সন্ধ্যা হলেই একটু নোনতা জাতীয় খাবারের জন্য মনটা কেমন মো মো করে ওঠে। ভোজন রসিকদের কাছে চপ, সিঙ্গারা, কচুরি একটি বিশেষ জায়গা দখল করে থাকলেও ধোঁয়া ওঠা একপ্লেট মোমো পেলে মন রসনা তৃপ্তিতে ভরে ওঠে।
মোমোর জন্মস্থান তিব্বতে। শোনা যায় তুলাধর জাতির মধ্যে সর্বপ্রথম মোমো জন্ম নিয়ে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, একটু নতুনত্বের ছোঁয়া দিয়ে তারা এটিকে নিত্যনৈমিত্তিক খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। পরে নেওয়ার ব্যবসায়ীরাই তিব্বত থেকে এটি প্রথম ক্রয় করে আনে। নেপালে মহিষের মাংস সহজলভ্য তাই নেপালে মোমোর পুর হিসেবে মহিষের মাংসের কিমা ব্যবহার করা শুরু করা হয়।
যদিও এটি নেপালের ব্রাহ্মণ ও ছেত্রী সম্প্রদায়ের কাছে নিষিদ্ধ খাবার ছিল তবু নেপালের প্রায় অধিকাংশ স্থানে সুস্বাদু খাবার হিসেবে ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করে মোমো। নেপালের জন আন্দোলনের পর থেকে শুরু করে ৯০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটি অন্যতম জনপ্রিয় প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

পরবর্তীকালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ব্যাপক দেশান্তর (Migration) ও মুক্ত অর্থনীতির কল্যাণে ২০০০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কলকাতা-সহ ভারতের বিভিন্ন মেগাসিটিতে মোমো খাবারটি পরিচিতি লাভ করে। বিশ্বের এখন প্রায় ষাট শতাংশ দেশেই এই খাবারটি পাওয়া যায়। কলকাতায় মুরগির মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি মোমো এতটাই ফেমাস যে তরুন-তরুণী-র কাছে এটি মাস্ট-ফুড হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
তিব্বতি ভাষায় ‘মো’ শব্দের অর্থ বাষ্প বা স্টিম।
সাধারণ মোমো বাষ্পের মধ্যেই তৈরি করা হয়। আর মোমো কথাটির অর্থ হলো “মাংসের পুর ভরা ভাপা ময়দার একটি বিশেষ খাদ্য”। তিব্বতে মোমোকে বলা হয় মগমগ (অর্থাৎ চলন), ইংরেজিতে ডাম্পলিং, আসামে মম, চীনে পিনইন, জাপানে গিয়োজার, মঙ্গোলিয়ার বাজ আর নেপালে মমচপ। এই সমস্ত নামের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কলকাতায় বলা হয় মোমো।

স্টিম ফ্রায়েড (Steam fried momo) থেকে প্যান ফ্রায়েড (Pan fried momo) মোমো নামগুলো শুনলেই কেমন যেন আপনা হতেই জিভে জল চলে আসে। এখনতো মোমোর পুর হিসেবে কোঁচানো বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, পনির, চকলেট-সহ বিভিন্ন স্বাদের সুস্বাদু মোমো তৈরি করা হচ্ছে। এটি বানানোর জন্য মাকটু নামে একটি বাসন ব্যবহার করা হয়। মোমোর অনুসঙ্গ হিসেবে স্যুপ বা লেবুর রস কাঁচালঙ্কা বাটার চাটনি বা মোমোর খাঁটি সস।
১৯৯৪ সালে দিল্লি লাজপথ নগরে প্রথম মোমোর দোকান চালু করেন দলমা সেরিং নামের একমাত্র মহিলা যাকে ভারতের প্রথম মোমো বিক্রেতা হিসেবে জানা যায়।
৯০-এর দশকে যখন দলমা প্রথম দিল্লিতে এসেছিলেন, তখন স্থানীয়দের মধ্যে মোমোর জন্য খুব একটা ডিমান্ড ছিলো না কারণ ক্রেতারা মনে করেছিল যে খাবারটি অন্যান্য রাস্তার খাবারের তুলনায় ‘কাচ্চা’ (কাঁচা)। কিন্তু গ্রাহকদের মন মজলো যখন গরম মোমোর সঙ্গে চিলি গার্লিক চাটনির কম্বিনেশন নিয়ে এলো এক নতুন স্বাদের করোক।

ধীরে ধীরে এতটাই জনপ্রিয় হলো এই ‘দলমা আন্টি মোমো’স (dolma aunty momos) লাজপত নগরের ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্ট প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি মোমো রোজ বিক্রি হয়। আজ দলমা আন্টির ২০ জনের বেশি কর্মচারী-সহ দিল্লি জুড়ে তিনটি দোকান রয়েছে। যদিও তার ছেলে রামু এখন মূল ব্যবসা পরিচালনা করে। সে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করে যে তাদের ঐতিহ্যবাহী রেসিপিটি এখনও সমস্ত আউটলেটে ব্যবহৃত হয়।
বিভিন্ন ধরনের এবং স্বাদে পাওয়া মোমোগুলি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারকও প্রমাণিত হয়েছে বহুবার। মোমোতে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেটও থাকে যা স্থূলতার কারণ হতে পারে। অনেক সময় মোমোর ভেতরে থাকা সবজিরপুর এতটাই নিম্নমানের হয় যে এর মধ্যে ইকোলাইয়ের মতো ব্যাকটেরিয়াও থাকতে পারে। ময়দার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হাই হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বুঝে শুনে খাওয়া দরকার।
আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর আগে প্রথম মোমো খাই দিল্লিতে। সেদ্ধ মাংসের পুর দেওয়া ধোঁয়া ওঠা মোমো আর সঙ্গে কমলা-বাদামী রঙের ঝাল ঝাল সস… সত্যি বলতে সেটা ছিলো জীবনে খাওয়া সেরা মোমো।

কলকাতায় আমি প্রথম মোমো খেয়েছিলাম এলগিন রোডের একটি খাঁটি তিব্বতি ছোট্ট ঠেকে। দোকানে শিখেছিলাম কীকরে তরিবত করে মোমো খেতে হয়। এখনতো পাড়ার মোড়ে, ফুটপাথের ধারে দিব্যি হাতে প্লেট নিয়ে মোমো খাওয়া চলছে। এসব দেখে মনে হয় মোমো কি তার কৌলীন্য হারিয়ে ফেলছে!! মোমোর খাস রাজত্ব দার্জিলিংয়েও যত্রতত্র মোমো পাওয়া যায়।
সে যাই হোক, পুলিপিঠে সদৃশ্য খাবার বলেই মন মজেছে মোমোতে বাঙালির। মোমো দার্জিলিং, নেপাল ইত্যাদি জায়গার জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। বিশ্বায়নের যুগে এই মোমোই সাত থেকে সত্তর সকলের মন জয় করেছে। বাঙালির জীবনে আসা নতুন ফাস্টফুড যতই নজর কাড়া হোক না কেন, মোমো সবার মাঝে ‘শ্রেষ্ট আসন লবে।’
Source: Various sources have been referred to for information.
Evening snacks
মনপসন্দ ইভিনিং স্নাকস ????
আমি প্রথম মোমো খেয়েছিলাম ভুটানে। এখন Dumdum রোড থেকে প্রায়ই খেয়ে থাকি। এখন দাম এত বেশি আর গুনমান এতো কম যে কিছুদিন পর হয়তো নাগালের বাইরে চলে যাবে।
সহমত হলাম।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ❤️