১৫৬৩ আকবর লুঙ্গি পরে হিন্দিতে গাণ্ডু গালি দিলেন
‘গাণ্ডু! বাচ্চাইলাদা [লউন্ডেকে বাচ্চে, খানকিরবাচ্চা] তুই কেন আমার আতকাকে খুন করলি?
[আকবর তখন বেশ কয়েক বছর সিংহাসনে কাটিয়েছেন। সিংহাসনে তাঁর বজ্রমুষ্ঠি ক্রমশঃ কঠোর হচ্ছে। তার ওপর থেকে বাবার প্রিয় আমলা, বহু যুদ্ধের নায়ক, আকবরের আতলিক [শিক্ষক, পথ প্রদর্শক] বৈরাম খানের দীর্ঘ ছায়া সরেগেছে। আকবরের রাজত্বে বৈরাম খান ছিলেন মুকুটহীন বাদশা। বৈরামই যেহেতু আকবরকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করেছিলেন, সেই অধিকারে তিনি বকলমে আকবরকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আকবর বৈরাম খানের বিধবা স্ত্রী সালিমা সুলতানা বেগমকে বিবাহ করে তার পুত্র আবদুল রহিম [পরে বাবার মতই খানইখানান হবেন] তাঁকে দত্তক নিয়ে ক্ষমতাধর বৈরাম খান গোষ্ঠীকে সদর্থক বার্তা পাঠিয়েছেন। বৈরাম খান দিলের মতই আরেক ক্ষমতা কেন্দ্র ছিলেন মাহাম আঙ্গা। এরা দুই দল পরস্পর স্বার্থ বিরোধী। এই রকম যে সব দল, গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠী শিশু আকবরকে সিংহাসনে বসিয়ে ক্ষমতার মৌতাত উপভোগ করছিল, তাঁদের নেতৃত্বকে ক্রমশ হয় ধরাধাম থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজ, না হয় ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কাজ সফলভাবে সম্পাদন করছিলেন বালক থেকে যুবক হওয়ার পরে যাত্রা করা আকবর। তাঁর এই পরিকল্পনায় কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি এলেন, কেউ ক্ষমতা থেকে দূরে গেলেন। আগরায় এই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ লাগল। আমরা এর আগে দেখেছি কীভাবে শামসুদ্দিন আতকা খান ১৫৬১-তে মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ মন্ত্রীপদে বৃত হলেন। তার পদোন্নতিতে দরবারি অভিজাত এবং খানজাদাদের একাংশ অখুশি হয়। আকবরের কাছে গুরুত্ব হারানো, বেশ কিছু পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া, ইত্যাদি মাহমকে বিপর্যস্ত করেছিল। তার পক্ষ থেকে আতকাকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলতে থাকে। এরই প্রতিক্রিয়ায় দরবারইআমওখাসে ১৫৬৩-তে দিনে দুপুরে আতকার হত্যাকাণ্ড ঘটে। এই হত্যাকাণ্ড মাহামের ইঙ্গিতে হয়েছিল, না কী তার পক্ষীয় লোকজন মাথা গরম করে হঠাতই ঘটিয়ে ফেলেছিল, সেটা আজও পরিষ্কার নয়। চিৎকার, গোলযোগ শুনে সম্রাট আকবর তার শোয়ার ঘর থেকে লুঙ্গিপরা অবস্থায় বেরিয়ে এসে দাইমা, সৎমা মাহম আঙ্গা পুত্র আজম খানকে অকুস্থলেই হত্যা করার নির্দেশ দেন। আজম খান মারা যাওয়ার ৪০ দিন পরে প্রাণাধিক পুত্রের মৃত্যুর আঘাত সই না পেরে আজম খানের মা মারা যান। আকবর সিংহাসনে আরোহণের এক দশকের মধ্যেই দুই শিবিরকে নখদন্থীন করে দেন।
আতকা খানের বিরোধী শিবরের অন্যতম অভিজাত মুনিম খানের সহযোগী বায়াজিদ বয়াত আমাদের এই ইন্টারেস্টিং গল্পটি শুনিয়েছেন। এই অংশটি বায়াজিদের তাজকিরাত-ই-হুমায়ুন ও আকবর বই থেকে নেওয়া।]
এই বছর আতকা খান [শামসুদ্দিন, আকবরের আতকা বা সতপিতা] এবং আজম খান কোকার [মাহাম আঙ্গা, আকবরের কোকা বা সৎভাই] মধ্যে নানান রকমের ভুলবোঝাবুঝি, স্বার্থদ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে ঝগড়ায় পরিণত হয়। দ্বন্দ্ব তুমুল আকার ধারণ করলে ১৬ মে ১৫৬২ আজম খান কোকার ভৃত্য খসম এবং আলিবর্দি দেওয়ানি আমের বিশাল কক্ষে প্রকাশ্য দিবালোকে বসে থাকা আতকাকে খোলা তরোয়াল নিয়ে এসে দল বেঁধে হত্যা করে। মহামহিম তখন প্রাসাদে ছিলেন। দূরে গোলযোগ শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ তরোয়াল হাতে নিয়ে, কোমরে লুঙ্গি জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে [দেওয়ানিখাসে] এলেন। ঘটনায় উপস্থিত বিহ্বল কর্মীদের তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এটা কার মৃতদেহ?’ সম্রাট বাবরের বোন খানজাদা বেগমের বংশানুক্রমিক ভৃত্য চার-মনসবদার পদাধিকারী রফিক জানাল ‘সম্মানিত মহামহিম, আপনার আতকার দেহ। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন ‘কে খুন করল?’ সে উত্তর দিল, ‘আজম খান’। তখন আজম খান সিঁড়ির তলার ধাপে ছিল, সম্রাটকে তার প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে সেও সিঁড়ি বেয়ে সম্রাটের দিকে উঠে আসতে থাকে। হিন্দুস্তানি লব্জে মহামহিম চিৎকার করে উঠলেন, ‘গাণ্ডু! বাচ্চাইলাদা [লউন্ডেকে বাচ্চে, খানকিরবাচ্চা] তুই কেন আমার আতকাকে খুন করলি?’ [এটা আবুলফজলের ভারসান। উল্টোদিকে প্রত্যক্ষ্যদর্শী বায়াজিদ বিয়াত লিখছেন ‘আহ গান্ডু, চারা আতকা মারা কাস্তি — ওরে গান্ডু, আমার আতগাকে তুই কেন খুন করলি] সে উত্তর দিল, ‘সে রাজদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক’। মহামহিম তার শালপ্রাংশু হাত বাড়িয়ে আজম খানের চুলের গোছা ধরে কপালে এত জোরে মারলেন যে সে আর কথা বলার অবস্থায় থাকল না, অজ্ঞান হয়ে নিস্তেজ হয়ে নেতিয়ে গেল। মহামহিম সম্রাট সিঁড়ির ওপর থেকে তাকে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। মেথর শুখাই, যাকে মহামহিম হুমায়ুন লাহোরে রাজধানী থাকাকালীন ফরহদ খান উপাধিতে সম্মানিত করেছিলেন, তিনি কাছে ছিলেন। তিনি এবং আরও কিছু জন মিলে আজম খানের মাথা নিচু করে নিচে ফেলে দিলেন যাতে মাথা ফেটে সে মারা যায়। কিন্তু তারপরেও সে মারা যায় নি, বেঁচেছিল। সম্রাট আবার নির্দেশ দিলেন তাকে তুলে এনে আবারও ফেলে দিতে। দ্বিতীয়বার তার নির্দেশ পালনের পরে দেখাগেল কোকার মৃত্যু ঘটেছে।
প্রাসাদের মানুষেরা ঘটনা প্রবাহের প্রাবল্যে এবং সম্রাটের রুদ্রমূর্তি দেখে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। মহামহিম মাহম বেগের [মাহম আঙ্গা] ঘরে গেলেন এবং বললেন ‘মাম্মা, আজমকে মেরে ফেললাম’। আঙ্গা সম্রাটের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করে বললেন, ‘হে মহামহিম, আপনি ঠিক কাজই করেছেন। আমি এবং আমার অন্যান্য পুত্র আপনার হাওয়ালে/নিরাপত্তায় থাকলাম। সে দুষ্কর্ম করেছে। আপনি বিচার দিয়েছেন; সে তার শাস্তি পেয়েছে’।
১৫৬৩ কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের দিকে
[আকবরের রাজত্বের ৭তম বছরের (১৫৬২-৬৩) ঘটনা। হামিদা বানুর সৎ ভাই খাজা মুয়াজ্জম আকবরের মামা। স্ত্রীকে হত্যা করার জন্যে [যদিও বহু বইতে অভিজাত মহিলা বলা হয়েছে, কিন্তু বায়াজিদের বয়ানে সত্য পরিষ্কার হল] তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আবুলফজল পরের দিকের সময়ে মন্তব্য করেছেন, আতকার গুষ্টিকে নির্বংশ করে দেওয়া আকবরের অন্যতম প্রশাসনিক পরিকল্পনা ছিল। এই অংশটাও বায়াজিদ বায়াতের তাজকিরাইহুমায়ুনওআকবর বই থেকে নেওয়া।]
একদিন মহামহিম মুনিমখান-ই-খানখানকে প্রশ্ন করলেন ‘আমার শাহী সরকার সম্বন্ধে জনগণের ধারণা কী?’ খানইখানান উত্তর দিলেন, ‘হে সম্রাট, আপনি ১২০ বছর আয়ুলাভ করুন। যে দিন আপনি আতকাকে হত্যার দণ্ডস্বরূপ আজম খানকে হত্যা করিয়েছেন, বিবি ফতিমার কন্যাকে হত্যার জন্যে মুয়াজ্জমকে হত্যা করান, জনগণ আপনার প্রশংসায় মুখর হয়েছে; আপনার এই কাজগুলি যথাযথ বিচার দেওয়ার নিদর্শন’। মহামহিম খানইখানানকে বললেন, ‘আমরা এর থেকে আরও ভাল ভাল কাজ করেছি; আশ্চর্যের হল জনগণ এসব নিয়ে রা কাড়ে না। তুমিও সে সবের কথা উল্লেখ করলে না, কারন সে সবে কেউ না কেউ মনঃক্ষুণ্ন হবে’। খানইখানান বললেন, ‘সে সব কোন ঘটনা, হে মহামহিম, আমার জানা সে সব কোন ঘটনা, যেগুলো বললে কারোর মনঃকষ্টের কারন হবে’? সম্রাট বললেন, ‘এগুলোর থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ছিল, আমি আতকা খানের পরিবার/গুষ্টিকে লাহোর থেকে বার করে এনে হিন্দুস্তানের নানান প্রান্তে জায়গির দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতেপেরেছি’। এই বাক্য থেকে আমাদের মহান সম্রাটের বিচার দেওয়ার ধারণা এবং প্রশাসনিক যোগ্যতার একটা ঝাঁকি খুঁজে পাই। (চলবে)