১৫৪১ হামিদা বানুর সঙ্গে হুমায়ুনের বিবাহ
[ভূমিকার আলোচনায় বলেছি আকবরের নির্দেশে গুলবদন বানু বেগম ভাই সম্রাট মহম্মদ হুমায়ুনের স্মৃতিকথা হুমায়ুননামা লেখেন বাবা বাবরের অসামান্য চাঘতাইতে লিখিত স্মৃতিকথা আঙ্গিক অনুসরণে যাতে ইতিহাসলেখক সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক আবুলফজল মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস আকবরনামা লেখার মালমশলা জোগাড় করতে পারেন। গুলবদন বানু বেগম শাহজাদা হিন্দালের মায়ের পেটের বোন। মায়ের নাম দিলদার বেগম। ১৯৪১-এর গ্রীষ্মের শেষ সময় থেকে হুমায়ুন-হামিদা প্রেমপর্ব চলে। তিনি এই ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী। হুমায়ুন-হামিদার বিবাহ হয় বসন্তে সিন্ধে, শের শাহের কাছে রাজত্ব হারিয়ে পারস্যের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময়। গুলবদন বানু বেগমের বেভারিজের স্মৃতিকথার অনুবাদ বিষয়ে হিস্টোরিসাইজিং হারেম-এ রুবি লাল এবং এপিসোডস ইন দ্য লাইফ অব বাবরে শিরিন মুসভি স্পষ্টভাবে অনুবাদের ইনএকিউরেসি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই অংশটি আমি নিয়েছি শিরিন মুসভির অনুবাদ থেকে]
ইতিমধ্যে মহামহিম সম্রাট হুমায়ুনের ছোট সৎ ভাই মির্জা হিন্দাল [অর্থাৎ ভারতজয়ী], সিন্ধু পার হলেন, যাতে সাধারণ মানুষ মনে করে তিনি কান্দাহারের দিকে রওনা হয়ে যাচ্ছেন। সংবাদটি শোনার পরে মহামহিম দূত পাঠিয়ে ভাইকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, তিনি শুনছেন যে হিন্দাল কান্দাহারের দিকে যাচ্ছেন, সে তথ্য সত্য কী না। হিন্দাল বার্তাবহকে উত্তর দিল ‘মহামহিমের কাছে ভুল তথ্য আছে’। পাঠানো সংবাদ শুনে মহামহিম মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। মির্জার বাড়ির সমস্ত মানুষ এবং উপস্থিত অন্যান্যরা মহামহিমের সঙ্গ নিলেন। সম্রাট, মা হামিদা বানু বেগমের পাশে একটি মেয়েকে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘[আপনার পাশে বসে থাকা] মেয়েটির পরিচয় কী?’ মা উত্তর দিলেন ‘ইনি মীর বাবা দোস্তের কন্যে’। [হামিদা বানুর ভাই] খোয়াজা মুয়াজ্জম মহামহিম সম্রাটের কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন। [তাকে লক্ষ্য করে] মা বললেন ‘এই বালকটি আমাদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত’ এবং হামিদা বানু বেগমের বিষয়েও একই কথা বললেন, ‘সেও আমাদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত’।
সে সব দিনে হামিদা বানু বেগম মির্জার শিবিরেই থাকতেন। পরের দিন আবারও মহামহিম আমার মা দিলদার বেগমের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তিনি মা’কে বললেন ‘মির্জা বাবা দোস্ত আমাদের গোত্রের মানুষ; আপনি যদি তার মেয়ের সঙ্গে আমার বিবাহের ব্যবস্থা করেন, তাহলে উপকার হয়’। মির্জা হিন্দাল অজুহাত দেওয়ার সুরে বললেন, ‘আমি কন্যাটিকে বোন বা মেয়ের মতই দেখি। মহামহিম আপনি সর্বেসর্বা; ধরুণ তিনি যদি যথোপযুক্ত রসদ বা দেনমোহরের ব্যবস্থা না করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আপনি কিছুটা বিরক্ত হতেই পারেন’। [বাতচিত তার বিপক্ষে যাওয়ায়] মহামহিম ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে গেলেন।
কিছু পরে আমাদের মা মহামহিমকে একটি চিঠি লিখে জানালেন যে মেয়েটির বিবাহ বিষয়ে আলোচনা চলছে; তার মা জানিয়েছে মেয়ের সোজাসাপটা কথা বলা অভ্যাস। অবাক হয়ে দেখলাম, ব্যতিক্রমীভাবে এই কটি মাত্র কথা শুনে মহামহিম উঠে চলেগেলেন। চিঠির উত্তরে মহামহিম লিখলেন, ‘ব্যাখ্যাটা আমি আনন্দিত চিত্তে গ্রহণ করলাম – যে ধরণেরই সোজাসাপটা কথা বলুক না কেন আমি সেটা মাথা আর মন দিয়ে শুনব। আর কন্যার দেনমোহর ইত্যাদি যে সব কথা আপনি লিখেছেন — সর্বশক্তিমান চাইলে সে সব জোগাড় হয়ে যাবে। আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম’। আমার মা মহামহিমের সমক্ষে গিয়ে তাকে [মেয়েটির বাড়ি থেকে] নিয়ে এলে সে দিন একটি আমন্ত্রণী ভোজসভা আয়োজন করা হল। এর পরে মহামহিম তার প্রাসাদে ফিরে যান। পরের দিন মহামহিম আমার মায়ের সামনে এসে বললেন তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে হামিদা বানুকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। মা তাঁকে ডেকে আনতে পাঠালে মেয়েটি না এসে বলেপাঠায় ‘তিনি আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জানানোয় আমি আগের দিনই তাঁর সঙ্গে দেখা করার সম্মান অর্জন করেছি। কিন্তু আমার আজকে [তার সকাশে] আসার যৌক্তিকতা কী’? মহামহিম সুভান কুলিকে মির্জা হিন্দালের কাছে পাঠালেন বেগমকে নিয়ে আসার জন্যে। মির্জা জানালেন, ‘আমি মেয়েটিকে যা বলার বলেছি, কিন্তু মেয়েটি আসতে ইচ্ছুক নয়। আপনি মেয়েটির কাছে গিয়ে বোঝান’। সুভান কুলি মেয়েটির কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে মেয়েটি বললে, ‘সম্রাট কোনও মেয়েকে একবার দেখতে চাওয়া আইনি খোয়াইশ, দ্বিতীয়বার তার সঙ্গে সাক্ষাৎকার করতে চাওয়া অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা করার তুল্য, তার সঙ্গে দেখা করা বেআইনি। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব না’। বেগমের বার্তা সুভান কুলি মহামহিমকে জানালেন, ‘সে যদি অচেনাই হয়ে থাকে (নামহরম), [তাহলে] আমি তাকে বিয়ে করে চিনব (মহরম)’।
চল্লিশ দিন ধরে নানাভাবে তাকে বোঝানো শোনানো এবং হামিদা বানুর পক্ষ থেকে খোশামদের চেষ্টা চলল, কিন্তু তার দিক থেকে সম্মতি মিলল না। শেষ পর্যন্ত আমার মা, দিলদার বানু বেগম তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, ‘তোমায় তো কাউকে না কাউকে পছন্দ করতে হবে, সব থেকে ভাল হয় রাজার পছন্দে যদি তুমি সম্মতি দাও’। বেগম সপাটে উত্তর দিলেন, ‘কিন্তু আমি তাকেই বিয়ে করব, যার জামার গলার কলার পর্যন্ত আমার হাত পৌঁছতে পারে, আমি এমন কাউকে বিয়ে করতে চাই না, আমরা সকলেই জানি যার জামার তলার ঘেরে আমার হাত পৌঁছবে না’। শেষ দিন পর্যন্ত আমার মা তাঁকে সতর্ক করে গিয়েছেন। চল্লিশ দিন পরে প্রথম জুমাদা ৯৪৮, ২৩ আগস্ট ২১ সেপ্টেম্বর ১৫৪১, পাতার নামক প্রাসাদে, দুপুরবেলায় মহামহিম এস্ট্রালোবটি এক হাতে ধরে শুভক্ষণ বেছে নিয়ে মীর আবদুল বাকাকে বিবাহের আচার আরম্ভ করতে বললেন। তিনি মীর আবদুল বাকাকে দুই লক্ষ টঙ্কা দিলেন দেনমোহর হিসেবে। বিবাহের পর তিনতে দিন সেখানে কাটিয়ে নৌকো করে, নববিবাহিতরা ভাক্ষারের দিকে চলে গেলেন।
১৫৪২ আকবরের জন্ম
[জৌহর আফতাবাচি [সম্রাটের বদনাবাহক], হুমায়ুনের ভৃত্য, আকবরের নির্দেশে ১৫৮৬-৮৭তে তাজকিরা-তুল-ওয়াকিতা বইতে তাঁর জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা হুমায়ুনের স্মৃতিকথা লিপিবদ্ধ করেছেন। জৌহর লিখছেন — হুমায়ুন যখন রাজত্ব হারিয়ে মারোয়াড় হয়ে পারস্যের দিকে পালিয়ে যাচ্ছেন, সে সময় রানা প্রসাদের বিশ্বস্ততায় ছেড়ে আসা স্ত্রী হামিদা বানু বেগমের প্রথম সন্তান আকবরের জন্ম সংবাদ পান। আকবরের জন্মবার্তা হুমায়ুনের সঙ্গে থাকা তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে একমাত্র জৌহরই প্রথম জেনেছেন। যদিও তিনি আকবরের জন্মতারিখ ১৪ অক্টোবর লিখছেন, কিন্তু গুলবদন বানু বেগমের লেখা আকবরের জন্মতারিখটি হল ১৫ অক্টোবর। ইতিহাস অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমান অনুসরণ করে গুলবদন বানু বেগমের উল্লিখিত তারিখটিকেই সম্রাট আকবরের জন্মদিন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শিরিন মুসভি স্পষ্টভাবে কর্ণেল স্টুয়ার্টকৃত ইংরেজি অনুবাদের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই অংশটি আমি নিয়েছি শিরিন মুসভির অনুবাদ থেকে।]
মহামহিম তখন একটি হ্রদের তীরে তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রামে আছেন। ভোরের নমাজের সময় অমরকোট থেকে দূত এসে রাজার পক্ষ থেকে সম্রাটকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন সর্বশক্তিমানের দয়ায় এ বিশ্বের অতিথি, মহামহিম, একটি পুত্র সন্তান লাভ করেছেন। পুত্র জন্মের সংবাদ পেয়ে মহামহিম যারপরনাই খুশি হলেন। শাহজাদা ১৪ তারিখে শনিবার রাতে ২৩ নভেম্বর ১৫৪২-এ জন্মালেন।
চৌদ্দতম [রাতের] চাঁদকে বলা হয় বদর। এইভাবেই শাহজাদা মহম্মদ আকবর, গাজি, বিশ্বের বিশ্বাসীদের পূর্ণচন্দ্র, দুই বিশ্বকে উজ্জ্বলতা দেওয়া বিশ্বে অবতরণ করলেন, বদরুদ্দিনের [পূর্ণিমার চাঁদ] সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর নাম রাখা হল জালালুদ্দিন, এবং সেই রাতে পূর্ণমার চাঁদের আলো ছাড়া অন্য কোনও আলো নেই; ফলে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় দুটি বিশ্বই অতি উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মহামহিমের উপাসনা শেষ হলে অভিজাতরা [এই সংবাদ শোনার পর] একে একে এসে তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে গেলেন। [সবাই চলে যাওয়ার পরে] মহামহিম আমায় বললেন, জৌহর আফতাবাচি, ‘আমি কী তোমার বকলমার সুরক্ষায় কিছু রেখেছিলাম?’ আমি উত্তর করলাম, ‘অবশ্যই মহামহিম’। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কী সম্পদ তোমার জিম্মায় আমি রেখেছিলাম?’। আমি সম্রাটকে উত্তর করলাম, ‘মহামহিম, দুশ শাহরুখি, একটা রূপোর দস্তানা আর এক দলা কস্তুরি। কিন্তু মহামহিম, আপনার নির্দেশে আমি সেই শাহরুখি আর রূপোর দস্তানাটি খাজাঞ্চিখানায় জমা করেছি’। মহামহিম উত্তর বললেন, ‘শাহরুখি আর হাত-দস্তানাটি আমি তোমায় উপহার হিসেবে দিয়েছি; তুমি কেন সেগুলি ফেরত দিলে?’ তখন মহামহিম উত্তর করলেন ‘কস্তুরির দলাটি আমার সামনে নিয়ে এসো’। আমি সেই বস্তুটি তার সামনে নিয়ে এলাম। মহামহিম একটি চৈনিক পেয়ালা আনার নির্দেশ দিয়ে কস্তুরির দলাটি খুললেন, অভিজাত আমীরদের ডাকিয়ে সেটি তাদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। তিনি উপস্থিত অভিজাত আমীরদের বললেন, ‘সর্বক্ষমতাধর আমাদের জন্যে একটি সন্তান জন্ম দিয়ে উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছেন’। উপস্থিত সকলে তাঁকে শুভেচ্ছা এবং আশিস জানাল। (চলবে)