যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তীব্র অবাক এবং পালাবার পথ খুঁজে না পাওয়া মহম্মদ হুসেন মির্জা ফিরে গিয়ে বিশাল প্রান্তরে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছুক সৈন্যদের ব্যুহ সাজালেন। তিনি ইখতিয়ারুল মুলকের অধীনে পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন খানইআজম যাতে কোনওভাবেই কেল্লা থেকে বেরোতে না পারে সেটা নিশ্চয় করতে হবে। বিপক্ষের আক্রমণের সময় পেরিয়ে গেলে সম্রাট অগ্রগামী বাহিনীকে নদী পেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন, এমন সময়ে এক সাধারণ সেনা বিপক্ষের এক সেনার কাটা মুণ্ডু নিয়ে সম্রাটের ঘোড়ার পায়ের কাছে রাখলেন। মহামহিম একে শুভ ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নিয়ে উজির খানের বাঁদিকের বাহিনীকেও নদী পার হওয়ার নির্দেশ দিলেন। শাহী সাম্রাজ্যের ছাতা হিসেবে সম্রাটও নদী পার হলেন।
নদী পার হওয়ার সময় বিশাল বাহিনী একসঙ্গে জলে নেমে পড়ায় সেনাবাহিনীর সমরসজ্জায় কিছুটা বিশৃংখলা তৈরি হল। জল কেটে কিছুদূর এগিয়ে পাড়ে ওঠার পর শাহী বাহিনী অনতিদূরে বিপক্ষের বিশাল বাহিনীকে দেখতে পেল। ১৫০০ আত্মনিবেদনী অগ্রগামী সেনাবাহিনী স্বয়ং মহম্মদ হুসেন মির্জার নেতৃত্বে মহম্মদ কুলি খান তোকবাই এবং তারখান দেওয়ানের বাহিনীকে আক্রমন করে। বিদ্রোহীদের আরও এক হাবসি এবং আফগান বাহিনী উজির খানের বাহিনীকে আক্রমন করায় যুদ্ধ এখন হাতাহাতি লড়াইতে পর্যবসিত।
শাহী অগ্রগামী বাহিনীর দুর্বলতা এবং আতান্তর অবস্থা দেখে সম্রাট রাগী বাঘের মত সেনাবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিপক্ষ বাহিনীর ওপরে। সম্রাটকে তীব্রভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে প্রাণহাতে নিয়ে ‘ইয়া মুমিন’ যুদ্ধচিতকারে প্রত্যেকটি শাহী সেনা যেন তিনজন হয়ে লাফিয়ে পড়ল বিপক্ষের বাহিনীর ঘাড়ে। সৈয়দ খান কোকা ব্যর্থ আক্রমণের পরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদ হলেন। বিদ্রোহী পক্ষের মহম্মদ হুসেন মির্জা আর শাহ মির্জা প্রথম সময়ে কিছুটা হাল্কা প্রতিরোধ খাড়া করার পরে যখন বুঝতে পারলেন তারা একটা হারা লড়াই লড়ছেন, যুদ্ধক্ষেত্রকে পিছনে রেখে পালিয়েগেলেন, বাকি শত্রু বাহিনী কচুকাটা হল। মাত্র কয়েক হাজার সেনা নিয়ে মহামহিম এক মহান বিজয় হাসিল করলেন।
আহত বিদ্রোহী মহম্মদ হুসেন মির্জা ঘোড়া চেপে পালাতে চেয়ে কাঁটা-ঝোপ টপকাতে ঘোড়া ঘাড় মটকাল, তিনি ঘোড়ার তলায় পড়লেন। তাঁর পিছন নেওয়া শাহী বাহিনীর জনৈক তুর্কি সেনা গাদা আলি, ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে হুসেন মির্জাকে বন্দী করে। শত্রুপক্ষের বাহিনীর বাঁদিকের অক্ষের দায়িত্বে থাকা সেনাপতি উজির খান প্রাণ হাতে নিয়ে লড়লেন। হাবসি আর গুজরাটি বিদ্রোহীরা শেষ অবদি লড়ে বার বার বিভিন্ন প্রান্তে আক্রমন শানাতে থাকলেও, মহম্মদ হুসেন মির্জার হেরে যাওয়ার সংবাদ শুনে মনোবল হারিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে থাকে। ডানদিকের অক্ষের সেনাপতি মীর মহম্মদ খান বিদ্রোহী শের খান ফৌলাদির বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করে তার তরোয়ালে বিদ্রোহী নেতাকে মাটির সঙ্গে গেঁথে ফেলল। সেখানেই যুদ্ধ প্রায় শেষ।
সম্রাটের ভাগ্যাকাশে উদিত সূর্যের রশ্মির মত বিজয় ঘোষণা যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটা কোণাকে শুদ্ধ করেছে। খান কালানের বাহিনীর গদা আলি এবং অন্য এক সেনা আহত মহম্মদ হুসেন মির্জাকে বন্দী করে সম্রাটের সামনে আনলেন, নদীর পাড়ের প্রতিরোধের খাড়াই দেওয়াল থেকে মহামহিম লাফিয়ে নেমে সর্বশক্তিমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। আগত দুই দুজনেরই দাবি তারাই বিদ্রোহী নেতাকে গ্রেফতার করেছে। রাজা বীরবল প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাকে কে গ্রেফতার করেছ’? মহম্মদ হুসেন মাথা নামিয়ে জানালেন, ‘মহামহিমের নুনের প্রতি আনুগত্য আমার বন্দীত্বের কারন’। কী সত্য বাক্যই না তিনি বলে উঠলেন! মহামহিম তাকে যথাবিহিত তিরষ্কার করে রাই সিংহের হাতে তুলেদিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্রোহী দলের বন্দীদের বিচার করতে গিয়ে আবিষ্কৃত হল জনৈক ভিক্ষুক হুসেন মির্জা। তার দাবি সে বিদ্রোহী নেতার কোকা ভাই। অবিলম্বে পুণ্যবান সম্রাট হাতে ধরা বল্লম ছুঁড়ে তাকে হত্যা করলেন, উপস্থিত সেনার তীরে তার দেহ ছিন্নবিছিন্ন হয়েগেল। জানাগেল সারনালের যুদ্ধে এই ব্যক্তি রাজা ভগবান দাসের ভাইকে হত্যা করেছিল।
বিজয়লাভের একঘন্টাও ব্যয় হয় নি বিদ্রোহীদের একটা বাহিনী ফিরে আসার সংবাদে শাহী বাহিনী সচকিত হয়ে ওঠে। অগ্রগামী বাহিনী সংবাদ নিয়ে এল খানইআজমের রাস্তা আটকে রাখা ইখতিয়ারুল মুলক গুজরাটির নেতৃত্বে শত্রু বাহিনী মহম্মদ হুসেন মির্জার পতনের সংবাদে কেল্লা অবরোধ ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। মহামহিম নির্দেশ দিলেন শাহী অগ্রগামী বাহিনীকে তুরন্ত এগিয়ে গিয়ে জীবনহরণ তীরান্দাজীতে শত্রুপক্ষকে হারিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিশ্চিতভাবে হঠিয়ে দিতে হবে। নির্দেশ জারি হতে না হতেই বিপক্ষের সেনানায়ক ইখতিয়ারুল মুলক আর তার বাহিনীর আবির্ভাব ঘটলে কয়েকজন মাত্র রক্তপিপাসু ঘোড়সওয়ার এগিয়ে গিয়ে বিপক্ষের বাহিনীকে তীব্র গতিতে আক্রমন করলে নেতাশুদ্ধ বাহিনী প্রতিরোধের দেওয়ালের দিকে, যেখানে শাহী নিশানটি উড়ছিল, পাশ দিয়ে পিঠটান দিতে বাধ্য হয়। আতঙ্কিত ইখতিয়ারুল মুলকের বাহিনী নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় শাহী বাহিনী বিপক্ষের সেনাকে চাঁদমারি করে মারতে শুরু করে।
ইতিমধ্যে জনৈক তুর্কমান সেনা শুহরাব বেগ ইখতিয়ারুল মুলককে চিনে ফেলে তার পিছু ধাওয়া করে। ইখতিয়ারুলের ঘোড়াও কাঁটাঝোপ লাফ দিয়ে পেরোতে গিয়ে ঘাড়মুড়ে পড়ে মারা যায়। শুহরাব ঘোড়া থেকে নেমে ইখতিয়ারুলকে গ্রেফতার করে। ইখতিয়ারুল মুলক শুহরাবকে বলে, ‘তোমায় দেখে তুর্কমান মনে হচ্ছে। তুর্কমানেরা মুর্তাজা আমীর দাস[অনুগত]! সর্বশক্তিমান তাঁকে আশীর্বাদ করুন। আমি বুখারার সৈয়দ। আমায় মেরো না’। শুহরাব বেগ বলল, ‘আমি তোমার চিনেছি বলেই তোমার পিছু নিয়েছি, তুমিই ইখতিয়ারুল মুলক’। শুহরাব তরোয়াল বের করে তার মাথা ছিন্ন করল। ঘুরেই দেখে কেউ তার তুর্কি ঘোড়াটি চক্ষুদান করেছে। জামার ঝুলে কাটা মাথাটি মুড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সম্রাটের অবস্থানের দিকে সে এগোতে থাকে নিশ্চিতমনে।
ইখতিয়ারুল মুলক পালিয়ে যাচ্ছে নদীর তীর বেয়ে, সম্রাটের উপস্থিতিতে রাই সিংহের যে সব রাজপুত সেনা মহম্মদ হুসেইন মির্জার দায়িত্বে ছিল, তারা তাকে হাতির পিঠ থেকে নামিয়ে এনে বল্লম দিয়ে খুঁজিয়ে হত্যা করে।
বিজয়ের পরে ঘেরাও হওয়া খানইআজম এবং অন্যান্য আমীর এসে সম্রাটের পা চুম্বন করার সম্মান পেলেন। মহামহিম মহান শাহী ঔদার্য দেখিয়ে আজম খানকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বহু সম্মান এবং উপহারে সম্মানিত করলেন।
প্রত্যেক আমীর অভিজাত তাদের পদাধিকার আর স্তর অনুযায়ী সম্মান আর উপহার পেলেন। আমীরদের সঙ্গে আলাপচারিতা শেষ হয় নি এমন সময় তুর্কইমান শুহমান বেগ এসে ইখতিয়ারুল মুলকের কাটা মাথা মহামহিম শাহের পদতলে লুটিয়ে দিল। সর্বশক্তিমানের দানে তিনি বারংবার তাঁর নাম উচ্চারণ করলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ২০০০ বিদ্রোহীর কাটা মাথা দিয়ে মিনার তৈরি করার নির্দেশ দিলেন যাতে এই মিনার দেখে যে কোনও মানুষের বিদ্রোহ করতে হৃদয় কেঁপে ওঠে।
যুদ্ধের সাফল্য এবং শত্রু বিজয়ের আনন্দে সম্রাট গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদের দিকে অগ্রসর হয়ে সুলতানের প্রাসাদকে নিজের আবাসগৃহ বানালেন। শহরের বিখ্যাত আমীর, অভিজাত, সমাজের বিভিন্নস্তরের মানুষ, কারিগর উপহার নিয়ে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে এলেন আনন্দিত চিত্তে। বিজয় উদযাপন নিয়ে প্রচুর সভা এবং সম্বর্ধনা আয়োজন করা হল। প্রাসাদে আনন্দ উপভোগের চারটি মহার্ঘ দিন কাটিয়ে সম্রাট শহরের মাঝখানে অবস্থিত ইতিমদ খানের বাড়িতে গিয়ে যে সব মানুষ সেনানী অংশ নিয়েছেন তাদের নানান উপহার এবং সম্মান দিলেন। তাঁর নির্দেশে প্রতিজন সেনানায়কের পদোন্নতি হল এবং মাইনে বাড়ল অনেকটাই। তাছাড়া লেখকদের বিজয় কাহিনী বয়ান করার নির্দেশ দিলেন। মহম্মদ হুসেইন মির্জা আর ইখিতিয়ারুল মুলকের মাথা আগরা এবং ফতেপুরের দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হল।
মহামহিম আহমেদাবাদের প্রত্যেক মানুষের হৃদয় জয় করার পর প্রত্যেককে শান্তি আর সুরক্ষার ভবিষ্যৎ উপহার দিলেন। (চলবে)