বহুকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের বেশকিছু অংশে খাবার পর মুখশুদ্ধির ব্যবহার চলে আসছে। রেস্তোরাঁ হোক বা ঘরের আটপৌড়ে খাবার কিংবা ভোজবাড়ির পোলাও কালিয়া কোপ্তা খাওয়ার পর, জিভের স্বাদ কোরককে শান্তির আস্বাদ চাখিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার ক্ষমতা কেবলমাত্র এই মুখশুদ্ধির একার।
ইদানিং উপকারী মুখশুদ্ধির তুলনায় অপকারী মুখশুদ্ধির ব্যবহার বেশি দেখা যায়। ছোটবেলায় চকোলেট, কৈশোরে চুইংগাম, যৌবনে খৈনি-গুটকা, বার্ধ্যকে দোক্তাপান মুখে রাখার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। অথচ এগুলি কোনোটাই শরীরের পক্ষে ভালো নয়। মুখশুদ্ধি এমন হওয়া উচিৎ যে ছোট থেকে বড় সকলেই খেতে পারেন। এমনকি অতিথিদেরও ভুঁড়িভোজের পর মুখের পরিতৃপ্তির হাসিটুকু অম্লান রাখতে দেওয়া যায়। আজ তেমনি কিছু উপকারী মুখশুদ্ধীর কথা বলবো।

মৌরি : মৌরির নিজস্ব সুগন্ধির জন্য মুখশুদ্ধি হিসাবে নাম্বার ওয়ান। মৌরি খেলে মুখের মধ্যে যে লাল নিঃসরণ হয়, তা হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। রুচি, ক্ষিদে, হজমক্ষমতা বাড়ায়। মৌরি বায়ুরোগ নাশক। মৌরিতে রয়েছে ফাইবার, যা একদিকে যেমন খাবার হজম করতে সাহায্য করে, তেমনই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দুর করতে সাহায্য করে। কৃমিনাশক হিসাবে ভালো কাজ করে। এছাড়া অ্যাংজাইটি কমায়, অ্যালার্জি নাশক, লিপিড কমায়, অ্যান্টি এজিং।
বহু রসনাবিলাসি রয়েছেন যাদের খাবার শেষে একটু শুকনো খোলায় ভাজা মৌরি না হলে খাবার সম্পূর্নতা আসে না। আর বাঙালির তো রেস্তোরাঁয় খাবার পর কাটিং মিছরির সঙ্গে মৌরি খেয়ে কাঠি দাঁতে না দিলে মন পেট কোনোটাই ভরে না।

জোয়ান : গৃহস্থের হেঁসেল থেকে শুরু করে ডাইনিং টেবিলে ছোট্ট কৌটায় সর্বদা বিরাজমান জোয়ান। লেবু বিট লবণ দিয়ে বানানো জোয়ান খেতে কার না ভালো লাগে।।শুধু আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নয়, বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় জোয়ানের উপকারিতা সম্পর্কে খোঁজ পাওয়া যায়। জোয়ান বীজে একটি বিশেষ ধরনের তেল থাকে যেটিকে জোয়ান তেল বলা হয়ে থাকে। জোয়ান তেলে থাকে থাইমল বা ফেনল। এটি সাধারণত হজম সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এর ছত্রাকনাশক ও ব্যাকটেরিয়ানাশকের ক্ষমতাও রয়েছে।
কাঁচা অবস্থায় পিত্তবর্ধক তাই হাল্কা ভেজে নিতে হবে। জোয়ান খাবারে রুচি, ক্ষিদে বাড়ায়।পেট ফাঁপা, অম্বল, পেট ব্যাথা, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। রোধ করে ব্রঙ্কাইটিস, ডিসমেনোরিয়া। লিভারের সুরক্ষা বাড়ায়, কাশি কমায়। দাঁতের ব্যাথা ও আর্থেরাইটিসে জোয়ান তেল ভালো কাজ করে। ঋতুস্রাবের সময় ব্যথা উপশমেও এটি দারুণ উপকারী। ত্বক-চুলের যত্নে জোয়ানের কোনও বিকল্প নেই।
তবে অভ্যাসবশত সবসময় জোয়ান চিবনো ঠিক নয়।
যাঁরা লিভারের রোগে আক্রান্ত তাঁদের জন্য জোয়ান না খাওয়াই ভাল। এ ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি থাকে। সারাক্ষণ ধরে মুখে জোয়ান রাখলে মুখে ঘা বা আলসারও হতে পারে।

লবঙ্গ : আমাদের ছোটবেলায় সর্দি-কাশি বা গলাব্যথা হলেই টোটকা হিসেবে ব্যবহার হতো লবঙ্গ। শুধু মুখশুদ্ধি নয়, লবঙ্গের মধ্যে রয়েছে অনেক ওষধি গুণ। লবঙ্গের সুগন্ধের মূল কারণ ‘ইউজেনল’।
লবঙ্গ তেল দাঁত ও মাথা যন্ত্রণা কমাতে সক্ষম। লবঙ্গ রুচি, ক্ষিদে, হজম ক্ষমতা বাড়ায়। ইউসোনফিল, স্ট্রেস কমাতে ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রূপেও কার্যকরী।
লবঙ্গে রয়েছে ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যালকালয়েড এবং স্যাপোনিন, যা যৌন ইচ্ছাকে উদ্দীপিত করতে বা কামশক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। যৌন ক্ষমতা এবং টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি, এটি অকাল বীর্যপাত রোধ করতে বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। আর্থারাইটিস ও অ্যান্টি এজিং হিসেবে ভালো কাজ করে।
তবে যদি অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া থাকে বা লবঙ্গ ত্বকে পরে যদি তীব্র জ্বালা, লালভাব, ব্যথা বা ফোলাভাব হয় তবে লবঙ্গ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

ছোট এলাচ : পানের খিলিতে, চায়ের মধ্যে, মুখশুদ্ধি বা সুগন্ধি মশলা হিসাবে এলাচের রান্নাঘর যথেষ্ট মর্যাদা আছে। ভারতীয় আয়ুর্বেদে অতি-সমাদৃত ছোট এলাচ। বাসে, গাড়িতে, পাহাড়ি রাস্তায় বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে এলাচ। গ্যাসের সমস্যায়, পেট ব্যাথা, অর্শ, মুখে দুর্গন্ধ, কোষ্টকাঠিন্য কমায়। এতে রয়েছে ল্যক্সেটিভ, ডাইইয়ারটিক গুণ। মানসিক চাপ কমাতে সক্ষম। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সম্পন্ন ছোট এলাচ মুখের আলসার সারাতে সাহায্য করে। তবে গর্ভবতী মহিলারা ছোট এলাচ খাবেন না, মিসক্যারেজের সম্ভাবনা থাকে।

হরীতকী : প্রাচীনকালে মুনি ঋষিরা যে কোনো মঙ্গল কাজে ব্যবহার করতো। হরীতকীর ফল-বীজ-পাতা সবই মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়। মুখশুদ্ধি হিসেবে ব্যবহার করতে বীজ বাদ দিয়ে কেটে শুকিয়ে রাখতে হবে। পাইলস, হাঁপানি, চর্ম রোগ, ক্ষত রোগ, আমাশয়, কনজাংটিভাইটিস, অন্ত্রের খিঁচুনি রোধক হিসেবে ভালো কাজ করে। হরিতকীতে এ্যানথ্রাকুইনোন থাকার কারণে ইহা রেচক বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ। ওভার ওয়েট,রক্তে লিপিড কমায়।

আমলকী : দুপুরে খাবার পর মুখশুদ্ধি ও হজমী হিসাবে এটি দুর্দান্ত কাজের। বিটনুন, জোয়ান, পাতিলেবুর রস মিশিয়ে আমলকী রোদে শুকিয়ে একটি এয়ার টাইট কৌটায় রাখতে হবে। এটি কাঁচাও খাওয়া যায়।
আমলকী ভিটামিন সি তে ভরপুর শীতকালীন ফল হলেও এখন সারাবছর পাওয়া যায়।এটি হজমকারক ,চুলের স্বাস্থ্যবর্দ্ধক এমন কি সর্বরোগের ঔষধি হিসাবে এর ভেষজ গুণ প্রচুর।

আদা : ঝিরি ঝিরি করে কেটে রোদে শুকিয়ে রাখুন। খাবারে রুচি বাড়ায়। সর্দি কাশি, অ্যাজমা, আমাশয়, কাশি,ওজন, লিপিড, মাইগ্রেন, কমায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। হৃদরোগ প্রতিরোধ করে। ইমিউনো মডিউলেটর ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ আছে।
এই মুখশুদ্ধিগুলি আসলে এক একটি বহুগুণ সম্পন্ন ভেষজ। রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এই মুখশুদ্ধিগুলির কার্যকারিতা অপরিসীম। শরীর সুস্থ ও নীরোগ রাখতে পরিমিত মাত্রায় মুখশুদ্ধি ব্যবহার করতে পারেন।।
ডিসক্লেইমার : এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন ম্যাগাজিন, বই, উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রহ করে কেবলমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য।আরও বিস্তারিত জানতে হলে বিশেষজ্ঞের থেকে পরামর্শ নিন।।
খুব সহজেই সুন্দর প্রতিবেদন থেকে অনেক তথ্য জানতে পারলাম।
Dhonyobad ????
খুব ভালো প্রতিবেদন। অনেক দরকারি কথায় সমৃদ্ধ।