বাংলার গ্রামীণ প্রকাশনীর জনক কাঙাল হরিনাথের ১৯০তম জন্মবর্ষে কৃষ্ণনগরে এক আলোচনাসত্রের আয়োজন করা হয়েছিল। যার আয়োজক ছিল কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘মুক্তধারা’। সমাজবিপ্লবী কাঙাল হরিনাথের সমকালে ও তাঁর জীবনাবসানের পর তাঁর শুভানুধ্যায়ী, অনুরাগীরা তাঁকে নিয়ে পরিমিত চর্চা করলেও, পরবর্তীতে কাঙাল হরিনাথকে নিয়ে বিস্তারিত চর্চা খুব বেশি হয়নি। অনুসন্ধানী গবেষকদের কাছে যা বিশেষ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। আজকের দিনে তিনি অনেকটাই বিস্মৃত। কাঙাল হরিনাথ সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন করবে এরূপ পত্র-পত্রিকা বা গ্রন্থাদির অভাবও তাই বিশেষভাবে অনুভূত হয়। কাঙাল হরিনাথের ব্যক্তিগত ডায়েরিটিও সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এখন আর সেই মহামূল্যবান নথির খোঁজই মেলে না, এমনকি তাঁর উত্তরসূরীদের কাছেও সেই ডায়েরি আর নেই। কাঙাল হরিনাথের মতো অবিস্মরণীয় একজন সমাজবিপ্লবী, গ্রাম বাংলার পীড়িত মানুষের অঘোষিত মুখপাত্র সম্পর্কে এখনো পর্যন্ত আমরা আদেও সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি কিনা, সে বিষয়েই সংশয় রয়েছে। ‘মুক্তধারা’ সাংস্কৃতিক সংস্থা তাদের এবারের আলোচনাসত্রে কাঙাল হরিনাথকেই বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছিল।

এটি ছিল ‘মুক্তধারা’-র ৪৭তম আলোচনাসত্র। ২ জুলাই ২০২৩ (রবিবার) কৃষ্ণনগর পৌরসভার দ্বিজেন্দ্রমঞ্চে এই আলোচনাসত্র বসেছিল। এদিনের আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘কাঙাল হরিনাথ — এক অবিস্মরণীয় সমাজবিপ্লবী’। আলোচক ছিলেন প্রবীণ সমাজসেবী ও নদিয়া ডিস্ট্রিক্ট সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান শিবনাথ চৌধুরী। দ্বিজেন্দ্রমঞ্চে এদিন বহু মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন ‘মুক্তধারা’-র আলোচনাসত্র শুনতে। ‘মুক্তধারা’ আয়োজিত আলোচনাসত্রগুলির প্রথমে একটি উদ্বোধন সংগীত পরিবেশন তাদের প্রচলিত প্রথা। উদ্বোধন সংগীতের পর মূল আলোচনা শুরু হয়। সেই প্রথা মেনে ৪৭তম আলোচনাসত্রের শুরুতেও একটি উদ্বোধন সংগীত পরিবেশিত হয়। আশ্রয় সেই রবিঠাকুর।
“ফিরে চল্, ফিরে চল্, ফিরে চল্ মাটির টানে—
যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে॥
যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে,
হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,
ডাক দিল যে গানে গানে।”
—এই গানটি ৪৭তম আলোচনাসত্রের উদ্বোধন সংগীতের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। কৃষ্ণনগরের ‘গীতাঞ্জলি’ গানের স্কুলের দুই ছাত্রীর কন্ঠে গানটি পরিবেশিত হয়। এদিনের অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন বিশিষ্ট কবি রামকৃষ্ণ দে।
আলোচক শিবনাথ চৌধুরী কাঙাল হরিনাথের কর্মজীবনকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে এদিনের আলোচনা শুরু করেন। যথা— ক) কাঙাল হরিনাথের শৈশবকাল, খ) সমাজ সংস্কারক হিসাবে তাঁর কর্মকাণ্ড, গ) তাঁর সাহিত্যকর্ম, ঘ) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা ও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সংগ্রাম, এবং ঙ) ফিকিরচাঁদ বাউল দল গঠন ও বাউল গান রচনা।

কুমারখালির অন্তর্গত কুণ্ডুপাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত তিলি পরিবারে ১৮৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন হরিনাথ। তাঁর পিতা ছিলেন হলধর মজুমদার ও মাতা কমলিনী দেবী। মাত্র ১০ মাস বয়সে হরিনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে। তাঁর পিতা আর দ্বিতীয় বিবাহ করেননি। পত্নিবিয়োগের পর তিনি সাংসারিক জীবনে উদাসীন হয়ে পড়েন। হরিনাথ তাঁর এক খুল্লমাতামহীর কাছে প্রতিপালিত হন। দুঃখ কষ্টের জীবন হরিনাথের চিরসঙ্গী ছিল। হরিনাথের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। বাল্যকালেই পিতা-মাতা উভয়কে হারিয়ে তিনি বেদনার সমুদ্রে পতিত হয়েছিলেন। তাঁর পিতার ঔদাসীন্য পরিবারের সহায় সম্পদও নষ্ট করেছিল।
পড়াশুনার প্রতি কাঙাল হরিনাথের চরম আগ্রহ ছিল, কিন্তু অর্থাভাবে কাঙ্খিত শিক্ষালাভ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। হরিনাথের প্রদত্ত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, কুমারখালির মান্য ব্যক্তি কৃষ্ণধন মজুমদার একটি ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করলে হরিনাথ সেখানে ভর্তি হন। কিন্তু তাঁর পক্ষে সেখানকার মাসিক বেতন প্রদান ও পুস্তক জোগার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে পড়াশুনা শেষ করে তিনি দুই পয়সার বেতনে এক দোকানে কাজ নেন। হরিনাথ আজন্ম সত্যবাদী, তেজস্বী এবং প্রতিবাদী ছিলেন। দোকানের মালিক হরিনাথকে চুরি করবার কুমন্ত্র দিলে সত্যনিষ্ঠ হরিনাথ রাজি না হয়ে চাকরী ছেড়ে দিয়ে পথের ভিখারী হয়ে যান। কাঙাল হরিনাথ তাঁর জীবনীগ্রন্থে লেখেন— “চাকরী হারাইবার পর জ্যাঠামশাই দু’বেলা যে দুটি অন্ন দিতেন সে অন্নের বরাতও উঠিয়া গেল। এখন আমি অন্নবস্ত্রহীন পথের কাঙালী হইলাম। প্রতিপালিকা খুল্লপিতামহী কখনও তাঁহার উদরান্নের অর্দ্ধাংশ (পান্তাভাত, জামির পাতা ও লবন) প্রদান করেন। কখনও কোন ঠাকুরবাড়ির প্রসাদে এক বেলা উদরপূর্তি করি। আমার বন্ধুর দাদা লোকনাথ রাত্রিকালের আহার দান করিতেন।” নিদারুণ দারিদ্র্য আর অর্থকষ্ট হরিনাথের কাছে প্রতিবন্ধতা ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম হলেও, তাঁর হাতের লেখাটি ছিল বেশ সুন্দর। তাই জনৈক এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় একদিন রাজা রামমোহন রায়ের রচিত ‘চূর্ণক’ গ্রন্থ নতুন করে মুদ্রণের প্রয়োজনে পুস্তকটি নকল করার প্রয়োজন হওয়ায় হরিনাথ একরাতে পুস্তকটি নকল করে দিয়েছিলেন। বদলে তিনি লজ্জা নিবারণের স্বার্থে একটি বস্ত্র পেয়েছিলেন।

এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা এদিন আলোচক শিবনাথ চৌধুরী দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত করেন। তিনি কাঙাল হরিনাথের সামগ্রিক জীবন ও কর্মের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন। আলোচকের সুনিপুণ ব্যাখ্যায় কাঙাল হরিনাথের সমগ্র জীবনভর (১৮৩৩-১৮৯৬খ্রি.) সংগ্রামের এক খণ্ডচিত্র শ্রোতাদের মানসচক্ষে ভেসে ওঠে। কাঙাল হরিনাথের অনুগামী, জীবনীকারদের প্রসঙ্গও এদিন আলোচক তুলে ধরতে ভোলেননি। জলধর সেন, মীর মোশারফ হোসেন থেকে শুরু করে আবুল আহসান চৌধুরী পর্যন্ত সকলের কথাই এদিনের আলোচনায় উঠে আসে।

আলোচক এদিন কাঙাল হরিনাথের ফিকিরচাঁদ ফকিরের দলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ১৮৮০ সালে বাউলসাধক লালন সাঁই কুমারখালিতে কাঙাল কুটিরে এসেছিলেন বলে জানা যায়। সে বছরই ‘ফিকিরচাঁদ ফকির’-এর বাউল গানের দল গঠিত হয়। ১৮৮২ সালে হরিনাথের জীবনে আরেকটি পর্যায় দেখতে পাওয়া যায়। ১২৮৯ সনের বৈশাখ মাসে সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পুনরায় প্রকাশ পায়। ১৮৮৪ সালে (১১ মাঘ ১২৯১) হরিনাথ ‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের দল’ নিয়ে কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে যোগদান করেছিলেন। সেখানে তিনি সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সাহচর্য ও আতিথ্যলাভ করেছিলেন। ১৮৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর ভারতের বড়লাট লর্ড রিপনের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে হরিনাথ রিপন-প্রশস্তি রচনা করেছিলেন। এমনকি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের জন্য ‘ফিকিরচাঁদ দল’ নিয়ে পোড়াদহ রেল-স্টেশনে উপস্থিত পর্যন্ত হয়েছিলেন। কাঙাল হরিনাথ ১৮৮৫ সালে (মাঘ ১২৯২ ব.) সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর আমন্ত্রণে ‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের দল’ নিয়ে ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের মাঘোৎসবে যোগদান করতে গিয়েছিলেন। বঙ্কবিহারী করের ‘পূর্ব্ব বাঙ্গালা ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত’ থেকে জানা যায় যে, সে সময়ে ফিকিরচাঁদ দলের ভক্তিভাবপূর্ণ কীর্তন ও সঙ্গীত নাকি ঢাকার নরনারীর উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ফিকিরচাঁদ দলের কীর্তন ঢাকার মানুষদের মধ্যে ভক্তিস্রোতের প্রবাহ ঘটিয়েছিল। কাঙাল হরিনাথের জীবনে ১৮৮৫ সালেই এক বড় আঘাত নেমে আসে। ১২৯১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ মুদ্রণ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

মুক্তধারার ৪৭তম আলোচনাসত্রে এভাবেই কাঙাল হরিনাথকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। তাঁর জীবন, সাহিত্য, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা, গানের দল-সহ সমকালীন সমাজ জীবনের এক সামগ্রিক চিত্র আলোচনায় প্রতিভাত হয়। আলোচক শিবনাথ চৌধুরী তাঁর ঘন্টাখানেকের বক্তব্যে সম্প্রতি তাদের কাঙাল হরিনাথের জন্মভিটে পরিভ্রমণ করে আসার অভিজ্ঞতার কথাও সকলকে বলেন। মুক্তধারার তিন আহ্বায়ক সম্পদনারায়ণ ধর, তপনকুমার ভট্টাচার্য ও দীপাঞ্জন দে এবং মুক্তধারার দর্শক-শ্রোতা বন্ধুদের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে আলোচক শিবনাথ চৌধুরী তাঁর আলোচনা পরিসমাপ্ত করেন। সামগ্রিকভাবে বলা যায় মুক্তধারার এই ৪৭তম আলোচনাসত্র তার বিষয় নির্বাচন ও উপস্থাপনা— এই উভয় কারণেই আশাকরি সকলের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে রাখবে।
লেখক: আহ্বায়ক, মুক্তধারা।
Kub sundor, onk ajana tottho jante parlam…..
ধন্যবাদ। ভালো লাগলো।