১৫৭৭ চাষীর বাড়ী রাত কাটানো
[আবুলফজলের আকবরনামার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রথম দিককার সংস্ককরণে এবং নিজামুদ্দিন আহমদের তবাকত-ই-আকবরিতেও উল্লেখ করা হয়েছে]
২৮ ডিসেম্বরে ১৫৭৭, মহামহিম সম্রাট আকবর পালামের কাছে লালনা গ্রামে শিকার করতে গিয়ে রাত কাটালেন গ্রামের মুখিয়া, ভুরার বাড়িতে। পরের দিন সকালে শিকারে বেরোবার আগে বলে যান মুখিয়া যতটুকু জমি ব্যবহার করছেন, সেটাকে একটা ফরমান বলে দানে রূপান্তরিত করতে। এই ফরমানটা সংবাদ লেখক, আখবারনবিশকেই লিখতে হবে।
১৫৭৮ ভূদান নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ করলেন
[আকবরের সময়ের ইতিহাস আকবরনামার লেখক সৈয়দ ইলাহদাদ ফৈজী শিরহিন্দিকে ৭০০ বিঘা জমি দান হিসেবে সম্রাট দিয়েছিলেন। এই অংশটা আমি শিরিন মুসভি থেকে নিয়েছি]
মহামহিন যখন শিরহন্দের কাছাকাছি পৌঁছে শিকারে জুটে গেলেন। তিনি এই ঘটনার ইতিহাসকারকে দান দেওয়া বাড়ির পাশ দিয়েই গিয়েছেন। গ্রামের কাছে ছায়া দেওয়া সব ধরণের গাছপালা ঘেরা জলভর্তি একটি বিশাল পুকুর দেখে সম্রাট এগিয়ে গেলেন। সেই ছয়াঘেরা সুশীতল পুকুরপাড়ের চারপাশটা সম্রাট হেঁটে ঘুরছিলেন। সম্রাটের আগমনের সংবাদ পেয়ে শশব্যস্ত হয়ে গ্রামের মুখিয়া অভিবাদন জানাতে এসে প্রচুর উপহার পেলেন। সম্রাট মুখিয়াকে প্রশ্ন করলেন এই বাগান, এই পুকুর, এই গাছপালার, এই সুন্দর জমিনটার মালিক কে? গ্রামের মণ্ডল উত্তর দিল, ‘জ্ঞানী মুল্লা আলি শের এই বাগানটা তৈরি করেছিলেন’। তিনি শেখ আবদুল নবির নবির ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলেন। [এলাকা ছেড়ে] চলে যাওয়ার আগে তিনি বললেন, ‘তোমার কথার চলন থেকে পরিষ্কার, গ্রামটি এমন এক মহান মানুষকে দেওয়া হয়েছে, যিনি এখন আর এই বিশ্বে নেই। এখন গ্রামের অবস্থাটা বল – কত চাষের জমি আছে এবং এর মালিক কে?’ মণ্ডল সম্রাটকে বললেন, ‘মহামহিম, এখানে ১০০০ বিঘা জমিতে চাষ হয়। তার পুত্র এখন এই জমির মালিক। মহামহিম বললেন, ‘তুমি আমায় বললে তার বাবা একজন মুল্লা ছিলেন। এখন তার অবস্থা কী? কে তাকে এই জমিটা দিয়েছে?’ ‘লোকে বলে ব্যাটাটি বাবার মত হয়েছে, সদর থেকে জমিটা তাকে দেওয়া হয়েছে’।
মহামহিম শাহী শিবিরে পৌঁছে বাহিনীর কাজি কাজি জালালুদ্দিনকে ডেকে বললেন, ‘আপনি কী মুল্লা আলি শের শিরহিন্দি আর তার পুত্রকে চেনেন’? কাজী উত্তর দিলেন, আমি শুনেছি তিনি খুবই দক্ষ মানুষ এবং এই অঞ্চলের মুল্লা হিসেবে কাজ করেন। আমি তার পুত্রের সঙ্গে আলাপ করি নি, কিন্তু শুনেছি সেও [এই কাজে] সমান দক্ষ’। ইতিমধ্যে হাজি ইব্রাহিম শিরহিন্দি এসে মহামহিমকে সিজদা করলেন। মহামহিম বললেন, ‘আমাদের পায়ের ধুলোর দিব্যি, এক শহরে বাস করার নৈকট্য বাদ দিলেও তুমি সত্য বয়ান করবে! মুল্লা আলি শিরহিন্দি মানুষটা কেমন আর তার পুত্রের দক্ষতাই বা কেমন? এবং তাদের কতটা জমি দেওয়া দরকার?’ সে বলল, ‘তার বাবা সত্যিকারের একজন মুল্লা, এবং তার পুত্র খুব বেশি হলে ছ’শ বা সাত’শ বিঘা জমি দান পাওয়ার যোগ্য’। মহামহিম উত্তর করলেন, ‘এতটা জমি তাদের আছেই’।
১৫৭৯ খুতবা
[সম্রাট আকবর মুসলমান বিশ্বের আইনি খালিফা হওয়ার দাবিতে খুতবা পড়লেন। সে সময়ে তুর্কি সুলতানের সঙ্গে মুঘলদের বিবাদ চলছিল [প্রেক্ষিতটি বুঝতে পূর্বের মুঘল-উসমানিয় বিবাদ সংক্রান্ত বিভাগটি নতুন করে ঝালিয়ে নিতে পারেন। বিষয়টা আকবরের তীব্র সমালোচক কবি, ধর্মতাত্ত্বিক বাদাউনি তিক্ত ভাষায় মুন্তাখাবুলতাওয়ারিখে উল্লেখ করেছেন]
মুসলমান বিশ্বের জনগণের ঐহিক এবং পারমার্থিক খলিফা হওয়ার উৎসাহে সম্রাট জানলেন মহান নবি, পূণ্যবান খলিফা ছাড়াও আমীর তিমুর সাহেবকিরন এবং মির্জা উলুঘ বেগ গুরগান নিজেরা শুক্রবারে খুতবা পড়তেন। সম্রাট আকবর স্বয়ং তাদের অনুকরণে এই কাজে লিপ্ত হবার কথা চিন্তা করলেন। কিন্তু বাস্তবে তার উদ্দেশ্য সাধিত হল না – সাধারণ মানুষ সম্রাটের এই উদ্যোগকে ইজতিহাদ বা ধর্মীয় আবিষ্কার হিসেবে গণ্য করল। ১১ জুলাই ১৫৭০-এ প্রথম জুমাদায় ফতেপুরের প্রধান মসজিদ থেকে তিনি খুতবা পড়া শুরু করলেন। কিন্তু শুরু থেকেই সম্রাট তোতলাচ্ছিলেন। বার বার আটকে যাচ্ছিলেন। তিনি অন্যের সাহায্যে শেখ ফৈজির লেখা তিনটে শ্লোক পড়তে পারলেন মাত্র। তারপর তড়িৎ গতিতে পালপিট থেকে নেমে এসে ইমামের খুতবা পড়ার কাজটি হাফিজ মহম্মদ আমিনকে অর্পণ করলেন।
যিনি সর্বশক্তিমান আমাদের সার্বভৌমত্ব দান করেছেন,
যিনি আমাদের জ্ঞানী হৃদয়, শালপ্রাংশু বাহু দিয়েছেন,
যিনি আমাদের সাম্য এবং বিচার প্রদান করার দিকে প্রণোদিত করেন,
আমাদের চিন্তায় সাম্য প্রথিত করেন,
তাঁকে ব্যাখ্যা করা যে কোনও চিন্তার অতীত
মহিমান্বিত তিনি, আল্লাহু আকবর।
ফারসি ইতিহাসের বেশ কিছু সূত্র আমাদের বুঝতে সাহায্য করে সুলতান/সম্রাটেরা শরিয়তের নিয়মকানুন নামে মাত্র জানতেন এবং রাষ্ট্রের কাজে সেগুলোকে খুব বেশি প্রয়োগ করেন নি। তাদের পক্ষে সেগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। তাই সাম্রাজ্য শাসন হত ‘জাহানদারির ভিত্তিতে — অর্থাৎ রাষ্ট্রপরিচালকের চিন্তা এবং বৈষয়িক জ্ঞানের ভিত্তিতে। তত্বগত এই উভয়সঙ্কটের অবস্থানকে কাটিয়ে ওঠার উদ্যম নেওয়া হল সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) সময়ে।
সম্রাট আকবরের রাজত্বে প্রায় ৩৫ বছরের কিছু কম সময়ের ব্যবধানের দুটি মুদ্রায় খোদাই করা বক্তব্যের পার্থক্য নজরকাড়া। প্রথম মুদ্রাটি ১৫৬৮-৬৯-এর; উতকীর্ণ আছে ‘লা ইলাহা ইল্লা আল্লা/মহম্মদ রসুল আল্লা’; অর্থাত no god but God, Muhammad is the messenger of God তারপরে খলিফার নাম। দ্বিতীয় মুদ্রা ১৬০২-এর — প্রয়াণের ৩ বছর পূর্বের। এতে লেখা ‘আল্লাহু আকবর/জাল্লা জালালুহু’ অর্থাৎ God is most great, glorified be his glory। এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৫৭৯-এ শেখ মুবারক একটি নথি খসড়া করেন। এতে উলেমা স্বাক্ষর করেন। এই নথিতে বলা হল আকবর পাদিশাইইসলাম এবং তার সময়ের মুজতাহিদ (ইসলামের ধার্মিক আইন ব্যাখ্যাকার)। তাঁকে শারিয়ার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেওয়া হল। সেই বছরেই তিনি খুতবা পড়ে উসমানীয় সুলতানকে ইসলামি জগতের এবং উপমহাদেশের মুসলমানেদের নেতা হিসেবে মানতে অস্বীকার করলেন। ‘আল্লাহু আকবর’ শব্দবন্ধটি উলেমা দ্বর্থকভাবে ব্যবহার করল। যদিও এর মানে ‘ঈশ্বর মহান/সর্বশক্তিমান’, কিন্তু এখানে ব্যাখ্যা হল, সম্রাট ‘আকবরই সর্বশক্তিমান’।
১৫৭৯ আকবর এবং শিল্পকলা
[আরিফ কান্দাহারি ১৫৭৯তে তারিখইআকবরি লেখা শেষ করেও ১৫৮১তে বেশ কিছু স্তবক নতুনকরে জুড়ছেন। দীর্ঘকাল মুঘল আমলাতন্ত্রে কাজ করার দরুণ তিনি আমলাতন্ত্রের কাঠামো, কাজের পদ্ধতি ইত্যাদিগুলি গভীরভাবে জানতেন, বুঝতেন। তিনি বইতে আকবরের বহু কৃতির সংক্ষিপ্তসার লিখেছেন। সেই সব স্তবক ছেনে শিরিন মুসভি আকবরের সময়ের স্থাপত্য, চিত্রকলা, বুনন বিষয়ে কিছু বাক্যাংশ তুলে এনেছেন।]
মহামহিম বিশাল বিশাল ইমারতি কাঠমো তৈরি করেছেন, তিনিই আবার বুনন বিদ্যার জ্ঞান কাজে লাগিয়ে অসামান্য উজ্জ্বল সব পরিধেয় তৈরি করছেন, আজমেঢ়ে বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেছেন, ফতেহাবাদে [ফতেপুরে] অসামান্য মহত্বে ভরপুর প্রাসাদ নির্ভর শহর বানিয়েছেন, রাজধানী আগরায় শুধুই লাল পাথরের তৈরি অসামান্য মজবুত লাল কেল্লা তৈরি করেছেন, শুধুই পোড়া ইট দিয়ে লাহোর শহরকে মাথাতুলে দাঁড় করিয়েছেন, তাছাড়া ভারতজোড়া অগণন শহরের মুঘল স্থাপত্যের বর্ণনা দেওয়া বাহুল্য। সাত আবহাওয়ার দেশে এইসব নয়াভিরাম স্থাপত্যের নতুন কাঠামো আঙ্গিক, স্থাপত্যের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজের তুলনা দেখা যায় না।
সূক্ষ্মতা কারুকার্যের ভাবনা মহামহিম সম্রাট রূপায়িত করেছিলেন পরিধেয়তে, সূচিশিল্পে, ঘরসজ্জার পর্দা-ঢাকনায়, রেশমের গালিচায় এবং জরিশিল্পে। তিনি প্রত্যেকটা কারিগরিতে এতই দক্ষ ছিলেন যে তার সময়ে মুঘল কারিগরির দক্ষতা এবং শিল্পরূপ ইওরোপ এবং পারস্যর শৈল্পিকগুণ ছাড়িয়ে চলেগিয়েছিল। তিনি এমন কিছু কাপড় আঙ্গিকের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, যা ইরানি ধর্মপ্রচারক শিল্পবেত্তা মানিকে রঙ আর কারিগরিতে মুগ্ধ করতে পারত।
উতকর্ষের প্রতি তার গভীর নিবেদনের ফলশ্রুতি আমীর হামজার ৩৬০টি গল্পের চিত্রাঙ্কন। প্রত্যেকটি গল্পের জন্যে আলাদা আলাদা ছবি আঁকার এবং একই সঙ্গে গল্পগুলি সুন্দর গদ্যে লেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই কাজে ১০০ জন অপ্রতিদ্বন্দ্বী চিত্রকর, গিল্ডার, লাইন আঁকিয়ে এবং বাঁধাইকরদের দল তৈরি করা হয়। প্রত্যেকে বই শেষ করার খুঁটিনাটি নিয়ে বছরের পর বছর মত্ত থাকত। বইটির আকার দেওয়া হল দেড় সেরি গজ (উচ্চতায়)। কাগজ রংকরা হল, প্রত্যেকটি কাগজে আঁকা পাতা একযোগে বাঁধাই করে পাতার পাড়ে ফুলেল ছবি জোড়া হল, দুটি পাতার মধ্যে একটা করে মসলিন কাপড় দেওয়া হল যাতে পাতাগুলি ভালভাবে বহুকাল টিকে থাকে। মহামহিমের নির্দেশ ছিল মিষ্টি কথার গল্প লেখককে প্রত্যেক গল্প ছন্দোবদ্ধ গদ্যে নতুন করে লিখতে হবে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অক্ষর লেখক সেই গদ্য বইতে লিপিবদ্ধ করবে। এতসব সত্ত্বেও এক একটা বই তৈরি করতে দুবছর সময় লেগেছে; আর প্রতিটি বইএর পিছনে ব্যয় হয়েছে দুলক্ষ তামার টঙ্কা। (চলবে)