পদ্মশিবির ছেড়ে ঘাসফুলে যোগ দিয়ে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন তিনি; মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে এমনটাই অভিযোগ বিজেপির। সেই মুকুল এখন বিরোধী শিবিরে কাঁটা। বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে স্বপ্নপূরণ তো হয়নি বরং ফল প্রকাশের পর থেকেই পাশা বদলাতে শুরু করেছে বিজেপির। একের পর এক বিজেপি নেতা বেসুরো হতে শুরু করেছেন, দলে দলে নেতা কর্মীরা গেরুয়া শিবির থেকে তৃণমূলে গিয়ে ভিড়ছেন। তবে আসল ছন্দোপদন ঘটিয়েছেন মুকুল রায়। ছেলে শুভ্রাংশুকে নিয়ে বিজেপি থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ঘুম ছুটেছে রাজ্য বিজেপির।
মুকুল রায় ঘাসফুলের সঙ্গে দু’দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে বিজেপিতে গিয়ে তিনি সর্বভারতীয় স্তরের পদ পেলেও যে কদর তিনি তৃণমূলে পেতেন সেই কদর বা গুরুত্ব তিনি বিজেপিতে পাননি। তাই একুশের ভোট শেষে হওয়ার পরই তিনি ফিরে এসেছেন তৃণমূল কংগ্রেসে। এরপর থেকেই রক্তচাপ বাড়তে শুরু করেছে বিজেপির। মুকুলের ঘরওয়াপসির জেরে বিজেপিকে বদলাতে হচ্ছে রণনীতি। মুকুলের পদক্ষেপের কারণে কি চাপে পড়ে রণনীতি বদলাচ্ছে বিজেপি! বিজেপি যে একুশের বিধানসভা ভোটের পর মুকুল রায়ের পদক্ষেপে চাপে পড়ে বিজেপি যে রণনীতি বদল করছেন তাঁর প্রমাণ হল রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের বয়ান। বিধানসভা শুরুর দিনই মুকুলের নাম নিয়ে তিনি আক্রমণ শানিয়েছেন। আর শনিবার তিনি আক্রমণ শানালেন নাম না নিয়ে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে মুকুলকে নিয়ে চাপে রয়েছে বঙ্গ বিজেপি।
কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটেই জিতেছেন মকুল রায়। তৃণমূলে যোগ দেওার পরেও মুকুল সেই বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেননি। তাই বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে সেই বিরোধী দলের ৪২ নম্বর আসনে বিজেপি বিধায়ক হিসেবেই বসতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর পাশে ছিলেন মিহির গোস্বামী। মুকুলের হাত ধরেই তিনি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে এসেছিলেন। অন্যদিকে বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের সময়ে বিজেপি বিধায়কদের প্রতিবাদের মাঝেই বিজেপির দুই বিধায়ক মনোজ টিগ্গা ও জুয়েল মুর্মু সকলের সামনেই মুকুল রায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। সেই ঘটনা কারওরই নজর এড়ায়নি বরং তাতে যে শুভেন্দু অধিকারী রীতিমত ক্ষুব্ধ হন তা তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দেয়। যদিও ওই ঘটনাকে মনোজ বা জুয়েল সৌজন্যতা বলেছেন কিন্তু বিষয়টি বঙ্গ বিজেপির নেতারা সহজভাবে নেন নি।
বাংলা বিজেপি দলের ঠিক কতজন সাংসদ, বিধায়ক, নেতা যে মুকুলের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে চলেছেন তা এখনও ঠাওর করে উঠতে পারছেন না বিজেপি রাজ্য সভাপতি ও তাঁর সঙ্গীরা। কিন্ত তাঁরা সবসময়য়েই আঁচ করছেন যে কোনও সময় মুকুলের নেপথ্য ভূমিকায় দলে বড়সড় ভাঙন ঘটে যেতে পারে।
যে কৃষ্ণনগর উত্তর থেকে জিতে মুকুল বিজেপির বিধায়ক হয়েছেন, তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম সেই এলাকায় পা দিয়েই বিজেপিকে ভেঙ্গেছেন তিনি। মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন বিজেপি নেতা অরূপ দাস। তিনি মুকুল রায়ের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন। শুধু অরূপ দাস নন, তাঁর সঙ্গে বিজেপির আরও নেতা-কর্মীরা যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। ফলে মুকুল রায়ের নির্বাচনী ক্ষেত্র নদিয়ার কৃষ্ণনগরে শক্তি বাড়ল তৃণমূলের। মুকুল জানিয়েছেন কৃষ্ণনগরে বিজেপি শূন্য হয়ে যাবে। শুধু কৃষ্ণনগরে নয়, বাবুল সুপ্রিয়ের গড় আসানসোলেও বিরাট ভাঙন ধরিয়েছেন মুকুল রায়। আসানসোলে বিজেপির জেলা সম্পাদক মদনমোহন চৌবে মলয় ঘটকের হাত থেকে তৃণমূলের পতাকা হাতে নিয়েছেন। তাঁর অনুগামীরাও যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর মুকুল রায়ের খেল শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপির আলিপুরদুয়ারের জেলা সভাপতিকে তৃণমূলে যোগদান করিয়েছেন। অনেক জেলাতেই বিজেপি ভাঙছেন মুকুল রায়। ভাঙছেন নিজের জেলা উত্তর ২৪ পরগনাতেও।
অন্যদিকে মুকুল রায় বিধানসভা শুরুর দিনেই বসেছিলেন বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে বিরোধী বেঞ্চে। সেই ছবিও যে বিজেপিকে স্বস্তি দেয়নি সে কথা বলাই বাহুল্য। বিজেপি ছেড়ে মুকুল রায় তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর বিধায়ক পদ বাতিলের দাবি তুলেছে বিজেপি নেতৃত্ব। বিজেপির পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সে ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। যদিও ওই বিষয়টি এখন বিচারাধীন। কিন্তু ইতিমধ্যে তৃণমূল পাল্টা চাল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, মুকুল রায় বিজেপিতেই আছেন। অন্তত বিজেপির বিধায়ক হিসেবে তিনি বিরোধী বেঞ্চেই বসছেন। তৃণমূল কৌশলে মুকুলকে পাবলিক অ্যাকাউন্ট কমিটির চেয়ারম্যান পদে বসানোর পরিকল্পনা করছে। সাধারণত পাবলিক অ্যাকাউন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হন বিরোধী বিধায়কের মধ্যে কেউ। সেই হিসেবে বিজেপি চেয়ারম্যান পদের দাবিদার। তবে সংবিধানে এমনও লেখা নেই যে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি বিরোধী দলকেই ছাড়তে হবে। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে নথিভুক্ত থাকবে ওই পদ বিরোধী বিধায়ককেই দেওয়া হয়েছে। আর ঘুরিয়ে শাসকদল তৃণমূল, নিজেদের লোককেই বসিয়ে দিচ্ছে ওই পদে। ফলে মুকুল নিয়ে বেজায় চাপে পড়েছে বিজেপি। বাধ্য হয়েই বদলাতে হচ্ছে যাবতীয় প্ল্যান।