৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬। রবিবার।
তাঁর প্রয়াণের উনিশ বছর পূর্ণ হলো।
মা টেরিজা সন্ত টেরিজায় উত্তীর্ণ হলেন। খ্রিস্ট ধর্মের বিরলতম এবং শ্রেষ্ঠ উত্তরণ। ঘোষণা করলেন ভ্যাটিকান থেকে পোপ ফ্রান্সিস বিশ্ববাসীর উদ্দেশে।
বিশ্বধর্মের এক অপ্রাকৃত আর ‘দৈব মুহূর্তের’ সাক্ষী রইলেন সারা বাংলার মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই গৌরব বাঙালির। মাদার টেরিজা এখন সেন্ট টেরিজা অব ক্যালকাটা। অনুষ্ঠানে কলকাতার মেয়রও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের ধন্যবাদ।
খবরের কাগজ, রেডিও আর টিভি-র বড়ো ব্যস্ততা আর আয়োজন ছিল এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমাদের দেশে বোধ-করি কিছু কম মাত্রায়, পশ্চিমে আরও বিপুল ছিল তার বিবরণ আর প্রসারণের সীমা।
ফলে, যুগোশ্লাভিয়ার এক প্রধান শহর, বর্তমান স্বাধীন ম্যাসিডোনিয়ার প্রাণকেন্দ্র স্কপিয়ে-তে বাবা-মায়ের সবচেয়ে ছোটো মেয়ে অ্যাগনেস গনকবোহ্যাকলু যেদিন জন্মগ্রহণ করল সেদিন বাড়িতে আনন্দ অনুষ্ঠান হয়েছিল। পাড়াপড়শিরাও তাতে যোগ দিয়েছিল আশা করি। অ্যাগনেসরা সম্পন্ন গৃহস্থ ছিল। তবে বাবা-মা পুরোপুরি সুখী ছিলেন না। পাঁচটি সন্তানের দু-জন মারা যায়। অ্যাগনেসের এক দাদা, আর এক দিদি। দাদার নাম অগা, দিদি লাজার। অ্যাগনেস-এর জন্মের দিনটা ছিল ২৬ আগস্ট ১৯১০ সাল। শুক্রবার।
১৮ বছর বয়সে ছোটোখাটো চেহারার অ্যাগনেস তখন আয়ারল্যান্ডে। সেখানে তাঁর শান্ত, সমাহিত মন এসে স্থির হলো লোরেটো অর্ডারের সন্ন্যাসিনীদের সংস্পর্শে। লোরেটো সিস্টারদের কাজকর্ম, সেবাধর্ম, আত্মোপলব্ধির বড়ো অংশ জুড়ে শিক্ষার জগৎ। সেখানেই স্থিত হলেন কিশোরী অ্যাগনেস। তার বছর খানেক সময় ঘুরতে না ঘুরতেই দার্জিলিং-এর কনভেন্টে পড়ানোর কাজ নিয়ে এলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন পূর্ণ হলো। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে।
মাত্র আট বছর বয়স তখন অ্যাগনেসের। বাবা মারা যান। নেহাত স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, সন্দেহ ছিল রাজনৈতিক আক্রমণের। যে রাজনীতির বিরোধী তাকে আদি বাসভূমি আলবেনিয়া থেকে পিছু নিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আর তার কিছু আগে-পরে আলবেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, যুগোশ্লাভিয়া—সব কিছু দ্রুত পাল্টাচ্ছে—পাল্টাচ্ছে সীমারেখা, কর্তৃত্ব, শাসনভার—রাজনীতির এই টালমাটাল অবস্থায় দিশাহারা, অসহায় সাধারণ মানুষ।
বাবা চলে গেলেন। মায়ের কাছে আরও নিবিড় আশ্রয় চাইল ছোট্ট মেয়েটি। মা ধর্মপ্রাণা মহিলা, এই বিক্ষুব্ধ সময়ে ধর্মই তাঁর আশ্রয়। মেয়েও ক্রমে ধর্মে মনোযোগী হতে শুরু করল। শুরু হলো বইপত্র নাড়াচাড়া। উপনিবেশের ভারতে দূরতম প্রান্তে আদিবাসী আর প্রান্তিক মানুষজনের মধ্যে, প্রাণ হাতের মুঠোয় রেখে কীভাবে খ্রিস্টান ধর্মযাজকের দল সেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন তার বিবরণ পড়তে পড়তে মগ্ন হয়ে যেত কিশোরী অ্যাগনেস। ক্রমে তাঁর স্বপ্নে-কল্পনায়, স্মরণে-মননে জুড়ে রইল শুধু ভারতবর্ষ। সেবাকর্মে তাঁর বেথেলহেম এই ভারত। ফলে দার্জিলিং এসে পৌঁছোবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অদৃষ্ট নির্ধারিত পথে চলতে শুরু করল সন্দেহ নেই। নিয়তির অভিসারে!
অ্যাগনেসের মধ্যে বিকশিত হয়ে উঠল সিস্টার মেরি টেরিজা। এবার কলকাতা। ১৯৩০-৩১ সাল, গরমকাল। যোগ দিলেন এসে সেন্ট মেরিজ হাই স্কুলে। গরিব ও দুঃস্থ মেয়েদের পড়ানোর কাজে শুরু হলো লোরেটো সিস্টার টেরিজার। পড়াতেন ইতিহাস আর ভূগোল। অনেকদিন পড়ানোর কাজ করে এবার অন্য কাজের ডাক পেলেন টেরিজা। ইতিমধ্যে তিনি শিক্ষয়িত্রী থেকে অধ্যক্ষা হয়েছেন স্কুলে, আর রোমান ক্যাথলিক অর্ডারে সিস্টার থেকে মাদার।
১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। অন্তরের গভীরতর অন্তঃস্থল থেকে ডাক পেলেন টেরিজা—তাঁর কথায় ‘Call within a call’. শুধুমাত্র শিক্ষাব্রত নয়—যারা সবার নীচে, সবার পিছে সেই সর্বহারাদের জন্য উৎসর্গ করো জীবন!
লোরেটো অর্ডার ছেড়ে শুরু হলো এক নতুন পথে যাত্রা। কঠিন পথ। ১৯৫৩ সালে অক্টোবর মাসে এলো অনুমতি, তাঁর নতুন সংঘ ‘সিস্টার্স অব চ্যারিটি’-র অনুমোদন।
এর পরের অধ্যায় কর্মযজ্ঞের। তার আকার, আয়তন, পরিসর সবটুকুই বিপুল। মোটামুটি এ তথ্য জেনে আমরা পরের আলোচনায় এগোতে পারি যে ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যখন মাদার টেরিজা ইহজগৎ ছেড়ে গেলেন, তখন তাঁর মিশনারিজ অব চ্যারিটির সেবিকার সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সেই চার হাজার সিস্টার কাজ করছেন পৃথিবীর ১২৩টি রাষ্ট্রের ৬১০টি কেন্দ্রে। কোনও বিখ্যাত মানুষের উক্তি ছিল—তিনি (মাদার টেরিজা) একটি রাষ্ট্রপুঞ্জ। মাঝখানে রয়েছে তাঁর ও সংঘের অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকা আর সেইসব কাজের নিরিখে বহু সম্মাননা। নোবেল থেকে সেন্টহুড।
পাশাপাশি একান্ত নিয়ম মেনে ক্রমশ জড়ো হয়েছে সমালোচনা, তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে নিন্দা। এমনকী সন্ত ঘোষণা করার জন্য টেরিজার যে দুটি অলৌকিক বা দিব্য ক্ষমতার প্রয়োগকে চিহ্নিত করা হয়েছে—ভারতীয় মহিলা মণিকা বেসরা ও ব্রাজিলীয় মার্সিলিও আন্দ্রিনোকে সুস্থ করে তোলার ঘটনা দুটি, সে সম্পর্কে নিন্দা কম হয়নি। এই সমালোচকের তালিকায় আছেন ধর্মগুরু, যুক্তিবাদী, রাজনৈতিক নেতা সকলেই। আক্রমণ ঠেকাতে মাদার টেরিজা আস্থা রেখেছেন তাঁর সংকল্পে, তাঁর কর্মব্যস্ততায়।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন আর একটু গভীরে। যে ভারতবর্ষ টেরিজার নবীন কৈশোরের স্বপ্ন ছিল, সে স্বপ্নকে তিনি বাস্তব রূপ দিয়েছেন। কিন্তু ভারতবর্ষ কতটা গ্রহণ করেছে তাঁকে? জানি, অতি বড়ো সমালোচকও স্বীকার করবেন যে ভারত এই সন্ন্যাসিনীকে অঙ্গীভূত করেছিল গভীর স্নেহে। কিন্তু এই অপূর্ব রহস্যের আলোচনা হয়নি।

সে আলোচনায় যাওয়ার চেষ্টা করার আগে বলে রাখি যে, টেরিজা-জীবনের যে ছায়াটুকু আমরা এতক্ষণ শুনেছি, পাঠক এখন তার প্রায় সবটাই জানেন। কিন্তু মূল প্রশ্নে যাওয়ার আগে, একটু নাড়াচাড়া করার আগে এই প্রেক্ষাপট প্রয়োজনীয় বোধ হতে পারে।
বিশেষ মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন নেই। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে মাদার টেরিজার প্রশ্নে, বিশেষ করে তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তী সময়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম বিশ্ব আলোড়িত হয়েছে অনেক গুণ বেশি। একে কেউ বলেছেন ক্রিস্ন্ডম, কেউ বলেছেন প্যান ক্রিশ্চিয়ানিটি, কেউ একধাপ এগিয়ে বলছেন ‘পণ্যপ্রাণ সভ্যতা’।
হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্ট বা বৌদ্ধ ধর্ম নয়—পৃথিবীর নিত্যদিনের ধর্ম আজ পণ্যদেবতা পূজার্চনা। যার থেকে বড়ো বিশ্বধর্মের খোঁজ পাওয়া মুশকিল। মঙ্গল নয়, বৈভব যেখানে যজ্ঞফল; লক্ষ্মী নন, কুবের যেখানে ইষ্টদেবতা।
প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সম্পদে উজ্জ্বল এই পণ্যপ্রাণ সভ্যতার সংকট আজ নয়, সেই বিশ শতকের একদম প্রথম পর্বেই প্রকট হতে শুরু করেছিল। ইতিহাসের পণ্ডিত গিবন, স্প্যাংলার অথবা টয়নবি এই সংকটের কথা বলেছেন বারবার। শুধু ঐতিহাসিকই বা বলি কেন, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকের কলমে, তুলিতে উঠে এসেছে এই সংকট আরও মর্মভেদী, তীব্রতর রূপ নিয়ে। এলিয়ট, সার্ত্র, কাফকা-সহ এ তালিকা নেহাত ছোটো নয়।
আর্নল্ড টয়নবি যেমন, ‘Western Technology has annihilated distance’, এই কথাটুকু জানিয়ে তারপর যোগ করেছেন, ‘it has also armed the people of the world with weapons of devastating power at a time when they have been brought to the point-blank range of each other without yet having learnt to know and love each other. At this supremely dangerous moment in human history, the only way of salvation for mankind is an Indian way.
এই ভারতীয় পন্থা বলতে টয়নবি বুঝেছেন প্রিয়দর্শী অশোক, শ্রী চৈতন্য অথবা গান্ধীর পথ—অহিংস। সনাতন ভারতের প্যানথিইজ্ম, সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা শুধু নয়, নিখাদ শ্রদ্ধা যে ‘অহিংসা’-র বড়ো দিক।
বাট্রান্ড রাসেল কঠিন ধাতের মানুষ। মুক্তচিন্তার পক্ষে সারাজীবন প্রচার চালিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত, মনে হলো, খ্রিস্টের প্রেম আর করুণা সেই পথ, যা দিয়ে পৃথিবীকে, মানুষের সভ্যতাকে হিংসামুক্ত করা যেতে পারে।
একদিকে প্রযুক্তির দিগন্ত খুলে যাচ্ছে, সসাগরা পৃথিবী ধরা পড়ছে নখদর্পণে; অন্যদিকে ‘এক বিশ্ব এক পরিবার’ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পাঁচশো কোটি আলাদা আলাদা সত্তায়, প্রতিটি মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নিঃসঙ্গ রবিনসন ক্রুশো। শেষ হয়ে গেছে মহাকাব্যের যুগ।
সুতরাং পশ্চিমে এ সংকট নতুন নয়। সমাধান খোঁজার চেষ্টাও চলেছে পাশাপাশি। চেষ্টা চলেছে ধর্মের পথ ধরে সবচেয়ে গভীরভাবে। অধ্যাত্মজীবনের সন্ধানে। পশ্চিমের অভিজ্ঞতা বলছে, সে পথেও সমস্যা বড়ো কম নয়। পশ্চিম জানে— ‘Men never do evil so completely and cheerfully as when they do it from religious conviction.’ এ তার প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, তার রক্তাসিক্ত ক্রুসেডের ইতিহাস, তার রাজা বনাম ধর্মগুরুর মধ্যে লড়াই-এর বৃত্তান্ত।
সনাতন ভারতবর্ষ এই সংকটের সামনে কখনো এত তীব্রভাবে পড়েনি। কারণ, সম্ভবত সিন্ধুপারের এই জনপদ প্রাচীন যুগ থেকে যে আশ্চর্য ক্ষমতায় আত্মস্থ করেছে বিচিত্র ও বিভিন্ন সংস্কৃতি, সভ্যতা, ধর্ম আর প্রযুক্তি, তার তুলনা একমাত্র ভারতবর্ষ।
‘রণধারা বাহি জয়গান গাহি উন্মাদ কলরবে
ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত যারা এসেছিল সবে
তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে, কেহ নহে নহে দূর—
আমার শোনিতে রয়েছে ধ্বনিতে তার বিচিত্র সুর।’
তাই পশ্চিম যখন মাদার টেরিজার কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে তার সংকটমোচনের মন্ত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন ভারতবাসী শান্ত, সমাহিত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে তাঁর সেবাব্রতকে সম্মান জানিয়েছে।
‘মানুষ সমস্ত জীবন ধরে ফসল চাষ করছে। তার জীবনের ক্ষেত্রটুকু দ্বীপের মতো, চারিদিকেই অব্যক্তের দ্বারা সে বেষ্টিত, এই একটুখানিই তার কাছে ব্যক্ত হয়ে আছে। যখন এই দ্বীপটুকু তলিয়ে যাওয়ার সময় হলো, তখন তার জীবনের কর্মের যা কিছু নিত্য ফল তা সেই সংসারের নৌকাটিতে বোঝাই করে দিতে পারে…’
গীতা বলেছেন—
অব্যক্তদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যান ভারত
অব্যক্তনিধনান্যের তত্র কা পরিবেদনা।।
রবি ঠাকুরের ‘সোনার তরী’।
ফলে প্রচারের আলোয় উজ্জ্বল, কীর্তির মহিমা কীর্তনে আলোড়িত সেন্ট টেরিজা তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়া, কিন্তু কিশোরী অ্যাগনেস থেকে মাদার টেরিজায় যিনি সেবাধর্মের পথে উত্তীর্ণা—তিনি আমাদের হৃদয়ের বড়ো কাছাকাছি অবস্থান করেন।
পোপ ফ্রান্সিস সেদিন ভ্যাটিকানের ঘোষণায় বলেছেন— ‘I think, perhaps, we may have some difficulty in calling her ‘Saint Teresa’ : her holiness is so near to us, so tender and so fruitful that we continual to spontaneously call her ‘Mother Teresa’.”
এটি ভারতীয় মনের কথা।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৬ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত