বর্ষা যাই যাই করেও রোদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। নদীপাড়ের কাশফুলের খুশির দোল দেখতে গিয়ে কখনো কখনো শরৎমেঘে লাগছে টোকা। আহ্লাদে ঝরঝরিয়ে খানিক বৃষ্টি ঝরিয়ে আবার নীল আকাশের বুকে উধাও হয়ে যাচ্ছে মেঘ। টইটম্বুর মাতলার মনে দুষ্টুবুদ্ধি। সবকিছু বুকের গভীরে রাখতে চেয়ে নদী ভাঙন ধরায় পাড়ে; নিমেষে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় মাঠঘাট, ঘরবাড়ি, জীবন। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে মাতলা বয়ে চলে আপন ছন্দে।
নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো পেঁজা তুলোর মেঘ যখন ঘন সবুজ গাছের ওপর নরম রোদের আল্পনা আঁকে তখন দুর্গার বড় মনকেমন করে। ঘরের লোকটা রোজগারের আশায় ঢাক কাঁধে শহরে গেছে। এ গাঁয়ে দুর্গাপূজো হয় না। দশমীর কয়েকটা দিন পর ঘরের মানুষ যখন ঘরে ফেরে তখনই দুর্গা পূজো পূজো গন্ধ পায়। ছুটে গিয়ে বনবিবির থানে পূজো দিয়ে আসে।
আজও দুর্গার মন বড় উদাস। তিনবছরের মেয়েটার হাত ধরে মাতলার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। উচ্ছল মাতলা ওর মনখারাপগুলোকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মন ভালো হয়ে যায় ওর। আজ সকাল থেকেই পেটেরটা বাইরে আসার জন্য যেন বড্ডো বেশি করে জানান দিচ্ছে। আরও একটা মুখ বাড়তে চলছে সংসারে। বড় ভয় হয় দুর্গার। নানান চিন্তার মাঝে হঠাৎই দুর্গার পায়ের তলার মাটি আলগা হয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নদীর জলে পড়তে পড়তে মেয়ের হাত ছেড়ে যায় ওর। দূর থেকে নৌকার মাঝিরা হইহই করে ওঠে, “হোওইই গো, বিজয়াতে বুঝি রাক্কুসী মাতলা গেরামের পিতিমে নিয়ে গেল গো।” তাড়াতাড়ি নৌকা নিয়ে এগিয়ে এসে ওদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ছোটে মাঝির দল। ছোট্ট তিনবছরের শরীরটা ততক্ষণে নিথর হয়ে গেছে। হাসপাতালে কয়েকঘণ্টা জীবনের সাথে লড়াই করে ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়ে দুর্গা চিরকালের মতো চোখ বোজে। লোক মারফৎ খবর পেয়ে দিনদুয়েক পর দুর্গার স্বামী গ্ৰামে ফিরলেও হাসপাতালমুখো হয় না। অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় মাতলার ধারেই ক’দিন কাটিয়ে কোথায় যে উধাও হয়ে যায় তার আর খোঁজ পাওয়া যায় না। দুর্গার মেয়ে রয়ে যায় হাসপাতালেই। নার্সদের কোলে কোলে বড়ো হতে থাকে।
***
দক্ষিণ চব্বিশ-পরগণার প্রত্যন্ত অঞ্চল সরোজপুর। এখানে জলে কুমীর ডাঙায় বাঘ। খামখেয়ালী প্রকৃতির বিধ্বংসী ঝড় কিংবা নদীর সর্বগ্ৰাসী ভাঙনের মুখেও লড়াই করে টিঁকে থাকে মানুষ। হারায় না ভালোবাসা।
এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে হিমেল এখানে প্রথম এসেছিল। দেখেছিল বিধ্বংসী ঝড়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া সরোজপুরকে। এখানকার মানুষের দুর্দশা ওকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেবার ওরা এসেছিল কিছু ত্রাণসামগ্ৰী নিয়ে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ সংগ্ৰহের পরও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার বরাদ্দের থেকে অনেক কম ত্রাণ বিলি ওকে কষ্ট দিয়েছিল। ওর মন এ ধরণের সংস্থার হাতের পুতুল হয়ে থাকতে সায় দেয়নি। তাই এরপর থেকে ও নিজের মতো করেই এখানকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে। চাকরির প্রতি মাসের মাইনের থেকে একটা অংশ ও তুলে রাখে সরোজপুরের জন্য।
এখানকার মানুষজন বুঝতে পারে যে ত্রাণ বিলি করতে আসা শহরের আর পাঁচজনের থেকে হিমেল একেবারেই আলাদা। দয়ার দানে বাঁচা নয়, ও চায় এখানকার প্রতিটি মানুষ সাবলম্বী হয়ে উঠুক। ধীরে ধীরে এখানকার মানুষের বড় আপনজন হয়ে উঠেছে ও। জল-জঙ্গল-মানুষের টানে বাঁধা পড়েছে হিমেল।
কয়েকবছর আগের ঘটনা। একদিন সরোজপুর যাওয়ার পথে শেয়ালদা স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে নামতেই হিমেলের চোখ আটকে যায় প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায়। একটি মেয়েকে ঘিরে ধরেছে কয়েকটি পথশিশু। মেয়েটি কাঁধের ঝোলা থেকে কেক, বিস্কুট বের করে ওদের দিচ্ছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে যায় ও। কানে আসে, মেয়েটি বলছে, “সবাই এটা খেয়ে নিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এসে এখানে পড়তে বোস। পড়া শেষ হলে আবার পাবি।”
সেদিন হিমেলের সরোজপুর আর যাওয়া হয় না। এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির সাথে আলাপ করে। জানতে পারে ওর নাম আগমনী রায়। যেহেতু দুজনেরই লক্ষ্য অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেইজন্য কথায় কথায় ওদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগে না। ধীরে ধীরে হিমেলের সরোজপুরের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আগমনী। ভালোবেসে ফেলে এখানকার মানুষকে। এখানকার মেয়েদের স্বনির্ভর হয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখায় ওরা। বোঝায়, সবাই মিলে একসাথে পরিশ্রম করলে সুদিন আসবেই। ওদের কথায় উৎসাহী হয় গ্ৰামের বউ-ঝিয়েরা।
আগমনী গ্ৰামের মেয়েদের বলে, “আমাদের সাধ্য খুবই কম। তবু সেটুকু দিয়েই মেয়েদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু নতুন জামাকাপড় তোমাদের দেব। তোমরা গ্ৰামের মেয়েরা এক হয়ে সেগুলো এখানকার হাটে, বাজারে কিংবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি কর। সেখান থেকে যে টাকা উঠে আসবে সেটাই হবে তোমাদের মূলধন। তাই দিয়েই শুরু হবে তোমাদের নিজের ব্যবসা।” আগমনী বলে চলে, “ব্যবসার মূলধনটুকু আমরা জোগাড় করে দেব ঠিকই, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার পথ তোমাদেরই খুঁজে নিতে হবে। এরপরে তোমরা যেখানে সুবিধা বুঝবে সেখান থেকেই তোমাদের ব্যবসার মালপত্র কিনতে পার।”
ওকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েরা একযোগে বলে ওঠে, “তুমি আর হিমেলদাদাই যে আমাদের ভরসা।”
***
হিমেল এখন খুবই কম আসে সরোজপুরে। নিজের চাকরি সামলে এখানকার মেয়েদের জন্যই ও ঘুরে বেড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। উৎপাদকের ঘর থেকে জামাকাপড় এনে শুধুমাত্র কেনাদামের বিনিময়ে এখানকার মেয়েদের হাতে তুলে দেয়। ওরা এখন স্বনির্ভর। এদের সহজ ভালোবাসার টানে আর ব্যবসার হিসেবনিকেশ দেখার জন্য আগমনীকে প্রায়ই এখানে আসতে হয়।
***
কয়েকদিন ধরেই মলিনার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। কারণে অকারণে ওর স্বনির্ভর-গোষ্ঠীর মেয়েদের ওপর চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কিন্তু আজ ও একেবারে চুপ। বুকের ভেতর নানান আশঙ্কার ঝড় উথালপাথাল করছে। বাইরের কাঠফাটা রোদেলা-মাঠটার দিকে তাকিয়ে ঘরের দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিটায় হেলান দিয়ে সকাল থেকেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মলিনা। হঠাৎই কিছু একটা নজরে আসতেই চোখদুটো কুঁচকে সোজা হয়ে দাঁড়ায় ও। ভালো করে ঠাহর করার চেষ্টা করে। কাঁধে ঝোলা নিয়ে গোলাপি চুড়িদার পরা ছোট্ট শরীরটা মাঠের শেষপ্রান্তে ফুটে উঠতেই চিৎকার করে ওঠে মলিনা, “ওরে শালুক, জাহিরা, চরকি, রাবেয়া তোরা সব শিগ্গিরি আয়রে। আমার বিপত্তারিণী আসতেছে।”
মলিনার ডাকে ঘরের ভেতরে মেয়েদের হাতের কাজ থেমে যায়।দৌড়ে বাইরে আসে ওরা। ততক্ষণে খড়ের ছাউনির দাওয়ায় এসে উঠেছে আগমনী। রোদ্দুরে পুড়ে বেগুনী হয়ে যাওয়া ওর ঘেমো মুখটা নিজের আঁচল দিয়ে যত্ন করে মুছে দেয় মলিনা। মাটিতে বিছিয়ে দেয় শীতলপাটি। বলে, “এট্টু আরাম করে বোসো মণিমা।” রাবেয়া গ্লাসে করে নিয়ে আসে কুঁজোর ঠাণ্ডা জল আর একটা স্টীলের থালায় চারটে বাতাসা। আগমনীর সামনে নামিয়ে রাখে। বলে, “এটুকখানি মুখে দিয়ে এট্টু জুড়োও দিকিনি মণিদিদি।”
“তোমাকে বেশিদিন না দেখলে চোখে যে আঁধার দেখি বিপত্তারিণী! তুমি শহরের মানুষ হলেও তোমার গায়ে যেন মাতলার জলের গন্ধ।” মলিনা জড়িয়ে ধরে আগমনীকে।
আগমনী হাসে।
বাড়ি ফিরে সরোজপুরের গল্প করে মায়ের কাছে। বলে মলিনার কথা। মেয়ের কথা শুনতে শুনতে মাধবীর গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। বলেন, একেই বোধহয় বলে ভবিতব্য!
আগমনী অবাক হয়।
মাধবী বলে চলেন অনেকদিন আগের এক বিজয়াদশমীর গল্প। তখন সরোজপুর হাসপাতালের সুপার মাধবী রায়। মেয়েকে জন্ম দিয়ে দুর্গা মারা যাওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে মাতৃহারা মেয়েটির খোঁজ কেউ করেনি। অথচ হাসপাতালেও আর ওকে রাখা যাবে না। পাঠিয়ে দিতে হবে কোনও হোমে। মনটা ভারী হয়ে ওঠে মাধবীর। শেষপর্যন্ত দত্তক নেন বাচ্চাটিকে। নাম রাখেন আগমনী।
মায়ের কথা শুনে মেয়ে চুপ করে বসে থাকে। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের জল।
***
মাতলার পাড় জুড়ে কাশফুলের জলসাঘর। শরতের খামখেয়ালী মেঘের ঝরে পড়া জলে সব মালিন্য মুছে গিয়ে ঝকঝকে প্রকৃতি। মেয়েদের উদ্যোগে সরোজপুরে এবার প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছে। ঢাকের আওয়াজ খুশি ছড়িয়েছে। তবুও আজ হাওয়ায় বিষণ্ণতার সুর। আজ যে বিজয়া দশমী। মাতলার পাড়ে দেবীর বরণ চলছে। একটু পরেই জলের গন্ধ বুকে নিয়ে উমা ফিরে যাবেন কৈলাসে।
আজ আগমনী রায়ও খুঁজে ফেরে তার শিকড়। মাতলার জল দুহাত ভরে নিয়ে নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে সরোজপুরের বিপত্তারিণী মণিদিদি। দুচোখের জল মিশে যাচ্ছে গণ্ডূষে। আর দুহাতের ফাঁক গলে পড়া জল ফোঁটায় ফোঁটায় মিলিয়ে যাচ্ছে নদীতে, এগিয়ে চলেছে দূর থেকে দূরে; সাথে নিয়ে যাচ্ছে অদেখা একটা ছোট্ট শরীর আর এক মা।
একটু দূরেই ঢাকের বোলের সাথে প্রতিমা জলে পড়েছে। ভেসে চলেছে অনির্দেশের পথে। পাড়ে সমবেত কন্ঠে চিরকালীন আকুলতা, “আবার এসো মা”।
অস্ফূটে নড়ে ওঠে আগমনীর ঠোঁট। চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে চায় বুকের ভেতরের ঝড়; আবার এসো মা।।
জলের গন্ধ বুকে নিয়ে উমা ফিরে যাবেন… কথাটা মন কাড়ল। ভাল লাগল বেশ। আরও গল্পের অপেক্ষায়…
অসংখ্য ধন্যবাদ❤️❤️
অনন্য!!!
অসংখ্য ধন্যবাদ❤️❤️