যে যাই বলুক, সবচেয়ে বেশি খারাপ দেখতে লাগে ঠাকুর চলে যাওয়ার পর ফাঁকা প্যান্ডেল। এমনকি যারা ভিড়ের ভয়ে প্যান্ডেলের ত্রিসীমানায় যান না তাদেরও। পুজোর পরে এই সময়টা যেন কেমন একটা মনখারাপের সময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলছে এই মনখারাপের ধারাবাহিকতা। আগে ছিল পুজোর ছুটির পর পরীক্ষার ভয়। সে পাঠ চুকে গেছে বহুদিন, এখন এমনি এমনি মনখারাপ হয়। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব, হালকা কুয়াশা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে হেমন্ত, উৎসবের উচ্ছ্বাসে সে যেন জল ঢেলে দেয়। ব্লটিং পেপারের মত নিঃশব্দে শুষে নেয় সব আনন্দ।

দেবী কৈলাসে চলে যাওয়ার পর আমাদের রক্ষা করার মত আর কেউ থাকে না। পাতা ঝরে যায়, রিক্ত হতে থাকে প্রকৃতি – কবি যতই বলুন না কেন, “জ্বালাও আলো আপন আলো শুনাও আলোর জয়বাণী রে” তাতে সবাই কি আর উদ্বুদ্ধ হতে পারে? একটা বিষণ্ণতা যেন ঘিরে নেয় আমাদের চারপাশ। আরেকটা ব্যাপার খুব অবাক লাগে, এই অনুভূতিটা কিন্তু আর কোন উৎসবের পর হয় না। সে দোলই বলুন বা সরস্বতী পুজো, দীপাবলি হোক বা নববর্ষ! আমি জানি সবাই রে রে কর তেড়ে এসে বলবেন, সেসবের সঙ্গে কি আর দুর্গাপুজোর তুলনা হয়?

আরে সেটাই তো বলছি, বোধন থেকে বিসর্জন এর গোটা ব্যাপারটাই আলাদা! এটা যেন একটা আশ্চর্য ম্যাজিকে সবাইকে সরাসরি বা আলতো ছোঁয়ায় জড়িয়ে নেয়। পাঠক থেকে পুরোহিত; প্রতিমা শিল্পী থেকে প্যান্ডেল নির্মাতা; ঢাকি থেকে ডাকের সাজের শিল্পী; পুজোসংখ্যার অক্লান্ত লেখক থেকে খদ্দের সামলাতে নাজেহাল লস্যিওয়ালা; নিঃসঙ্গ মদ্যপ থেকে মস্তিতে মজে থাকা কেলাবের ছেলেছোকরা; পুজো সবাইকে নিজের মত করে কাছে টেনে নেয়। এই মিক্সড রিঅ্যাকশন দেশের আর কোন উৎসবে পাওয়া অসম্ভব!

পাগল করা ভিড়, ব্যাপক ব্যস্ততা কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে নিজের মত করে থাকা, নিজের মত করে সময় কাটানোর, নিজের মত করে উপভোগ করার পছন্দসই পরিসর। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, সেসব পাওয়ার জন্য বিরাট কোন পরিশ্রম বা খোঁজাখুঁজিরও কোন দরকার নেই। একটু ভাবলেই, একটু খোঁজ করলেই সহজে তার নাগাল পাওয়া যায়। বাঙালির পুজোয় কোন ঢালাওতন্ত্র মানে এক ছাঁচে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ভক্তি-অভক্তি সবকিছুকে ঢালাই করে নেওয়ার ব্যাপার নেই। সবাই নিজের নিজের মত করে এতে অংশ নিতে পারে। দশভুজা দেবীকে দেখে অনুপ্রাণিত মানুষ নিজেরাই নিজেদের মুশকিল আসান হয়ে ওঠেন। যেন দশ হাতে সামলায় সবকিছু। মহামায়ার এ কোন মায়া জানিনা — পুজো অনেককে এক করে দেয়, এককে করে অনেক। এটাই তো উৎসবের শক্তি। ফাঁকা প্যান্ডেল সেসব কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এরপরেও মনখারাপ না হলে, মনখারাপ ব্যাপারটা আছে কি করতে!