বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণরোধে ও পরিবেশ সংরক্ষণের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর পালন করা হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা। আর পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে বৃক্ষ রোপনের পরিকল্পনা। একজন সাধারণ মানুষ তার কর্মের সুবাদে সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ — সালুমারাদা থিম্মাক্কা (Saalumarada Thimmakka)।
থিম্মাক্কার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমী এই নারী জানেন প্রকৃতির মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় জীবনের প্রতি ভালোবাসা। মাগাদি তালুকের হলিকাল গ্রামের বাসিন্দা বেকাল চিক্কাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হবার ২৫ বছর বাদে ঘরে যখন তাদের কোন সন্তানের জন্ম হলোনা, সমাজ তাকে একঘরে করে দেয়।

গ্রামের লোকেরা পরামর্শ দিতে শুরু করে যে প্রার্থনা এবং বিভিন্নপ্রকার আচার_রীতি পালন করলে তার গর্ভাবস্থা সম্ভব হবে। সেই আচারগুলির সম্পাদনের অংশ হিসাবে, থিম্মাক্কা এবং চিক্কাইয়া বটগাছ রোপণ শুরু করেন। সন্তানের মতো গাছগুলোকে যত্ন নিতে থাকেন। সমাজ এবং পরিবার পরিজনের কাছ থেকে সরে গিয়ে এ যেন প্রকৃতির মাঝেই নিজেদের সান্ত্বনা খোঁজার অপার চেষ্টা।
কিন্তু দরিদ্র পরিবারটি চারাগাছ কেনার পয়সা পাবে কোথায়!! নেই গাছ লাগানোর জন্য তাদের নিজস্ব জমি। দুজনে ঠিক করলেন, কুদুর এবং হুলিকালের মধ্যে ছায়াহীন রুখা-সুখা পথের দুধারে আনাচে কানাচে অবহেলায় জন্ম নেওয়া বট, পিপুলের চারা গাছগুলি লাগাবেন।
শুরুর দিকে প্রথম বছরে দশটি, দ্বিতীয় বছরে পনেরোটি, তৃতীয় বছরে কুড়িটি বট গাছের চারা লাগলেন। চার কিলোমিটার পথের দু-ধার ভরিয়ে তুললেন সবুজের সম্ভারে। একটি প্রথা হিসাবে যা শুরু করা হয়েছিল, পরিবেশবাদী হিসাবে তাদের যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই। সমাজের মানুষ অবহেলা করলেও প্রকৃতি দু-হাত ভরে তাদের ভালোবেসেছে।
সন্তানসম এই গাছগুলোর দেখাশুনা করার জন্য দিনমজুরের কাজ ছেড়ে দেন চিক্কাইয়া। থিম্মাক্কা রোজগার করতেন স্বল্প। প্রতিদিন প্রায় চার কিমি পথ হেঁটে গাছগুলিতে জল দিতে আসতেন। বসত গ্রাম হুলিকাল থেকে কুদুড় অবধি থিম্মাক্কা দুশো চুরাশিটি বটগাছের চারা বড়ো করে তোলেন। চারাগাছগুলোকে গবাদি পশুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কাঁটা তারের বেড়াও বানিয়ে দেন।

১৯৯১ সালে চিক্কাইয়া মারা যাওয়ার পর থিম্মাক্কা একাই নিজের হাতে রোদ-ঝড়-বৃষ্টি-শীত উপেক্ষা করে কাজ করতে থাকেন। গাছের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা ক্রমে গ্রামবাসীদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। থিম্মাক্কাকে সন্মান জানিয়ে গ্রামবাসীরা তাঁকে “সলুমারাদা” (কন্নড় ভাষায় যার অর্থ গাছেদের সারি) বলে ডাকতে থাকেন।
বোটানিক্যাল সার্ভের এক তথ্যমতে বলা হয়, “সবুজ আইকন” থিম্মাক্কা পঁয়ষট্টি বছর ধরে যে গাছগুলো লাগিয়েছেন সেই গাছগুলির মূল্য কোটি টাকার উপর। বট গাছের বৈজ্ঞানিক মূল্য ছাড়াও প্যাকেজিং বা জ্বালানী কাঠ হিসাবে ব্যবহার করা হয়৷ এছাড়া অন্যান্য গাছগুলির অক্সিজেন উৎপাদন, মাটি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জ করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়া সবুজের শামিয়ানা পাখিদের বাসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দেয়, যা দুর্মূল্য। চাইলে থিম্মাক্কা গাছগুলি বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারতেন কিন্তু বৃক্ষ জননীর সংকল্প, “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
বিবিসির সূত্র অনুযায়ী, গত আশি বছরে প্রায় আট হাজার গাছ পুঁতে বড়ো করে তোলেন প্রায় ১১০ বছর বয়সী বৃক্ষমাতা। ২০১৫ সালে লেখক ইন্দিরামা বেলুর তাঁর জীবন নিয়ে প্রকাশ করেন একটি বই ‘সালুমারাদা সর্দারনী’। ১৯৯৬ সালে ‘জাতীয় নাগরিক সম্মান’ এ ভূষিত হওয়ার পর থিম্মাক্কা সমাজের নজরে আসেন।

কর্ণাটক সরকার তাঁকে বনমিত্র, নিসর্গরত্ন, গাছশ্রী এবং গাছপ্রেমীর মতো শিরোনামে ভূষিত করেন। ভারত সরকার তাকে ২০১৯ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের কারণেই। পদ্মশ্রী ছাড়া আন্তর্জাতিক স্তরেও বহু পুরস্কার পেয়েছেন এই বৃক্ষমাতা। বর্তমানে থিম্মাকার রোপণ করা গাছগুলির সংরক্ষণের দায়িত্ব কর্ণাটক সরকার নিয়েছেন।
আমাদের হিন্দু ধর্মে বৃক্ষ রোপণকে একটি পবিত্র কর্ম বলে মনে করা হয়। যে ব্যক্তি রাজপথের দুধারে পথিকদের জন্য ফল-ফুলের গাছ রোপণ করেন, তিনি মনুষ্যদেহেই দেবতুল্য সন্মান লাভ করেন। “আমাদের সময়ের জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ” থিম্মাকা পরিবেশ রক্ষা করার পথ দেখিয়েছেন। এখন প্রয়োজন আমাদের সৎ ইচ্ছার।
দূষণের প্রবল কবলে পরে প্রকৃতি বদলাচ্ছে তার রূপ। অস্বাভবিকভাবে বজ্রপাত, তাপপ্রবাহ, গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর জায়গায় মুহুর্মুহু সাইক্লোন, বর্ষাকাল শুষ্ক, পৌষের ভরা শীতে মুষলধারায় বৃষ্টি.…. প্রকৃতির এই অজানা রূপে অসহায় হয়ে পড়ছে সমস্ত জীবকুল।
পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে মানব সভ্যতাকে সমূহ বিপদের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের প্রত্যেকের প্রতিবছর অন্তত দুটি থেকে তিনটি বৃক্ষ রোপনের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
Source : Various articles and journals have been referred for the Writeup.
লিচু আম জাম খেয়ে আঁটি ফাঁকা জায়গাতে ফেলুন।
সমর্থন জানলাম। ধন্যাদান্তে
অনুপ্ররণা মূলক রচনা, যে কেউ থিমক্কা হয়ে উঠতে পারেন, প্রতিদিন বিশ্ব সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে,এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন, উষ্ণায়নের হাত থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।রিঙ্কির রচনার বৈচিত্র্য মনোমুগ্ধকর। শুভেচ্ছা।
খুব খুশি হলাম ❤️❤️