| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘মণিদিদার পুকুর’

Reporter
সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় / ২৯৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৩

খানিক আগেও বড় মনোরম সকাল ছিল রায়পাড়ায়। পাখি-টাখি ডাকছিল। অল্প যে ক’টা গাছ-পালা আছে, মাথা নাড়ছিল হঠাৎ ওঠা হাওয়ায়। এমন সময় মোটরবাইকের আওয়াজে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল চারপাশ। প্রোমোটার সুনীল সিংহ এসে দাঁড়াল নিজের সাইটের সামনে। বাইকের পিছনে বসা চামচা রতন নেমে দাঁড়াল। সাইটের দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ। হতভম্ব হয়ে বসকে বলল, “এটা কী কেস হল?”

সুনীল সিংহও ব্যাপারটা দেখে বেশ থতমত খেয়েছে। বলল, “তাই তো ভাবছি।”… রাস্তার দু’পাশ আর পিছনের মাঠটা দেখে নিয়ে সুনীল বলে, “লোকজন তেমন একটা নেই। ও দু’টো নিয়ে চলে আয়।”

“কিন্তু মালা পরানো ফোটো। ফট করে হাত দেওয়া কি ঠিক হবে?”

রতনের কথায় সুনীল একটু থমকায়। মালা পরানো বলেই কেসটা একটু সিরিয়াস হয়ে গেছে। আসলে হয়েছে কী, এই সাইটের দোতলা বাড়িটা কাল ভাঙা কমপ্লিট করে ফোন করেছিল কন্ট্রাক্টর দুলাল। সুনীলকে বলেছিল, “টুকটাক কিছু জিনিস রেখে এসেছি। মনে হচ্ছে পরে আপনার দরকারে লাগবে।”… সেই সব জিনিসের মধ্যে এই বাড়ির কর্তা-গিন্নির ল্যামিনেশন করা আলাদা দুটো ফোটো রেখে গেছে। বেশ পেল্লাই সাইজ ফোটো দুটোর। পুরনো রঙিন ছবি, তাই একটু বেগুনি ঘেঁষা হয়ে গেছে। ফোটো দুটো পাশাপাশি দু’টো পিলারে ঠেসান দিয়ে বসিয়েছে কেউ বা কারা। মালাও পরিয়েছে। গাঁদা ফুলের। পিলারের হাইট আড়াই ফুট। কন্ট্রাক্টরকে পিলারগুলোকে এমন করেই রাখতে বলা হয়েছিল। এর উপর ফ্ল্যাট তৈরি করতে সুবিধে হয়। সুনীল সিংহ তার চ্যালাকে বলে, “যা হবে দেখা যাবে। সরাতে তো হবেই। যা যায়, নিয়ে আয় জলদি।”

সুনীল সিংহ-এর মাতৃভাষা হিন্দি হলেও জন্মাবধি পশ্চিমবঙ্গবাসী। বাংলাটা ভালই বলে। আদেশ মেনে এগিয়ে গেছে রতন। ফোটোতে হাত দেওয়ার আগের মুহূর্তে চারপাশে ‘হই হই’ রব, “এই একদম না। ফোটো যেমন আছে, তেমন থাকবে। হাত লাগাবে না।’’ বলতে বলতে বেশ কিছু ইয়াং ছেলে এগিয়ে আসতে লাগল। বাড়ি, গুমটি দোকানের আড়ালে লুকিয়েছিল ওরা। রতন ফিরে আসে। পাড়ার ছেলেগুলো সুনীল সিংহ-এর সামনে দাঁড়িয়েছে। সুনীল সিংহ বলে, “জমি আমার। সেখানে কোনও জিনিস পড়ে থাকলে, তুলব না!”

ছেলেগুলোর মধ্যে পলাশ বেশ তেরিয়াভাবে বলে উঠল, “জিনিস মানে! ডাক্তারবাবুর ফোটোকে আপনি জিনিস বলছেন! উনি আমাদের পাড়ার কে ছিলেন জানেন? মসিহা! পড়ার কত মানুষকে দরকারে হেল্প করেছেন। ওই তো মাঠের ক্লাবঘরের অর্ধেক টাকাই দিয়েছিলেন উনি।”… ক্লাবঘরের দিকে আঙুল তুলেছে পলাশ। সুনীল আন্দাজ করে ছেলেগুলোর ভিড়ে এ হচ্ছে লিডার। বলে, “ফোটো দুটো তার মানে তোমরাই বসিয়েছ?”

“না। আমরা বসাইনি। যে বসিয়েছে, সে হয়তো ডাক্তারবাবুর থেকে বড় কোনও উপকার পেয়েছিল।” বলল পলাশ।

সুনীল সিংহ বলে, “তা হলে আমি এখন কাজটা কী ভাবে শুরু করব? কমপ্লেক্সটা বানাব কী করে? একগাদা টাকা দিয়ে জমিটা কিনেছি।”

পলাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিবু বলল, “সেটা আপনার ব্যাপার। শুধু ফোটো দু’টোতে আপনি হাত লাগাতে পারবেন না।”

এ ধরনের মস্তানিতে ঘাবড়ায় না সুনীল সিংহ। সে পোড় খাওয়া প্রোমোটার। এরকম সিচুয়েশনে আগেও পড়েছে। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বার করে। দীপক রায়কে ফোন করতে হবে। সে হচ্ছে পাড়ার ক্লাবের সেক্রেটারি। দীপককে যা টাকা দিয়েছে সুনীল সিংহ, সে একাই গিলেছে বোঝা যাচ্ছে। পাড়ার ছেলেদের ভাগ দেয়নি। তাই এই ঝামেলায় পড়তে হল সুনীল সিংহকে। দীপকের ফোন বাজছে। খানিক বাদেই কল রিসিভ করল দীপক। সুনীল সিংহ এখানকার পরিস্থিতি বলতে থাকে।

ফোটোয় সেঁটে থাকা ডাক্তার অমল মুখোপাধ্যায় আর তার স্ত্রী দূরের জমায়েতটার দিকে তাকিয়ে আছেন। ডাক্তারবাবু ফোটো থেকে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “বুঝলে নিরু, এবার মনে হচ্ছে আমাদের ঢাকা-ছাওয়ার মধ্যে নিয়ে যাবে।”

নিরুপমা বললেন, “একটু তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলে বড় স্বস্তি পাই। একেবারে হাটখোলা জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে। লজ্জা লাগছে ভীষণ। অপমানিতও লাগছে।”

“আর মান-অপমান!” হতাশ গলায় বললেন ডাক্তারবাবু। ফের বলেন, “আমি মরলাম, তুমিও দু’মাস বাদে চলে এলে। মেয়ে আমেরিকা থেকে কাকার ছেলেকে দিয়ে শ্রাদ্ধ-শান্তি করাল। আত্মীয় স্বজনকে খাওয়াল ওদেশ থেকে নির্দেশ দিয়ে। আমরা বাড়ির মায়া ত্যাগ না করতে পেরে এখানেই থেকে গেলাম। ভেবেছিলাম মেয়ে একবার নিশ্চয়ই আসবে। বাড়িটা দান করবে আমাদের গুরুদেবের আশ্রম কমিটিতে। আমরা তো তেমনটাই বলে রেখেছিলাম। ওর আর জামাইয়ের যা রোজগার, বাড়ি বিক্রির টাকাটা সে তুলনায় অতি তুচ্ছ। মেয়ের বিয়ের সময় বাড়িটা ওদের দানপত্র করে দেওয়া ভুল হয়েছিল। যেভাবে শ্রাদ্ধ-শান্তি করল! ছ’মাস বাদে বাড়িটাও বেচে দিল খুড়তুতো ভাইকে পাওয়ার অব অ্যাটার্নি দিয়ে।”

“ওসব কষ্টের কথা ছাড়ো। পাড়ার ছেলেগুলো এখন কী চাইছে বলো তো? টাকা আদায় করতে চাইছে প্রোমোটারের থেকে?”

“না। ওই যে পলাশ বলে ছেলেটা, ওই তো নাটের গুরু। বন্ধু-বান্ধব জুটিয়ে আমাদের এখানে বসিয়েছে। বুদ্ধি করে মালাও দিয়েছে। ওর ইচ্ছে এই জমিতে যাতে ফ্ল্যাট না হয়। আসলে ওর কাকা সদানন্দর ধরন পেয়েছে ছেলেটা।”

“সদানন্দটা আবার কে?”

“সে কী নিরু, ভুলে গেলে! আমরা এখানে বাড়ি করার আগে”… বলতে বলতে থেমে গেলেন ডাক্তারবাবু। দেখলেন ক্লাবের সেক্রেটারি দীপক হন্তদন্ত হয়ে প্রোমোটারকে ঘিরে থাকা জটলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারবাবু স্ত্রীকে বললেন, “দাঁড়াও, ওদের ব্যাপারটা আগে দেখে নিই।”

সেক্রেটারি দীপক খুব মন দিয়ে সুনীল সিংহ আর পাড়ার ছেলেদের কথা শুনল। তার মাঝে দু’তিনবার তাকাল সাইটে রাখা ফোটো দুটোর দিকে। এবার পাড়ার জুনিয়রদের সে বলে, “তোরা আসলে কী চাস পরিষ্কার করে বল? উনি জমি কিনেছেন, ফ্ল্যাট করবেন বলে। তোদের এসব সেন্টিমেন্ট দিয়ে কি আটকে রাখতে পারবি? ডাক্তারবাবু উদারহৃদয় ছিলেন, আমিও মানছি। কিন্তু এখন তো আর জমিটা ওঁর নয়। তোরা যদি ফোটো দুটো না সরাস, প্রোমোটার পুলিশ ডেকে সরিয়ে দেবে।”

সুনীল সিংহ বলে ওঠে, “না না, আমি পুলিশ ডাকতে রাজি নই। এখানে যখন কনস্ট্রাকশন তুলব তখন তো পুলিশ এসে পাহারা দেবে না। পাড়ার ছেলেরা ঝামেলা করলে কাজ আটকে যাবে আমার। ওদের অ্যাকচুয়াল ডিমান্ড কী, সেটা বলুক।”

“আপনার কমপ্লেক্সের মেন গেটের দুই থামে ছবি দু’টো লাগতে হবে।” বলল পলাশ।

সুনীল সিংহ অসহায় ভাবে বলে, “তা কী করে সম্ভব! যারা ফ্ল্যাট কিনবে, আপত্তি জানাবে না? ফ্ল্যাট কেনার পর তারাই মালিক। গেটে অন্য কারুর ছবি থাকলে তাদের মনে হবে যেন ভাড়ার ফ্ল্যাটে আছে।”

“ভ্যালিড পয়েন্ট।” বলল দীপক।

ফের সুনীল সিংহ বলে, “আমি বরং এই কমপ্লেক্সের নাম দেব ডাক্তারবাবুর নামে। ‘অমল অ্যাপার্টমেন্ট’। চলবে না?”

“না, আমরা যা শর্ত দিয়েছি, সেটাই মানতে হবে।” এটা বলল গৌতম। যাকে ওর বন্ধুরা গোঁয়ারগোবিন্দ বলে ডাকে।

সেক্রেটারি দীপক বলে, “দাঁড়া। এরকম জেদাজেদি করলে চলে না। সব কিছুরই একটা সুষ্ঠু সমাধান হয়। আপাতত ফোটো দু’টো ক্লাবঘরে রাখ। কাল পাড়ার আরও লোকজনকে নিয়ে মিটিংয়ে বসি। আলোচনার মাধ্যমে সেখানে নিশ্চয়ই কোনও একটা রাস্তা বেরিয়ে আসবে।”

এখন রাত। ফোটো দুটোর ঠাঁই হয়েছে ক্লাবঘরের দেওয়ালে। মালার ফুল অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। ডাক্তারবাবু আর নিরুপমা গল্প করে চলেছেন নিজেদের মধ্যে। বেশির ভাগটাই স্মৃতিচারণ আর কিছুটা আত্মীয় পরিজনদের সমালোচনা। কথা একই বিষয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে দেখে নিরুপমা বলে ওঠেন, “আচ্ছা, তোমার ওই সদানন্দর ব্যাপারটা তো বললে না। লোকটা আমাদের জমি কেনার সময় ব্যাগড়া দিয়েছিল, এটুকু মনে পড়ছে। বাকি সব ভুলে গেছি।”

আবার স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন ডাক্তারবাবু। বললেন, “লোক না গো। যুবক বলা যায়। আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে তার বয়স ছাব্বিশ কিম্বা সাতাশ। একদিন স্টেশন রোডের চেম্বারে প্র্যাকটিসে বসেছি, হঠাৎ দেখি একটা উসকো খুসকো চেহারার ছেলে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। দেখেই বুঝেছিলাম রোগ দেখাতে আসেনি। অন্য কোনও কারণে এসেছে। বললাম, কী চাই?… সে বলল, আমি সদানন্দ পাল। আপনি রায়পাড়ার যে-জায়গাটা কিনছেন, তার সামনের রাস্তার ওপারে পশ্চিম দিকে আমাদের বাড়ি। ক্লাবের মাঠটার ঠিক পিছনেই।… বললাম, ও আচ্ছা। তা আমার কাছে কী কারণে… কথা শেষ করতে না দিয়ে সদানন্দ বলল, আপনি দয়া করে মণিদার পুকুরটা কিনবেন না।…অবাক হয়ে বললাম, আমি তো ও নামে কোনও পুকুর কিনছি না। কিনছি বুড়ির পুকুর।… সদানন্দ বলল, ওটারই আসল নাম মণিদিদার পুকুর। মণিদিদাকে পাড়ার লোক ভুলে গেছে। সম্ভ্রান্ত ঘরের পুত্রবধূ ছিলেন। শেষ বয়সে পাড়ার লোকের সুবিধের জন্য পুকুরটা খনন করেন। … আমি তখন বলেছিলাম, ওঁর উত্তরসূরীরাই তার মানে পুকুরটা বিক্রি করছে আমাকে। কেন কিনব না আমি?”… বলে থামলেন ডাক্তারবাবু। অল্প বিরতির পর স্ত্রীকে বললেন, “আজ থেকে চব্বিশ বছর আগের ঘটনা। পুকুর বোজানো নিয়ে সরকারের এত কড়াকড়ি ছিল না তখন। সে সময় আশপাশে প্রচুর জলাশয়। সদানন্দ পুকুর না কেনার কারণ হিসেবে আমাকে প্রথমে বলল, পাড়ার অনেক গরিব বাড়ি ওই পুকুরের উপর নির্ভরশীল। যাদের পাতকুয়ো বা টাইমকলের জল নেই। খাওয়ার আর রান্নার জল তারা টিউবওয়েল থেকে জোগাড় করে। বাকি কাজ ওই পুকুরের জল দিয়ে চালায়।… আমি বললাম, কই, আমাকে তো তারা নিষেধ করছে না। আপনি কেন করছেন?… সদানন্দর উত্তর ছিল, নিষেধ তো কেউই করতে পারে না। বড় জোর অনুরোধ করতে পারে। কারণ আপনি আইন মেনেই পুকুরটা কিনছেন। আমিও অনুরোধই করছি। আপনি শিক্ষিত মানুষ, একটা জলাশয় বোজানো হলে পরিবেশের কতটা ক্ষতি হয় ভাল মতোই জানেন।… আমি তখন বলেছিলাম, আপনি হয়তো এভাবে একটা পুকুর বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারেন। আরও অজস্র জলাশয় বুজিয়ে কনস্ট্রাকশন হচ্ছে, সেগুলো কে বাঁচাবে? নগরায়নকে আটকাতে পারবেন আপনি? … সদানন্দ বলেছিল, আমি অন্য জলাশয় নিয়ে ভাবতে যাব কেন? আমি শুধু আমার পাড়ার পুকুরটা নিয়ে ভাবব। ওই পুকুরে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পাড়ার আরও অনেকেরই আছে। ওই পুকুরের মাথায় যে-চাঁদ ওঠে, সেই চাঁদ দেখিয়ে মা আমাকে গান গেয়ে ঘুম পাড়াত। আমি আমার ভাইপোকে ঘুম পাড়িয়েছি। পুকুরধারে গাছ থেকে তাল নারকেল জলে পড়লে দৌড়ে গিয়ে ডাইভ মারতাম। সাঁতার শিখেছি মণিদিদার পুকুরে । কচুরিপানা এক জায়গায় এনে নৌকো বানিয়ে লগি ঠেলেছি। গরমের ছুটিতে পুকুর ধারে বসে ছিপ ফেলেছি দুপুরে। বিকেলবেলা এখনও  পাড়ার মেয়ে-বউরা মণিদিদার বাঁধিয়ে দেওয়া ঘাটে বসে গল্পগুজব করে। পাড়ার হাঁসগুলো চরে ওই পুকুরেই। ওখানেই ইতুপুজোর সরা ভাসান দেয় মেয়ে-বউরা। আপনি জায়গাটা কিনে নিলে পুরো পরিবেশটাই পাল্টে যাবে। ওই পুকুরটার জন্য পাড়াজুড়ে একটা হাওয়া খেলে। বন্ধ হয়ে যাবে  সেটা। শ্বাস-কষ্ট হবে পাড়ার।… একটানা বলে থেমেছিল সদানন্দ। আমি যুক্তি দিলাম, কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকা থেকে  এখানে রোজ প্র্যাকটিস করতে আসি। আমার কি ইচ্ছে করে না এরকম ফাঁকা একটা এলাকায় থাকার।… সদানন্দ বলেছিল, করতেই পারে। তবে সেই ইচ্ছে থেকে যদি স্থির করেন ওই পুকুরটা বুজিয়ে বাড়ি করবেন, আমি ওখানে আমরণ অনশনে বসে যাব। বলে চলে গিয়েছিল সদানন্দ। ওর শেষ কথাটায় একটু ঘাবড়ে গেলাম আমি। রায়পাড়ায় এসে ওর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিলাম। যা জানলাম, ও একটি কাঠ বেকার। চাকরি পায়, কিন্তু টেকাতে পারে না। দাদার সংসারে বসে খায়। খুবই নীতিবাগীশ। কোথাও সামান্য অন্যায় দেখলেই ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ ছেলেটা একটু ক্ষ্যাপাটে টাইপের। পাড়াতেও পপুলার নয়। ওর দাদা অসীমানন্দর সঙ্গে দেখা করতে ওদের বাড়িতে গেলাম। ভাই আমাকে কী ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছে বললাম সব। অসীমানন্দ তো মরমে মরে যায়! বলেছিল, ওই পাগলের কথায় কান দেবেন না। আমাদের কত সৌভাগ্য আপনার মতো নামী ডাক্তার পাড়ায় আসছেন। আপদেবিপদে হাতের কাছে পাব। তারপর শুনেছি আপনি খুবই জনদরদি, গরিবদের কাছে ভিজিট তো নেনই না, বিনা পয়সায় ওষুধ পর্যন্ত দেন। আমার ফ্যামিলির জন্য এরকম একজন সহৃদয় ডাক্তারের খুবই প্রয়োজন ছিল।… বুঝতেই পেরেছিলাম এবার থেকে পাল বাড়ির মেম্বারদের আমায় বিনামাগনায় চিকিৎসা করতে হবে। তা হোক। কত মানুষের জন্যই তো করি। বাড়ি বানানোর বাধা তো থাকবে না। এরপর হঠাৎ একদিন শুনি সদানন্দ নিরুদ্দেশ। দাদার সঙ্গে বিরাট ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে তার। সেই যে উধাও হয়েছে সদানন্দ, আজও ফেরেনি।”

ডাক্তারবাবু থামতে নিরুপমা বলে উঠলেন, “এবার যেন ঘটনাটা অল্প অল্প মনে করতে পারছি।”

দু’জনেই কিছুক্ষণের জন্য চুপ।  নীরবতা ভেঙে নিরুপমা বলেন, “হ্যাঁ গো, আজ কি পূর্ণিমা?”

“কেন বলো তো?” জানতে চাইলেন ডাক্তারবাবু।

নিরুপমা বললেন, “কী সুন্দর নিটোল চাঁদ উঠেছে আকাশে। আমাদের বাড়ির ঠিক পিছনে। বাড়িতে থাকাকালীন এত সুন্দর চাঁদ দেখিনি। আসলে বাড়িটা এখন নেই, অনেকটা জায়গা ফাঁকা, তাই হয়তো এত সুন্দর লাগছে!। তুমি দেখতে পাচ্ছ না চাঁদটা?”

“না, আমাকে এমন জায়গায় টাঙিয়েছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না।” আক্ষেপের সুরে বললেন ডাক্তারবাবু।

হঠাৎই বেশ বিস্ময়ের গলায় নিরুপমা বলেন, “কী ব্যাপার বলো তো, চাঁদের নীচে বেশ কিছু গাছ-পালার মাথা দেখা যাচ্ছে কেন? তালগাছ, নারকেল গাছ, আরও কী সব গাছ যেন! আমাদের বাড়ির পিছনে তো কোনও গাছ ছিল না!”

“আশ্চর্য ব্যাপার!” বললেন ডাক্তারবাবু। ফের বলেন, “চলো তো দেখি ঘটনাটা কী! আমরা খামোকা ফোটোতে আটকেই বা আছি কেন?”

গা ঝাড়া দিয়ে ফোটো থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার অমল মুখোপাধ্যায়। নিরুপমা অনুসরণ করলেন তাঁকে। দু’জনে ক্লাবঘরের বন্ধ দরজা ভেদ করে এসে দাঁড়ালেন পাড়ার মাঠটায়। নিজেদের বাড়ির জমিটার দিকে তাকিয়ে অমল ডাক্তার বললেন, “সে কী গো, আমাদের বাড়ির ভিত কোথায়? ওখানে তো পুকুরটা ফিরে এসেছে দেখছি! বুড়ির পুকুর।”

“চলো, চলো যাই দেখি।” প্রগলভতার সঙ্গে বললেন নিরুপমা।

দু’জনে এগিয়ে চললেন, পুকুরটার দিকে। হ্যাঁ, পুকুর ঘিরে প্রচুর গাছ-পালা। একটা এতোল বেতোল হাওয়া দিচ্ছে মাঠ, পুকুর জুড়ে। আকাশ ভরা জ্বলজ্বলে তারা। এত পরিষ্কার আকাশ শেষ কবে দেখেছেন মনে পড়ে না দু’জনের।

মণিদিদার বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে বসলেন ডাক্তারবাবু আর নিরুপমা। হাওয়ায় অল্প তরঙ্গ উঠেছে পুকুরের জলে। দু’জনে মন দিয়ে প্রতিফলিত চাঁদের দুলুনি দেখছেন।

প্রথম প্রকাশ : ৯ জুন ২০২১

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev