১৫৪২ শিশু আকবর
উমরকোটে শিশু আকবর পৌঁছলেন। সেখানে নানান গোষ্ঠীর আদিবাসী মহিলা দাইরা তাঁকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সম্মান পাওয়ার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। মাথায় রাখতে হবে মধ্য এশিয়ার আদিবাসী সমাজে দাই-এর গুরুত্ব অপরিসীম — তিনি শুধু শিশুকে পালন করে বড় করে তোলেন না, শিশুটির সৎমা হিসেবেও তিনি গণ্য হন। কখনও কখনও তিনি মায়ের থেকেও বেশি গুরুত্ব পান। যে শাহী বাচ্চাটা যে মায়ের দুধ খেয়ে বড় হচ্ছে, সে যদি কোনও ক্রমে ক্ষমতায় চলে আসে, তাহলে এই দুধ মায়ের ক্ষমতা রাষ্ট্র প্রধানের কাছাকাছি হয়। রাষ্ট্র প্রধান রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দুধ মা’র বক্তব্যকে বিপুল গুরুত্ব দেন।
এখানে, উমরকোটে, ভবিষ্যতের মুঘল সম্রাটকে বুকের দুধ খাইয়ে বড় করার সম্মান অর্জন করলেন একদা হুমায়ুনকে কনৌজে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচানো গজনীর শামসুদ্দিন মহম্মদের স্ত্রী জিজি আঙ্গা। কিন্তু জিজি যেহেতু তখন গর্ভবতী ছিলেন [তাঁর গর্ভে তখন ছিলেন ভবিষ্যতের সেনানায়ক মির্জা আজিজ কোকা (কোকা = সৎ ভাই)], তিনি আকবরকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারলেন না। সেই সময় জিজি ছাড়াও আকবরকে স্তন্য পান করানো যে দশ জন মহিলার নাম পাওয়া যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অমুসলমান বিবি রূপা।
দাই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন দশ বছরের সন্তান আজম খানের মা মাহাম আঙ্গা। আকবর রাজত্বের প্রথম কালে তাঁর অপ্রতিহত ক্ষমতা তৈরি হবে। এই মহিলারা এবং তাদের শিশুরা, আগামী দিনের কোকা ভায়েরা, ভবিষ্যতের সম্রাট আকবরকে নিরাপদ বেষ্টনী দিয়ে সারাক্ষণ ঘিরে থাকতেন। জিজি আঙ্গাকে আকবর এতই সম্মান করতেন যে তার মৃত্যুর পর আকবর স্বয়ং তার কফিন কাঁধে জানেজায় অংশ নিয়েছেন।
১৫৪৩ হুমায়ুনের পারস্য পলায়ন
পালিয়ে যেতে থাকা মুঘল দরবার কান্দাহারের দিকে যাওয়ার পথে মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে হতাশ বাদশা হুমায়ুন বিড় বিড় করছিলেন ‘হিন্দুস্তানের জনগণের আনুগত্য প্রকাশ করার এই হল অস্বাভাবিক তরিকা’। কয়েকমাস চলার পরে সংবাদ পাওয়া গেল সম্রাটের ভাই আসকরি ২০০০ সেনা নিয়ে তাদের তাড়া করেছেন। হুমায়ুন বুঝলেন হিন্দুস্তানে তাঁর পিতার সাম্রাজ্য উদ্ধার করা হয়ত তাঁর খোয়াবেই থেকে যাবে। সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত হল পলাতক সম্রাটের বাহিনী কান্দাহারের দিকে না এগিয়ে পারস্যের সম্রাট শাহ তামস্পের দরবার পানে যাবে।
কিন্তু হুমায়ুনের সঙ্গে আকবরকে নিয়ে না যাওয়া বিষয়ে ইতিহাসে বেশ কয়েকটা পাল্টা বয়ান রয়েছে। হুমায়ুননামায় সম্রাটের বোন গুলবদন বেগম, হামিদা বানুর বেগমের সূত্রে বলছেন, আসকরির হুড়মুড় করে সম্রাটের বাহিনীর ঘাড়ের ওপর এসে পড়ার সংবাদে আতঙ্কিত হলেও খাজা মুয়াজ্জম এবং বৈরাম খান হুমায়ুনের পিছনে একটি ঘোড়ায় হামিদা বানুকে রওনা করিয়ে দিলেন। সব গুছিয়ে বেঁচে পালানোর সময় এত কম ছিল যে ‘মায়ের হাতে সদ্য জন্মানো শিশু আকবরকে তুলে দেওয়ার মত সময় বার করারও সুযোগ ছিল না’। তবে, ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী, আগামী দিনে হুমায়ুনের স্মৃতিকথা রচনা করা, সম্রাটের বদনাধারক জৌহর আফতাবাচির বক্তব্য, বাধ্য হয়ে আকবরকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন স্বয়ং হুমায়ুন। দরবারি ঐতিহাসিক নিজামুদ্দিন আহমেদের বক্তব্য এই গরম আবহাওয়ার দরুন আকবরকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভব ছিল না। আবুলফজলের বয়ান সম্রাটের মাস্থায় সর্বশক্তিমানের হাত ছিল। তাই তার অনিষ্ট হওয়া সম্ভবছিল না। তবে হুমায়ুন যে পারস্যের দিকে মাত্র ৩০-৪০ জনের দল নিয়ে রওনা হয়েছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহই নেই। এই বাহিনীতে মাত্র দুজন মহিলা ছিলেন, তাদের একজন হামিদা বানু বেগম। শোনাযায় স্বয়ং হুমায়ুন ১৬ বছরের হামিদা বানুকে তার সঙ্গে একলা আসার প্রস্তাবদিলে পরিস্থিতির চাপে, সদ্যজাত পুত্রকে ছেড়ে যাওয়ার আবশ্যিকতাকে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না।
শিশু আকবর বাকি দলের সঙ্গে থেকে গেলেন। হুমায়ুনের খোঁজে আসকরি বাহিনী নিয়ের পৌঁছলে তাকে বলা হল, ‘তিনি বহুক্ষণ শিকারে বেরিয়েছেন’। আসকরির নির্দেশে আকবরকে কান্দাহারে নিয়ে গিয়ে তাঁর স্ত্রী সুলতানম বেগমের জিম্মায় সঁপে দেওয়া হল।
১৫৪৫ কাবুলে বাল্যকাল
[দক্ষিণ কোয়েটার মুস্তাঙ্গ থেকে শিবির তুলে হামিদা বানু বেগমকে নিয়ে ১৫৪৩-এ সিস্তানের দিকে পালিয়ে যাচ্ছেন হুমায়ুন। আকবর কাকা আসকরির জিম্মায় কান্দাহারে আছেন। ১৫৪৫-এ হুমাইয়ুন যখন পারস্য থেকে ফিরে এসে কান্দাহার দখল নিতে সেনাবাহিনীকে রণসাজে সজ্জিত করছেন, আসকরি শিশু আকবরকে কান্দাহার থেকে কাবুলে তার আরেক কাকা কামরানের জিম্মায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সে সময় কাবুলে হুমায়ুনের সৎবোন আকবরের পিসি, হুমায়ুনের স্মৃতিকথা লেখা গুলবদন বেগম উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী। শিরিন মুসভি তাঁর বয়ান ব্যবহার করেছেন। আমি বয়ানটা নিয়েছি শিরিন মুসভির অনুবাদ থেকে।]
সম্রাটের ইরাণ ছেড়ে কান্দাহারের অভিযানের সংবাদ পেয়ে মির্জা আসকারি শাহজাদা জালালুদ্দিন মহম্মদ আকবরকে কাবুলে মির্জা কামরানের অধিকারে পাঠিয়ে দেয়। মির্জা কামরান শাহজাদাকে আমার আকা জান, খানজাদা বেগমের কাছে হস্তান্তরিত করেন। সে সময়ে জালালুদ্দিন মহম্মদ আকবর মাত্র আড়াই বছরের শিশু। শাহজাদাকে কাছে পেয়ে আকা জান তাঁকে দেখভাল করতে লাগলেন, তাঁকে স্নেহে ভরিয়ে দিলেন, তাঁর হাত পা চুম্বন করে বললেন, ‘আকবরের ছোটছোট হাত পাগুলো আমার ভাই সম্রাটের বাবরের মত দেখতে হয়েছে’।
১৫৪৫ জোর করে খেলনা কেড়ে নিলেন
[ঘটনাটি ঘটেছিল, আকবর যখন কাবুলে ১৫৪৫-এ তাঁর কাকা কামরানের দখলে ছিলেন। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন বন্দিত ঐতিহাসিক আবুলফজল তাঁর কর্তৃত্বব্যাঞ্জক লেখার আঙ্গিকে, কামরানের বিপক্ষে। আবুলফজল যেহেতু মুঘল সাম্রাজ্যে স্বয়ং সম্রাট আকবরের ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি বহু প্রত্যক্ষ্যদর্শীর স্মৃতিকথার অনুলেখক, শ্রোতা ছিলেন, আমরা ধরেই নিচ্ছি, তাঁর বয়ানটা সত্য। সে সময় শবেবারাত পড়েছিল ১ নভেম্বর, তাই ঘটনাটির তারিখ নির্দিষ্ট করা যায়। ঘটনার ১৫ দিন পরে সম্রাট আকবরের সঙ্গে তাঁর পিতার মিলন হবে। আকবর খেলনা চাওয়া নিয়ে কামরানের প্রতিক্রিয়ায় মাথায় রাখা দরকার আকবর তখন তিন বছরের। হেনরি বেভারিজের অনুবাদে আকবরনামা আহমদ আলির সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল। অনুবাদের এই অংশটিকে শিরিন মুসভি যথেষ্ট সংস্কার করেছেন]
মির্জা কামরান তখন ফরচুনের রোজারিয়ামের সত্যকারের সাইপ্রাসকে [আকবর] শহর-আরা বাগানে আটকে রেখেছিল। সে সময় কামরান মহামহিমের [আকবরের] উজ্জ্বল কপালে চিরকালীন আধিপত্য এবং সাফল্য অর্জনের মহত্ব দেখে মাঝেমধ্যে নিজের অভাগাভাগ্যের জন্যে বিহ্বল এবং অবাক হয়ে যেতেন। সর্বশক্তিমান বিশ্ব-মোহন ঈশ্বর, সাফল্যের বিজয়ের সমস্ত মহত্ব মহামহিমের ভাগ্যে অর্পণ করে মির্জার আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক পরাজয় নিশ্চিত করলেন এবং মির্জা যতই জীবন থেকে পরিতুষ্টি সংগ্রহ করার চেষ্টা করুক না কেন সে সব আনন্দ শুধুই তার জীবনে বিরক্তি উৎপাদন করছিল। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, নিজের সম্মানে মির্জা [কামরান] ভোজ আয়োজনের দিন, তিনি মহামহিম সম্রাটকে [আকবরের] তলব করলেন এবং শবে-বরাতের দিন আচারের অঙ্গ হিসেবে তিনি পুত্র ইব্রাহিম মির্জাকে একটি সাজানোগোজানো নাকাড়া উপহার দিলেন। মহামহিম সম্রাট আকবর জানতেন এই নাকাড়া একদিন সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে তাঁর নামে বাজবে। তিনি ভাবলেন সেটি তার কব্জাতেই রাখা যাক। বিশ্বাসঘাতক মির্জা, মহামহিমের হাতে সেই নাকাড়াটি দিতে অস্বীকার করেও নাকাড়ার জন্যে দুই শিশুকে লড়িয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ভাঁজলেন। মির্জা ইব্রাহিম যেহেতু দুই শিশুর মধ্যে বড় এবং দেখতে শক্তপোক্ত, তাই তিনি হয়ত ভেবেছিলেন নাকাড়া নিয়ে দ্বন্দ্ব হলে তাঁর পুত্রই জিতবে; ফলে মহামহিমের কাকা দুই শিশুকে কুস্তি লড়িয়ে দেখতে চাইলেন কে জেতে। ঠিক হল যে জিতবে, নাকাড়াটা তাঁর হবে।
মির্জা কামরানের সম্পদ দেখনদারিতে অথবা ইব্রাহিম মির্জার বয়স এবং বড়সড় চেহারায়, স্বর্গের দুয়ায় এবং মহাকালের পৃষ্ঠপোষকতায় বড় হয়ে ওঠা মহামহিম বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হন নি; মির্জা নিজের আনন্দের জন্যে মহামহিমের ওপর খেলার শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিল, মহামহিম সে সব শর্ত শুনে, মনমরা না হয়ে আরও উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন। এর আগে নানান ঘটনায় তিনি ক্রমশঃই মির্জার দুঃখের কারন হয়ে উঠছিলেন। বাল্যাবস্থাতেই মহামহিমের আচার ব্যবহার মির্জার জীবনে অপার বিস্ময় জাগিয়ে তুলছিল। তিনি ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা এবং নির্দেশনায় জামার হাতা গুটিয়ে কোমর বেঁধে শক্ত বাহু তুলে অসীম ক্ষমতায় ঘটনার মুখোমুখি হতে এগিয়ে গেলেন। মনে হচ্ছিল যেন তিনি কত কাল প্রশিক্ষিত কুস্তিগিরদের অধীনে কুস্তি খেলার তত্ত্ব অনুসরণ করেছেন। অসম দক্ষতায় তিনি হাতটি প্রতিপক্ষের কোমরে বেড় দিয়ে ধরে তাকে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিলেন। উপস্থিতদের মুখ থেকে হর্ষচিৎকার বেরিয়ে এল, আর পিছনে, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মুখ থেকে ‘দুঃসাহসী’ ‘বীর’ ইত্যাদি শব্দ শোনা যেতে লাগল। সম্রাট, বিজয়ী, সর্বশক্তিমানের ছায়া মহামহিম বিজয়ী হয়ে নাকাড়ার অধিকারী হয়ে নাকাড়া বাজালেন। এটাই ছিল মাটির ওপরে আর আকাশের তলায় ভবিষ্যতের সম্রাটের প্রথম জয়ের নাকাড়া বাদন।
মির্জা কামরান দুই শিশুর কুস্তিকে, তাঁর এবং মহামহিম জাহানবানির (হুমায়ুন) মধ্যে লড়াইয়ের পরীক্ষা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কুস্তি যুদ্ধের ফলে তিনি অশুভ অমঙ্গলের ছায়া দেখে আতঙ্কিত হয়ে নিরন্তর হতাশা প্রকাশ করতে থাকলেন, আর মহামহিম সম্রাটের [আকবর] পক্ষের মানুষেরা, অসীম আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলেন এবং এই বিজয়কে শুভ লক্ষ্মণ গণ্য করতে লাগলেন।
বাহুবলে মহামহিম যে নাকাড়ার দখল অর্জন করেছেন, সেটি তার ছোট্ট ছোট্ট হাতে বাজাতেনো শুরু করতেই রাজকীয় ভৃত্য, অনুগামীদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ উঠল। ঘটনাক্রম তাঁর পরিকল্পনামাফিক না চলায় কামরান আশংকার লক্ষ্মণে হতাশ হলেন এবং [আকবরের] ভাগ্য পরিবর্তনে, তাকে তখনও স্তন্যপান ছাড়াবার সময় না এলেও, মির্জা আকবরকে স্তন্য পান ছাড়াবার নির্দেশ জারি করলেন। তিনি জানতেন, যে ব্যক্তি ঐশ্বরিক পৃষ্ঠপোষণায় স্বর্গের দুগ্ধ পান করেন, এবং দৈবী দাইদের থেকে পুষ্টি আহরণ করেন, এই ধরণের চক্রান্ত করে তাঁর কোনও ক্ষতি করা যায় না এবং যে মানুষটার রক্ষাকর্তা হন স্বয়ং সর্বশক্তিমান তাকে এই ধরণের হীন চক্রান্তে কাবু করা যায় না। (চলবে)