মার্গশীর্ষ বা অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিকে বলা হয় মোক্ষদা একাদশী। একাদশী ব্রত পালনে একাদশ ইন্দ্রিয়ের সংযম হয়। ইন্দ্রিয় সংযত হলে জাগতিক রিপু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা আজকের দিনে পরিবারগতভাবে ও সমাজে একান্ত জরুরী। একাদশী দেবী তার একান্ত অনুগত ভক্ত বা সাধককে জাগতিক সমস্ত কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত করে পরমপথে অর্থাৎ মোক্ষের পথে পৌঁছে দেন।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথি ৩ ডিসেম্বর ২০২২, শনিবার সকাল ৫:৩৯ এ শুরু হচ্ছে এবং পরের দিন রবিবার সকাল ৫:৩৪ এ শেষ হচ্ছে।
পুরান মতে, প্রাচীনকালে কোনও এক সময় চম্পক নগরে বাস করতেন বৈখনাস নামে এক রাজা। তিনি ছিলেন সমস্ত বৈষ্ণব সদগুণে বিভূষিত। প্রজাদের তিনি পুত্রের মতো পালন করতেন। তার রাজ্যে বহু বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাস করতেন। রাজ্যের সকলেই ছিল বেশ সমৃদ্ধশালী। একবার রাজা একদিন রাতে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন জানতে পারলেন যে তার পিতৃদেব নরকে নিদারুন যন্ত্রণা ভোগ করছেন। তা দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হলেন।
পরের দিন তাঁর পরিষদদের ও ব্রাহ্মণদের ডেকে এই দুঃস্বপ্নের কথা বললেন। তিনি বলতে লাগলেন —”হে ব্রাহ্মণগণ! আমার এই বিশাল রাজ্য, স্ত্রী-পুত্র থাকা সত্ত্বেও আমি কিছুতে শান্তি পাচ্ছিনা। পিতার যন্ত্রণা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে। আমার মতো পুত্র থাকতেও যদি পিতামাতা পূর্বপুরুষেরা এমন নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকেন তবে এমন পুত্রের কি বা প্রয়োজন?”
ব্রাহ্মণগণ বললেন — হে মহারাজ! আপনার রাজ্যেই ত্রিকালজ্ঞ ঋষি মহর্ষি পর্বত মুনির আশ্রম রয়েছে। তাঁর কাছেই আপনি আপনার মুক্তির পথ পাবেন।

ব্রাহ্মণদের উপদেশমতো বৈখনাস তাদের সঙ্গে নিয়ে সেই পর্বত মুনির আশ্রমে গমন করলেন। রাজা যখন পার্বত মুনির আশ্রমে পৌঁছলেন এবং ঋষিবরকে সষ্টাঙ্গে প্রণাম করে তাঁর স্বপ্নের কথা বললেন। রাজন বললেন, “হে ঋষিবর! কোন পুণ্যের ফলে পিতা এই দুর্দশা থেকে মুক্তি পাব, তার উপায় জানতেই আপনার নিকট উপস্থিত হয়েছি।”
ঋষি ধ্যান করে রাজার পিতার নারকীয় অত্যাচারের কারণ খুঁজে পেলেন। তিনি বললেন —হে রাজন! পূর্বজন্মে তোমার পিতা অত্যন্ত কামাচারী হওয়ায় তার এরকম অধোগতি লাভ হয়েছে। ঋষি জানান, যে তার বাবা তার স্ত্রীর সাথে অকারণে ঝগড়া করতেন এবং স্ত্রীর প্রতিবাদের পরেও ঋতুস্রাবের সময় তার সাথে সহবাস করার পাপ করেছিলেন।
ঋষিবর উপদেশ দিলেন, বৈখনাস সপরিবারে পূর্ন বিশ্বাস ও ভক্তি সহকারে শাস্ত্রীয় বিধান মেনে মোক্ষদা একাদশী পালন করলে তবেই তাঁর পিতৃদেব মুক্তিলাভ করবেন। বৈখনাস সেই ব্রত পালন করে একগণ্ডুষ জলযোগে পিতৃদেবের উদ্দেশ্যে ব্রতের পুণ্যফল প্রদান করলে তিনি সদগতি প্রাপ্ত হন। অন্তিমে রাজা বৈখনাস নিজেও গমণ করেন বৈকুণ্ঠলোকে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একথা বলেছেন নকুল, সহদেব প্রমূখ পান্ডবদের। তিনি একথাও বলেন মোক্ষদা একাদশী অন্যান্য উপবাসের মতো পুণ্যফল প্রদান করে। অন্তিমে সাধক বা ভক্তজনের মোক্ষপ্রাপ্তি হয়। এই ব্রত কথা যিনি পাঠ করেন এবং যিনি শ্রবণ করেন, উভয়েই বাজপেয় যজ্ঞের ফল প্রাপ্ত হন। মোক্ষদা একাদশীর দিনে মিথ্যা কথা, অপবাদ ও অন্যান্য অপকর্ম ত্যাগ করে পুণ্য অবলম্বন করলে তবেই মোক্ষ লাভ হয়।
হিন্দুদের মধ্যে মোক্ষদা একাদশীর একটি বড় তাৎপর্য রয়েছে। দ্বাপর যুগে এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শ্রীমদভগবদ্গীতা বাণী শুনিয়েছিলেন। আজ শ্রীমদ্ভাগবতগীতার ৫১৫৯তম বার্ষিকী। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে এই দিনেই শ্রী কৃষ্ণ অর্জুন কে গীতারূপ জ্ঞানের দ্বারা সাংসারিক আসক্তি থেকে মুক্ত হাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। এটি সারা দেশে সমস্ত কৃষ্ণভক্তদের দ্বারা পালিত হয় — এমনকি দেশের বাইরেও ভক্তি সহকারে পালিত হয়।

গীতার মত ধর্মগ্রন্থ পৃথিবীতে বিরল। মহাভারত রচয়িতা ব্যাসদেব বলেছেন — ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ বিষয়ে এবং অধর্ম, অনর্থ, অকাম ও অমোক্ষ বিষয়ে যা মহাভারতে আছে তা অন্যত্রও আছে এবং যা মহাভারতে নেই, তা অন্য কোথাও নেই। গীতা সর্বযুগের সর্ব মানুষকে সব সময় কিছু না কিছু দিতে পারে। জীবনের অনেক সমস্যা চিন্তাভাবনার সমাধান এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের কথা এখানে উল্লিখিত আছে।
মানব জীবনের সমগ্র সার কথা গীতায় বলা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কর্ম যোগ, জ্ঞান যোগ, ভক্তি যোগের শিক্ষা।এই দিনে শ্রী কৃষ্ণকে স্মরণ করা উচিত এবং গীতা পাঠ করা উচিত। গীতায় বর্ণিত শ্লোকে ভক্তিই হলো সর্বগুহ্যতম তত্ত্ব।
“মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্ যাজী মাং নমস্কুরু। / মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।(১৮/৬৫)
অর্থাৎ — তুমি আমাতে চিত্ত অর্পণ কর, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা কর এবং আমাকে নমস্কার কর। তা হলে তুমি আমাকে অবশ্যই প্রাপ্ত হবে৷ এই জন্য আমি তোমার কাছে সত্যই প্রতিজ্ঞা করছি, যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়।”
শেষে প্রার্থণা করি, ঈশ্বর আমাদের যেন অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোকে, মৃত্যু থেকে অমৃতের পথে চালিত করেন। সকলের মধ্যে শান্তি বিরাজিত হোক। মায়াধীশ নিজেই তাঁর মায়াকে বশীভূত করে মায়াধীন জীবের কল্যাণের জন্য অবতীর্ণ হোক।
ওঁ শান্তি।।
অসাধারণ লেখনী ????????????
ধন্যবাদ। জয় যোগেশ্বর।
জয় যোগেশ্বর।
জয় যোগেশ্বর ????