লৌকিকতাবর্জিত যুবা সম্রাট
ক
[ব্যবসায়ী রফিউদ্দিন সিরাজি, পারস্য, ইরান থেকে মুঘল হিন্দুস্তানে আসেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে ১৫৫৯-৬০-এ। ১৫৬০-৬৪ অবদি তিনি আগরায় কাটান। আগরা শুধু যে মুঘল সাম্রাজ্যের তিন রাজধানীর প্রথম শহরই ছিল না, ছিল সে সময় দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠতম পাইকারি বাজারও। তিনি আগরা থেকে দক্ষিণে চলে যান। তাঁর তাজকিরাতুলমুলুক বইতে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সম্রাট আকবরের স্মৃতিচারণও করেছেন। এই পর্বের দ্বিতীয় অংশে দেখবেন মহিলারা ছোট সরাইখানা ভাটিয়ারি চালাচ্ছেন। সরকারিস্তরে তৈরি ]
তখন মহামহিম জালালুদ্দিন মহম্মদ আকবর স্বাভাবিক অটল সাহস এবং মহত্ব নিয়ে খিলাফত আর সার্বভৌমত্ব অবলম্বন করে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহন করেছেন। সিংহাসনে বসেও শিকার ক্রীড়ার প্রতি তাঁর অনবদ্য আকর্ষণ ছিল এবং বন্য জন্তুকে তিনি দীর্ঘ রাস্তা তাড়া করতেন। শিকারী কুকুর, শ্যেন, বাজ, চিতা, শাহী সদা শ্যেন শিকারী পশুকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। শাহী শিকারখানায় এধরণের বহু পশু লালিত পালিত হত। তাছাড়া শিকারের জন্যে মহামহিম হলুদ আর সবুজে মেশানো আলাদা পরিচয়সুলভ পরিধেয়ও বানিয়েছিলেন যাতে জঙ্গলে ক্যামোফ্লেজ করে থাকতে সুবিধে হয়। শিকার দলের সব সহকারী এবং ভৃত্যকেও একই পরিধেয় পরতে হত। মহামহিমের বন্দুকের আওতায় থাকা কোনও পশুর নিস্তার ছিল না। কখনও তিনি তীর ধনুক, কখনও তিনি মাস্কেট, কখনওবা তরোয়াল নিয়ে শিকার করতেন। কোনও কোনও সময় তিনি একাই শিকার করতে পশুর পিছনে তিন-চার ফারসাখ [ফারসাখ = ৪ মাইল] দূরত্ব অবদি চলে যেতেন। এই সময়ে তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল কেউ যেন তার পিছন না নেয়। এক দিন তিন চার ফারসাখ দূরত্বে হরিনের পিছন ধাওয়া করে চলে তাকে হত্যা করেন। শিকারে মৃত হরিণ ছেড়ে আসাকে অশুভ ইঙ্গিত মনে করে তার নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করে হরিনটিকে কাঁধে চাপিয়ে আর অন্য হাতে শেকলে বাঁধা চিতাকে হাঁটিয়ে নিয়ে ফিরলেন।
একবার একটি শিকারকে তাড়া করতে করতে তিনি বিদ্রোহীদের গ্রামে উপস্থিত হলেন। ক্রুর তারা তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন ‘খানইখানানের [বৈরাম খাঁ] আমলা’। দুষ্টুমি করে তারা মহামহিমকে গরুর খুঁটিতে বেঁধে রাখল। মহামহিমের ঠিক সময় না ফেরায় শিকার শিবিরে মানুষজন উদ্বিগ্ন হয়ে সেনা বাহিনী নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে তাকে সেইভাবে আবিষ্কার করে উদ্ধার করল, গ্রামের মানুষকে গ্রেফতার করল। মহামহিমের সঙ্গে এই রকম ঘটনা দুতিনবার ঘটেছে।
আরেকদিন শিকারের পিছনে ছুটতে ছুটতে তিনি ক্ষুধায় জলতেষ্টায় এক ভাটিয়ারির, মহিলা সরাইমালিকের বাড়ি আশ্রয় নিয়ে ক্ষুধানিবৃত্তি করলেন এবং বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সম্রাট আকবরের সময় প্রত্যেক এক বা অর্ধেক ফারসাখে [ফারসাখ = ৪ মাইল] অবস্থিত সরাইখানার মাঝে মহিলা ভাটিয়ারি থাকতেন। সরাইখানা ছেড়ে আসা বণিক/মুসাফিরদের যদি তেষ্টা বা ক্ষুধানিবৃত্তি করতে হত, তারা সাময়িকভাবে ভাটিয়ারির বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তাঁকে খাদ্য তৈরির রসদ দিতেন, ভাটিয়ারি তাদের আস্বাদমত রেঁধে দিতেন; এর বদলে ভাটিয়ারি তার শ্রমের মূল্য নিতেন। বিশ্রামের জন্যেও ভাটিয়ারিকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হত।
শিকার খেলায় ক্লান্ত, কপর্দকহীন মহামহিম সম্রাট যখন ভাটিয়ারির বাড়িতে ক্ষুধানিবৃত্তি করে শ্রম অপনোদন করছেন সেই সময় একদল বণিক সেখান এল। তারা উস্কোখুস্কো কপর্দকহীন সম্রাটকে দেখে তাদের সম্মান সালাম জানাতে নির্দেশ দেয়। মহামহিম তাদের পাত্তা না দেওয়ায় তারা তাকে কয়েক ঘা চাবুক মারে এবং তাকে সেখান থেকে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। একা পড়ে যাওয়ায় মহামহিম, বণিকদের আক্রমনের অবস্থা অনুকূল নয় বুঝে ভাটিয়ারি থেকে চলে যান। ইতিমধ্যে গণ্ডগোল শুনে ভাটিয়ারি এসে বণিকদের মহামহিমের পরিচয় দিয়ে বললেন, কেন তিনি ভাটিয়ারিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বণিকেরা নিজেদের ঘৃণ্য কাজের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে গেল।
খ
[ব্যবসায়ী রফিউদ্দিন শিরাজি, তাজকিরাতুলমুলুক বই থেকে আরেকটি ঘটনা। ১৫৬২-৬৩তে শাহ তামস্পের দূত সৈয়দ বেগ আগরায় দৌত্য কার্যে আসেন। সে সময় রফিউদ্দিন শিরাজি আগরায় এই ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনাটি নিয়েছি ইকতিদার আলম খানের স্টাডিজ ইন হিস্টোরি, খণ্ড ২, নম্বর ১ থেকে]
বইটির লেখক ব্যবসার উদ্দেশ্যে গুজরাট থেকে আগরা আসেন। এখানে তিনি ব্যবসা করতেন। আশা ছিল আমার কোনও দিন নিশ্চই এই অঞ্চলের সম্রাটের সঙ্গে দেখা হবে। শুনলাম পারস্যের শাহ তসামস্পের ডান হাত, মাসুম বেগের সন্তান সৈয়দ বেগ তখন আগরায় আশ্রয় নিয়েছেন সুলতানের দূত হিসেবে। তাঁকে অভ্যর্থনার জন্যে শাহী বাগানে একটি বিশাল শাহী তাঁবু এবং বড় শিবির ফেলা হয়েছে। সেই তট ক্ষেত্র মনমোহনভাবে সাজানো হয়েছে। অভিজাতরাও সেখানে তাদের মত করে শাহী নিয়ম মেনে তাঁবু খাটিয়েছেন। শহরের মানুষেরা সেই সব সাজানোগোজানোর পরিবেশ দেখতে মাঝেমধ্যেই বাগানে ঘুরতে যেতেন। আমারও মনে হল আমারও একদিন সেখানে যাওয়া দরকার, আমিও সেই সাজসজ্জা ঔজ্জ্বল্য দেখব। একদিন আমিও ভিড়ে দাঁড়িয়ে সেই সব সাজসজ্জা দেখছি, হঠাত শুনলাম সমবেত উচ্ছ্বাস ‘বাদশা সালামত, সর্বশক্তিমান বাদশাকে রক্ষা করুন’। বুঝলাম, সৌভাগ্যবশত সেখানে বাদশা উপস্থিত হয়েছেন। আমার ভাগ্যকে আমি দাদা দিলাম। আমি আমার ডানে বাঁয়ে দেখলাম, মনে হল না একজনও শাহী পরিবারের/সংযোগের মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন, কারোরই চেহারায় শাহী চিহ্ন বা ছাপ নেই। হঠাত পিছনে ফিরে দেখলাম অদূরেই বিশ বছরের এক যুবা কোনও একজন সাথীর কাঁধে হাত রেখে লম্বা হয়ে একটু টেরে দাঁড়িয়ে আছে। আন্দাজ করলাম, তিনিই শাহ আকবর হবেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ দিয়ে যে সব প্রজা দাঁড়িয়ে আছেন, তারা কেউই তাঁকে সম্মানজনক সালাম দিচ্ছেন না। আমি একটু দূর সরে গিয়ে কী ধরণের ঘটনাবলী ঘটে বুঝতে চাইছিলাম। ঘটনাক্রমে অবাক হয়ে পাশের মানুষদের প্রশ্ন করলাম, দরবারেও কী সম্রাটকে সম্মান জানানোর কোনও প্রথা নেই যার মাধ্যমে উপস্থিত প্রজারা সম্রাটকে সালাম জানাতে পারেন। তারা বলল, ‘অন্যান্য শাসকের তুলনায় এই সম্রাটের দরবারে খুবই বিশদে এবং কঠোরভাবে সম্মান জানানোর প্রথা পালন করানো হয়; কিন্তু সম্রাট মাঝেমধ্যেই দরবারের বাইরে বেরিয়ে এসে দরবারি অনেক প্রথা ভাঙতে ভালবাসেন, এবং অনানুষ্ঠানিকও হতে চান। অনেক সময় তিনি সাধারণ মানুষের পোষাকে সাথীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে অপরিচিত আর পরিচিতের বেড়া ভেঙে দেন। এইরকম অবস্থায় তাঁকে কীভাবে তসলিম জানানো হবে?’ একবার আমি তাকে তাঁর প্রাসাদের ছাদ থেকে খালিগায়ে, খালি মাথায় লুঙ্গি জড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াতে দেখেছিলাম। সেদিন থেকে আমার মনে হয় মহামহিম অনেক বেশি খোলামেলা মনের এবং অপ্রাতিষ্ঠানিকও বটে। (চলবে)