“হরিদাসের বুলবুল ভাজা/হার মেনে যায় খুরমা-খাজা/কোথা লাগে পাঁপর ভাজা/গলদা চিংড়ি জিবে গজা!”
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে শহর কলকাতায় এমন কোন পাড়া ছিল না যেখানে ঘুঙুরপরা ফেরিওয়ালার কণ্ঠে এই গানে মন মজতো না ছোট থেকে বুড়ো সকলের। সাড়ে বত্রিশভাজা বা গরম চানাচুর বা ডালমুট ভাজা যাই নামেই ডাকুন না কেন, মুখরোচক এই পণ্যটির জনপ্রিয়তা ছিলো বরাবরই।
এমনিই বাঙালি চিবোতে একটু বেশি পছন্দ করে, তা সে চানাচুর হোক বা যে কোন স্বাদের জিনিষ। আর সেটি যদি মুখরোচক হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। ৭২ বছর ধরে নস্টালজিয়ায় ভরা বাঙালিদের স্ন্যাক্স অভ্যাসে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়েছে ‘মুখরোচক’ চানাচুর। আজ গল্প হবে তারই।
চন্দ্র’রা কলকাতায় তাদের শিকড়-সহ চানাচুর শিল্পের পুনরুদ্ধারের কৌশল আয়ত্ত করেছিল, যা স্ন্যাকসের ইতিহাসের যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আয়ুর্বেদিক মশলা, দামি কোম্পানির বাদাম তেল, কানপুরের বিটনুন, বেসন, বেজোয়াদা বাদামের যাদু সংমিশ্রনের স্বাদ, স্ন্যাকসটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। নির্মলেন্দু চন্দ্র মুখরোচকের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন যা বাঙালির স্বাদ এবং বিশেষজ্ঞ স্ন্যাক প্রস্তুতকারকদের মধ্যে একটি চিরসবুজ সম্পর্কের সূচনা করে।
নির্মলেন্দুবাবুর বাবা ছিলেন একটি সোনার দোকানের কারিগর। যদিও পরে তিনি একটি স্যাকরার দোকান করেন কিন্তু তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে সেই ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছেলে সেই সময় স্কুলে পড়ে, অভাবের তাড়নায় টালিগঞ্জের একটি ছোট্ট কাপড়ের দোকানে কর্মচারীর কাজ নিলেন। জ্যোতিষীর পরামর্শে ছেলের নামে চানাচুরের ব্যবসা শুরু করেন।

স্কুল ছেড়ে দিয়ে নির্মলেন্দু বাবু ভাঙা সাইকেল নিয়ে টালা থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত পাইকারি বাজারে চানাচুর বিক্রির জন্য ছুটতেন। লোকে ঠাট্টা করে বলতো, ‘ভেতো বাঙালির হাড়ে এত পরিশ্রম সহ্য হবে না’। এরপর এক সহৃদয় পানের দোকানদার — শ’আড়াই টাকা দিতে হবে শুরুতে ও দিনে এক টাকা ভাড়া হিসেবে টালিগঞ্জ ট্রামডিপোর কাছে চানাচুরের দোকানের ব্যবস্থা করে দিলেন। চন্দ্রবাবু চেয়েছিলেন চানাচুরে নতুন কিছু বাঙালি স্বাদ দিতে।
নির্মলেন্দুবাবু কাজের সূত্রে দিল্লি গিয়ে এক বৈষ্ণব হোটেলে খাবার সময় তরকারিতে মাংসের ঝোলের মতো স্বাদ পান। পরে হোটেলের মালিকের সঙ্গে কথা বলে স্বাদের সূত্রটি জানেন। কলকাতায় ফিরে নির্মলেন্দুবাবু জোয়ান, লবঙ্গ, জিরে, দারচিনি, পিপুল, বিশেষ ধরনের লঙ্কা, শুকনো আদা, হিং এবং আরো ডজন কয়েক উপাদানের মিশ্রণে নতুন ফর্মূলায় চানাচুরের স্বাদ দেন।
নির্মলেন্দু বাবুর অদম্য প্রচেষ্টা, নিষ্ঠা, সাধনা এবং উদ্ভাবনী শক্তিতে ব্যবসা এখন বৃহত্তর রূপ ধারণ করেছে। তিনি বলেন, “চনাচুরেই আমাদের মুক্তি, চানাচুরই আমাদের মোক্ষ”। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বহু ভাগ্য করে এসেছিলাম, কিছু মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছি এবং সেই সঙ্গে দুটো পয়সাও করতে পেরেছি। বাড়তি লাভ, মুখরোচক বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। মুখরোচক মানেই যে চানাচুর, এটা বাঙালিদের মাথায় ঢুকে গিয়েছে।”
‘মুখরোচক’ নামটি কোনো একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিকের দেওয়া বলে তিনি মনে করেন।

টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় খ্যাতনামা চিত্ৰতারকা, সঙ্গীতবিদ, সাহিত্যিকদের যাতায়াত ছিলো এই দোকানে। বাপী লাহিড়ী তাঁর বাবা অপরেশ লাহিড়ির সঙ্গে আসতেন চানাচুর খেতে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বোম্বে যাওয়ার সময় লতাজীর জন্য এই চানাচুর নিয়ে যেতেন। উৎপল দত্তের যেদিন শর্ট ঠিক মতো না হতো, তিনি বলতেন মুখরোচক চানাচুর আনতে যা মুখে দিলেই ‘মেজাজ খুশি হয়ে উঠবে’।
বর্তমানে এই সংস্থার কর্ণধার নির্মলেন্দু বাবুর পুত্র প্রণব চন্দ্র প্রতিদিন মশলার মিশ্রণ জিভে দিয়ে টেস্ট করে বাবার শিক্ষার গোপন গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাকে সাহায্য করার জন্য আছেন পুত্র প্রতীক চন্দ্র। ১৯৫০ সাল থেকে ব্যবসার পথ চলা শুরু হয়ে আজ চতুর্থ প্রজন্মের ব্যবসা। চানাচুর ছাড়াও মুখরোচক বাজারে এসেছেন ডায়েট চিঁড়ে, চাল ভাজা, চিঁড়ে ভাজা, সল্টেড পিনাটস, ধনিয়া পিনাটস, কাজু নাটস ইত্যাদি। কারখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের বিশেষ খেয়াল রাখা হয়, কাজ করার আগে সবাই মেডিটেশন করেন (প্রজাপিতা ব্রহ্মাকুমারীর সন্ন্যাসিনীদের দেখানো পথে) ।
২০২০ তে সংস্থার ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়ের একটি বই প্রকাশিত হয় ‘গল্পটা মুখরোচক’। আজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই চানাচুরের স্বাদ। গভর্নমেন্ট পলিসি মেনে চলে, ফুড কোয়ালিটি মেইনটেন করে মুখরোচকের একটিই উদ্দেশ্যে— ‘ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন’। ঝমঝমে বৃষ্টিতে, কনকনে শীতে বা গরমের বিকেলে, হালকা আড্ডা কিম্বা গভীর আলোচনায়, ট্রেনে-বাসে-বিমানে স্ন্যাক্স হিসাবে মুখরোচকের স্বাদ সবের সঙ্গেই মানানসই।।
তথ্যসূত্র : রান্নাঘর, কিচেন কিংবা রসবতী — শংকর এবং সম্পর্কিত সূত্র।
জিবে জল এসে গেল।
মুখরোচক রচনা, গুণগত মানের দিকটা লেখায় উল্লেখ থাকলেও, বাস্তবে তা নেই, জানিনা নকল কিনা? দু-একবার ঠকে ছেড়েছি খাওয়া।তবে রচনার বৈচিত্র্য মুগ্ধ করে।
Explanation খুবই ভালো কিন্তু এই চানাচুরই পছন্দের না। বাদাম থাকে বিশেষ করে পচা।
Quality control বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না।
বেশ বেশ
মুখরোচক চানাচুরের মত মুখরোচক লেখাটি হয়েছে।
আমি একটি চানাচুরের খাই…ওই মুখরোচক।