রূপসী পুরুলিয়াকে ভালবেসেছিলেন মধুসূদন। ১৮৭২ সালের মার্চ মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পঞ্চকোটরাজ নীলমণি সিংহের আইনি উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ছিলেন কাশীপুর রাজবাড়ির সম্মাননীয় অতিথি। অথচ মুখ আবরণীর কারনে তাঁকে ত্যাগ করতে হয় কাশীপুর রাজবাড়ির চাকরি!
পুরুলিয়াকে বিষয় করে মধুসূদন লিখেছিলেন ছয়টি সনেট বা সনেট কল্প কবিতা। কবিতাগুলো হল — ‘পুরুলিয়া’, ‘পরেশনাথ গিরি’, ‘কবির ধর্মপুত্র’, ‘পঞ্চকোট’, ‘পঞ্চকোটস্য রাজশ্রী’, ‘পঞ্চকোট গিরি বিদায় সঙ্গীত’। অনেকেই মনে করেন বাংলা সাহিত্যে ‘পুরুলিয়া’ (পুরুল্যে’র পরিবর্তে) শব্দটি মধুসূদনই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। নিশ্চয়ই কবির দৃষ্টি এড়ায়নি রূপসী পুরুলিয়ার বর্ষাকালীন বৈভব আর শরতের আগমনী বার্তা!
এই পুরুলিয়া থেকেই তাঁকে ফিরে যেতে হয় একপ্রকার পালিয়ে! নগেন্দ্রনাথ সোম তাঁর ‘মধুস্মৃতি’ গ্রন্থে মধুসূদন-এর কাশীপুর ত্যাগ সম্পর্কে এক বিচিত্র কাহিনী শুনিয়েছেন।
“মধুসূদন পঞ্চকোটে উপস্থিত হইয়া রাজ্যের কাজ- কর্ম্মের অবস্থা বড়ই বিশৃঙ্খল দেখিলেন। রাজ্যপরিচালনার কার্য্যে নানা কু-প্রথা প্রচলিত”। মধুসূদন ‘রাজ্যে শৃঙ্খলা’ স্থাপনের চেষ্টা করলে অসাধু রাজ কর্মচারীদের বিরাগভাজন হন এবং চক্রান্তের শিকার হন। রাজার অনুগত ও বয়স্য এক ক্ষৌরকার মধুসূদন এর বিরুদ্ধে অদ্ভুত এক ষড়যন্ত্র করেন। নগেন্দ্রনাথ কে উদ্ধৃত করা যাক — “এরূপ কথিত আছে যে মধুসূদন যখন রাজার সহিত কথাবার্তা কহিতেন তখন একখানি সুগন্ধযুক্ত রুমালে মুখ ঢাকিতেন। অনেকে অনুমান করেন, মধুসূদন অতিশয় মদ্যপান করিতেন বলিয়া — রাজা যাহাতে সুরাঘ্রাণ না পান, সেই জন্য তিনি রুমালে মুখ ঢাকিয়া কথা কহিতেন।” এই মুখ আবরণী হয়ে উঠল মধুসূদন এর বিপদের কারণ। নতুন আইনী উপদেষ্টা কেমন কাজ করছেন জিজ্ঞেস করায় রাজকর্মচারীরা বলেন, “ইনি যেরূপ কর্মদক্ষ, তেমনিই ভদ্রলোক। তবে তিনি একটি অন্যায় কার্য্য করেন”। কি অন্যায় কাজ! উত্তরে কর্মচারী বলেন, “মহারাজ, আপনার যে রাজগাত্রে আমরা স্বর্গের পারিজাতের সৌরভ পাইয়া থাকি, — ইনি বলেন কিনা, সেই সুরভিত রাজগাত্র অতিশয় গন্ধযুক্ত! “রাজা এর প্রমান চাইলেন। মধুসূদন রাজার সঙ্গে দেখা করতে এলে পূর্বেকার মতই মুখে রুমাল দিয়ে এলে “ধূর্ত ক্ষৌরকার অতি ধীরে ধীরে রাজাকে বলিল, মহারাজ, ঐ দেখুন, আপনার পারিজাত-বাসিত গাত্র দুর্গন্ধময় ভাবিয়া, ম্যানেজার সাহেব খসবুদার রুমালে মুখ ঢাকিয়া কথা কহিতেছেন!”
এর পরের ইতিহাস সহজেই অনুমেয়। রাজার বিরাগভাজন তিনি! আর কি কাশীপুর থাকা চলে! মধুসূদন রাজবংশীয় এক সহৃদয় ব্যক্তির আনুকুল্যে কাশীপুর ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। নগেন্দ্রনাথের কথায়, “আমরা শুনিয়াছি যে, মধুসূদন যাহাতে পালকী-বেহারা, কুলী, বেগারি না পান, এরূপ রাজাদেশ প্রচারিত হইয়াছিল”।
অবশ্য নগেন্দ্রনাথ তাঁর গ্রন্থে বলেছেন, মধুসূদন এর পঞ্চকোট ত্যাগ সম্মন্ধে নানা কাহিনী আছে যেগুলি “অদ্ভুত কিম্বদন্তীবৎ সন্দেহমূলক এবং সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাস্য”। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত গ্রন্থে যোগীন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন, “রাজার চপলতায় বিরক্ত হইয়া অল্পদিনের মধ্যে, তিনি এই কার্যত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন”।
পারিবারিক বিপর্যয়, আর্থিক অনটন, রোগব্যাধির আক্রমণ, স্বজনহীনতায় ক্লিষ্ট কবি পুরুলিয়ার কাশীপুরের রাজার কাজটি নিয়েছিলেন জীবনের শেষ অবলম্বন হিসেবে। বিড়ম্বিত জীবন এখানেও তাঁকে স্বস্তি দিলনা!
আজ মধুকবির মৃত্যুদিন। থাকুক তাঁর শেষ জীবনের হতমান সময়ের টুকরো বৃত্তান্ত ।