১৫৮০-৮১
[ফতেপুর সিক্রিতে ১৫৮০-তে সম্রাট আকবরের দরবারে জেসুঈট মিশনের সদস্য হিসেবে প্রথম পৌঁছন এন্থনি মনসারেত, রুডলফ আকোয়াভিয়া এবং ফ্রান্সিস হেনরিকে। মনসারেত মুঘল আমল বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী এবং দীর্ঘ মূল্যবান স্মৃতিকথা কমেন্ট্রি অব ফাদার মনসারেত লেখেন। ১৯২২-এ অনুবাদ করেন জে এস হইল্যান্ড। সে সময় জেসুঈট ফাদারেরা তাঁদের ধর্ম কেন্দ্রে যে সব চিঠি লেখেন তার কয়েকটা এখানে তুলে দেওয়া গেল — চিঠিগুলি নেওয়া হয়েছে হেরাস ইন্সটিটিউট প্রকাশিত লেটার্স ফ্রম মুঘল কোর্ট থেকে।]
ক : ফাদারের প্রথম সাক্ষাৎ
ফাদারদের সম্রাটের সামনে নিয়ে যাওয়া হল। উঁচু সিংহাসন থেকে তাদের দেখে সামনে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। তাঁরা গোয়ার আর্চবিশপের পক্ষ থেকে মহামহিম সম্রাটকে একটি মানচিত্র উপহার দেন। দরবারে সম্মানের সঙ্গে সেটি গৃহীত হয়। সম্রাট তাদের দেখে প্রীত হলেও, তাঁর সম্বোধনে সেই ঊষ্ণতা প্রকাশ পেল না, হয়ত কিছুটা তার মনেরভাব লুকিয়ে রাখতে আর কিছুটা নিজের ওজনের কথা ভেবে তিনি অনুভূতিতে রাশ টানলেন। কিছুক্ষণ পরে পাশের ঘরে (যার নাম কাপুর তালাও) পাদ্রিদের আসতে বললেন যাতে তিনি তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ করাতে পারেন। তাদের নিয়েগেলেন দৌলতখানাতেও। সেখানে হঠাৎ বর্ষায় পর্তুগিজেরা ভিজেগেলে তিনি তাদের সোনার বন্ধনীওয়ালা স্কারলেট কোট উপহার দেন। পরে তার পুত্রদেরও পর্তুগিজ টুপি সহ নানান পরিধেয় পরতে নির্দেশ দিলেন। অতিথিদের খুশি করতেই তিনি এইসব নির্দেশ দিয়েছিলেন।
খ : ‘আকবর কথা দিয়েছিলেন বাঙ্গালির কোনও প্রথায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না, সে নির্দেশ উলঙ্ঘন করতে পারব না’
খ্রিষ্টিয় সন্ত সেবাস্টিও মনরিকের জাহাজডুবির পর সড়কপথে ইওরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দল নিয়ে ওডিসা থেকে বাংলার দিকে যাচ্ছিলেন। দলের এক মুসলমান সঙ্গী মেদিনীপুরের এক গ্রামে তিনটি ময়ুর মারে। সেটা নিয়ে গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। [মেদিনীপুরের] নারায়ণগড়ে শিকদারের (যিনি ধর্মে মুসলমান) দপ্তরে অভিযোগ করা হলে শিকদার অভিযুক্তকে পাকড়াও করে আদালত বসিয়ে বলেন, ‘তুমি তো বাঙালি এবং মুসলমানও…? তুমি কী করে একটি হিন্দু জেলায় জীবন্ত প্রাণী হত্যার সাহস করলে?’
মনরিকে বিচারসভায় তাঁর সঙ্গী অভিযুক্তর পক্ষে কোরান থেকে উদ্ধৃত করে অনেক যুক্তি দিলেও শিকদার মনরিকেকে বললেন, ‘আপনি যা বলেছেন সে সব ধর্মীয় সত্য, কিন্তু ৬৫ বছর আগে আকবর যখন বাংলা দখল করেন, তখন তিনি কথা দিয়েছিলেন, ‘তিনি এবং তাঁর উত্তরসূরীরা তাদের [বাঙালি] নিজেদের যাপন, প্রথা ইত্যাদির ওপর কোনও হস্তক্ষেপ করবেন না, তিনি (শিকদার) সম্রাট আকবরের দেওয়া নির্দেশ উলঙ্ঘন করতে পারেন না।’
হাত কাটার বিধান থাকলেও তাকে চাবুক মেরে ছেড়ে দেওয়া হল। একজন বাঙ্গালি মুসলমানকে একজন মুসলমান বিচারক শাস্তি দিচ্ছেন এবং সেটা হিন্দুদের কোনও একটা স্পর্শকাতর বিষয় উল্লঙ্ঘনের জন্যে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আজকের হিসেবে।
গ : হেনরিকের চিঠি, ৬ এপ্রিল ১৫৮০
তাঁর উপস্থিতিতে আমরা মুল্লাদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আলাপচারিতা চালালাম, মুল্লাদের বিব্রত অবস্থা থেকে অব্যাহতি দিতে তিনিই আমাদের অধিকাংশ গভীর প্রশ্নের উত্তর দিলেন, বিষয়গুলি তার থেকে বেশি গভীরে কেউ জানে না, যে কোনও বিষয়ে সহজে বুঝিয়ে দেওয়ার এই ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা তিনি ব্যবহার করলেন, কিন্তু তার উত্তর, তাঁর যুক্তি মুল্লাদের পুরোপুরি খুশি করতে পারে নি। আলোচনা খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। খুব যে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নির্দিষ্ট অভিমুখে আলোচনা চলছিল না সেটা পরিষ্কার, কারন তাঁকে ঘিরেই আশেপাশের সমস্তকিছুই আবর্তিত হচ্ছিল, এবং তিনি ঠাণ্ডামাথায় শান্তচিত্তে কোনওরকম উত্তেজনা না দেখিয়ে সব কাজ সম্পাদন করছিলেন।
তিনি প্রত্যেকের প্রতি খুবই সহজ এবং শিষ্ট আচরণ করলেন। সারাক্ষণ হাসিখুশিতে ভরপুর, কিন্তু রাজা হিসেবে প্রত্যাশামতই তিনি নিজের ওজন কখনওই লঘু হতে দেন না। জনগণ তাকে ভালবাসে আবার একইসঙ্গে ভয়ও পায়। অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারেন; কখনোই তাঁকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখিনি, সারাক্ষণ কিছু না কিছু করেই চলেছেন; সব বিষয়ে তার সাধারণ জ্ঞান বিষ্ময়কর এবং প্রজাদের সামনে তিনি কখনও ছুতোরের কাজ, কখনও লোহাকমের কাজ, কখনও বর্ম তৈরির কাজ করেছেন। তার লক্ষ্যভেদের তুলনা নেই, চ্যাম্পিয়ান ঘোড়সওয়ার, বন্য ঘোড়া প্রশিক্ষিত করে তার পিঠে তিনি চড়তে ভালবাসতেন।
ঘ : ব্যক্তিত্ব এবং আকবরের কর্মপদ্ধতি (মনসেরাতের মন্তব্য)
মর্যাদাবান সম্রাট আকবরের মুখাবয়ব ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। সম্রাটের চেহারায় গম্ভীর রাজকীয়ভাব প্রথম দর্শনে যে কোনও দর্শনার্থীর চোখে টানবেই। চওড়া কাঁধ, ঘোড়ায় চড়ার উপযোগী সুগঠিত পদযুগল, হালকা বেগুনি গায়ের রঙ। মাথা ডান দিকে কাঁধের ওপর ঈষৎ ঝোলানো। চওড়া, উঁচু কপাল। দুপুরে সমুদ্রের জলে রৌদ্ররশ্মিপড়া ঝকঝকে আলোর মত উজ্জ্বল চোখ। চোখের পাতা অস্বাভাবিক লম্বা — ঠিক সৌরোমাইট, সিনাই, নিপ্পনি [সিথিয়ান, চিনা, জাপানি] এবং অন্যান্য উত্তর এশিয় জাতির মত। ভ্রু সহজে দেখা যায় না। নাক খাড়াই, ছোট, কিন্তু তুচ্ছ নয়, বোঝা যায়। নাকের ফুটোগুলো খুব চওড়া, যেন উপহাসের বস্তু। বাঁ নাসারন্ধ্র আর ঠোঁটের মাঝে একটা তিল আছে। নিয়মিত দাড়ি কামান, কিন্তু গোঁফ বয়ঃসন্ধির তুর্কি যুবার মত পাতলা [পূর্ণযৌবনে সাধারণত গোঁফ আরও পোক্ত হয়]। স্বজাতির প্রথা অমান্য করে তিনি চুল ছাঁটেন না, টুপি পরেন না, কিন্তু পাগড়ি বেঁধে লম্বা চুল আঢকে রাখেন। জনশ্রুতি এসব তিনি ভারতীয় প্রথা মান্য করার জন্যে, ভারতীয় প্রজাদের খুশি করাতে পালন করেন। বাঁদিকে হালকা টলে হাঁটেন, যদিও দেহে আঘাত পাওয়ার ইতিহাস নেই। চেহারা অতিশয় সুগঠিত, বলিষ্ঠ, শক্তসমর্থ এবং হৃদয়বত্তায়ভরা। হাসলে মুখটা পুরোপুরি বেঁকেচুরে যায়। তার প্রকাশভঙ্গী প্রশান্ত, নির্মল, খোলামেলা, মর্যাদাপূর্ণ কিন্তু তিনি রেগেগেলে ভীতিপ্রদভাবে রাজকীয়। আমাদের, পাদ্রিদের সঙ্গে আলাপ হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৩৮।
উৎসুক সাক্ষাতপ্রার্থীদের জন্যে তিনি নিজেকে কতটা সহজলভ্য করে তোলেন এটা বলা মুশকিল। তার কাছে আসা প্রতিজন অভিজাত, সাধারণ প্রজার সঙ্গে একইভাবে, একই গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেন। তিনি কারোর সঙ্গে রুঢ় কথা না বলে প্রত্যেকের সঙ্গে নিজেকে মিষ্টভাষী, ভদ্র রাজা হিসেবে উপস্থিত করেন — সবাই মনেকরে একমাত্র তার সঙ্গেই সম্রাট আন্তরিক ব্যবহার করছেন। বোঝা যায় তার ভদ্রতা, তার কথাবার্তার তরিকা প্রজাদের মানসিকতায় চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলছে। মুহম্মদের ধর্ম নিয়ে তাঁর খোলামেলা অবস্থান মুসলমানদের চোখে ক্ষমার অযোগ্য; তা সত্ত্বেও তিনি কিন্তু আজও নিহত হন নি। তাঁর অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সঙ্গে মানানসই দূরদৃষ্টি যেমন সাম্রাজ্যকে নানান বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে তেমনি তার পরিকল্পনায় বহু অদেখা সুযোগসুবিধেকেও আত্মস্যাৎ করতে সাহায্য করেছে। তিনি সত্য বিশ্বাসকে [খ্রিষ্টবাদ] স্বীকার না করায়, সম্রাটের দেহ আর মনের এই সব অদ্ভুত অপার্থিব গুণাবলী, দ্যুতি সব ব্যর্থ হয়ে যায়।
আকবরের শখ ছিল শিকার করা। তিনি অনেকটা নির্বোধ স্বভাবের [morose disposition] শাসক। নিজেকে নানান খেলাধুলায় ডুবিয়ে রাখতেন। তিনি নানান বর্ণময় কার্নিভ্যালের মত জন-উতসব আয়োজন করতেন। এগুলোতে অভিজাতদের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগণও মুগ্ধ হয়ে মেতে থাকত, সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত। এসব উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রধানতমগুলো ছিল পোলো, হাতির লড়াই, কুস্তি [বলা হয়েছে বক্সিং], অসিযোদ্ধাদের লড়াই, কবুতরবাজি ইত্যাদি। এছাড়া বিচিত্র সব পশুপাখি এবং অন্য কিছু আশ্চর্য বস্তুর দিওয়ানা ছিলেন তিনি। নাচ, গান, বাদ্যবাদন, ভোজবাজি, ভাঁড়েদের ভাঁড়ামোও তার পছন্দের ছিল। এসব ব্যক্তিগত বিনোদনে ব্যস্ত থেকেও তিনি রাষ্ট্রকর্ম সম্পাদন করার কাজ ভুলতেন না। তার আশেপাশে সবসময় বহু মানুষের ভিড় লেগে থাকত, সেসব তিনি লোকজনের সঙ্গ খুবই পছন্দও করতেন। এই জন্যে তার দরবার নানান কিসিমের মানুষে ভর্তি থাকত। প্রাসাদের বাইরে গেলেই অভিজাতদের বাহিনী ছাড়াও তার নিজের দেহরক্ষীরাও থাকত। তবে তিনি যতক্ষণ না পায়ে হাঁটা মানুষদের বাহনে চড়ার ইঙ্গিত করছেন, ততক্ষণ তাদের পায়ে হাঁটতে হত। এ সব গল্প মিলে দরবারি ঐশ্বর্যের জন্ম হয়েছে। (চলবে)