“আমার সঙ্গে চলো মহানগরে — যে মহানগর ছড়িয়ে আছে আকাশের তলায় পৃথিবীর ক্ষতের মতো আবার — যে মহানগর উঠেছে মিনারে মন্দির চূড়ায়, আর অভ্রভেদী প্রাসাদ-শিখরে তারাদের দিকে প্রার্থনার মতো মানবাত্মার।’ প্রেমেন্দ্র মিত্রের মহানগর গল্পের সূচনার এই দীর্ঘ বিস্তার আমাদের সম্মোহিত করে রাখে। একই সঙ্গে একটি প্রশ্নের জন্ম দেয় কবি জীবনানন্দ যে ‘কল্লোলিনী তিলোত্তমা’র কথা বলেছেন সেই কলকাতা কি সত্যিই কল্লোলিনী তিলোত্তমা হয়ে উঠতে পেরেছে? কলকাতার নগরায়ণের সূত্রপাত ১৬৯০-এর ২৪ আগস্ট — যেদিন জোব চার্নক সাহেব তৃতীয় বার এবং.স্থায়ীভাবে সুতানুটি অঞ্চলে পদার্পণ করেন। সেই দিন থেকে তিল তিল করে যে মহানগর সেজে উঠেছে সেই মহানগরের বাইরের জৌলুসের আড়ালে এক নিভন্ত চলমান ইতিহাস রয়েছে। এই ইতিহাস বহন করে চলেছে উত্তর কলকাতা — অতীতের সুতানুটি। বাগবাজারের খাল থেকে বড়ো বাজারের টাঁকশাল পর্যন্ত এই সুতানুটির বিস্তার। ভাগীরথীচুম্বিত বাগবাজারের উপল উপকূলে যে ইতিহাস অঙ্কিত হয়ে রয়েছে তা কখনো মল্লিকদের মার্বেল প্যালেসের গৌরবান্বিত অতীত আলোর ঝলকানি, কখনো আহিরীটোলার পুতুল বাড়ির ভৌতিক রহস্যে ঢাকা। উত্তর কলকাতা শুধু কুমোরটুলির প্রতিমা আর নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লার নস্টালজিক বাঙালিয়ানা নয়,— এক ক্রমক্ষীয়মাণ শহরের জঙ্গম অস্তিত্ব।
মতি নন্দীর গল্প সেই উত্তর কলকাতার নিভন্ত অতীতের চলমান জলছবি। মতি খ্যাতিমান লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন ১৯৫৭ সাল থেকে। তাঁর ‘ছাদ’ গল্পটি ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। মতি আদ্যন্ত নাগরিক। যে চোখ দিয়ে তিনি কলকাতাকে দেখেছেন সেই চোখ উত্তর কলকাতার নাগরিক মানুষের চোখ। এর আগে কলকাতার নাগরিক জীবনের পটভূমিকায় অনেকেই গল্প লিখেছেন। বস্তুত ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ এর মধ্যে বেশ কয়েকজন গল্পকার কলকাতায় এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (১৯১২-১৯৮২) এসেছিলেন পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা শহর থেকে। সন্তোষ কুমার ঘোষ (১৯২০-১৯৮৪) এসেছিলেন ফরিদ পুরের গ্রাম থেকে। নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৭-১৯৭৫) এসেছিলেন ফরিদপুরের খাড়া গাঁ থেকে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়(১৯১৮-১৯৭১) এসেছিলেন ফরিদপুর থেকে।বিমল কর (১৯২১-২০০৩)-এর জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগণার টাকির কাছে এক গ্রামে।রমাপদ চৌধুরী (১৯২২-২০১৮) এসেছিলেন খড়গপুর থেকে। সমরেশ বসু (১৯২৪-১৯৮৮)-এর জন্ম ঢাকার মুন্সিগঞ্জের কাছে। এঁদের লেখা অনেক গল্পেই নগর কলকাতাকে পেয়েছি। পেয়েছি স্মৃতির পিছুটান বনাম নাগরিকতার সংকট। কিন্তু এঁরা যে চোখে কলকাতাকে দেখেছেন সেই চোখ নতুন নাগরিকের চোখ। মতি নন্দী জন্মসূত্রেই মহানাগরিক। বাস করতেন শোভাবাজারের তারক চ্যাটার্জি লেনে — “আমার অধিকাংশ লেখার চরিত্র এসেছে এই গলিটা থেকেই যেহেতু আমি জন্মাবধি আছি এইরকম এক গলিতে, এতেই আমি সড়গড়। এই পরিবেশেই আমার প্রধান চরিত্রদের বাস” (দ্বাদশ ব্যক্তি)। তাঁর গল্পের চরিত্ররা কলকাতার নগরবাসী হলেও এরা অতি সাধারণ নর-নারী। যাদের জীবন উত্তর কলকাতার সংকীর্ণ গলির মতোই শত আবদ্ধতায় জীর্ণ। ‘বেহুলার ভেলা’ গল্পে এই গলির বর্ণনা: “ডাব বোঝাই একটা ঠেলাগাড়ি পথ জুড়ে মাল খালাস করছে, চারধারে যেন কাটামুণ্ডুর ছড়াছড়ি। তারপর বাজারের আস্তাকুড়টাও জিনিসপত্রের দামের মতোই বেড়ে এসেছে গেট পর্যন্ত। পূর্বদিকের গেট দিয়ে বেরোনো ঠিক করল প্রমথ। দুটো রকের মাঝখানের পথটায় থই থই করছে জল। চাপা কল থেকে জল এনে ধোয়াধুয়ি শুরু করেছে দুটো লোক। ঝাঁটার জল যেন কাপড়ে না লাগে সেই দিকে নজর ছিল।”
গলির মানুষগুলির জীবনে যেন কোনো আনন্দ নেই,উচ্ছ্বাস নেই,এক গম্ভীর নিরুৎসব জীবন তারা বহন করে চলেছে।এই গল্পের প্রধান চরিত্র প্রমথ। তারই দৃষ্টিকোণ (point of view)থেকে গল্পটি বিবৃত। প্রমথর চোখ দিয়ে লেখক গলি জীবনকে দেখিয়েছেন। এই জীবনের একটি অনুপুঙ্খও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি।প্রমথ কলকাতার মানুষ। এই নাগরিক পরিচয় তাকে উদ্বেলিত করে না। কলকাতা তার কাছে কোনো স্বপ্নমায়ায় বোনা শহর নয়। উত্তর কলকাতার ক্ষয়ে যাওয়া ইতিহাসের মতোই এক মৃতকল্প মানুষ প্রমথ। সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে সে কেবল গলিরই মানুষ — “হাড়গোড়সার ছেলের হাত পায়ের মতোই ন্যাতানো গলিটা। হালকা বাতাস পর্যন্ত স্যাঁতসেঁতিয়ে যায়। “এই গলি জীবনে বাঁচতে বাঁচতে.প্রমথর ‘জীবনটা যেন জলভাত হয়ে গেছে। ওঠানামা নেই স্বাদ গন্ধ নেই কিছু নেই, কিছু নেই, তবু কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। আশ্চর্য এই ভোঁতার মতো বেঁচে থাকাটাও একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। বদ অভ্যাস।” এমনকী এই গলির বীভৎস বাতাসে বেঁচে থাকার অভ্যেসটাই যেখানে বদ অভ্যাস হিসেবে গণ্য সেখানে সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনিও বেমানান বলে মনে হয় — “শাঁখ বাজাচ্ছে অমিয়া। পুতুলের কাঁপুনি ধরে গেল। বিশ্রী শাঁখের আওয়াজটা শুভ কাজে শঙ্খ ধ্বনি দেওয়া হয়, অথচ এখন মনে হচ্ছে মাটি টলছে ভূমিকম্পে।” এই গল্পে সময়ের পরিবর্তনের ছবি, কলকাতার বদলে যাওয়ার ছবি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত মর্মভেদী বর্ণনায় তুলে এনেছেন গল্পকার — “ভাবলে অবাক লাগে। চাঁদুর মতো বয়সে ছ-আনা সের মাংস এই বাজার থেকেই সে কিনেছে। তখন প্রায় সবই ছিল মুসলমান কসাই। ছেচল্লিশ সালের পর কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল।” গলি জীবনে প্রমথ আর অমিয়ার দাম্পত্য ফিকে হয়ে গেছে। সেই দাম্পত্যে যেন কোনো প্রাণের সাড়া নেই। গল্পের শেষে প্রমথ অমিয়াকে বলেছে — ‘অমি, একটা মড়া আগলে বসে থাকা ছাড়া আর আমাদের কাজ নেই।’ গল্পের ‘বেহুলার ভেলা’ নামকরণের মধ্যে দিয়ে উত্তর কলকাতার মৃতকল্প নর নারীর জীবন ভাষ্য রচনা করেছেন মতি নন্দী। প্রকৃতপক্ষে ‘বেহুলার ভেলা’ এক মৃতপ্রায় শহরের গল্প। এই ভেলায় যে রূপসী ভেসে যাচ্ছে জীবন্ত শবদেহ নিয়ে তার লাবণ্য কলকাতার ইতিহাস। উত্তর কলকাতার সমস্ত লাবণ্য শুষে নিয়ে সে যাত্রা করেছে।
‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান ‘গল্পটি রচনার একটি নেপথ্য কাহিনি রয়েছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এক্ষণ ‘পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহ করতে মতি নন্দীর পরিচিত এক ভদ্রলোকের তেলিপড়া লেনের বাড়িতে এসেছিলেন সৌমিত্র বাবু। রীতিমত সরুগলি বেয়ে নিজের হাতে গাড়ি চালিয়ে তাঁকে প্রবেশ করতে হয়েছিলো। এই ক্ষুদ্র ঘটনাটি ‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান’ গল্পের নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলো। এ গল্পের শুরুটাই হয়েছে একরকম নাটকীয় ভাবে : “ধূসর অ্যাম্বাসাডারটা ফ্যালাকে লক্ষ করেই ষোলো হাত চওড়া রাস্তাটায় থামলো। ড্রাইভারের আসন থেকে প্রশ্ন হল, এটাই কি ঘোষপাড়া লেন? বিমূঢ় ফ্যালা উঠে দাঁড়াল। প্রশ্নকারী জানলা থেকে মুখটাকে একটুখানি বার করেছে। ফ্যালার আর কোনো সন্দেহ রইল না। অবশ্য কণ্ঠস্বরেই আধখানা চিনেছিল।”.
অতি পরিচিত নায়ক যখন উত্তর কলকাতার গলির মধ্যে প্রবেশ করেন, তখন থমকে থাকা গলির জীবনও যেন সাময়িক সচকিত হয়ে ওঠে — “গাড়িটা কষ্টেসৃষ্টে ঢুকে গেল। বেশিদূর যেতে পারবে না,কারণ মাস দুয়েক আগে কর্পোরেশন থেকে রাস্তায় একটি টিউবওয়েল বসানো হয়েছে।….টিউবওয়েলে স্নান করছিল গোবিন্দ দত্ত।…ওর পিছনেই গাড়িটা থামল। জলটা ঠাণ্ডা তাই মাথায় জল ঢেলে থাবড়ে থাবড়ে আমোদ করছিল গোবিন্দ। ভোর ছটায় বেড়িয়ে সন্ধ্যা ছটায় ফেরা। এ সময় তিন নম্বর বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞাসা করল, ও যে জলঢালা থামিয়ে কথার জবাব দেবে না প্রশ্নকারী তা কেমন করে জানবে। সুতরাং দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করে গোবিন্দর দাঁত খিঁচুনি দেখে আর কথা বাড়াল না। ফ্যালা ছুটে এসে গোবিন্দকে চাপা সুরে ধমকাল, “ও কে জান? অমন করে যে কথা বললে? গোবিন্দ হক্ চকালো। ঘাড়ের কাছেই গাড়িটা, ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকিয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে বলল “কে?”
এই গল্পে গলির বর্ণনা অনেক বেশি ম্রিয়মাণ — “বাড়ি গুলো কলিচটা;বালি বেড়িয়ে পাণ্ডুরবর্ণ। ওর মধ্যেই কালী বাবুর বাড়িটা সদ্য কলিফেরানো। ফলে মনে হয় গলিটার শ্বেতী হয়েছে।” এ যেন রোগপাণ্ডুর মৃতপ্রায় জীবনের প্রতিচ্ছবি। তবু এখানেও জীবনের সাড়া মেলে। তাই দেখা যায় গলি ক্রিকেটের কল্যাণে ছাদ বেয়ে নেমে আসা জলের পাইপগুলোর তলার অধিকাংশই ভাঙা। গল্পে এরপরেই রয়েছে চমক — “গলিতে দাঁড়িয়ে আকাশে তাকালে প্রথমেই মনে হবে চিরকুট শারী ফেঁসে গিয়ে বিব্রত কোনো গৌরাঙ্গীর দেহ।”
মতি নন্দীর গল্পে যে চরিত্রেরা ভিড় করে আসে তারা সকলেই মধ্যবিত্ত বঙ্গসন্তান। স্বাধীনতা পরবর্তী নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের নিদারুণ জটিলতা গুলি তাঁর গল্পে ভয়ংকরভাবে উঠে এসেছে। সমসাময়িক অন্যান্য গল্পকারদের রচনায় রয়েছে উদ্বাস্তু সমস্যার কথা। সে দিক থেকে মতির চরিত্রেরা সকলেই কলকাতার। যারা শীর্ণ গলিতে থাকে। শহরে থাকলেও নাগরিক জটিলতা তাদের সেভাবে গ্রাস করেনি, বরং অর্থাভাব জনিত ক্ষুদ্রতা তাদের অনেক বেশি। গলির ভিতরে এক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন তারা যাপন করে চলেছে। এই চরিত্রগুলির চোখে কলকাতা শহরের পরিবর্তনের ছবি অনেক বেশি স্পষ্ট। কারণ উত্তর কলকাতা বাবু কালচারের উৎসভূমি। সেই বাবুদের বসবাসের চিহ্ন এবং বাবু কালচারের প্রত্ন-অস্তিত্ব উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে গঙ্গার তীরে অতীতের সাক্ষী হিসেবে ছড়িয়ে রয়েছে। সমসাময়িক অন্যান্য গল্পকারদের তুলনায় মতি নন্দী এই কারণেই আলাদা। তাঁর চরিত্রেরা মহানগরের সেইসব উপেক্ষিত নর-নারী যাদের কথা এর আগে কেউ এভাবে লেখেননি।
মতি নন্দীর ‘জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ’ গল্পটি গলির মানুষদের ঈর্ষা ও নির্মমতার গল্প। উত্তর কলকাতার গলির ভিতরে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত পরিবার ও বস্তিবাসীদের পারস্পরিক ঈর্ষার মনোভাব যে কী ভয়ঙ্কর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আত্মপ্রকাশ করতে পারে তার বাস্তব চিত্র এই গল্পে দেখিয়েছেন লেখক। গলির মানুষদের পারস্পরিক শ্রেণি বৈষম্যের ছবি এই গল্পে নগ্নভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।কলকাতা কর্পোরেশনের অব্যবস্থা জনিত কারণে তীব্র জল সংকট যে কী দুর্বিষহ পরিণতি ডেকে আনে গল্পটি তারই বাস্তব চিত্রায়ণ। গলির দুর্বিষহ জীবনে বাঁচতে বাঁচতে.মানুষগুলো যেন জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের এই ক্রোধ এবং ক্ষোভ — চাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব যে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়তে পারে গল্পটি সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে।
মতি নন্দীর অনেক গল্পেই মহানগরীর রাজপথ অন্ধ গলির বাঁকে হারিয়ে যায়।সেখানে এক প্রেতলোকের বীভৎস নরক জেগে ওঠে! কলকাতার ইতিহাস সন্ধানী গবেষকগণ উত্তর কলকাতার বর্ণময়.অতীতকেই শুধু খোঁজেন। সেই বর্ণাঢ্য অতীতের আড়ালে অপরিসর সিঁড়ি আর ছাদ, গঙ্গাজলের বাতিল পাইপ, ভাঙা টিউবওয়েল নিয়ে অতন্দ্র জেগে আছে যে কলকাতা, সেই কলকাতার খবর রাখেন কি? মানুষের নিষিদ্ধ কামনা মানুষকে রাজপথ থেকে অন্ধকার অপরিসর গলিতে টেনে আনে। আর সেই কামনার নারকীয় আগুনে নিজেকে সঁপে দেয় নিঃসহায় নারী। যে কখনোই রূপোপজীবিনী ছিলো না, শুধু জীবনের পরাজয়ে নিজেকে নামিয়ে এনেছে রাজপথ থেকে অন্ধ গলির নিষিদ্ধ তিমির যাত্রায়। ‘একটি সাধারণ ব্যাপার’ গল্পে দেখি একটি মেয়ে অপরাহ্ন বেলায় কলকাতার রাজপথের উপর একটি বিরাট বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছে। মেয়েটির জন্ম অতি দরিদ্র পরিবারে, কলকাতার শহরতলীতে। শৈশব থেকেই সে অনাদর, অশিক্ষা এবং অর্ধাহারে লালিত। শহরতলীর মেয়ে জীবনে পরাজিত হয়েই কলকাতায় এসেছে। রাজপথে সে অপেক্ষারত। এই অপেক্ষার পিছনেও রয়েছে বাঁচতে চাওয়ার সাধ। “মেয়েটি সত্যিই একজনের জন্য অপেক্ষা করছে। লোকটিকে সে চেনে না তাকে চিঠি দিয়ে দেখা করতে বলেছে লোকটি। লোকটি বিবাহেচ্ছুক।….মেয়েটির কৈশোরে কিছু প্রেমিক জুটেছিল। কয়েক বছর মেয়েটি অনটন ও লাঞ্ছনার মধ্যেও সুখ লাভ করে। প্রত্যেকেই তাকে বিবাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়, সে তাদের বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার দেহে যুবতী সুলভ মনোহারিত্বের অভাবগুলি প্রকট হওয়ায় এবং প্রেমিকদেরও সাংসারিক দায়িত্ব এবং চিন্তা বেড়ে যাওয়ায় মেয়েটি এক সময় লক্ষ্য করল, সে আবার একা হয়ে গেছে। সে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করল, প্রণয় দ্বারা কোনো পুরুষকে সে আকর্ষণ করতে পারবে না, অর্থব্যয় দ্বারা বিবাহ দেওয়ার সামর্থ্যও পরিবারের নেই। একমাত্র দৈববশেই যদি বিবাহ হয়।”
মেয়েটি কলকাতার প্রশস্ত রাজপথ থেকে হারিয়ে গেল চোরা গলির বাঁকে। মতি নন্দীর গল্পে এই চোরা গলির সর্পিল অন্ধকার বারেবারে জীবনের পরাজয়ের ছবিকে ফুটিয়ে তোলে।
মতি নন্দী কি শুধুই খেলার লেখক? পেশায় ক্রীড়াসাংবাদিক মতি খেলাকে উপজীব্য করেই লিখেছেন। কিন্তু তাঁকে শুধুমাত্র খেলার লেখক ভাবলে ভুল হবে। তাঁর নিজের কথায় — “খেলা আর মাঠ আমার কাছে জ্ঞান হওয়া থেকেই একটা ব্যাপার। এটাই অবশেষে আমার জীবিকা হয়েছে। খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় মানুষের দেহের গুরুত্ব, দেহ সঞ্চরণের সৌন্দর্য, শ্রম দ্বারা অধিত গুণাবলীর প্রকাশ, যা কখনো কখনো শিল্প আস্বাদনের স্তরে উত্তীর্ণ হয়, এবং সমাজের নিচুতলার মধ্যবিত্ত মানুষের অস্তিত্বের চেহারাটি কেমন তা আমাকে দেখিয়ে ও বুঝিয়ে দেয়। “মতি নন্দীর আত্মজীবনী মুলক লেখা ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’। এই দ্বাদশ ব্যক্তিটি কে? ক্রিকেট টিমের প্রথম একাদশের বাইরে একজন থাকে, যে মাঠে খেলায় অংশগ্রহণ করে না, দলের জয় পরাজয়ে যার কোনো ভূমিকা থাকে না, যার কাজ জল এনে দেবার, প্রয়োজনে ফিল্ডিং খাটার। আসলে প্রত্যেক মধ্যবিত্ত মানুষই দাঁড়িয়ে এই দ্বাদশ ব্যক্তির অবস্থানে। “দ্বাদশব্যক্তি এই তাড়াখাওয়া ক্ষিপ্ত, ভীত মানুষ, যাকে অবশেষে ঘুরে দাঁড়িয়ে একসময় বিদ্রোহ করতেই হয় নিজের বিরুদ্ধে। ভূমিষ্ঠ কাল থেকেই বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া দয়া, করুণা, ক্ষমা, প্রেম, কৃতজ্ঞতা প্রভৃতি শব্দ দ্বারা বাহিত ভাবগুলি আদৌ কাম্য অথবা নিজের পারিপার্শ্বিকে প্রার্থনীয় কিনা তাই নিয়েই সে চ্যালেঞ্জ জানায় (দ্বাদশব্যক্তি)। “যে আত্মসঙ্কট মধ্যবিত্তের প্রতিমুহূর্তের সঙ্গী, সেই আত্মসঙ্কটে দীর্ণ বিদীর্ণ, মধ্যবিত্তই অবস্থান করে দ্বাদশব্যক্তির ভূমিকায়।
মতি নন্দী কলকাতার সেইসব মানুষগুলিকে এঁকেছেন যারা জীবন যুদ্ধে পরাজিত। কবি জীবনানন্দ যাদের চিনতেন গগন, বিপিন, শশী প্রভৃতি নামে। মতি নন্দীর গল্পে এরাই তারক, সুধা, প্রমথ হয়ে উঠে এসেছে— “… গগন, বিপিন, শশী পাথুরেঘাটার; /মানিকতলার, শ্যামবাজারের, গ্যালিফ স্ট্রিটের এন্টালির/কোথাকার কে বা জানে/জীবনের ইতর শ্রেণীর মানুষ তো এরা সব; /ছেঁড়া জুতো পায়ে/বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করে;”
মতি নন্দীর ‘শবাগার’ গল্পটি মধ্যবিত্ত সমাজের নির্মম ভয়াবহ চিত্র। এখানে উত্তর কলকাতা যেন সেই শবাগার যেখানে ‘সবাই বুঝি মৃত’। মানুষের অন্তর ভালোবাসার অন্ধকারে নিশ্ছিদ্র নিষ্প্রদীপ— “যক্ষার রোগীর মত ধুঁকে মরে মানুষের মন! /জীবনের চেয়ে সুস্থ মানুষের নিভৃত মরণ! /মরণ,-সে ভালো এই অন্ধকার সমুদ্রের পাশে! /বাঁচিয়া থাকিতে যারা হিঁচড়ায় করে প্রাণপণ — /এই নক্ষত্রের তলে একবার তারা যদি আসে, —/রাত্রিরে দেখিয়া যায় একবার সমুদ্রের পরের আকাশে!”…. ‘শবাগার’ নকশাল আন্দোলনের সমকালীন গল্প। যখন প্রতিদিন রাস্তায় গলিতে অশনাক্ত মৃতদেহ। অল্প বয়সী তরুণ যুবক মাত্রই পুলিশের সন্দেহের তালিকায়। যাকে পারছে তারা সেই সন্দেহে প্রচুর মারধোর করছে। যাতে তারা চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। এই দমবন্ধ আতঙ্ক জড়ানো সময়ে কলকাতার বাসিন্দা মুকুন্দ তার নীচতলার ভাড়াটে গৌরাঙ্গর স্ত্রী শিপ্রার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত। গৌরাঙ্গ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী। মুকুন্দর ছেলের চোখেও এই সম্পর্ক দৃষ্টি এড়ায়নি— “শিপ্রা দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের ঘরের দরজাটা ভেজানো। মুকুন্দর হাত থেকে দশটাকা নেওয়া মাত্রই শিপ্রাকে সে জড়িয়ে ধরল। চুমু খেতে যাবে, কিন্তু শিপ্রার দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছন ফিরে তাকিয়েই তার বুকের মধ্যে প্রচণ্ড এক বিস্ফারণ ঘটল। মনু সদর দরজার কাছে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। মুকুন্দর শরীরের মধ্যে তখন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মাথায় উঠছে, হাড় থেকে মাংস খুলে খুলে পড়ছে।”
এরপর একদিন হঠাৎ মুকুন্দ খবর পেলো তার ছেলেকে থানায় ধরে নিয়ে গেছে। থানায় গিয়ে মুকুন্দ দেখলো মনু ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে। মনুকে ভয় পেতে দেখে মুকুন্দও কাতর হয়ে পড়লো। মনু পুলিশকে তার বন্ধুদের সব খবর বলে দিয়ে থানা থেকে ছাড়া পায়। থানা থেকে বেরিয়ে এসে মুকুন্দকে বলে:— ‘‘তুমি কি আমায় ঘেন্না করছ আমি যা করেছি?” ‘‘মোটেই না আমি চিরকাল তোকে ভালবাসবো।” ‘‘কিন্তু আমি নিজেকে ঘেন্না করছি।” ‘‘থানায় তুমি এমন করে আমার দিকে তাকালে মনে হল আমি একটা মরা মানুষ।কীরকম যেন ভয় করল আমার।নায়তো একটা কথাও বলতাম না, কিছুতেই না। …তোমার জন্য শুধু তোমার জন্য।তুমি আমায় করাপ্ট করেছ। “পুত্রের এই জমাট বাঁধা ক্রোধের অভিব্যক্তিতে মুকুন্দ জর্জরিত হয়ে যায় এরপর সে তার সমস্ত ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়ে অসুস্থ এবং আসন্ন মৃত্যুপথ যাত্রী গৌরাঙ্গর সামনেই তার স্ত্রীকে সম্ভোগ করে— “ও তো মরে যাচ্ছেই তাহলে আবার ভয় কিসের।”
রমাপদ চৌধুরী ‘গত যুদ্ধের ইতিহাস’ গল্পে এক নামহীনা মেয়ের নানান অবস্থান্তরের মধ্যে দিয়ে ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ — এই দীর্ঘ দশ বছরের কলকাতা শহরের বদলে যাওয়ার ছবি দেখিয়েছেন। মেয়েটির ভিখারিনী থেকে ফেরিওয়ালা, ফেরিওয়ালা থেকে নবৌঢ়া বধূ, বধূ থেকে গরবিনী মা, তারপর বারবনিতা হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে কলকাতা শহরের গোটা একটি দশকের জটিল জীবনধারার পরিচয় তুলে ধরেছেন। গল্পটি এক সদ্য যুবক হয়ে ওঠা তরুণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবৃত। যে নিশ্চিতভাবেই কলকাতার মানুষ নয়। পড়াশোনার সূত্রে কলকাতায় এসেছে। এই গল্পের বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে রাজপথে। গল্পে আমরা যেন সদ্যযুবক রমাপদকে খুঁজে পাই। রমাপদ চৌধুরী নিজেই ১৯৩৯-এ খড়গপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হতে। তারপর ইডেন হিন্দু হোস্টেলেই তিনি থাকতেন। আগেই বলেছি মতি নন্দীর গল্পের চরিত্রেরা প্রায় সকলেই কলকাতার বাসিন্দা। তাদেরই চোখ দিয়ে মতি দেখান কলকাতার বদলে যাওয়ার ছবি। কলকাতার গলির ভিতরকার মানুষগুলোর অপরিসর জীবনের মতোই উত্তর কলকাতার নিভে যাওয়া ইতিহাস সেখানে হতশ্রী চেহারা নিয়ে উঁকি দিয়ে যায়। রাজপথ হারিয়ে যায় অন্ধ গলির বাঁকে।
উত্তর কলকাতার গলিতে রকে টেনিদা, হাবুল, প্যালাদের এখন আর খুঁজে পায়না কেউ। থিয়েটার পাড়া জৌলুসহীন। স্টার থিয়েটার নির্মাণ— ভস্মীভূত-পুনর্নির্মাণের পর কেবলই অতীতের স্মারক। তার ইট কাঠ কংক্রিটের আড়ালে ইতিহাস গুমড়ে কাঁদে। কলকাতার ইতিহাস সন্ধানী গবেষকগণ। আজ খুঁজে বেড়ান অতীত আলোর বর্ণালী। যে অগণিত নর-নারী শ্যামবাজার, ফরিয়াপুকুর, চিতপুর, বেলেঘাটা কিংবা আহিরীটোলায় আসে আর যায়, তারা আজন্ম উত্তর কলকাতার নগ্নপদ মানুষ। সেই চলমান ইতিহাস, সেই জীবন্ত জীবাশ্মের সন্ধান তাঁরা রাখেন কি! এখানেই মতি নন্দীর বিশিষ্টতা। এভাবেই তিনি ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ছেন।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক