সুকীর্তি যা বোঝে তাই বলে। যা বোঝে সেটাই শেষ কথা। যা বোঝে সেটাকেই সে কথার জোরে প্রতিষ্ঠিত করে। কোন একটা বিষয় নিয়ে যা ভাবে সেটাই শেষ ভাবনা। তার ভাবনার বাইরে কেউ কথা বললে কথার বাণে তাকে জর্জর করে। অন্যের ভাবনার তার কাছে কোন মূল্য নেই। অন্যের মতামতের কোন মূল্য নেই তার কাছে। কেউ তার অভিমত পোষণ করতে গেলেই তাকে থামিয়ে দেয় সে। তারপর নিজের কথা বলে, বলতেই থাকে। কেউ শুনলো, নাকি শুনলো না তা তার দেখার সময় নেই। সে বলেই যাবে। কথা বলার সময় তার এই একাধিপত্যতা সবাই ভালো ভাবে নেয় না। কথা বলার অধিকার সবার আছে। সে হরণ করবে কেন? তাই তার সাথে কেউ কথা বলতে চায় না, কথা বললেও কথা বাড়াতে চাই না। কথা বলার আশ্চর্য গুণ আছে সুকীর্তির। কথা জানার কারণে সবাই তার সামনে স্তমিত হয়ে যায়। বাক্য জানে, জানে বাক্যবাণ। তর্ক করে, তর্কে যুক্তি থাকে, সব যে যৌক্তিক যুক্তি তাও না, খোঁড়া যুক্তিও থাকে। কথায় পেরে উঠে না, বা কথা বলতে গেলে অপমানিত হওয়ার ভয়ে কেউ তার সাথে কথা বলতে যায় না। যেই কথা বলতে যাক না কেন তার কথার সাথে একমত হতে হয়, হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকাতে হয়। নিজের মত পোষণ করার কোন উপায় নেই। এই বিচিত্র চরিত্রের মানুষটাকে নিয়ে তার পিছনের মানুষ হাসি তামাশা করে, করে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ।
চায়ের দোকানে যখন থাকে, কথা বলার নেতৃত্ব তার কাছেই থাকে। কোন এক চাখোর যখন কোন একটি বিষয়ে কথা বলতে যাবে ওমনি তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ঐ বিষয়ে কথা বলতে থাকবে। অন্য আর এক চাখোর অন্য একটি বিষয় উত্থাপন করতেই এবার ঐ বিষয়ে সে কথা বলতে থাকবে। সব বিষয়ে তার যেন জ্ঞান আছেই। কেউ যদি একটা চুরির ঘটনা বলতে যায় ওমনি সে পাঁচটা চুরির ঘটনা বলে। যে বিষয়ই হোক না কেন যা জানে তার সাথে রং মিশিয়ে বলে বলে জিতবেই সে। অন্য কেউ কিছু বলতে গেলেই সুকীর্তি বলে, ছাই জানিস, না জেনে বলবি না। না জানলে বলবি না। আমি বলছি শোন…
আবার সুকীর্তি বলা শুরু করবে। রঙে মোড়া, মিথ্যায় ভরা, মনগড়া, বানানো কথা মিথ্যা না সত্য বোঝা যায় না। তার কথা বলার ধরণ-কৌশলে বাধা দেয়া যায় না। তার্কিকের সাথে তর্ক করতে গেলে তথ্য থাকতে হয়, তথ্য থাকলেই হয় না, বলার ধরণও জানতে হয়। কেউ তার সাথে কথা বলতে গেলেই দু চারটা কথা বলার পর আর কথা পায় না। কিন্তু সুকীর্তির কথা ফুরায় না। বেলা ফুরায়, কিন্তু তার মুখ থেকে কথা ফুরায় না। কথা না শুনে কেউ উঠে যেতে চাইলে সুকীর্তি বলবে, ভালো কথা শুনবি না তো! ভালো কথা কি ভালো লাগে!
অগত্যা না শুনতে চাওয়া ব্যক্তিকে আবার বসতে হয়। বসে বসে তার কথা শুনতে হয়। কিছু একটা বলতে গেলেই সেই কথার একটু অংশ শুনেই এবার সুকীর্তি ঐ বিষয়ে বলতে শুরু করে। ঐ বিষয়ে সে একটা গল্পও জানে। এবার সে গল্প বলা শুরু করবে। কে জানে কখন সেই গল্প বলা শেষ হবে! ধৈর্য ধরে শুনতে হবে, অমনোযোগী হলে কি বলেছে জানতে চাইবে। না বলতে পারলে বলবে, কথা শুনিস না কেন? মন কোথায় দিস? বন-বাদাড়ে?
এই সুকীর্তিকে নিয়ে পরিবারের মানুষও আছে বিপদে, ভয়ে। বিশেষ করে তার বৌ চরম বিপদে আছে। কখন কি বলে বসে এই ভয়ে থাকে। মান-সম্মান হারানোর ভয়ে থাকে। ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার ভয়ে থাকে। তার বৌও বাকবহুল, কিন্তু তার মত একরোখা না। এ কারণে পেরে উঠে না। তার বৌ তাকে সয়াবিন তেল আনতে বললে সয়াবিন তেলের ক্ষতিকর দিক বলতেই থাকে। কিন্তু বাজার থেকে ফেরার সময় ঐ সয়াবিন তেল নিয়েই ফিরবে। তার বৌ যদি এবার তাকে সেই সয়াবিন তেল আনার কারণ জানতে চায়, তখন সুকীর্তি বলবে, বাজারে সরিষার তেলের যোগান নেই।
এবার যোগান কি এই নিয়ে মিনিট পাঁচেক বকবে। এভাবে সংসারে অসহ্য রকমের যন্ত্রণা দিচ্ছে সে।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও একটি দলের প্রশংসা করতে করতে গালে ফ্যানা তুলে ফেলবে। তার দল জিতবেই, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা উপস্থাপন করে অন্যের পছন্দকে তার দলের দিকে আনার চেষ্টা করতেই থাকে। বাড়ির ছোট-বড় সবাই তার চরিত্র খুব ভালো করে জানে, তাই কথা বলে পরিবেশ দূষিত করে না। তারপর যখন তার পছন্দের দল হেরে যায় তখন এ খেলেনি, ও খেলেনি, সে খেলেনি বলে বলে অস্থির করে তোলে। নিজের পছন্দের দল হেরে গেলে যে চুপ থাকতে হয় তাও তার দ্বারা হয় না।
এভাবে অন্যকে দমিয়ে, অন্যকে থামিয়ে নিজে জেতার চেষ্টা তার ভেতর প্রবল। এই জাতীয় স্বভাব দোষে তার বন্ধুরা তার সামনে আসে না, তার ছোট-বড় ভাই-ব্রাদার সামনে আসে না, তার পরিবারের মানুষ তার সামনে আসে না। আর সে ভাবে, সে ভালো কথা বলে বলেই তাকে কেউ পছন্দ করে না। নিজের দোষে মানুষ তার সমাজ হারায়, নিজের দোষ নিজেই ধরতে জানে না, শুধু অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়। সবাই তাকে এড়িয়ে চললেও ঘরের বৌ তাকে এড়িয়ে চলতে পারে না। শিক্ষিত মেয়ে, স্বপ্ন নিয়ে সংসারে এসেছিলো। সুখে-দুখে কত গল্প-আলাপ করবে, কিন্তু স্বামীর সাথে তার দুই মিনিটও কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কথার মধ্যে শুধু নিজেকে জাহির করার চেষ্টা। সে যে কি করতে পারে পাড়ার মানুষ না জানলেও ঘরের মানুষটা তো ভালোই জানে। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে বৌর সাথে কথা বললে বৌর কি ভালো লাগে! বৌও তাই রেগে গিয়ে বলে, বড় বড় গল্প মুখে! সংসার চালাতে পারো না, বিশ্ব নিয়ে গল্প! সারা দেশের খবর রাখো, সংসারের খোঁজ রাখো না। তরকারি কেনার সামর্থ্য নেই, ডাল কিনে বাড়ি ফেরো।
সুকীর্তি বৌর মুখ থেকে অপমানসুলভ এসব কথা শুনে অপমানিত হয় না। বৈশ্বিক বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ে বৌকে জ্ঞান দিতে থাকে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে জ্ঞান দিতে থাকে। এসব কথা শুনে তার বৌ তার উপর এত পরিমাণ বিরক্ত হলো বলে বোঝানো দায়। কিন্তু বৌর এই রাগ তার চোখে পড়ে না। বলে, বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরো মনোনিবেশ দেয়া প্রয়োজন।
সংসার চলে না, সেই সংসারে সরকারের আলোচনা অবান্তর গল্পের মত৷ নিজের ভাঙা বাথরুমের মাছি দশ পরিবারের সকল সদস্যের পাতলা পায়খানার কারণ হচ্ছে তার মুখে যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গল্প চলে শুনতে বড়ই তিক্ত লাগে।
এভাবেই দিন চলছে, কিন্তু সুকীর্তির বড় গলা থামছে না। চায়ের দোকানে মেম্বার সাহেব তাঁর কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক গল্প করছেন। সুকীর্তি তার মধ্যে নাক ইচ্ছেমত গলালো। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে জো বাইডেন, ডেবিড ক্যামেরুন থেকে বরিস জনসন, ভ্লাদিমির পুতিন জেলেনস্কির মধ্যে যুদ্ধ সব বলা শুরু করে দিলো। মেম্বার সাহেব তাকে থামিয়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু সুকীর্তি থামার মানুষ না, বললো, মেম্বার বলেই যে আপনি সব জানেন, তা নয়; যে জানে তার কথা শুনতে হবে।
মেম্বার সাহেব ধমক দিয়ে বললেন, তোমার দৌড় আমার জানা। অযথা বকবক না করে কাজ করো, পেটে ভাত যাবে।
সুকীর্তি আশ্চর্য হয়ে বললো, আমার দৌড় জানেন মানে?
এরপর সে পাঁচ সাত জেলার নাম অনর্গল বলে বললো, এসব জেলার চৌদ্দ-পনের জন এমপির সাথে আমার কথা হয়। সবাই আমার পরিচিত।
মেম্বার সাহেব বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন সুকীর্তির এই কথা শুনে। মেম্বারের মুখে মুখে কথা বলছে বলে তাঁর এক কর্মী সুকীর্তিকে বললো, যারা জানে তারা চুপ থাকে। যারা জানে তারা নিজেকে এভাবে জাহির করে হালকা করে না। গুণওয়ালা মানুষের ভারত্ব থাকে। মুখে মুখে এভাবে বাহাদুরি না করে কাজে-কর্মে বাহাদুরি করলে ভালো হয়।
সুকীর্তি এসব কথা শুনে আবার বললো, এমপি-মন্ত্রীদের সাথে আমার সম্পর্ক নেই? বড় বড় সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে আমার যোগাযোগ নেই? ব্যবসায়ীদের সাথে আমার কথাবার্তা হয় না?
টপাটপ প্রশ্নগুলো করে সুকীর্তি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে তা থেকে একটার পর একটা কার্ড বের করতে থাকলো।
মেম্বার সাহেব এ কাণ্ড দেখে একটু হেসে বললেন, ভিআইপি, সিআইপিদের নাম্বার মানিব্যাগে রেখে লাভ নেই। মানিব্যাগে মানি থাকতে হবে। তোমার বৌ বলেছে, তুমি বাজার-সদাই করো না। তরি-তরকারি কেনো না, শুধু ডাল কেনো। মাসের পর মাস ডাল খাচ্ছো, বাইরে এসে গালগল্পে ফ্যানা তুলছো, ঠিক না।
সুকীর্তি এবার ডালের গুণাগুণ বলতে শুরু করলো। ভীষণ বিরক্ত হয়ে মেম্বার সাহেব চায়ের দোকান ত্যাগ করলেন।
চা দোকানদার বললেন, কথা কম বলে কাজ করো। কাজ করলে টাকা আসবে। টাকাতে সুখ।
সুকীর্তি এবার বললো, টাকার প্রতি অত লোভ নেই আমার। শহরে গেলেই তো লাখ লাখ টাকা ইনকাম করতে পারবো। বিঘে বিঘে জমি কিনতে পারবো।
চা দোকানদারকে আর কিছু বলতে দিলো না, বললো, টেলিভিশনটা হয় খবরে দেন, না হয় খেলাতে দেন।
দোকানদার বললেন, খবর শুনে, খেলা দেখে কিছু জানলেই তো তর্ক করতে সুবিধা হয়। আজব একটা মানুষ।
দোকান থেকে ফেরার পথে সুকীর্তির সাথে যার যার দেখা হলো কেউ তার সাথে কথা বললো না। দূর থেকে দেখে কেউ কেউ রাস্তা বদলে ফেললো। রাস্তায় যে ছিলো বাড়ির মধ্যে চলে গেলো। কথা বলার লোক পাওয়া তার জন্য মুশকিল হয়ে গেছে। এক কৃষককে ধরতে পেরেছে, কৃষকটি মন খারাপ করে বসেছিলো। আকাশে মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই, ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কেন বৃষ্টি হচ্ছে না, কেন এত গরম পড়ছে এই নিয়ে এবার সুকীর্তি বলা শুরু করেছে। এসব শুনে কৃষক অসন্তোষ প্রকাশ করতেই সুকীর্তি রেগে গেলো। তার কথা না শুনলে এর আগে কখনো সে এত রাগেনি। রাগান্বিত হয়ে বললো, তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টি হচ্ছে না, কিন্তু কেন এমন হচ্ছে জানতে হবে। বড় বড় দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে।
এটুকু শুনেই কৃষক হাটা শুরু করেছে। এত জ্ঞানের কথা শোনার তার সময় নেই। সুকীর্তি পিছন পিছন হেটে তার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে আবার বলা শুরু করলো। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কৃষক দ্রুত হাটতে শুরু করলো। সুকীর্তি একা একাই বলতে থাকলো, মূর্খ মানুষ জ্ঞানের কথার কি বোঝে!
এভাবে এদিক ওদিক ঘোরে আর জ্ঞান বিতরণ করে সুকীর্তি, কিন্তু ঘরে ফিরতে দেরি করে। সবাইকে কথা দিয়ে দমন করতে পারলেও ইদানিং বৌকে আর দমন করতে পারছে না। লম্বা লম্বা কথা বলে বাইরের মানুষের কাছ থেকে রেহাই পাওয়া যায়, কিন্তু ঘরের মানুষের কাছে লম্বা লম্বা কথা চলে না। গালগল্প চলে না। অতি কথা চলে না। কথা দিয়ে জব্দ নীতি চলে না। বাইরের মানুষের কাছে গল্প করা যায় মাছ, মাংস, দুধ, ডিম খাওয়ার; কিন্তু ঘরের মানুষের কাছে এ গল্প চলে না। বাইরের মানুষের কাছে লাখ লাখ টাকার গল্প করা চলে, কিন্তু ঘরের মানুষের কাছে ঐ ফাঁকা বুলি চলে না। আর তাই এখন বাড়ি এলে সে চুপ থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু কথা বলার স্বভাব যার, চামড়ার মুখটা তার থামে না।
মুখ দিয়ে কথার ফোয়ারা ঝরানো মানুষটি বাড়ি এসে চুপ করে বসে থাকে। মঞ্চ কাঁপানো বক্তাও ঘরে এলে নীরবশ্রোতা। আকাশ বিজেতা ধন্য ব্যক্তিটিও ঘরে নেহাত নগণ্য। জগৎ বিখ্যাত ব্যক্তিও ঘরে অখ্যাত। কর্মক্ষেত্রের সুনামধারী মানুষটিও ঘরে অতি অগণ্য। কারণ ঘরের মানুষটি দুর্বলতার সবটুকু জানে। তার কাছে কোন কিছু জাহির করে জেতা যায় না।
ওদিকে সুকীর্তির বৌ উঁৎ পেতে বসে আছে, কথা বললেই মুখ বরাবর গরম জল ছুঁড়ে মারবে। কোন রকমে রাতটা পার করেই সুকীর্তি সকালে বাইরে বের হয়ে পড়লো। কৃষক দেখলেই ধান, পাট চাষের গল্প দিচ্ছে, ব্যবসায়ী দেখলেই ব্যবসায়ের উন্নতির মন্ত্রণা দিচ্ছে। কথার প্রতিউত্তরে তা ঠিক তা ঠিক না বললে বলছে, কি ভুল বললাম? জ্ঞানীর কথা পঁচে না। যা বলছি সেটাই সত্যি, যা বলবো সেটাই হবে। না ভেবে কথা বলি না।
হ্যাঁ-বোধক মাথা নাচাতে নাচাতে শ্রোতা কেটে পড়ে। কিন্তু এভাবে কত দিন? সুকীর্তির বৌ তার বাবাকে ডেকে এনেছে, কিন্তু কেন ডেকে এনেছে এখনো বলেনি। শ্বশুরমশায়কে পেয়ে সুকীর্তি গল্প শুরু করেছে। সকাল গড়িয়ে দুপুরের খাবার বেলা পার হয়ে যায়, শ্বশুরমশায় সুকীর্তির কথা শুনতেই আছেন। তাঁর জামাই এত কথা জানে তাঁর কল্পনাতেও ছিলো না। বৃদ্ধ মানুষের সাথে কথা বললে তাঁর আর কিছু লাগে না। আর এমন একজন নীরব শ্রোতা পেলে সুকীর্তির আর কিছু লাগে না। নীরব শ্রোতার সাথে সুকীর্তির এই গাল-গল্প বলতে দেখা দেখছে আর সুকীর্তির বৌ জ্বলছে। দ্রুত পদে হেটে এসে বললো, বাবা, তোমাকে ডেকে এনেছি, কারণ তোমার জামাই কোন কাজ করে না। বাজার-সদাই করে না। এভাবে সারাদিন গল্প করে কাটায়।
সুকীর্তি শুনে বললো, কথা বলা ভালো গুণ। মনের কথা চেপে রাখতে নেই। যত কথা বলবে মন তত হালকা হবে।
এটুকু বলতেই সুকীর্তির বৌর হাতে ঝাটা উঠে গেলো। ঝাটা দেখে সুকীর্তির শ্বশুরমশায় থ, সুকীর্তি চুপ। সুকীর্তির বাবা মা দৌঁড়ে এলেন। মা বললেন, বৌমা, এ তোমার কেমন আচরণ, তাও বাবার সামনে?
সুকীর্তির বৌ বললেন, আপনার ছেলে এত কথা বলে কেন? কাজের কথা হলেও হয়। দুটো পয়সা রোজগারের মুরদ নেই, সারা গ্রামের মানুষের জ্ঞান দিয়ে বেড়ায়, গ্রামের মানুষ কি তাকে ন্যূনতমও মূল্যায়ন করে? পরিবারের কর্তা যদি সবার কাছে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের হয়, আপনাদের বলেন আমার বলেন সম্মান তখন কোথায় যায়? যা বোঝে তাই বলে, তার বোঝাটায় কি শেষ বোঝা? যা মনে আসে তাই বলে, কাউকে কথা বলতে দেয় না। কারো কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করে না। এত এত বদাভ্যাস থাকবে কেন একটা মানুষের?
একথা শুনে সুকীর্তি যেই বলেছে, দোষে গুণেই একটা মানুষ। ওমনি তার বৌ দৌড়ে রান্না ঘরে গিয়ে গরম খুন্তি নিয়ে এসে বললো, আর একটা কথা বলেছো তো দুই ঠোঁটে এই গরম খুন্তির ছ্যাকা দেবো। ভালো ভালো কথা বলা শিখেছো, কাজ করা শেখোনি কেন? কাজ না করলে নিজের যে ভালোটা হয় না সেটা শেখোনি কেন?
এসব বলে সুকীর্তির বৌ রান্না ঘরে গেলো। বাবা মা আর শ্বশুরমশায় সুকীর্তিকে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। দুদিন ধরে সে নিজের ঘরে ঢুকছেই না। সে ভেবেই পাচ্ছে না, যে মানুষটা সারারাত জেগে যার কথা শুনতো, সেই মানুষটার মুখ থেকে এখন একটা দুটো কথা বের হলেই সে কেন এত পরিমাণ রেগে যায়!
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ