১৫৭৫-৭৬ ইবাদতখানায় আকবর এবং ধর্মতাত্ত্বিকেরা
[১৫৭৫-৭৬-এ সম্রাট আকবর ফতেহপুর উপাসনাগৃহ, ইবাদতখানা তৈরি করলেন মুসলমান ধর্মতাত্ত্বিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার উদ্দেশ্যে। কেন তিনি ইবাদতখানা তৈরি করলেন, ধর্মতাত্ত্বিকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় তিনি কী লাভ অর্জন করেছেন, সে সব বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন ঐতিহাসিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক বাদাউনি। ইবাদতখানার আলোচনাসভাগুলোয় অন্যতম আমন্ত্রিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন বাদাউনি। আকবরের দরবারের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন প্রখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক মখদমুল মুলক আবদুল্লা সুলতানপুরী; আকবর শুধুই তাঁর সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করে সম্পূর্ণ খুশি ছিলেন না। তিনি বিস্তৃত ধর্মআলোচনাসভার আয়োজনের ভাবনা ভবেন; এই উদ্দেশ্যে ফতেহপুর সিক্রিতে ইবাদতখানা তৈরি করলেন যেখানে অন্যান্য ধর্মের তাত্ত্বিকরাও উপস্থিত থাকতে পারবেনন। এই অংশটা নিয়েছি বাদাউনির মুন্তাখাবুলতাওয়ারিখ থেকে। অনুবাদ করেছি শিরিন মুসভির মূলের ইংরেজি অনুবাদ থেকে।]
১৫৭৫-৭৬-এ ইবাদতখানা তৈরি সম্পূর্ণ হল। ইবাদতখানা তৈরির গভীর উদ্দেশ্য ছিল। অতীত বছরগুলিতে সম্রাট একেরপর এক যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করেছেন, প্রতিদিন সাম্রাজ্যের আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুঘল সাম্রাজ্যের সব কিছুই আপাত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী থাকল না। মহামহিম সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গ খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। [আজমেঢ়ের] প্রয়াত মুইন চিস্তির সঙ্গে তিনি দীর্ঘসময় ধরে সর্বশক্তিমান, মহান নবী এবং অতীন্দ্রিয়বাদ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন। দর্শন আর আইন আলোচনাতেও তার দিলচস্তপি কম ছিল না। মহামহিম রাতভর সর্বশক্তিমানের গুণগান করতেন; তিনি বারংবার ‘ওহ তিনি [সর্বশক্তিমান]’ ‘ওহ পথনির্দেশক’ আবৃত্তি করে তাঁর নাম গুণগুন করতেন। সত্যকারের সর্বশক্তিমান-দাতার জন্যে তার হৃদয় সদা উতসর্গিত থাকত; সম্রাট তার অতীত সাফল্যের জন্যে সর্বশক্তিমানকে কৃতজ্ঞতা জানাতে প্রায় প্রতিদিন ঊষাকালের ওম মেখে আগরা প্রাসাদের থেকে বহুদূরে পুরোনো এক পাথরের গুহায় একা একা ধ্যানে সময় কাটাতেন। তিনি শুনেছিলেন বাংলার শাসক সুলেইমান করনানি প্রতি সকালে প্রায় ১৫০ জনের মত শেখ আর উলেমার সঙ্গ সান্নিধ্যে, মহান নবীর নাম এবং কাজকর্ম ইত্যাদি আলোচনা করে সময় কাটাতেন। সকালের উপাসন শেষ হলে তিনি সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র এবং প্রজাদের কাজে সময় ব্যয় করতেন। তাছাড়া বাদাকশনের শাহজাদা মির্জা সুলেইমানের অতীন্দ্রিয়তার ওপর তীব্র আকর্ষণ ছিল; ভাবাবেশের আকর্ষণে তাঁর বহু অনুগামীও তৈরি হয়েছিল। এইসব আধ্যাত্মিক উদাহরণে মহামহিম উদ্বুদ্ধ হয়ে একদা শেখ ইসলাম চিস্তির অনুগামী, পরে মোকাম পাল্টে মহাদিভি গোষ্ঠীতে অন্তর্ভূক্ত হওয়া আবদুল্লা নিয়াজি শিরহিন্দির অনুগামী হন। তাঁর গুরুর জন্যে সিক্রির এক পাহাড়ি জায়গায় চারদিক ঘিরে একটি প্রেক্ষাগৃহ বানান। একই সঙ্গে অনুপ তালাও নামে একটি বড় জলাশয়ও তৈরি করেন। তিনি প্রেক্ষাগৃহটির নাম দেন ইবাদতখানা, উপাসনাগৃহ যা পরে ইয়াদত খানায় (অসুস্থদের ঘর) রূপান্তরিত হয়।
শুক্রবার উপাসনার পর মহামহিম শেখ ইসলামের নতুন তৈরি বাসস্থানে নিয়মিত গিয়ে সেখানকার উপাসনা গৃহে বৈঠক করতেন। মহামহিম সেখানে কিছু শেখ, কিছু উলেমা, কিছু পূণ্যাত্মা আর কয়েকজন সহকারী নিয়ে আলাপআলোচনায় বসে মানসিক শান্তি পেতেন। বিভিন্ন ব্যবহারিক বিষয় সেই সব আলোচনায় উঠে আসত। আমার পৃষ্ঠপোষক জালাল খান কুর্চি দরবারে আমার অন্তর্ভূক্তির আলোচনায় মহামহিমকে বললেন, ‘আমি সেদিন আগরায় শেখ মহম্মদ ঘাউসের পুত্র শেখ জিয়াউল্লাহের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে দেখি, তাদের জীবনে দারিদ্র ঘিরে ধরেছে; মনে আছে একদিন আলোচনা শেষে তিনি আমার থেকে এক সের দানাশস্য চাইলেন। এর একাংশ তিনি নিজের জন্যে ব্যবহার করবেন, একাংশ আমায় দেবেন, আর একাংশ বাড়ির মানুষদের খাদ্য হিসেবে পাঠাবেন’। তাঁর এই কথা শুনে সম্রাটের হৃদয় আর্দ্র হয়ে উঠল; একদিন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ইবাদতখানায় তাঁর সম্মানে একটি বৈঠক আয়োজন করলেন। প্রতি শ্রক্রবার রাতে [অর্থাৎ প্রতি শুক্রবারের আগের রাতে] তিনি সৈয়দ, শেখ, অভিজাত আর উলেমাদের আমন্ত্রণ জানাতেন। আমন্ত্রিতদের বসার ক্রম নিয়ে বিবাদ উপস্থিত হলে প্রত্যেকের বসার ক্রম নির্দিষ্ট করেদিলেন স্বয়ং মহামহিম। তিনি নির্দেশ দিলেন অভিজাতরা বসবে পূর্ব দিকে, সৈয়দেরা পশ্চিমে, উলেমারা দক্ষিণে আর শেখেরা উত্তরে। তিনি মাঝেমাঝে প্রত্যেক দলের সঙ্গে বৈঠকে বসে সত্য এবং বিশ্বাস-সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। আলচনাসভা চালানোর সময় বিপুল পরিমান সুগন্ধী জ্বালানো হত। সম্রাটের অভিজাত দরবারিদের সুপারিশে যেসব মাননীয় ব্যক্তি ইবাদতখানায় প্রবেশ করতেন, তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতা এবং বৌদ্ধিকতার সম্মান অনুযায়ী বিপুল অর্থ সাহায্য দেওয়া হত। ইতিমদ খান গুজরাটির গ্রন্থাগারের বহু উল্লেখযোগ্য বই এবং গুজরাট অভিযানের পরে দখল করা যে সব বই শাহী গ্রন্থাগারে রাখা ছিল, সে সব পূণ্যাত্মা এবং অন্যান্য জ্ঞানীর মধ্যে বিতরণ করা হল। তাঁর হাত থেকে আমি যে সব বই পেয়েছিলাম, তার মধ্যে উজ্জ্বলতমটি ছিল মাশকুতুল আনোয়ারের জোড়াপাতার অংশ আনোয়ারুল মাশকুট। আর যেসব বই [বিতরণ করা হল না] পড়ে থাকল, সে সব অর্থের বিনিময়ে ‘ইরমাস’ বা শত্রু ধ্বংসকারী হিসেবে বিতরণ করা হল।
এই ধরণের আলোচনা চলতে চলতে এক রাতে এক বর্ষীয়ান উলেমা গলার ধমনী ফুলিয়ে তীব্র চিতকার শুরু করায় ইবাদতখানায় তীব্র গোলযোগ শুরু হল। উলেমাদের গর্হিত ব্যবহারে তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে মহামহিম আমায় জানালেন, ‘ভবিষ্যতে তোমার যদি মনে মনে হয় কোনও ব্যক্তি আংসাং ভুলভাল বকছে, তুমি আমায় জানাবে। আমি তাকে এখান থেকে বার করে দেব’। আমি নিচুস্বরে আসফ খানকে জানালাম, ‘আমায় যদি সম্রাটের নির্দেশ মান্য করতে হয়, অধিকাংশ উলেমাকে এই প্রেক্ষাগৃহ থেকে বার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিতে হবে’। নিচুস্বরে কী বললাম শুনতে না পেয়ে মহামহিম আমায় জিজ্ঞাসা করলে আমি জানালাম আসফ খানকে আমি কী বলেছি। মহামহিম আমার জবাবে খুবই তুষ্ট হলেন, এবং তার পাশে বসা কয়েকজনকে আমার বক্তব্যটা নতুন করে শুনিয়ে দিলেন। তিনি প্রায়শই মুখদুমুল মুলক মৌলানা আবদুল্লা সুলতানপুরীকে অসন্তুষ্ট করার জন্যে ইবাদতখানায় নিয়ে আসতেন। তার বিরুদ্ধে হাজি ইব্রাহিম শেখ আবুলফজল এবং আরও নতুন আসা তাত্ত্বিকদের লড়িয়ে দিয়ে মজা দেখতেন। প্রত্যেকেই আবদুল্লা সুলতানপুরীর প্রতিটা বাক্যের বিরুদ্ধাচরণকরে বক্তব্য পেশ করতেন। মাঝেমাঝের সম্রাটের ইঙ্গিতে কিছু দরবারি অভিজাতও তাঁর সামনে এমন কিছু প্রশ্ন নিয়ে আসতেন যা দিয়ে তাকে তুচ্ছ করা যায় এবং তার তত্ত্বে ঠুকরোনো যায়; তাছাড়া তার সম্বন্ধে নানান অদ্ভুত গপ্প বলতেন। (চলবে)