| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মুহম্মদ জাফর ইকবাল-এর ছোটগল্প ‘পোকা’

Reporter
মুহম্মদ জাফর ইকবাল / ১০৮৮ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০২২

বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি ক্রাউস তাঁর দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ভিডি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করছেন স্বাভাবিক থাকার জন্য, কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, তাঁর হাত দুটি কাঁপছে। ভিডি স্ক্রিনের ভেতর থেকে একটি রাক্ষুসে পোকার ত্রিমাত্রিক ছবি তাঁর ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।

এটি সত্যি নয়, এটি শুধু একটি ছবি; তার পরও তিনি তাঁর মাথা সরিয়ে এই পোকাটির কাল্পনিক স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন।

ক্রাউসের ব্যক্তিগত সহকারী মেয়েটি তাঁর দিকে তাকিয়েছিল, সে নরম গলায় বলল, ‘মহামান্য ক্রাউস, আমি ভিডি স্ক্রিনটি বন্ধ করে দিই?’

বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি ক্রাউস কাঁপা গলায় বললেন, ‘না, লানা বন্ধ করো না। আমি দেখতে চাই।’

‘এখানে দেখার বিশেষ কিছু নেই মহামান্য ক্রাউস। পঙ্গপালের আরেকটি ঝাঁক উত্তরাঞ্চলে হানা দিয়েছে। শস্য খেতের সব শস্য খেয়ে ফেলছে। এর মধ্যে দেখার মতো নতুন কিছু নেই।’

‘আছে। পঙ্গপালের এই প্রজাতিটি রাক্ষুসে প্রজাতি। এটি অনেক বড়, অনেক বেশি আগ্রাসী। এটি অনেক দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে।’

‘সেটি নতুন তথ্য নয়, মহামান্য ক্রাউস। আপনি দু বছর আগে এই নতুন প্রজাতির পঙ্গপালের অস্তিত্বের কথা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।’

বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি ক্রাউস মাথা ঘুরিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী লানার দিকে তাকালেন, নিচু গলায় বললেন, ‘আমি বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি, আমার অশুভ ভবিষ্যদ্বাণী করার কথা নয়। আমার দায়িত্ব অশুভ ভবিষ্যৎ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা।’

‘আপনি চেষ্টা করেছিলেন মহামান্য ক্রাউস। পৃথিবীর আবহাওয়ার পরিবর্তনে অসংখ্য নতুন কীটপতঙ্গের জন্ম হয়েছে, সেগুলো বংশবৃদ্ধি করেছে, আপনার কিছু করার ছিল না।’

বৃদ্ধ ক্রাউস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তুমি দেখেছো লানা আমি চেষ্টা করেছিলাম। পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি নিয়েও আমরা কীটনাশক কেমিক্যাল ব্যবহার করেছি। আমরা কীট ধ্বংস করার জন্য বিশেষ ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে সেগুলো ব্যবহার করেছি। আমরা জিনেটিক প্রক্রিয়ায় কীটপতঙ্গরা যেন বংশ বৃদ্ধি করতে না পারে সে জন্য তাদের ক্লীব করে দিয়েছি। কিন্তু তার পরও তাদের পরাস্ত করতে পারিনি।’

কথা বলতে বলতে বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতির গলা ধরে এলো, তিনি প্রায় ভেঙে পড়লেন এবং তাঁকে একজন পরাজিত মানুষের মতো দেখাতে লাগল। লানা কী বলবে বুঝতে না পেরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি ক্রাউস দীর্ঘ সময় চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, ‘আমি পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারিনি। পঙ্গপালের ঝাঁক পৃথিবীর এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, একটি শস্য খেতের পর আরেকটি শস্য খেত উজাড় করে দিচ্ছে। গত বছর ফসল বলতে গেলে কিছুই হয়নি। এই বছর যেটুকু হয়েছিল, গত কয়েক সপ্তাহে শেষ হয়ে গেছে। পৃথিবীতে কোনো শস্য নেই। গুদামজাত শস্য দিয়ে মানুষ বেঁচে আছে। অনেক জায়গায় এর মধ্যে দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা। ভবিষ্যতে কী হবে আমি সেটা চিন্তা করতে ভয় পাচ্ছি। আমি এটা সহ্য করতে পারছি না লানা।’

লানা বলল, ‘আপনি এই পুরো বিপর্যয়টিকে কেন নিজের ব্যর্থতা হিসেবে নিচ্ছেন? এটি একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আপনার নেতৃত্বে পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গেছে, কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আপনার হাত নেই মহামান্য ক্রাউস। আমরা অতীতে অনেকবার দেখেছি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে নগরী ধুলায় মিশে গেছে, ভয়ংকর ভূমিকম্পে লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে, মহাকাশ থেকে ছুটে আসা উল্কার আঘাতে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে, ভয়ংকর ভাইরাস পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে, এটিও সে রকম একটি বিপর্যয়। অন্য বিপর্যয় থেকে এটি ভিন্ন কারণ। আপনি এর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, পৃথিবী প্রস্তুতি নিয়েছিল, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি। আমরা এখনো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখিনি। আমাদের প্রকৃতির পাশাপাশি থাকতে হয়। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।’

বৃদ্ধ ক্রাউস কষ্ট করে হাসার চেষ্টা করে বললেন, ‘লানা, ছোট শিশুকে যেভাবে কিছু বোঝানো হয় তুমি আমাকে সেভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছো!’

লানা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘আমি দুঃখিত প্রফেসর ক্রাউস, আমি খুব লজ্জিত। আপনার মতো একজন মানুষকে কিছু বলার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। আপনাকে এ রকম ব্যাকুল হতে দেখে আমি এ রকম নির্বোধের মতো আচরণ করছি।’

‘না। তুমি মোটেও নির্বোধের মতো আচরণ করছো না। এ রকম একটা সময়ে মানুষকে যেভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়, সাহস দিতে হয়, তুমি ঠিক সেভাবেই সাহস দিচ্ছো, সান্ত্বনা দিচ্ছো। তোমায় ধন্যবাদ লানা।”

বৃদ্ধ ক্রাউস ভিডি টিউবের দিকে তাকিয়ে রইলেন, সামনে বিশাল একটি শস্য খেত দেখা যাচ্ছে। আকাশে কালো মেঘের মতো পঙ্গপালের ঝাঁক ছুটে আসছে। কীটনাশক তাদের ওপর কাজ করে না, ব্যাক্টেরিয়া তাদের স্পর্শ করে না, জিনেটিক প্রযুক্তিকে তারা হার মানিয়ে বংশবৃদ্ধি করছে। ভিডি স্ক্রিনে প্রথমে একটি-দুটি পতঙ্গকে দেখা গেল। তারপর শত শত পতঙ্গ নিচে নেমে এলো। হিংস্র শ্বাপদের মতো সেগুলো শস্য খেতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কর্কশ শব্দ করে সেগুলো শস্যের কচি দানা খেতে থাকে, সেই দৃশ্য দেখে বৃদ্ধ ক্রাউসের শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। তিনি দুর্বলভাবে বললেন, ‘আমি আর সহ্য করতে পারছি না লানা।’

লানা এগিয়ে এসে বলল, ‘ভিডি টিউবটি বন্ধ করে দিই?’

‘দাও। বন্ধ করে দাও। আমি এই কুৎসিত পোকাটি আর দেখতে পারছি না।’

লানা ভিডি টিউবটি বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো। বৃদ্ধ ক্রাউস একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কীটপতঙ্গের প্রতি আমার এক ধরনের ভীতি আছে। এটি আসলে ফোবিয়া। আমি কখনো ভাবিনি এই কীটপতঙ্গই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।’

লানা কোনো কথা বলল না। বৃদ্ধ ক্রাউস বললেন, ‘সেই শৈশব থেকে আমি পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ দেখে এক ধরনের তীব্র আতঙ্ক, তীব্র ঘৃণা অনুভব করি। জীববিজ্ঞানের ক্লাসে পোকামাকড় সম্পর্কে পড়তে গিয়ে যখনই তার ছবি দেখেছি, মডেল দেখেছি, আমি আতঙ্কে শিউরে উঠেছি। ল্যাবরেটরিতে যখন পোকামাকড় মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখতে হয়েছে, আমার গা গুলিয়ে এসেছে।’

লানা বলল, ‘মহামান্য ক্রাউস, আপনি আমার থেকে অনেক ভালো করে জানেন, অনেক মানুষের ভেতরই এ রকম ফোবিয়া আছে। কেউ সাপ দেখে ঘৃণায়-আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যায়, কেউ মাকড়শাকে ভয় পায়, কেউ উঁচু জায়গায় উঠতে পারে না। এগুলো ফোবিয়া।’

‘হ্যাঁ। আমার ফোবিয়া হচ্ছে কীটপতঙ্গে। একটা জীবন্ত পোকা যদি আমার দিকে এগিয়ে আসে, আমি আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যাই। এমন কী একটা মৃত পোকা দেখলে আমার গা গুলিয়ে আসে। আমি সেটার দিকে তাকাতে পারি না!’

লানা কিছু বলল না, এক ধরনের মমতা নিয়ে অনেকটা শিশুর মতো এই জ্ঞানতাপস বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইল।

বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি ক্রাউস একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আর কয়েক দিনের ভেতরেই এই পঙ্গপালের ঝাঁক নগরে প্রবেশ করতে শুরু করবে। সেই দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারব না। কুৎসিত পতঙ্গের ঝাঁক আমার বাগানের ফুলগাছ, সবুজপাতা কচকচ করে খেতে থাকবে, সেই দৃশ্য দেখে আমি পাগল হয়ে যাব। তাই আমি ঠিক করেছি-‘ বিজ্ঞানী ক্রাউস কথা শেষ না করে হঠাৎ থেমে গেলেন।

লানা জিজ্ঞেস করল, “কী ঠিক করেছেন?’

‘আমি শীতল ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে যাব।’

‘শীতল ঘরে ঘুমিয়ে যাবেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কত দিনের জন্য ঘুমিয়ে যাবেন?’

‘আমি সেটা ঠিক করিনি। পৃথিবীর মানুষ যখন এই কীটপতঙ্গের সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে পারবে, আমি তখন আবার জেগে উঠব। যখন দুর্ভিক্ষ বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষ আবার পেট পুরে খেতে পারবে, কোথাও কোনো অভুক্ত ক্ষুধার্থ মানুষ থাকবে না, আমি তখন জেগে উঠব।’

লানা বিষণ্ন দৃষ্টিতে বিজ্ঞান আকাদেমির সভাপতি ক্রাউসের দিকে তাকিয়ে রইল।

****

হালকা একটি সংগীতের সুর শুনতে শুনতে ক্রাউস চোখ খুলে তাকালেন। ছোট ক্যাপসুলের ভেতর এক ধরনের মিষ্টি সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি শীতল ঘরে ক্যাপসুলের ভেতর ধীরে ধীরে জেগে উঠছেন। আবছা আবছাভাবে তাঁর মনে পড়ল তিনি এই শীতল ঘরে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন। ভয়ংকর কীটপতঙ্গ-পোকামাকড়ের আক্রমণে সারা পৃথিবী যখন দিশেহারা, তখন তিনি শীতল ঘরে ঢুকেছিলেন। কথা ছিল পৃথিবীর মানুষ যখন আবার পুরোপুরি এই ভয়ংকর কীটপতঙ্গ-পোকামাকড়-পঙ্গপালের হাত থেকে মুক্ত হতে পারবে, দুর্ভিক্ষের ছোবল থেকে উদ্ধার পাবে, তখন যেন তাঁকে জাগিয়ে তোলা হয়। তাঁকে এখন জাগিয়ে তোলা হচ্ছে, যার অর্থ পৃথিবী তার সমস্যার সমাধান করেছে। কত দিন সময় লেগেছে? দশ বছর? ১০০ বছর? হাজার বছর? ক্রাউস ক্যাপসুলের ভেতর তাকালেন, সামনে প্যানেলের দিকে তাকালেন। অনেক রকম আলো, অনেক বাতি, স্ক্রিন জ্বলছে-নিভছে, সংখ্যা পাল্টে যাচ্ছে, এর মধ্যে তিনি অতিক্রান্ত সময়টা খুঁজে পেলেন না। ক্রাউস একটু অবাক হলেন, তিনি ভেবেছিলেন শীতল ঘরের ঘুমন্ত মানুষ যখন দীর্ঘ একটা নিদ্রা থেকে জেগে উঠবে, তখন সে প্রথম জানতে চাইবে কত দিন থেকে সে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু এই ক্যাপসুলে শুয়ে সেটি সহজে বোঝার উপায় নেই।

ক্রাউস অনুভব করলেন, একটা আরামদায়ক উষ্ণতা খুব ধীরে ধীরে তার শরীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। তিনি ধীরে ধীরে তাঁর হাত-পা-মাথা-ঘাড়-শরীরে অনুভূতি ফিরে পেতে শুরু করেছেন। ক্রাউস চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন। একটু পরেই ক্যাপসুলের দরজা খুলে যাবে, তখন তিনি কী দেখবেন?

ক্যাপসুলের দরজা খুলতেই তিনি দেখলেন বেশ কয়েকজন মানুষ তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়ল। একজন হাসি মুখে বলল, ‘মহামান্য ক্রাউস, উষ্ণ পৃথিবীতে আপনাকে আমন্ত্রণ। শীতল ঘরে আপনার নিদ্রাটি নিশ্চয়ই শান্তিপূর্ণ হয়েছিল!’

মানুষটির উচ্চারণ নিখুঁত, পৃথিবীতে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলে উচ্চারণ পরিবর্তন হতো। যার অর্থ পৃথিবী খুব অল্প সময়েই তার সমস্যার সমাধান করেছে। মানুষটি তাঁকে মহামান্য ক্রাউস বলে সম্বোধন করছে ঠিক, যেভাবে তাঁকে পৃথিবীতে সবাই সম্বোধন করত। মনে হয় মানুষটি তাঁকে চেনে।

সাদা পোশাক পরা মানুষগুলো তাঁর দুই হাত ধরে ক্যাপসুল থেকে বের করে আনল। শীতল ঘর থেকে বের হওয়ার পর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন। তাঁর খুব জানতে ইচ্ছে করল কত বছর তিনি শীতল ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক কী কারণে কে জানে তাঁর সেটা জিজ্ঞেস করতে একটু সংকোচ হলো। পৃথিবীর দুঃসময়ে সেখান থেকে পালিয়ে শীতল ঘরে ঘুমাতে চলে যাওয়া নিয়ে তাঁর ভেতরে কোথায় জানি একটু হীনম্ম্যনতা আছে। মনে হয় সে জন্যই তিনি সহজভাবে কথা বলতে পারছিলেন না।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উষ্ণ পানিতে তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করলেন, তাঁকে নতুন কাপড় পরিয়ে আবার পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসা হলো। সেখানে খাবার টেবিল, টেবিলে খাবার সাজানো। টেবিল ঘিরে বেশ কয়েকজন মানুষ বসে আছে। ক্রাউস টেবিলের ওপর সাজানো খাবারের দিকে তাকালেন, কী চমৎকার খাবার, দেখে তাঁর চোখ জুড়িয়ে গেল। পৃথিবী নিশ্চয়ই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে, তা না হলে এত চমৎকার খাবার কোথা থেকে এলো?

ক্রাউস তাঁর জন্য রাখা চেয়ারে বসে প্লেটটি নিজের কাছে টেনে আনলেন। ডিশ থেকে খানিকটা খাবার নিজের প্লেটে তুলে নিলেন। চামচ দিয়ে খাবারটা মুখে তুলে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মনে হলো সারা জীবনে তিনি এত সুস্বাদু খাবার খাননি।

ঠিক তখন দরজা খুলে একটি মেয়ে এসে ঢুকল। তিনি মেয়েটিকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী লানা। ক্রাউস অবাক হয়ে বললেন, ‘লানা! তুমি?’

‘হ্যাঁ, মহামান্য ক্রাউস! আমি এই মাত্র খবর পেয়েছি আপনাকে শীতল ঘর থেকে বের করা হচ্ছে, খবর পেয়েই আমি ছুটে এসেছি!’

‘আমি কত দিন শীতল ঘরে ঘুমিয়েছিলাম?’

‘তিন মাস। ঠিক করে বললে দুই মাস ২৮ দিন।’

‘এত কম সময়? এত কম সময়ে পৃথিবী কীটপতঙ্গ-পঙ্গপালের সমস্যা সমাধান করে ফেলেছে?’

লানা হাসি মুখে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’

ক্রাউস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিভাবে তারা পোকামাকড়-পঙ্গপালকে নিশ্চিহ্ন করে দিল?’

লানার হাসি আরো বিস্তৃত হলো, বলল, ‘খেয়ে।’

‘কী বললে?’

‘পৃথিবীর মানুষ পোকামাকড় খাওয়া শুরু করেছে?’ ‘কীটপতঙ্গ-পোকামাকড় অসম্ভব সুস্বাদু আর পুষ্টিকর। এই টেবিলের সব কিছু পোকামাকড় দিয়ে তৈরি। আপনি আপনার প্লেটে যেটা নিয়েছেন সেটা পঙ্গপালের ডিম থেকে বের হওয়া ছোট লার্ভার একটা স্যুপ! কী চমৎকার খেতে, তাই না?’

ক্রাউস বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। লানা বলল, ‘এখন যখন আকাশ থেকে পঙ্গপালের ঝাঁক কোথাও ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের আনন্দের সীমা থাকে না। এটা বিশুদ্ধ প্রোটিন। পৃথিবীর মানুষের খাবারের সমস্যা চিরদিনের মতো মিটে গেছে। আর কখনো আমাদের খাবার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।’

লানা তার পকেট থেকে ছোট একটা প্যাকেট বের করে সেখান থেকে বড় একটা পোকা বের করে তেলে ভাজা মুচমুচে, কচ কচ করে সেটা খেতে থাকে।

ক্রাউস তাঁর দীর্ঘদিনের সহকারীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।

প্রথম প্রকাশ : বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev