১৫৬৪ একটি কেলেঙ্কারি এবং হত্যার চেষ্টা
[১৫৬৪ বছরটাতে সম্রাট আকবর দিল্লিতে কাটান। আবুলফজলের আকবরনামা সূত্রে জানতে পারছি, সেই বছরের শেষের দিকে তাঁর প্রাণ নেওয়ার একটা ব্যর্থ চেষ্টা হয়। পলাতক বিদ্রোহী শারাফুদ্দিন হুসেইনের এক হাবসি দাসের পক্ষ থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছোঁড়া তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গভীরভাবে সম্রাট আকবরের বাহুতে গেঁথে যায়; যদিও আকবরের তীব্র সমালোচক আবদুল কাদির বাদাউনি এই আঘাতকে সামান্য উল্লেখ করে ঘটনার পিছনে দিল্লির এক কলঙ্কজনক ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন শারাফুদ্দিনের সঙ্গে আরেক অভিযুক্ত শেখ ওয়াসি হত্যার চক্রান্তে ছিলেন। এই ঘটনার পরে শারাফুদ্দিনও গুজরাট হয়ে বিদরে পালিয়ে যান। ওয়েসি আগে থেকেই বিদরে ছিলেন।
মাথায় রাখা দরকার, আমরা আগেই বলেছি ঐতিহাসিক বাদাউনি তার ইতিহাসে সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্য পরিচালনার পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা এতই তীব্র ছিল যে সম্রাটের জীবিতাবস্থায় বাদাউনি সেই ইতিহাসের অনেকগুলোই প্রকাশ করার সাহস পান নি; কিছু রচনা সম্রাট আকবর মারা যাওয়ার পরে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ ছিল আকবরের রাজত্বের প্রথম সময়ে রচিত বাদাউনি তার ইতিহাসে ঐতিহাসিক ঘটনার বদলে ব্যক্তিগত ভাললাগা না লাগার বিষয়কে জোর দিতেন। বাদাউনি যখন ইতিহাসের গল্প লিখেছেন সে সময় তারিখইআলফিতে বাদাউনির লিখিত নির্দিষ্ট একটি অংশ পড়ে অসন্তুষ্ট আকবর তাঁকে নতুন করে তথ্য যাচাই করে লেখার নির্দেশ দিলেন। ঘটনার এই অংশটার মূল বক্তব্য বাদাউনির মুন্তাখাব-উল-তাওয়ারিখ থেকে নেওয়া]
ততদিনে সম্রাট আকবরের দুই ক্ষমতাধর প্রতিদ্বন্দ্বী বৈরাম খান এবং মহাম আঙ্গা ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন। আকবর নিজের অবস্থান জোরদার করতে সে বছর দিল্লি থাকাকালীন বিভিন্ন অভিজাত পরিবারের মধ্যে বিবাহ দেওয়ার উদ্যম শুরু করেন। তিনি মুখমিষ্টি ঘটক আর খোজাদের অভিজাত পরিবারের অন্দরমহলে পাঠাতেন সুন্দরী আকর্ষণীয় কুমারী কন্যা খুঁজে বের করে তাদের বিষয়ে নানান তথ্য জোগাড় করতে। আগরার দুই ধর্মগুরু শেখ বুধ এবং শেখ লাড়ার পরামর্শেই ঘটনার সূত্রপাত। শেখ বুধের বিধবা বৌমা, কুচক্রী, লাস্যময়ী ফতিমা আজম খানের বড় ভাই বাকি খানের বাড়ির কাছাকাছি থাকতেন। দুজনের মধ্যে কিছু দিন অবৈধ সম্পর্ক চলার পর তাদের বিবাহ দেওয়া হয়। ফতিমা-বাকির প্রাসাদেই শেখ বুধের আরেক অতুলনীয়া পরমা সুন্দরী কন্যা তার স্বামী আবদুল ওয়াসি বাস করতেন। সম্রাটের লালসাভরা দৃষ্টি সুন্দরীর ওপর পড়ল। তিনি শেখের পরিবারে বিবাহ প্রস্তাব পাঠালেন।
মুঘল সম্রাটদের নীতি ছিল, সাম্রাজ্যের কোনও মহিলাকে যদি সম্রাটের পছন্দ হয়, তাহলে তার স্বামীকে বাধ্যতামূলক বিবাহ বিচ্ছেদ করে স্ত্রীকে বন্ধনমুক্ত করতে হবে। এই বিষয়টা লেখা আছে সুলতান আবু সৈয়দ, আমীর চোবান সবং তার পুত্র দামাস্ক খোজার বইতে। ওয়াসি স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দক্ষিণের শহরে বিদরে চলে যান এবং ক্রমশ দৃষ্টি শক্তি হারাতে থাকেন। ইতিমধ্যে আকবরের চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে মহিলা শাহী হারেমে প্রবেশ করেছেন। শ্বশুরের প্ররোচনায় লাস্যময়ী ফতিমা সম্রাটকে আবেদন করে বলেন, তিনি আগরা আর দিল্লির অন্যান্য অভিজাত পরিবারের কন্যার সঙ্গে বিবাহ সম্পর্ক করুন, তাহলে পক্ষপাতিত্ব না করে সব পরিবারের সদস্যকে সাম্রাট একই দৃষ্টিতে দেখতে পারবেন।
একদিন শিকার করে ফেরার সময় সম্রাটের বাহিনী মাহাম আঙ্গা প্রতিষ্ঠিত মসজিদ মক্তব খৈরুল মসজিদ এলাকা পার হচ্ছেন, সম্রাটের সঙ্গে বিবাদে বিদ্রোহী পলাতক মির্জা শারাফুদ্দিন হুসেইনের পক্ষ থেকে মুক্তি দিয়ে যাওয়া এক পারিবারিক হাবসি দাস ফৌলাদ সম্রাটকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ে। সৌভাগ্যের কথা সেটি সম্রাটের হাতের চামড়াও ভেদ করতে পারে নি। অভিজাতরা এই ঘটনার তদন্ত করতে চাইলে সম্রাট অস্বীকার করে বালকটিকে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে দিল্লির কেল্লায় ঢুকে চিকিতসকেদের চিকিৎসা নিয়ে সিংহাসনে চেপে আগরার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
১৫৭২ চিতার পুরষ্কার
[১৫৭২এ গুজরাটে প্রথম অভিযানের সময় জুলাই মাসে রাজস্থানের অম্বরের দক্ষিণে সাঙ্গানেরে শিকারের জন্যে থামেন। এটা নেওয়া হয়েছে আকবরনামার দ্বিতীয় খণ্ড থেকে]
এই সময় তিনি শিকারে অধিকাংশ সময় চিতা ব্যবহার করতেন। চিতাকে বড় শিকার দলের সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে তিনি বিশেষ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শিকারে বেরোলেন। ইতিমধ্যে চিৎকার উঠল একটি হরিণের পিছনে চিতরঞ্জন চিতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ দেখা গেল তাদের সামনে ২৫ গজের একটি দীর্ঘ গিরিখাত। দৌড়তে দৌড়তে হরিণটি জ্যা মুক্ত তীরের মত লাফ দিয়ে গিরিখাত পেরিয়ে গেল। চিতাটাও একই দক্ষতায় হরিণের পিছু পিছু মাস্কেটমুক্ত গুলির মত লাফ দিয়ে ভীমবেগে গিরিখাত লাফিয়ে ওপারে পৌঁছে হরিণের ভবলীলা সাঙ্গ করল। এই অপার্থিব দৃশ্য দেখে সকলে মোহিত, অবাক এবং বিস্মিত। সম্রাট চিতার পদাধিকার বাড়ালেন। সে তখন হল মুঘল চিতা বাহিনীর প্রধান এবং চিতা তার সামনে নাকাড়া বাজানোর অধিকার পেল। (চলবে)