১৫৭৭ একটি হত্যাকাণ্ড এবং সম্রাটের ক্ষোভ
[রাজস্ব দপ্তরের এক ছোট মন্ত্রী এবং ধর্মতাত্ত্বিক শেখ আবদুল নবির হাতে মথুরার এক ব্রাহ্মণের হত্যা নিয়ে ১৫৭৭-এ ফতেহপুর সিক্রির অন্দরমহল এবং দরবার বেশ কয়েক দিনের জন্যে তেতে উঠেছিল। এ নিয়ে ফতেপুর সিক্রির ইবাদতখানায় সম্রাটের সঙ্গে উপস্থিত ধর্মতাত্বিকদের যে আলোচনা হয়, সে তথ্য আমরা বাদাউনির বয়ান মার্ফত জানতে পারছি। বাদাউনি স্বয়ং এই আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। বাদাউনির মুন্তাখাবুলতাওয়ারিখের তৃতীয় খণ্ড থেকে এই অংশটা নেওয়া। অনুবাদ শিরিন মুশভি]
শেখ আবদুল নবির পতনের অন্যতম কারন ছিল একটি চাপিয়ে দেওয়া বিচার সিদ্ধান্ত। সম্রাট বাঁশওয়াড়া থেকে ফতেহপুর সিক্রিতে ফিরলে মথুরার কাজি, কাজি আবদুর রহিম, শেখ আবদুল নবির দপ্তরে অভিযোগ করেন তিনি শহরে মসজিদ তৈরির জন্যে যে উপকরণ জোগাড় করেছিলেন, সেই উপকরণগুলি জনৈক ধনী এবং উদ্ধত ব্রাহ্মণ সরিয়ে নিচ্ছিলেন। কাজির দপ্তরে এই অভিযোগ করলে কাজি ব্রাহ্মণকে রুখতে গেলেন। সেই ব্রাহ্মণ বহু সাক্ষীর সামনেই তাকে হেয় করে, এবং মহান নবি এবং সাধারণভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উচ্চারণ অযোগ্য শব্দ ব্যবহার করেন। ব্রাহ্মণকে বিচারের জন্যে ডেকে পাঠালে সে শেখের শমন মেনে তাঁর সামনে উপস্থিত হতে অস্বীকৃত হয়। গণ্ডগল যখন বেশ পেকে উঠেছে সেই ঘটনা সম্রাটের কানে আসে। সম্রাট, বীরবল এবং আবুলফজলকে দিয়ে শেখ আবদুল নবিকে ডেকে পাঠান। তারা বিচারককে সম্রাটের সমক্ষে নিয়ে আসেন। শেখ আবুলফজল সম্রাটকে জানালেন তিনি জনগণের মুখ থেকে মামলাটির বিষয়ে শুনেছেন এবং ব্যক্তিটির ধর্মের বিরুদ্ধে কুবাক্য বলার অভিযোগ সত্য। কয়েকজন উলেমা জানিয়েছেন ব্যক্তিটিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিৎ। তবে দরবারে উপস্থিত অন্যান্যদের রায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুধুই প্রকাশ্যে অপমান এবং জরিমানা করা হোক। উলেমারা দুভাগে বিভক্ত হয়ে এই বিষয় নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে আলোচনা করতে থাকেন। ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্যে শেখ সম্রাটের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সম্রাট উলেমাদের বললেন, ‘মহান আইন অনুযায়ী দুষ্কর্মের জন্যে শাস্তি দেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার আপনাদের আছে হে উলেমা, আপনারা আমার থেকে কী অনুমতি চাইছেন?’ ধর্মবিদ্বেষ প্রকাশের জন্যে ব্রাহ্মণকে কিছু দিন কাজির হেফাজতে রাখা হলে শাহী জেনানার মহিলারা আর দরবারে হিন্দু আমলারা ব্রাহ্মণকে কারাগার থেকে ছাড়াবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠে সম্রাটকে বার্তা পাঠাতে লাগলেন। কিন্তু কাজির প্রতি সম্রাটের অটল শ্রদ্ধায় সে সব প্রতিবাদ নিষ্ফল হল। সম্রাট যখন বললেন, ‘আমাদের উত্তর আমি আপনাকে জানিয়ে দিয়েছি, আপনি সেটা জানেন’ — শেখ দেখলেন তার সামনে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব দরজা খোলা। তিনি দপ্তরে পৌঁছে তুরন্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারি এবং কার্যকর করলেন।
মহিলাদের বিক্ষোভের সংবাদ সম্রাটের কানে পৌঁছলে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। জেনানার সব মহিলাই এবং হিন্দু অভিজাতরা জেনানার বাইরে সম্রাটকে অভিযোগ করলেন, ‘আপনি মোল্লাদের এতই মাথায় তুলেছেন যাতে তারা আপনার প্রস্তাবকে ঠুকরে দেওয়ার উচ্চতায় পৌঁছে গিয়ে আপনার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তাদের অপ্রতিহত ক্ষমতা জাহির করছে। কী দুঃসময় এল’। মহামহিমের সামনে নিয়ত এধরণের নানান অভিযোগ দায়ের হতে থাকলে সম্রাট আকবর নিজের মনে এই মামলার পক্ষে [মৃত্যুদণ্ডাদেশের] যে সব যুক্তি সাজিয়ে রেখেছিলেন সে সব হঠাতই একদিন অন্তর্হিত হল। এক রাতে অনুপ তালাওতে তাত্ত্বিকদের সামনে এই মামলার সমস্ত দিক তিনি উপস্থিত করলেন। সেদিন কয়েকজন বিচারপতি, মুফতি উপস্থিত ছিলেন। তিনি এবিষয়ে তাদের মত জানতে চাইলেন। উপস্থিত মুফতিদের মধ্যে একজন বললেন, ‘সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যে উপস্থিত এক সাক্ষী জানিয়েছিলেন শেখ অপরাধ এবং আইন উল্লঙ্ঘন দুটোই করেছেন’। আরেক মুফতি জোরগলায় বললেন, ‘আশ্চর্যের ব্যাপার হল, বিচারপতি শেখ আবু নবির দাবি তিনি আবু হানিফার (পরম করুণাময় তাকে দয়া প্রদর্শন করুন) উত্তরাধিকারী। আবু হানিফা ধর্মতত্ত্বের আঙ্গিকে বলা হয়েছে ইসলামের রাজত্বে বসবাসকারী কোনও অবিশ্বাসী যদি মহান নবীকে কটুক্তিও করে তাহলেও সে মুসলমানের সঙ্গে সে দেশের জনতার উপনীত হওয়া চুক্তি উল্লঙ্ঘন করছে না, এবং এ দেশে কোনওভাবেই কোনও মুসলিম, কোনও অমুসলিমকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। হানাফি বিচার ব্যবস্থায় এই ধরণের বিষয় নিয়ে বিশদে আলাপ আলোচনা করা হয়েছে। আমরা অবাক হয়ে যাচ্ছি কীভাবে শেখ তার পূর্বজর তৈরি করা আইনের বিরুদ্ধাচরণ করলেন’।
ইতিমধ্যে বর্তমান পুস্তক লেখকের দিকে মহামহিমের দৃষ্টি নিবদ্ধ হল। আমার দিকে ফিরে ডেকে বললেন, ‘আমার কাছে এস’। আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গেলে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি নিশ্চই জান, ধরে নাও নির্দিষ্ট কোনও অপরাধের জন্যে নির্দিষ্ট কোনও আইন আঙ্গিকে ৯৯ ধরণের পারম্পরিক মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা আছে, আর অন্য কোনও এক আঙ্গিকে সেই অপরাধের জন্যে তাকে মুক্তি দেওয়ার বিধান দেওয়া আছে। মুফতি কী ঐ ১টা আঙ্গিকের পরম্পরাকে বাছতে পারে’? আমি উত্তর দিলাম, ‘আপনার কথাই সত্য; এই প্রশ্নর উত্তর একটা আরবি নীতিবাক্যে বলা হয়েছে, ‘virily legal punishment and infliction are set aside by doubts’ [কোনও রকম সন্দেহ উপস্থিত হলের ভীতিপ্রদ আইনি শাস্তিকে সরিয়ে রাখতে হয়]। আমি আরবি বাক্যটা মহামহিমকে ফারসিতে অনুবাদ করে বললাম। সম্রাট বিষাদের গলায় বললেন, ‘আবদুল নবি হয়ত এই বিধান বিষয়ে জানতেন না, তাই তিনি বেচারা ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন’। সম্রাট প্রশ্ন করলেন, ‘[তোমার কী মনে হয়] তার এই আচরণ করার কারন কী’? আমি বললাম, ‘হয়ত মানুষের মন থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ আটকানো এবং ধর্মাবিদ্বেষের জীবানু ধ্বংস করা’। এই মামলা নিয়ে আলোচনা চলাকালীন আমি সম্রাটের সামনে কাজি আয়াজের শয়তানি বন্ধ করার পরম্পরা তুলে ধরলাম। কেউ কেউ বললেন, ‘কাজি আয়াজ মালিকি পরম্পরার। হানাফি পরম্পরার দেশে তার রায় মূল্যহীন’। সম্রাট প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কী মনে হয়’? আমি উত্তর দিলাম, ‘যদিও তিনি মালিকি পরম্পরার, আইন কোনও বিজ্ঞ মুফতিকে তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মত প্রকাশের অধিকার দেয়’। এই বিষয় নিয়ে আমি [সম্রাটের সঙ্গে] বাদানুবাদ করেই চললাম; আমার চারপাশের লোকেদের চোখে পড়ল সম্রাটের গোঁফটা শিকারী বাঘের মত ফুলতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে একজন আমায় অনেক্ষণ বাদানুবাদ থামানোর ইঙ্গিত করছিল। একসময় সম্রাট রেগে বলে উঠলেন, ‘তুমি কিন্তু এবারে বাজে বকছ’। সঙ্গে সঙ্গে আমি থেমে গিয়ে তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে ঘরের মধ্যে আমার বরাদ্দ জায়গায় চলেগেলাম। সেখান থেকেই আমি এই বাদানুবাদের প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত করে দূর থেকে তাকে তসলিম করলাম।
সেই দিন থেকে বিচারক শেখ আবদুল নবির ভাগ্যের পতন শুরু হল। (চলবে)