| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মুক্তধারার আলোচনাসত্রে মধুসূদনের নারী : দীপাঞ্জন দে

Reporter
দীপাঞ্জন দে / ১২৫১ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৭ মার্চ, ২০২৪

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মের দ্বিশতবর্ষে নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে এক অনবদ্য আলোচনাসত্রের আয়োজন করা হয়েছিল। এই আলোচনাসত্রের আয়োজন করেছিল কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘মুক্তধারা’। মুক্তধারার সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের আলোচনাসত্রের আয়োজন করে থাকেন। এটি ছিল ‘মুক্তধারা’-র ৪৮তম আলোচনাসত্র। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের আলোচনাসত্রের আয়োজন ইতিমধ্যে বহু মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে। শহর তো বটেই, বহু দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষেরা ছুটে আসেন মুক্তধারার আলোচনা শুনতে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি, মুক্তধারার আলোচনা শুনতে আগ্রহী বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন একই ছাদের তলায়। প্রতিবারের আলোচনাসত্রের মতো এবারের বিষয়টিও ছিল স্বতন্ত্র। এই প্রথম মুক্তধারা মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে আলোচনাসত্রের আয়োজন করেছিল। আলোচনার শিরোনাম ছিল— ‘নারী— মধুসূদনের জীবন ও মননে’। বস্তুত, মুক্তধারার ৪৮তম আলোচনাসত্রে মধুসূদনের জীবন ও মননে নারী চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনুসন্ধানের প্রয়াস নেওয়া হয়। আর মুক্তধারার সান্ধ্যকালীন আলোচনাসভায় মধুসূদনের জীবন ও মননে নারীর ভূমিকার কথা এদিন সবিস্তারে উপস্থাপন করেন ড. কৃষ্ণগোপাল রায়।

১৭ মার্চ ২০২৪ (রবিবার) কৃষ্ণনগর পৌরসভার দ্বিজেন্দ্র মঞ্চে বসেছিল মুক্তধারার ৪৮তম আলোচনাসত্র। মুক্তধারার পক্ষ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাত থেকে আটটি এই রকম আলোচনাসত্র আয়োজন করা হয়। প্রত্যেকটি আলোচনাসত্রে একটি স্বতন্ত্র বিষয় থাকে, যে বিষয়ে আলোচক প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা আলোচনা করেন। আর মুক্তধারার দর্শক-শ্রোতা বন্ধুরা তাদের আসনে বসে সান্ধ্যকালীন সেই আলোচনাগুলি উপভোগ করেন। সাংস্কৃতিক সংস্থা হিসেবে ‘মুক্তধারা’-র পথচলা শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশতবর্ষের সময় থেকে। আলোচনাসভা, পত্রিকা প্রকাশ, সংগীতানুষ্ঠান, রবীন্দ্র মেলা— এই ধরনের বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে মুক্তধারা একীভূত হয়ে যায়। তারপর ২০১৫ সাল নাগাদ শুরু হয় নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক এই ধরনের আলোচনাসত্র। ক্রমান্বয়ে পথ চলতে চলতে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হলো মুক্তধারার ৪৮তম আলোচনাসত্র। এদিনও আলোচনা শুনতে বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। আসলে মুক্তধারার নিয়মিত যে সকল শ্রোতা-দর্শকেরা রয়েছেন, তারা বিশেষভাবে এই আলোচনাসত্রগুলি শোনার অপেক্ষায় থাকেন। ৪৮তম আলোচনাসত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাড়তি পাওনা ছিল এদিনের আলোচনাসত্রে ড. কৃষ্ণগোপাল রায়ের আলোচনা শুনতে তাঁর কর্মক্ষেত্র চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকর্মীদের উপস্থিতি। শুধু কলেজ নয়, চাপড়া জনপদের বহু মানুষও এদিন ড. কৃষ্ণগোপাল রায়ের আলোচনা শুনতে মুক্তধারার আলোচনাসত্রে উপস্থিত হয়েছিলেন।

মুক্তধারার ৪৮তম আলোচনাসত্রের আহ্বায়ক ছিলেন সম্পদনারায়ণ ধর, তপনকুমার ভট্টাচার্য এবং দীপাঞ্জন দে। তাঁরা মুক্তধারার সকল দর্শক-শ্রোতাদের নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে আলোচনা শুরু করেন। মুক্তধারার আলোচনাসত্রের সূচনায় প্রথামেনে একটি উদ্বোধন সংগীত পরিবেশিত হয় এবং তারপর আলোচনা শুরু হয়। আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সাজুজ্য রেখে গানটি নির্বাচন করা হয়। ৪৮তম আলোচনাসত্রের সূচনায় যে উদ্বোধন সংগীত পরিবেশিত হয়, সেটি মধুসূদন দত্তেরই লেখা। নাম ‘বঙ্গভূমির প্রতি’। বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী দিলীপ বিশ্বাসের কন্ঠে পরিবেশিত হয়—

“রেখো মা দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে

সাধিতে মনের সাধ, ঘটে যদি পরমাদ,

মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে।

প্রবাসে দৈবের বশে, জীব-তারা যদি খসে

এ দেহ-আকাশ হতে, – নাহি খেদ তাহে। —

জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে,

চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?”

এ দিনের আলোচনাসত্রের সঞ্চালক ছিলেন দীপাঞ্জন দে। উদ্বোধন সংগীত শেষ হলে তিনি আলোচক ড. কৃষ্ণগোপাল রায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে তাঁকে আলোচনা শুরু করার জন্য অনুরোধ করেন। ড. কৃষ্ণগোপাল রায় নদিয়া জেলার চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। কলেজের শ্রীবৃদ্ধিতে তাঁর বিশেষ ভূমিকা স্বীকার করতেই হয়। তাঁর নেতৃত্বে চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয় নদিয়া জেলার একটি অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাংলা ভাষাসাহিত্যের অধ্যাপক ড. কৃষ্ণগোপাল রায় বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে সমাধিক পরিচিত। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের কথা এখানে বিশেষভাবে বলতে হয়— মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য (সম্পা.), ইংরেজি সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র, কবি নজরুল ও তাঁর কবিতা, জীবনানন্দের কাব্যে পাশ্চাত্য প্রভাব, অভিনিবেশ : একালের কবিতায়, পদ্মনদীর মাঝি : সাহিত্যবিচার ও রসবিশ্লেষণ, ঘরে বাইরে নবনিরীক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা ও রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্র-কথাসাহিত্য: আপেক্ষিত প্রসঙ্গ, জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা (সম্পা.), পর্যালোচনায় গোরা, মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্য (সম্পা.), বিদ্যাসাগর বিবিধ, সাহিত্যের পরিভাষা, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত : কবি ও কাব্য প্রভৃতি।

মুক্তধারার ৪৮তম আলোচনাসত্রে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা বন্ধুরা এদিন মধুসূদনের নারী বিষয়ক এক মনোজ্ঞ আলোচনার সাক্ষী থাকেন। মধুসূদনের ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যকে আশ্রয় করে ড. কৃষ্ণগোপাল রায় তাঁর অনবদ্য যুক্তি ও বাচনভঙ্গি দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করেন। মধুসূদনের নারী ভাবনা ও তাঁর সাহিত্যে নারী চরিত্রের মূল্যায়ন স্বতন্ত্রভাবে ড. কৃষ্ণগোপাল রায় উপস্থাপন করেন, যা সকল দর্শক-শ্রোতা বন্ধুদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে এবং আকৃষ্ট করে। তাঁর আলোচনায় উঠে আসে বিবিধ প্রসঙ্গ। তিনি এদিন বলেন— বঙ্গীয় তথা ভারতীয় নবজাগরণের পক্ষে অনিবার্য ছিল নারীমুক্তি বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা, কারণ সমাজে তখনও তারা বল্লালী-বালাই। শিক্ষাহীন, অর্থশক্তিহীন, অসূর্যম্পশ্যা তারা সততই অবলা; গৌরীদানের পুণ্যলোভে— অরক্ষণীয়ার বিধানে— বাল্যবিবাহে তারা পুরুষের খেয়ালখেলার পুতুল, বহুসতীনকাঁটায় কন্টকিত তাদের জীবন, পরমগতি পতির তারা নির্বাক দাসী— তার পুত্রোৎপাদনের যন্ত্র; সহমরণ তাদের নিয়তি, নির্মম বৈধব্যাচারপালন তাদের কেবলা ধর্ম। তাদের যৌবনবেদনার সুযোগে ঘরে ঘরে ব্যভিচার, ভ্রূণহত্যা, অতঃপর খাতায় নাম লেখানোর অবারিত ইতহাস। অনিবার্য ছিল রেনেসাঁসের পক্ষে এই কলুষধারা, এই গ্লানিময় আবহ থেকে নারীর উদ্ধার তথা মুক্তির পথ খোঁজা। রামমোহন খুঁজেছিলেন, বিদ্যাসাগর, ইয়ং বেঙ্গলরা, সেকালের সকল উন্নিদ্র মানুষই যে-যার নিজশক্তিমতো নারীর এইসব সমস্যায় বিচলিত হন এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধে, আলোচনা-বক্তৃতায়, অথবা সৃজনশীল লেখাপত্রে প্রতিবাদ বা বিহিত-প্রস্তাব করেন। রেনেসাঁসের সন্তান হিসাবে মধুসূদন প্রত্যাশিতভাবেই নারীমুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভেবেছেন। ছাত্রাবস্থাতেই নারীশিক্ষা বিষয়ে যে প্রবন্ধ লিখে তিনি স্বর্ণপদক পান, সেখানে তিনি বলেন নারীই যেহেতু ভবিষ্যতের দার্শনিক বা কবির প্রথম শিক্ষয়িত্রী তাই তার শিক্ষার দরকার, তার মন অনালোকিত হলে ভূতপ্রেতাদির মতো অন্ধবিশ্বাসও শিশুমনে সঞ্চারিত হতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষিতা নারীর দাম্পত্যসাহচর্যই ধন্য করতে পারে পুরুষজীবন। শিক্ষিতা নারীর সঙ্গে দাম্পত্যকামনাতেই তিনি পিতৃনির্দিষ্ট হিন্দুবালিকা বিয়ে থেকে অব্যাহতি পেতে ধর্মান্তরিত হন, যা তাঁর পরবর্তী জীবনপথ বদলে দেয়। বিশপস কলেজে পড়া অসমাপ্ত রেখেই তাঁকে মাদ্রাজ চলে যেতে হয় অ্যাসাইলামের সামান্য বেতনের শিক্ষকতা নিয়ে। এখানেই রেবেকার সঙ্গে তাঁর পরিচয়, প্রেম ও বিয়ে। সপ্তদশী রেবেকা বিশেষ শিক্ষিতা ছিলেন না, কিন্তু তাঁর রূপ ও ব্যক্তিত্বে নারীর এমন প্রকাশ ছিল যা মধুসূদন হিন্দু মেয়ের মধ্যে আশা করেন নি। দাম্পত্যনির্বাহে সাচ্ছল্য আনার জন্য, সেই সঙ্গে অন্তর্গত মনীষার তাড়নায় তিনি প্রেমাবেগপ্ররোচিত লিরিকসের পাশাপাশি মাদ্রাজের কিছু পত্রপত্রিকায় যে প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলি লেখেন তাতে দেখা যায় বহুবিবাহের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার, বিধবাবিবাহের তিনি উচ্চকন্ঠ সমর্থক, সম্পত্তির উপর নারীর অধিকারের তিনি প্রত্যাশী। আর, মনুর অন্ধ অনুকরণের তিনি ঘোর প্রতিবাদী।

রেবেকার সঙ্গে তাঁর দাম্পত্যসম্পর্কের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য নেই, তবে ‘ক্যাপটিভ লেডি’ ভূমিকার পঞ্চান্ন চরণ ছাড়াও প্রথম সন্তান জন্মানোর পর তিনি আপার প্রভিন্সে বেড়াতে গেলে তাঁকে নিয়ে যে কবিতা লেখেন, অথবা আরও অনেক পরে বন্ধু গৌরদাসকে লেখা চিঠিতে তাঁর যে সপ্রশংস উল্লেখ করেন তাতে সেই সম্পর্ককে প্রেমনিবিড় বলেই মনে হবে। অথচ এ চিঠি লেখার প্রায় দু’বছর আগে তাঁর জীবনে এসেছেন হেনরিয়েটা। কেন, কিভাবে তিনি মাইকেলের মনের গভীরে প্রবেশ করলেন, সেই প্রবেশের প্রাথমিক স্বরূপটাই বা কি, যে মাইকেল ব্যক্তিজীবনে চিরকাল নারী-সম্পর্কে শুদ্ধতাপন্থী তিনিই বা কোন অনুভবে তাঁকে আপন মনে প্রবেশাধিকার দিলেন, সে কি তাঁর অসংযম, নাকি নতুন মায়ের তীব্র নির্যাতনে কাতরা একটি মেয়ের প্রতি সহানুভূতি, যা পরে প্রেম হয়ে গেছে, আজ অভ্রান্তরূপে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। বন্ধু গৌরদাসকে ওই চিঠি লেখার (২০.১২.৫৫) মোটামুটি চল্লিশ দিন পরে মধুসূদন মাদ্রাজ থেকে কোলকাতায় আসেন। আর ফিরে যান নি। কোলকাতায় তিনি ব্যস্ত হয়েছেন পিতৃসম্পত্তি উদ্ধার, চাকরি এবং লেখালেখিতে। লেখালেখি শুরু হয়েছে ১৮৫৮ থেকে এবং এ বছরেরই শেষ দিকে কোলকাতায় এসেছেন হেনরিয়েটা। রেবেকাকে কি ডেকেছিলেন মধুসূদন? ডাকলে কেন তিনি এলেন না? ইত্যাদি সকল সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরসন্ধান করে আলোচক বলেন, সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উপায় নেই, নেই বলেই মধুসূদনকে বিশ্বাসহন্তাও বলা উচিত হবে না, বিশেষত হেনরিয়েটা বিমাতানির্যাতনে আতুরা জেনেও দু বছর সাত/ আট মাস তাঁকে ডাকেন নি। হয়তো এ সময়টা তিনি অপেক্ষা করেছেন রেবেকা তাঁর রাগ ভেঙে, তাঁকে ক্ষমা করে কোলকাতায় তাঁর কাছে ফিরে আসবেন এই ভেবে। রেবেকা আসেন নি, ডিভোর্সও দেন নি। আমরণ তাঁর পদবী ছিল ‘ডাট’। রেবেকা ডিভোর্স দেন নি বলে হেনরিয়েটা কোনোদিন হতে পারেন নি মধুসূদনের বৈধ পত্নী। নিজ জীবনের এই তীব্র সংকট কখনো প্রকাশ করেন নি মধুসূদন। কিন্তু এর ছায়া পড়েছে তাঁর সাহিত্যে। শর্মিষ্ঠা নাটক, মেঘনাদবধ কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে সেই ছায়া আলোকিত করেন আলোচক।

আপন সিদ্ধান্তে অনড় রেবেকা মধুসূদনকে ব্যক্তিগত জীবনে যে সংকটের মধ্যেই পৌঁছাক না কেন, নিজের অপরাধ হয়তো তিনি অস্বীকার করতে পারেন নি, বিদ্বেষের চোখে দেখেন নি তাঁকে, বরং তাঁর তেজোময়ী ব্যক্তিত্বকে হয়তো তিনি সম্মানই করেছেন মনে মনে। সেই সম্মানবোধই হয়তো গূঢ়পথে উজ্জ্বল করে তুলেছে তাঁর দেবযানী, চিত্রাঙ্গদা, কেকয়ী, জনা, জাহ্নবী প্রভৃতি চরিত্রদের। তাঁর স্বাধীন স্বচ্ছ যুক্তিশীলতায় সংগঠিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যই হয়তো মধুসূদনের চেতন অথবা অবচেতনায় সম্মানীয়ভাবে ক্রিয়াশীল থেকে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে ভানুমতী, রুক্মিণী, দুঃশলা ইত্যাদি চরিত্রে। একথাও ভাববার শকুন্তলা ও দ্রৌপদীর চিঠিতে যে প্রোষিতভর্তৃকার ব্যাকুলবাণী তা কি কোথাও আবিষ্ট হয়েছে রেবেকার পথ চেয়ে থাকা দৃষ্টির আকুলতায়। জানি না আমরা, স্পষ্ট করে— জোর দিয়ে বলবার মতো অকাট্য তথ্যপ্রমাণ একেবারেই নেই। তবু সমাবিষ্ট হৃদয়ে মনে হয় জীবনের প্রথম প্রেম কেবল নিষ্করুণ অবমানে ফিরিয়ে দেয় নি তাঁকে, মানুষ হিসাবে যে তমসায়ই তিনি ডুবে যান, স্রষ্টা হিসাবে রেবেকার কাছেই সেই সূর্যকণা তিনি পেয়েছেন যা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে বীরাঙ্গনা নারীদের প্রথম কথাকার হতে সাহায্য করেছে। ভাবতে অবাক লাগে অভিজ্ঞতার এমন ঐশ্বর্য, পড়াশোনার অতিপ্রবল ব্যাপ্তি এবং মননশীলতার নিশিতধার থাকতেও তাঁর ‘মানসকন্যা’ কথিত প্রমীলাকে কেন তিনি সহমরণে নিয়ে গেলেন! প্রমীলাও তো বীরাঙ্গনাই ছিলেন, রামচন্দ্রের ‘বিকট কটক কাটি’ নিজভুজবলে লঙ্কায় স্বামীসম্মিলনে যেতে যিনি ভয় পান নি, সাহসে শস্ত্রপারঙ্গমতায় যুক্তিশীলতা ও বাক্যপ্রক্ষেপনে যিনি সংশ্লিষ্ট কাব্যপাঠকের প্রধান আগ্রহ নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন তিনি সহমরণকেই মনে করলেন প্রেমিকা নারীর পরম গতি? রেনেসাঁসে দৃপ্ত নারীর কাছে এ কি প্রত্যাশিত ছিল? বত্রিশ বছর আগে যে প্রথা বহু লড়াইয়ের পর আইনত নিষিদ্ধ হয়ে গেছে প্রেমের গভীরতার মাপ দিতে তাতেই সন্নিহিত হতে দেখিয়ে মধুসূদন হতচকিত করে দিয়েছেন তাঁর পাঠককে। নারী সম্পর্কে ‘দাসী’, ‘অবলা’ ইত্যাদি বিশেষণও অভিপ্রেত ছিল না প্রমীলার মুখে, কিম্বা ‘পতি বিনা অবলার কি গতি জগতে’— এরকম ত্রিকালগত উক্তিও। বস্তুত নারী যে ‘দাসী’ নয়, ‘অবলা’ নয় তা তো চিত্রাঙ্গদা-প্রমীলা ও বীরাঙ্গনার কেকয়ী, জনা, জাহ্নবী থেকে সূর্পণখা, উর্বশী, রুক্মিণী, দ্রৌপদী, তারা প্রমুখ সকল নারীরাই প্রমাণ করেছেন; তারা, কেকয়ী, জনা, জাহ্নবী প্রমুখ নারীরা প্রমাণ করেছেন পতি বিনা নারীর কত রকমের গতি হতে পারে। আধুনিক নারী-জীবনের গতিপ্রকৃতির এত বিভিন্নতার ধারণা থাকা সত্ত্বেও মধুসূদন প্রমীলাকে কেন ওই পরিণতিতে পৌঁছালেন অথবা তাঁর মুখে অমন উক্তি কেন তুলে দিলেন তার সঙ্গত মীমাংসা হতে পারে একটিই— যুক্তিপথে এগিয়েও সংস্কারগত আবেগে তিনি এই একবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। লক্ষণীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধে নারীর যেসব সমস্যার কথা মধুসূদন বলেছিলেন, সেসব বা তার সমগোত্রীয় বিষয় তাঁর সৃজন-সাহিত্যে ফিরে আসে নি। সৃজন-সাহিত্যে তিনি মূলত নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রবক্তা, সেটা তিনি সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

মুক্তধারার শ্রোতা-দর্শকেরা এদিন প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আলোচক ড. কৃষ্ণগোপাল রায়ের আলোচনা শোনেন। সভাকক্ষে উপস্থিত মানুষেরা মুক্তধারার আলোচনাসত্রটি মন দিয়ে উপভোগ করায় আয়োজকেরাও আনন্দিত। আয়োজকদের পক্ষ থেকে মুক্তধারার অন্যতম আহ্বায়ক সম্পদনারায়ণ ধর বলেন, “মুক্তধারার একেকটি আলোচনাসত্র দর্শকদের সামনে নতুন বিষয় উপস্থাপন করে, তাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়— এখানেই আমাদের ভালোলাগা। এর ফলে আমাদের দায়িত্বও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবেই গুটি গুটি পায়ে চলতে চলতে আমরা এগিয়েছি— আগামীতে মুক্তধারার ৫০তম আলোচনাসত্রও সন্নিকটে। সকল দর্শক-শ্রোতাবন্ধুদের সহযোগিতায় আমরা এভাবেই অগ্রসর হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”

লেখক: আহ্বায়ক, মুক্তধারা।

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “মুক্তধারার আলোচনাসত্রে মধুসূদনের নারী : দীপাঞ্জন দে”

  1. Ram Prasad Mukherjee says:

    কৃষ্ণগোপাল রায় সুপণ্ডিত ও সুকথক।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev