“আঙুলের ফাঁকে আজ আমি কই…”
এক. ফেব্রুয়ারী মাসের এক শীতের দুপুর। আট বছর আগের কথা। কমেন্ট্রি বক্সে মাইকটা হাতে তুলে নিয়েছেন মানস-পল্লব। ব্যাকফুটে থাকা করিম বেঞ্চারিফার মোহনবাগানের মুখোমুখি ট্রেভর জেমস মরগ্যানের ইস্টবেঙ্গল। ম্যাচের প্রথমার্ধে ডি বক্সের একটু আগে মোহনবাগান তাদের বাম দিক ঘেঁষে একটি ফ্রিকিক পায়। ভগ্নদশাগ্রস্থ মোহনবাগানের তখন অক্সিজেন দুইজন— ওডাফা ওকোলি আর রহিম নবি। টোলগে ওজবে তখন অমাবস্যায় নিভে যাওয়া জোৎস্না। ফ্রিকিকটা নিতে এগিয়ে এলেন নয় নম্বর জার্সির এক দীর্ঘকায় মানুষ। লোকটা সেট পিস মারেন সাধারণত ডান পায়ে। ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার অভিজিৎ স্বভাবতই নিয়ার পোস্ট কভার করে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে আছে লালরিনডিকাদের দুর্ভেদ্য ওয়াল। ছয় ফুট এক ইঞ্চির লোকটা শ্লথ গতি আস্তে আস্তে হেঁটে ফ্রিকিক মারলেন। জোরে নয়, একেবারে আস্তে, মাখনের আলতো গায়ে ছুড়ির যেমন রোম্যান্টিক পরশ থাকে তেমন করে। অভিজিৎ বোকা বনলেন। নাইজেরিয়ান লোকটা নিয়ার পোস্টে ফ্রিকিকটা রাখেননি। রাখলেন ফার পোস্টে। লালরিনডিকাদের মাথার চুলগুলো আলতো ছুঁয়ে বলটা ড্রপ খেতে খেতে স্পর্শ করলো ফারপোস্টে। অভিজিৎ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তাকিয়ে থাকলেন লালরিনডিকারাও। মাইক ফেলে চুপ হয়ে থাকলেন মানস-পল্লব। লোকটা বলটাকে ফারপোস্টে খেলাবে, ভাবেনি কেউ। বলটা গোলে ঢুকলোনা। ফারপোস্ট ছুঁয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো। অভিজিৎ তারপরেও তাকিয়ে রইলেন। তাকিয়ে রইলেন লালরিনডিকা-মেহতাব হোসেনরা। চুপ হয়ে রইলেন মানস-পল্লব। কিছুক্ষণ পর মাইক হাতে নিয়ে পল্লব বসু মল্লিক বজ্রসম কিন্তু মৃদু, বিস্ময়ভরা এক স্বরে আলতো করে বলে গেলেন— “বিশ্বমানের ফ্রি কিক”। এই পুরো ঘটনাটা ঘটে গেলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। গোল হলোনা… কিন্তু কিছু একটা হলো যেটা সবাইকে হতবাক করে রেখেছিলো কিছুক্ষণ।

লোকটাকে আমরা কোবরা বলতাম। তিনি গোল করলে পল্লব বসু মল্লিক গলা উঁচিয়ে পুরো নামে ডাকতেন— “ওডাফা ওনিয়েকা ওকোলি”। আর গোল না করলে, তিনি মাঝেমধ্যে এমনই “কিছু একটা” করতেন যেটাতে হতবাক হতাম আমরা। আমরা হতবাক হতে চাইতাম বারবার এই লোকটার কাছে। চাইতাম কিছু একটা করুক, সত্তর মিনিটেও, আশি মিনিটেও, নব্বই মিনিটেও… কিংবা তারপরেও। আমরা হতবাক হতে চাইতাম বারবার… এই একটা লোকের কাছেই।
দুই. আবারও ফেব্রুয়ারী মাস। এক শীতের দুপুর। ঠিক একবছর আগেই। সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্য ওডাফা ওকোলিকে নাম দিলেন ও-টু। যথার্থ নাম। আই সি ইউ বেডে থাকা মোহনবাগানের অক্সিজেন কিনা। অবশ্য মোহনবাগান ততদিনে আই সি ইউ বেড ছেড়ে বেশ চাঙ্গা। চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই লড়ছে ডেম্পোর সাথে। সৌজন্যে সুব্রত ভট্টাচার্য-প্রশান্ত ব্যানার্জির শত্রুতা ভুলে সুহৃদময় টিডি-কোচ জুটি এবং ওডাফা ওকোলি। ফেব্রুয়ারীর ওই শীতের দুপুরটিতে খেলা পড়লো মোহনবাগান-মুম্বই এফ সির। মাস্ট উইন ম্যাচ। ৭৪ মিনিট পর্যন্ত মোহনবাগান পিছিয়ে ০-১ গোলে। একদা স্ট্রাইকার থেকে আচমকা স্টপার হয়ে যাওয়া অভিষেক যাদব ৭৪ মিনিট পর্যন্ত আটকে রেখেছেন ওডাফাকে। ৭৪ মিনিট পর্যন্ত ম্যান অফ দ্য ম্যাচ অভিষেকই। কিন্তু ওডাফাকে কে কবেই বা আটকে রাখতে পেরেছে। ৭৪ থেকে ৮১— সাত মিনিটে মাটি ফুঁড়ে ওডাফার দুইবার উত্থান। দুই উত্থানে দুই গোল। মোহনবাগান ম্যাচ জিতলো ২-১ এ। ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে টিডি সুব্রত ভট্টাচার্য বললেন মোট চারটি শব্দ— “ওডাফা হলো একটা বোমা”।

পরের দিনের সংবাদপত্রে রূপায়ণ ভট্টাচার্য লিখলেন— “ও টু’ জানেন, কখন ঝাঁপাতে হয়, অক্সিজেন নিতে হয়। ১৬ মিনিটই তাঁর যথেষ্ট (৭৪ মিনিট থেকে ৯০ মিনিট)। ১৬ মিনিট… ১৬ মিনিট কোথায়? শনিবার তো আসলে যুদ্ধ জিততে ৭ মিনিট লাগল ওডাফার!
তিন. ডিসেম্বরের আরেকটা শীতের দুপুর। সেই ভয়ংকর ম্যাচ। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল মুখোমুখি। নবির মাথায় ইট লেগে রক্তপাত চলছে। মোহনবাগান সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বিতীয়ার্ধে দল নামাবেনা। কিন্তু আমি এখন তুলে ধরছি এই ঘটনাগুলির ঠিক কিছু মিনিট আগেকার ক্লাইম্যাক্সটা। করিমের মোহনবাগান তখন আই সি ইউ পেশেন্ট। ইস্টবেঙ্গলের চেয়ে ধারেভারে মাইল খানেক পিছিয়ে। তবুও ডার্বিতে মোহনবাগান শুরু করেছিলো খানিকটা চাঙ্গা হয়েই। কিছুক্ষণ পরেই ওডাফার খুনে মেজাজ উগরে পড়লো রেফারি বিষ্ণু চৌহানের ওপর। ক্ষিপ্ত বিষ্ণু চৌহান সরাসরি লাল কার্ড দেখালেন ওডাফাকে। ওডাফা গালি দিতে দিতে বেরিয়ে যাচ্ছেন স্টেডিয়াম ছেড়ে। পল্লব বসু মৌলিক কমেন্ট্রি দিতে দিতে শুধু বলে উঠলেন— “আই সি ইউ তে থাকা পেশেন্টের মুখ থেকে অক্সিজেনের নবটা খুলে নেওয়া হলো”। মানুষটা ঠিক কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো একটা ভাঙাচোরা দলের কাছে, যে মাঠছেড়ে বেরিয়ে গেলে দলটা কার্যত সূর্যাস্তের কোলে ঢলে পড়ে!

আজ আকাশজুড়ে কালবৈশাখীর উদ্দাম নাচ কেনো যে বারবার মনে করাচ্ছে সেই লম্বা লম্বা পা দুটোর সর্পিল গতিতে বারবার ডি বক্সে আছড়ে পড়াটা, জানিনা। সেই গতিতে উদাসী বৃষ্টি নেই। আছে ভয়ংকর অথচ সুন্দর ধুমকেতুর আভাস। মুহুর্তের জন্য আলোক জ্বলে ওঠে আকাশে। আবার মিলিয়ে যায়। আবার হারিয়ে যায়। আবার নিখোঁজ হয়ে যায়… ধুমকেতুর মতো… ওডাফার মতো করে।
আর আমরা, স্মৃতিবিলাসীরা পথ চেয়ে বসে রই আজও, কখন ওডাফা কিছু একটা করবে… সত্তর মিনিটেও… আশি মিনিটেও… নব্বই মিনিটেও… কিংবা তারপরেও…