়াখালিতে আক্রান্ত মানুষদের রক্ষা তো তুমি করই-নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণকারীদের উৎসাহ দিয়েছ। আবদুল্লা গান্ধীর সামনে কোনও জবাব না দিয়ে কিঞ্চিত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। গান্ধী আবদুল্লার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে এসো। যে পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে হিন্দুদের পুঞ্জিভূত অভিযোগ, গান্ধী তাকে নিয়েই এলেন প্রার্থনাসভায়। শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। গান্ধী আবদুল্লাকে নিজের পাশে বসালেন। পরে প্রতিদিন গান্ধী প্রতিটি আক্রান্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। বেশ কিছু দিন ছিলেন নোয়াখালিতে। আর আবদুল্লা ততদিনে একজন বিশ্বস্ত গান্ধী ভক্ত। পরে আবদুল্লা বদলি হয়ে যান মুর্শিদাবাদে। দেশভাগের সময় গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে তিনি জানতে চাইলেন, তিনি কি ভারতে থেকে যাবেন না পাকিস্তানে চলে যাবেন। গান্ধী আবদুল্লাকে বললেন, না, তুমি পাকিস্তানে যাও। নতুন রাষ্ট্র, পাকিস্তানের তোমার মতো অফিসারের দরকার আছে। গান্ধীহত্যার পর গান্ধীস্মৃতি রক্ষায় একটি তহবিল তৈরি হয়েছিল। সেই তহবিলে প্রথম যে হাজার টাকার মানিঅর্ডারটি এসে পৌঁছেছিল, সেটা ঢাকা থেকে আসা, এস এম আবদুল্লার। এই হলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। আর সেখানে নরেন্দ্র মোদি বক্তৃতায় বলেন, আন্দোলনকাদরীদের পোশাক দেখে বোঝা যায় (লুঙি বোঝাতে এই মন্তব্য) তারা কারা! তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য কখনও আখলাখের খুনিকে বলছেন দেশপ্রেমিক, কখনও শাহিনবাগের উদ্দেশে বলা হয়েছে গোলিমারো শালোকো। আর যাঁরা এসব করছেন, তাঁদের সর্বোচ্চ নেতা দাবি করছেন, তাঁরা না কি ‘হিন্দু গান্ধী’র অনুসরণকারী। নোয়াখালি থেকে কিছুদিনের মধ্যেই গান্ধী ছুটে এলেন বিহারে। বিহারে তখন নোয়াখালির বদলা নিতে দাঙ্গা শুরু হয়েছে সেখানে। বিহারে তখন কংগ্রসের সরকার। সেই সময় একদিন স্থানীয় কংগ্রেস নেতাদের ডেকে গান্ধী বলেছিলেন, যারা বলেন বিহারের দাঙ্গা নোয়াখালির বদলা, তাদের আমি বলি, এমন ভাবে ভাবা মানে গুন্ডামির প্রতিযোগিতায় নামা। তিনি কংগ্রেস সদস্যদের উদ্দেশে বললেন, চোখের সামনে আপনারা দেখলেন নিরীহ মানুষকে খুন করা হচ্ছে, বাধা দিতে গিয়ে আপনাদের মৃত্যু হল না কেন! হয় করব না হয় মরব, এই ভাবনা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন না কেন!
নরেন্দ্র মোদি কি তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব-কালে ঘটা গুজরাট গণহত্যার পর তাঁর দলের কর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে এই কথা বলতে পেরেছিলেন? পারেননি।
২০২০-এর ২ অক্টোবর, সদ্য পেরিয়ে আসা গান্ধীজয়ন্তীতে টুইটার ট্রেন্ডিংয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে এক সারিতে উঠে এসেছিল তাঁর হত্যাকারী, নাথুরাম গডসের নাম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যিনি মাঝে মাঝে গান্ধীকে আনুকরণের চেষ্টা করেন, তিনি এটা দেখেও নীরব রইলেন। দোসরা অক্টবর সারা দিন টুইটারে শোনা গেল গান্ধী হত্যাকারীদের উল্লাস। শোনা গেল নাথুরামগডসে জিন্দাবাদ। ভোর ৫টা থেকে নাথুরামগডসেজিন্দাবাদ হ্যাশট্যাগে ক্রমাগত টুইট করা শুরু। দুপুরের মধ্যেই গডসে নিয়ে টুইটের সংখ্যা আশি হাজার ছাড়িয়ে যায়। গডসের সমর্থনে টুইট যাঁদের প্রোফাইল থেকে হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একাধিক ঘোষিত বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদের সমর্থককে দেখা গিয়েছে। গান্ধীকে সারা পৃথিবী কী চোখে দেখে তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। পশ্চিমবঙ্গর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ যে একসময়ে নিয়মিত বিদেশি জার্নালে কেমিস্ট্রির উপর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতেন, সেটা খুব একটা লোকজন জানেন না। সেই প্রফুল্ল ঘোষ ১৯৫৩ সালে প্রিন্সটোনে গিয়েছিলেন আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে। আত্মজীবনীতে প্রফুল্ল ঘোষ লিখেছেন, ‘তাঁর ঘরে দেখলাম মহাত্মাজির ছবি। আইনস্টাইন আমাকে বললেন, তিনি (গান্ধী) এ যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ।
এইখানেই হিন্দুত্বাদীদের খুব অসুবিধে হয়ে যাচ্ছে। গান্ধীকে আক্রমণ করলে, গডসের নামে জয়ধ্বনি দিলে ভারতে তাদের সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে, আর সারা পৃথিবী তাদের ছি ছি করছে। গান্ধী-হত্যাকারীকে সমর্থন করলে সারা পৃথিবীর সভ্য সমাজের কাছে যে মুখ দেখানো কঠিন হবে, সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন হিন্দুত্বাদীরা। এই সমস্য থেকে বেরোতে চাইছেন তাঁরা। তাই তাঁরা এখন গান্ধীর গায়ে জয়শ্রীরামের নামাবলী পরাতে এত ব্যস্ত। কিন্তু, ঈশ্বর আর আল্লার বিরোধ যাদের একমাত্র রাজনৈতিক পূঁজি, তাঁরা কী করে গাইবেন, ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম….।
ঋণ : বঙ্গসংহার, সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত