জীবনানন্দ খুব একটা শ্রদ্ধার্ঘ ধরনের কবিতা লিখতেন না। অসহ্য যন্ত্রণার মতো নিজের কাব্য প্রেরণাই তাঁকে নেশাতুর করে রাখতে যথেষ্ট ছিল। তবু গান্ধির অনস্তিত্ব তাঁর কলমকে নড়িয়ে দিয়েছিল। জীবনানন্দ তাই ‘মহাত্মা গান্ধী’ কবিতায় লেখেন
“অনেক রাত্রির শেষে তারপর এই পৃথিবীকে
ভালো বলে মনে হয়; সময়ের অমেয় আঁধারে
জ্যোতির তারণকণা আসে,
গভীর নারীর চেয়ে অধিক গভীরতরভাবে
পৃথিবীর পতিতকে ভালোবাসে, তাই
সকলেরই হৃদয়ের ‘পরে এসে নগ্ন হাত রাখে;
আমরাও আলো পাই — প্রশান্ত অমল অন্ধকার
মনে হয় আমাদের সময়ের রাত্রিকেও।
একদিন আমাদের মর্মরিত এই পৃথিবীর
নক্ষত্র শিশির রোদ ধূলিকণা মানুষের মন
অধিক সহজ ছিল – শ্বেতাশ্বতর যম নচিকেতা বুদ্ধদেবের।
কেমন সফল এক পর্বতের সানুদেশ থেকে
ঈশা এসে কথা বলে চলে গেল — মনে হল প্রভাতের জল
কমনীয় শুশ্রূষার মতো বেগে এসেছে এ পৃথিবীতে মানুষের প্রাণ
আশা করে আছে বলে — চায় বলে —
নিরাময় হতে চায় বলে।
পৃথিবীর সেই সব সত্য অনুসন্ধানের দিনে
বিশ্বের কারণশিল্পে অপরূপ আভার মতন
আমাদের পৃথিবীর হে আদিম ঊষাপুরুষেরা,
তোমরা দাঁড়িয়েছিলে, মনে আছে, মহাত্মার ঢের দিন আগে;
কোথাও বিজ্ঞান নেই, বেশি নেই, জ্ঞান আছে তবু;
কোথাও দর্শন নেই, বেশি নেই, তবুও নিবিড় অন্তর্ভেদী
দৃষ্টিশক্তি রয়ে গেছে; মানুষকে মানুষের কাছে
ভালো স্নিগ্ধ আন্তরিক হিত
মানুষের মতো এনে দাঁড় করাবার;”
বেশ দীর্ঘ এই কাব্যের শেষে কীভাবে যেন জীবনানন্দ-র মনন থেকে উপচে পড়ে এমন কয়েক পংক্তি —
“আমাদের মৃত্যু হয়ে গেলে এই অনিমেষ আলোর বলয়
মানবীয় সময়কে হৃদয়ে সফলকাম সত্য হতে ব’লে
জেগে রবে; জয়, আলো সহিষ্ণুতা স্থিরতার জয়।”
জেগে কি রয়েছে ‘জয়, আলো সহিষ্ণুতা স্থিরতা’? ২০২১-এর ভারত যেন অসহায় আক্রান্ত, আজ তার বড় দরকার মহাত্মাকে।

যে অসহায় নিষ্ঠুর মির্মিরে মনে হয় অমাবস্যা অচলা, তাদের তিরন্দাজির লক্ষ্য বারবার হয়েছেন মোনহদাস। অথচ তাঁর ধমনীতে যতক্ষণ বইছিল প্রাণ অনির্বাণ, ততক্ষণ আশ ছিল ঘৃণামুক্তির, সাম্প্রদায়িক বৈজাত্যর বিপরীতে জেগে ছিল অদ্বৈত বিবস্বান। প্রয়োজন হয়েছিল সেই দিবাকর নির্বাপণের, তাই ঘাতকের অব্যর্থ নিশানা। তাই আরও একবার হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হবার পরে যেন কেমন একটা অপার্থিব বাণী মোহনদাসের। ৩০ জুন ১৯৪৬ তাঁকে হত্যা-প্রচেষ্টার পরের দিন পুনায় এক প্রার্থনা সভায় তিনি বলছেন,
“By the grace of GOD I have been saved from the proverbial jaws of death seven times. I have not ever hurt anybody. I consider no one to be an enemy. So I fail to understand why there have been so many attempts on my life? The attempt on my life yesterday failed. I am not ready to die just yet. I am going to live till I reach 125 years.”
তিনি বাঁচতে চান, কেননা অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। ৩০ জুন ১৯৪৬ তারিখে দেশ তখনও ভাগ হয়ে যায়নি, কিন্তু তেমনই তোড়জোড় চলছে। গান্ধির অন্তরের অন্তঃস্থল বিদীর্ণ হচ্ছে আসন্ন প্রলয়ের মরণ-শঙ্কিল বেদনায়। আবার রিয়েল পলিটিক-এর ওজন সামলানোও অত সহজ ছিল কি? দাঙ্গার আগুন চারদিকে লেলিহান, পৃথিবীর সবথেকে বড় উদ্বাস্তু স্রোত তখন শুরু হয়েছে। তাই তিনি বাঁচতে চান।
এখানে অতি সংক্ষিপ্তভাবে আমরা দেখব, কীভাবে বারবার মহাত্মা গান্ধিকে খুন করার চেষ্টা করা হয়েছে। একটু ইতিহাস অনুসারী হলেই দেখতে পাব, ব্রিটিশের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ও ভারতকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়ার সিরিয়াস প্রচেষ্টা শুরুর যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল এসবের বিরুদ্ধে সবথেকে বড় বাধা মহাত্মাকে সরিয়ে দেবার প্রচেষ্টা। উল্লেখযোগ্য, রাজনৈতিক সমতার ভিত্তিতে গঠিত নতুন ভারত যারা চায়নি, তারাই এসব প্রচেষ্টা ও অবশেষে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। ১৯৩১ সালে কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনের প্রস্তাবে ভবিষ্যৎ ভারতের যে রূপরেখা আঁকা হয়েছিল, যারই চূড়ান্ত পরিণতি ভারতের সংবিধান, সেটাকেই হত্যাকারীরা মানতে চায়নি।

প্রথম প্রচেষ্টা
২৫ জুন ১৯৩৪। পুনে কর্পোরেশন অডিটোরিয়ামে বক্তৃতা দেবার কথা ছিল গান্ধির। দুটি একই রকম গাড়ির একটিতে গান্ধি ও কস্তুরবা ছিলেন। প্রথম গাড়িটি অডিটোরিয়ামে পৌঁছতেই বোমা ছোড়া হয়। গাড়িটিতে সওয়ার ওই কর্পোরেশনের চিফ অফিসার মারাত্মকভাবে আহত হন, গান্ধি বেঁচে যান। আক্রমণের পরে গান্ধি বলেছিলেন, “দুঃখের বিষয় যে এটা ঘটেছে। আমার এখনই শহিদ হবার ইচ্ছা নেই, তবে যদি তা-ই ঘটে আমি তার জন্য প্রস্তুত আছি। আমাকে হত্যা করা সহজ। কিন্তু আমাকে হত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে তারা অন্যদের প্রতি এত অবিবেচকের মতো আচরণ করছে কেন, যেসব নির্দোষ ব্যক্তিরা আমার সঙ্গে থাকেন বা ভ্রমণ করেন, তাঁদের সাংঘাতিকভাবে আহত বা হত্যা করে?”
দ্বিতীয় প্রচেষ্টা
১৯৪৪ সালের মে মাসে আগা খান প্যালেস থেকে তাঁর কারামুক্তির পরে গান্ধির ম্যালেরিয়া হয়। তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে পুনের কাছে পঞ্চগ্নি পাহাড় এলাকায় বিশ্রাম নিতে যান। এই অবস্থায় ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে জনা কুড়ি লোক নিয়ে একটি ভাড়া করা বাস ওখানে যায়। সারাদিন ওই লোকেরা গান্ধির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। সন্ধ্যায় প্রার্থনা সভায় গান্ধি বিক্ষোভকারীদের নেতা নাথুরাম গডসে-কে আসতে অনুরোধ করেন। গডসে একটি ভোজালি নিয়ে গান্ধির দিকে হঠাৎই তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে দৌড়ে যান। গডসেকে ধরে ফেলা হয়, এবং গান্ধি বেঁচে যান। বাকি যুবকেরা পালিয়ে গেলেও গডসে ধরা পড়েন। গান্ধি গডসেকে ৮ দিন তাঁর সঙ্গে থাকতে অনুরোধ করেন, যাতে গডসের রাজনৈতিক বক্তব্য গান্ধি বুঝতে পারেন। গডসে সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। পুলিশে না দিয়ে গান্ধি গডসেকে ছেড়ে দেন। পরে কাপুর কমিশনে গডসের এসব কাজ প্রমাণিত হয়।
তৃতীয় প্রচেষ্টা
গান্ধি জিন্নার সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। গডসেরা এই আলোচনার চূড়ান্ত বিরোধিতা করছিলেন। বোম্বাইয়ে আলোচনা হবার কথা ছিল। সেবাগ্রাম থেকে গান্ধি বোম্বাইয়ে যাবেন, এমনই ব্যবস্থা হয়েছিল। আলোচনা চলেছিল ১৯৪৪ সালের ৯ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যদিও ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। গডসেরা কয়েকজন গান্ধির বাসস্থানের কাছে এসে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন যাতে গান্ধি না যেতে পারেন। এমন সময়েই একদিন গডসে ভোজালি নিয়ে গান্ধিকে হত্যা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু উপস্থিত অন্যরা তাকে ধরে ফেলেন। পরে কাপুর কমিশনের কাছে ড. সুশীলা নায়ার এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেলেন।

চতুর্থ প্রচেষ্টা
১৯৪৬ সালের ২৯ জুন গান্ধি ট্রেনে করে পুনা যাচ্ছিলেন। যে ট্রেনে তিনি যাচ্ছিলেন সেটিকে গান্ধি স্পেশাল ট্রেন নাম দেওয়া হয়েছিল। নেরুল ও কারজাট স্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায় ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পড়ে। জানা যায়, রেললাইনের উপরে বড় পাথরের খণ্ড রাখা ছিল। ড্রাইভারের তৎপরতায় বড়সড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় গান্ধি সহ ট্রেনের আরোহীরা। এরপরের দিন গান্ধি উপরে উল্লিখিত বক্তৃতা করেছিলেন। ওই বক্তৃতায় সাতবার হত্যার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, যদি বক্তৃতার কথাগুলি ঠিকভাবে রির্পোট করা হয়ে থাকে, তবে ২৯ জুন ১৯৪৬-এর ঘটনাটি চতুর্থ নয়, সপ্তম। এর অর্থ, আগে আরও তিনবার গান্ধি-হত্যার প্রচেষ্টা হয়েছে, যা নিয়ে গান্ধি জনসমক্ষে সোচ্চার হননি, আমরাও সেসব ঘটনার বিষয়ে জানিনা।
পঞ্চম প্রচেষ্টা
১৯৪৮ সালের ২০ জানুয়ারি এই ঘটনা ঘটেছিল। নতুন দিল্লিতে বিড়লা হাউসে গান্ধির প্রার্থনাসভা স্থল বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। বোমা ফাটলেও হত্যাকারীরা যতটা ভেবেছিলেন, ততটা বড় বিস্ফোরণ হয়নি। গান্ধি ও অন্যরা বেঁচে যান। এই ঘটনাতেও নাথুরাম গডসে ছিলেন। পরে গান্ধি হত্যা মামলার শুনানিতে তা প্রমাণ হয়।
ষষ্ঠ এবং সফল প্রচেষ্টা
এবার গডসে আর ব্যর্থ হননি। গডসে ও তাঁর মদতকারীরা এবার বন্দুক জোগাড় করেছিলেন। তা নিয়ে ২৯ জানুয়ারি তাঁরা নতুন দিল্লি পৌঁছন। পরের দিনটা ছিল ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। নতুন দিল্লির বিড়লা ভবনে প্রার্থনা সভায় যাওয়ার সময় বিকাল ৫টা ১২ মিনিটে তাঁর দেহে তিনটি বুলেট ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হন গডসে। গান্ধি মাটিতে পড়ে যান ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যু যখন তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তখনও তিনি এক স্বপ্নাদিষ্ট পথিক, বয়স অবশ্য ৭৯ বছর।
নির্মম রূঢ় সত্যের ধারাবিবরণী। মর্মস্পর্শী লেখা। মন ছুঁয়ে গেল।