সম্রাট আকবর, মা হামিদা বানু বেগমের নাম রাখেন মারিয়ম মাকানি বা কুমারী মেরির প্রাসাদ। মাথায় রাখতে হবে পবিত্র কোরানে ৩০টি কবিতায় কুমারী মেরির বন্দনা করা হয়েছে। জাহাঙ্গিরের সময়েও মেরির বন্দনায় মায়ের নাম রাখা হয় মারিয়ুজ্জামানি বা যুগের মেরি। কোনও কোনও গবেষক দাবি করেছেন জাহাঙ্গির সরকারি চিঠিতে কুমারী মেরি আর খ্রিষ্টের ছবি সিল হিসেবে ব্যবহার করতেন। আংরাখার নিচে ক্রুশও ঝোলাতেন। আকবর এবং জাহাঙ্গির প্রাসাদের ছাদে শখ করেই কুমারী মেরি এবং খ্রিষ্টের ছবি আঁকিয়েছিলেন।

আকবর এবং জাহাঙ্গির উভয়েই ইওরোপিয় শিল্পকলা নিয়ে প্রভূত উৎসাহ দেখিয়েছেন। আকবরকে ১৫৮০তে জেসুঈট পাদ্রিরা আন্টওয়ার্পের পলিগ্লট বাইবেল উপহার দেন। তা ছাড়াও মুঘল দরবারে ডাচ শিল্পী পিটার ভ্যান্ডার হাইডেন, পাইটার হুই, জেরার্ড ভন কাম্পেন এবং উইরিক্স ভাইদের ছবি উপহার দেওয়া হয়। এর পর থেকে মুঘল চিত্রশিল্পে ইওরোপিয় চিত্রশিল্পের ছোঁয়ায় ছবিতে প্রধান চরিত্রগুলোর মাথায় পিছনে আভা এবং অন্যান্য খ্রিষ্টিয় অনুষঙ্গ জোড়া হতে থাকে। বিশেষ করে ম্যাডোনা এই সময় মুঘল ছবিতে বহুবার উপস্থিত হয়েছেন।

‘ভার্জিন মেরির ছবি হাতে জাহাঙ্গির’ ছবিটিতে উভয় চরিত্রের মাথায় পিছনে জ্যোতির্বলয় দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলেছেন জাহাঙ্গিরের মায়ের নাম যেহেতু মেরির নামে দেওয়া হয়েছে, এরি ছবিটা মারিয়ুজ্জামানিরও হতে পারে।

১৫৭৯র সেপ্টেম্বরে আকবর গোয়ায় খ্রিষ্ট ধর্ম বিষয়ে জানতে মূল যাজকের কাছে মুঘল রাজদূত পাঠিয়েছিলেন। ‘আমি রাজদূত আবদুল্লা এবং ডমিনিক পেরেজকে (আরমেনিয় খ্রিষ্ট, দুবাস বা দোভাষী) পাঠালাম; তাদের হাতে আপনি ধর্মের বই, বিশেষ করে গসপেল দিয়ে দু’জন জ্ঞানী যাজক পাঠাবেন; আমি ধর্মের মূল সূত্রটি আত্মস্থ করতে চাই’; এই দূতিয়ালির মধ্যে দিয়ে শুরু হল মুঘল আর জেসুঈটদের দীর্ঘকালের সুসম্পর্ক এবং মুঘল আর পারসিক ছবিতে ম্যাডোনা আর খ্রিষ্টের উপস্থিতি যুগের।

নাদির শাহের তাণ্ডবে ধ্বংস হওয়ার আগে পর্যন্ত দিল্লিতে আরমেনিয়দের দুটি গির্জা ছিল। প্রত্যেক বছর খ্রিষ্ট দিবসে এই দুই গির্জায়, মুঘল রাজপুত এবং অন্যান্য অভিজাতদের সামনে খ্রিষ্ট নাটক আয়োজিত হত। ১৬২৫-২৬এ তারা সম্রাট জাহাঙ্গিরকে উপস্থিত থাকার জন্যে অনুরোধ করে। বাল্যকালে তিনি আগরায় বাবার সঙ্গে নাটক দেখতে যেতেন। ফ্রান্সিসকিয় পঞ্জিকায় বলা হয়েছে এই সব নাটকে ছোট ছেলেমেয়েরা দেবদূতের পোষাক পরে খ্রিষ্টদিবসের রাতে আবির্ভূত হত। উপস্থিত সম্রাটের মাথায় গোলাপের পাঁপড়ি ছড়াতেন যাজক এবং অন্যান্যরা।

খ্রিষ্টদিনে সকালে আকবর তার দরবারের অভিজাতদের নিয়ে যিশুর জন্মস্থান হিসেবে প্রতীকী ছলন গুহা দেখতে আসতেন। সম্রাটের দর্শন শেষ হয়ে চলে গেলে শাহী জেনানার মহিলারা আসতেন। জাহাঙ্গির লাহোরের চার্চে একবার মোমের বাতি উপহার দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক রোনাল্ড ভিভিয়ান স্মিথ দিল্লি আননোন টেলস অব আ সিটিতে বলছেন সম্রাট গির্জায় খ্রিষ্ট উপাসনায় অনেক সময় বিশপের মত সেজে ঘন্টা বাজাতেন এবং ক্যারল গাইতেন।