এক গরিব বৃদ্ধা একটু বেশি কাঠ পাওয়ার আশায় এক গভীর জঙ্গলে ঢোকে। জঙ্গলে সে অনেক কাঠ কুড়োয়।মহা আনন্দে কাঠ জড়ো করে একটা বড়ো বোঝা বানায়। এবার বাড়ি ফেরার পালা। ভারী কাঠের বোঝা মাথায় তুলে কিছুদূর হাঁটার পর পরিশ্রান্ত হয়ে যায় বৃদ্ধা। ঘর্মাক্ত শরীরে একটি গাছের তলায় বসে পরে। বসে থেকে অদৃষ্টকে দূষতে থাকে। ধিক্কার জানিয়ে বলেন, “মৃত্যুও কী আমায় ভুলেছে!”
বলতে না বলতেই হঠাৎ করে বিরাটকায় মৃত্যু এসে উপস্থিত হয় বৃদ্ধার সামনে।
বৃদ্ধা কে বলে, “আমায় ডাকছিস কেন?”
এদিকে বৃদ্ধা মুখে যাই বলুক, মনে মনে বাঁচার ইচ্ছা ছিলো ষোলো আনা। তখন আমতা আমতা করে সভয়ে বললো, “মহাশয়, বোঝাটা আমার বড্ড ভারী। ঘন জঙ্গলে ভারী বোঝা একা মাথায় তুলতে পারছিলাম না। তাই সাহায্য করার জন্য আপনাকে ডেকেছি।”
আমাদেরও অনিত্য বিষয়গুলি ছাড়তে ঠিক এমনি হয়। অথচ প্রত্যেকটি মানুষ জানে যে, জন্ম বা মৃত্যু কোনোটাই তাঁর জীবনের একান্ত নিজস্ব কিছু নয়। মৃত্যু শব্দটি যেন অপার রহস্যে মোড়া ভয়ঙ্কর একটি শব্দ। হাজার হাজার পুরোন সভ্যতা নিঃশেষ হয়ে যায় এর প্রকোপে। মৃত্যু কখনো আসে নিঃশব্দে, কখনো বা সে উদ্দাম, অশান্ত, উত্তাল। কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তাণ্ডবলীলায় দুমড়েমুচড়ে কেড়ে নেয় অগুনতি তাজা প্রাণ।
আজো কোন দেবতার ঝুলি থেকে কোন সঞ্জীবনী বুটি বেরোয়নি যা কোন মৃত্যুহীন মানুষের জন্ম দিতে পারে। মনের ভিতরে তীব্র বাসনা নিয়েই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়তে বাধ্য হয় সকলেই।
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের একটি প্রধান শিক্ষা হলো— “মন ও মুখ এক করা।” ঠাকুর বলতেন, মানুষের মন সর্ষের পুঁটলির মতো। সর্ষের পুঁটলি যেমন একবার ছড়িয়ে গেলে কুড়ানো ভার হয়ে ওঠে ঠিক তেমনি মানুষের মন একবার সংসারে ছড়িয়ে পড়লে তাকে গুছিয়ে তোলা বড়ো কঠিন। বালকদের মন ছড়ায়না, তাই অল্পতেই তারা স্থির হয়ে যায় কিন্তু বুড়োদের ষোল আনা মন সংসারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেইখান থেকে মন তুলে ঈশ্বরে স্থির করা বড়ো শক্ত।
ঠাকুর বলতেন, “যাত্রার দল দেখেছ, যতক্ষণ বাজনা খচ্ মচ্ করতে থাকে, কৃষ্ণ এস হে, কৃষ্ণ এস হে— বলে চিৎকার ক’রে গান করচে, কৃষ্ণের তখনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আপন মনে সাজ পরে তামাক খাচ্ছে, গল্প করচে। যখন সে-সকল থামল, নারদ ঋষি মৃদুস্বরে প্রেমভরে গান ধরলেন, হরি প্রাণ হে গোবিন্দ, মম জীবন,— তখন কৃষ্ণ আর থাকতে পারলেন না। অমনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি আসরে নেমে পড়লেন। সাধকের ভেতরেও সেইরূপ। যতক্ষণ সাধক,—প্রভো এস হে, প্রভো এস হে, বলে চেঁচাচ্চে, ততক্ষণ জেনো, প্রভু সেখানে আসেননি। প্রভু যখন আসবেন, সাধক তখন ভাবে গদগদ হবেন, আর চেঁচাবেন না। সাধক যখন ভাবে গদগদ হয়ে ডাকে, তখন প্রভু আর দেরি করতে পারেন না।”
শোকসন্তপ্ত মানুষকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া সকলেরই কর্তব্য। বৃদ্ধ মণিমোহনের পুত্রের মৃত্য হয়েছে। পুত্রের সৎকারের পরেই মণিমোহন চলে আসেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে একটু সান্ত্বনা পাবার আশায়। ঠাকুর মৃত্যুর খবর শুনে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসলেন। তারপর অর্ধবাহ্যদশায় দাঁড়িয়ে উঠে তাল ঠুকে গান ধরলেন—
‘জীব সাজ সমরে’। সেই গান শোনার পর মণিমোহন ও অন্য সকলে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, সকলের প্রাণে আশা ও উদ্যমের স্রোত প্রবাহিত হলো।
ঠাকুর তখন ‘সংসারের অনিত্যতা ও অসারতা’ এবং ঈশ্বরের শরণাগতি ইত্যাদি বিষয়ে মণিমোহনকে অনেক কথা বললেন। মণিমোহন ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন ও ঠাকুরকে বললেন : “এই জন্যই তো আপনার কাছে ছুটে এলুম। বুঝলুম — এ জ্বালা আর কেউ শান্ত করতে পারবে না।
ঠাকুর বলতেন, মুখে বলছি, ‘হে ভগবান, তুমি আমার সর্বস্ব ধন’ কিন্তু মনে বিষয়কেই সর্বস্ব জেনেই বসে রয়েছি। তখন সে সাধনা বিফলে যাবে। সতীর পতিতে টান, মায়ের সন্তানের প্রতি টান, বিষয়ীর বিষয়ের প্রতি টান… এই তিন টান একসঙ্গে করে যদি কেউ ঈশ্বরকে দিতে পারে, তখন তাঁর দর্শন হয়। অর্থ্যৎ ব্যাকুলতা। ব্যাকুল হয়ে আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে কাম, ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা, দ্বেষ ইত্যাদি থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হলে ঈশ্বরের দর্শন হয়। প্রতিকূল পরিবেশে, লোভ ও ভয়ের সামনে দাঁড়াতে হলে দরকার শক্তিশালী মন। জ্ঞান, সৎসঙ্গ, ভক্তি, বুদ্ধি, কর্ম ও অভ্যাস যোগের দ্বারা মনের একাগ্রতা বাড়ানো সম্ভব। আর এই দক্ষ মনের সাহায্যে ভবসাগর পার হওয়া যায়।
তথ্যঋণ : রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ , গুরুভাব। স্বামী ব্রহ্মানন্দ সংকলিত “শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ উপদেশ”।
তমেব সর্বঙ মম দেবদেব।
জয়তু রামকৃষ্ণ। ধন্যবাদ।
Lekha ta sotti opurbo..apnake ami dhonnobad janai thakur e eto sundor bani apni eto sundor vabe amader samne Nea esechen
অনেক ধন্যবাদ????
কি অপূর্ব ব্যাখ্যা…
থ্যাংক ইউ????