হুমায়ুনের রাজত্ব দুই অংশ হল – মুঘল হিন্দুস্তান আর কাবুল। এখনে একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে মাথায় রাখতে হবে কাবুল কিন্তু মুঘল হিন্দুস্তানের অধীন সাম্রাজ্য নয়, বলা যায় সমান্তরাল সাম্রাজ্য। মুঘল হিন্দুস্তানের অংশে আকবরের পথনির্দেশক, অভিভাবক আতলিক হলেন বৈরাম খান। কাবুলে মির্জা হাকিমের আতলিক হলেন মুনিম খান। দুজনেই হুমায়ুনের প্রশাসনের বিশ্বস্ত কর্মচারী। কিছু দিনের মধ্যে মুনিম খান কাবুলে পুত্র গনি খানকে শাসন ভার বুঝিয়ে দিয়ে ১৫৬০এ নিজে আরও বড় রাজনৈতিক জীবনের আশায় আকবরের আগরা দরবারে অভিবাসিত হলেন। গণি খানের ক্ষমতায় আরোহনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানালেন মির্জা হাকিমের মা, হুমায়ুনের বিধবা এবং ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকা ৩১ বছর বয়সী মাহ চুচক বেগম। পরের কয়েক দশক নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত শিশুপুত্রের রাজনৈতিক কাজকর্ম একাহাতে সামলাবেন তিনি।
মাহ চুচক বেগমের রাজনৈতিক উত্থান চোখ ধাঁধানো হলেও খুবই পরিকল্পিত দক্ষতায় তিনি কাবুলের রাজনীতিতে নিজের ছায়াকে দীর্ঘ করানোর কাজ শুরু করবেন। গণি খানকে উচ্ছেদ করতে, গণির কাকা ফয়জল বেগের সঙ্গে জোট বেঁধেও ফয়জল বেগকে খুন করাবেন। মাহ চুচকের পাশে দাঁড়ালেন হুমায়ুনের আর এক কর্মচারী, আতগা গোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, শাহ আলি আতগা। তিনি হলেন মির্জা হাকিমের নতুন আতলিক। বেশ কিছুকাল ধরে শাহ আলিকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার পরে মাহ চুচকের ধারণা হল তিনি আতগা গোষ্ঠীর ক্ষমতা সংশ্লিষ্টতা কাজে লাগিয়ে হয় কাবুলের সিংহাসন দখলের চেষ্টা করছেন, না হয় তার কাবুলের উচ্চপদে থাকার সুবাদে আকবরের দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার জন্যে দরকষাকষি করছিলেন। মাহ চুচক আতগার ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার মনোভাব বুঝে তাকে কাবুলের ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যোগী হলেন। তাঁর উত্থান আটকাতে কাবুলের তার শিশু সন্তানের রক্ষাকর্তা হিসেবে আরেক আমীর অভিজাত হায়দার কাসিম খোব্বারকে বেচে নিয়ে তাঁর সঙ্গে জোট বাঁধলেন।
১৫৬৪-তে খুন হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত মাহ চুচক দুটো রাজনৈতিক লক্ষে তার ক্ষমতাশীল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চালিত করেছেন — ১) আকবরের প্রভাবে প্রভাবিত যে কোনও আতলিকের প্রভাব থেকে তাঁর শিশু পুত্র মির্জা হাকিমকে মুক্ত রাখা। ১৫৬৩তে মির্জা হাকিমের প্রাক্তন আতলিক মুনিম খানের নেতৃত্বে আসা আগ্রাসী শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি স্বয়ং নেতৃত্ব দিয়ে জালালাবাদের যুদ্ধে শাহী বাহিনীকে হারিয়ে তার পুত্রের ওপর আকবরের প্রভাব চিরতরে নির্মূল করলেন। এবং তার পুত্র যাতে চিরতরে আকবরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে, ছেলের মানসিকতা সেইভাবে গড়ে তুললেন; ২) তার পুত্রকে হুমায়ুনের যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে শাহী সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা। পরিকল্পনা সফল করতে তিনি স্পষ্টভাবে আকবর দরবারে আকবরের প্রথম যুগে আকবর বিরোধীদের জন্যে কাবুলের দরবারকে নিরাপদ ঠাঁই হিসেবে গড়ে তুললেন। কাবুলে আশ্রয় পাওয়াদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশ্বাসঘাতক, রাজনৈতিকভাবে দক্ষ শাহ আবদুল মালি। তিনিও হুমায়ুনের প্রিয়তম কর্মচারীদের মধ্যে অন্যতম। আকবরের সিংহাসনে আরোহন করার পর, তার বিরুদ্ধে অসফল বিদ্রোহ করে ধরা পড়ায় তাকে মুঘল প্রথা অনুযায়ী ক্ষমা করে মক্কায় তীর্থ করতে মূল কথা মুঘল হিন্দুস্তানেরর ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে নির্বাসনে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। কয়েক বছর পরে ফিরে এসে শাহ আবদুলের নতুন করে বিদ্রোহের তোড়জোড় আবারও অসফল হল। ১৫৬৩-৬৪তে তিনি কাবুলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। মাহ চুচক শাহ আবদুলের দু’বার বিদ্রোহকে আকবর বিরোধিতার ভিত্তি ধরে তার সঙ্গে মির্জা হাকিমের বড় বোন ফকরুন্নিসার সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু শাহ আবদুল মালি যৌথ উদ্যোগে বা ক্ষমতা ভাগ-বাঁটোয়ারায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী ছিলেন না — তিনি একচ্ছত্র ক্ষমতা দখলে বিশ্বাস করতেন। ১৫৬৪র এপ্রিলে কাবুলে এক প্রাসাদ ক্যুতে মাহ চুচক এবং তাঁর বহু ঘনিষ্ঠকে খুন করলেন। প্রাসাদ বিপ্লবের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাদাকশনের সুলতান মির্জা সুলেইমান কাবুল দখল করে, মাহ চুচকের সমর্থকদের সহায়তায় শাহ আবদুল মালিকে গ্রেফতার করলেন। বায়াজিদ বায়াতের তাজকিরাত-ই-হুমায়ুন-ওয়া-আকবর সূত্র জানাচ্ছে মির্জা হাকিমের অনুরোধে তিনি শাহ আবদুলকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেন।
কিন্তু মির্জা সুলেইমানের কপালে কাবুল অধিকার দীর্ঘদিন সইল না। কাবুলের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় এক বাদাকশনির নিয়ন্ত্রণ কাবুলিদের অসহ্য মনে হল, মির্জা সুলেইমানের প্রতিনিধিকে কাবুল দরবার থেকে বহিষ্কার করা হল। মির্জা হাকিমের সমর্থকেরা জানতেন মির্জা সুলেইমান এই অপমান সহ্য করবেন না। তারা মরিয়া হয়ে আকবরকে সতভাইএর রাজত্ব রক্ষার জন্যে সেনা পাঠাবার অনুরোধ জানায়। আকবর কাবুল দখলের সুযোগ ছেড়ে দিতে চান নি। তিনি বাহিনী পাঠিয়ে সিন্ধুতীরে মির্জা সুলেইমানের বাহিনীকে পরাজিত করেন। আকবর শাহ ওয়ালি আতগার বড় ভাই মীর মহম্মদ আতগাকে আকবর সম্রাটের প্রতিনিধি করে কাবুলের রাজপাটের নেতৃত্ব দিলেন।
নতুন রাজনৈতিক বিধানটিও কাবুলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারল না। মীর মহম্মদ আতগা সাঁড়াশি আক্রমনে পড়লেন। এক দিকে তিনি আন্দাজ করছিলেন হেরো সুলতান মির্জা সুলেইমান হয়ত নতুন করে কাবুল আক্রমন করতে পারেন, অন্য দিকে তিনি স্পষ্ট দেখছিলেন যুবা মির্জা হাকিমের সাঙ্গপাঙ্গরা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে কাবুল দরবারে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও মির্জা হাকিম, মীর মহম্মদ আতগার প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রকাশে বিন্দুমাত্র কসুর করছিলেন না, কিন্তু ভেতর ভেতর তিনি ক্ষমতা দখলের উদ্যম নিচ্ছিলেন, সেটা আতগার বুঝতে বেশি সময় লাগে নি। মির্জা হাকিমের স্বাধীন হওয়ার উদ্যমের পাশে দাঁড়ালেন পারিবারিক সদস্যরা, সৎ ভাইএর দল আর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা। পঞ্চদশ শতের অন্যতম প্রধান নক্সবন্দী সুফি খাজা ওবাইদুল্লা আহরারের উত্তরাধীকারী অনুগামী খাজা হাসান নক্সবন্দী কাবুলে ১৫৬৪-তে মির্জা হাকিমের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা নিযুক্ত হন। পরের বছর মির্জা হাকিম তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে বৃত করে তাঁর সঙ্গে নিজের বোন, শাহ আবদুল মালির বিধবা ফকরুন্নিসার বিয়ে দিলেন। বিবাহটা আকবরের কাবুলের প্রতিনিধি মীর মহম্মদ আতগা খানের অনুমোদন ব্যতিরেকেই ঘটল। তিনি বুঝলেন রাজনৈতিক জল ঘোলা হচ্ছে, যে কোনও মুহূর্তে তাঁর জানের ওপর আক্রমন নেমে আসাতে পারে। জানের আশঙ্কায় ভুগতে ভুগতে আতগা খান হিন্দুস্তানে অতি শীঘ্রই পালালেন। আতগা খানের পালিয়ে যাওয়ার পরের সময়ের সিংহাসন ভোগের শান্তির সুখদ ঘটনাটা উপভোগ করতে না করতেই মির্জা হাকিম বুঝলেন মির্জা সুলেইমান নতুন করে কাবুল আক্রমণের ফন্দি আঁটছেন। মির্জার সামনে বাঁচার দুটি পথ – হয় বলখের উজবেগদের সাহায্য চাওয়া না হয় আকবরের কাছে নিরাপত্তা দেওয়ার অনুরোধ পাঠানো। খাজা হাসান নক্সবন্দীর প্রতিবাদ সত্ত্বেও তিনি ১৫৬৬-তে সশরীরে হিন্দুস্তানের দরবারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
হিন্দুস্তানে আসার পথে মির্জা হাকিম সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। তার কাছে হিন্দুস্তানে উজবেগদের বিদ্রোহের সংবাদ ছিল। সেই সুযোগে সামরিক অভিযান করে তিনি আকবরের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত পাঞ্জাব আক্রমন এবং দখল করলেন কাবুলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যে পাঞ্জাব দখল নেওয়া অন্যতম জরুরি রাজনৈতিক উদ্যম। যদিও মুঘল ঐতিহাসিকেরা মির্জার এই পদক্ষেপকে বিশ্বাসঘাতকতা বলছেন, কিন্তু মির্জা পক্ষের যুক্তি ছিল হুমায়ুন প্রথম পর্বে (১৫৩০-৪০) কাবুল থেকেই পাঞ্জাব শাসন করেছেন। তিনিও হুমায়ুনের উত্তরাধিকারী। তার দিক থেকে পাঞ্জাব আক্রমন জায়েজ। তিনি পাঞ্জাব আক্রমনকে তার জন্মগত অধিকার বললেন। তাঁর যুক্তি, হুমায়ুনের অসময়ের প্রয়ানের সুযোগে আকবর সাম্রাজ্য অসম ভাগ করে নিজের দিকে বড় অংশটা টেনে নিয়েছিলেন। পাঞ্জাব দখল করে তিনি প্রয়াত মায়ের স্বপ্ন, বাবার রাজত্বকে কিছুটা সমভাগে বন্টিত করে নিজেকে আকবরের সাম্রাজ্যিক সম্মানের সমান করার দিকে এক পা এগোলেন।
মির্জা হাকিম লাহোরের দিকে যাওয়ার উদ্যম নিতেই তার প্রাক্তন আতলিক আতগা গোষ্ঠীর শাজ ওয়ালি আতগা এবং মির্জা হাকিম আতগার বিরোধিতায় লাহোর দখল সম্ভব তো হলই না, উল্টোদিকে বিপুল বিশাল বাহিনী নিয়ে আকবর প্রতি-আক্রমণ পরিকল্পনার খবর পেয়ে তিনি, আকবরের মুখোমুখি না হতে চেয়ে কাবুল ফিরে এলেন মির্জা সুলেইমানের অবরোধ হঠিয়ে। পাঞ্জাব থেকে ফিরে যাওয়ার পরের পনের বছর মির্জা হাকিম আকবরের শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই হবেন না, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাঁর প্রধান সামরিক প্রতিপক্ষও হয়ে উঠবেন। (চলবে)