হাট করে খোলা হবে কি তৃণমূলের দরজা? একুশের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় ছিনিয়ে আনার পর দলনেত্রী দরাজ কণ্ঠে বলেছিলেন, কেউ যদি ফিরতে চান, স্বাগত। কয়েকদিন আগে মুকুল রায় বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর বেড়েছে ঘরওয়াপসির প্রবণতা। কিন্তু ফিরতে চাইলেই কি ফেরানো হবে? ভোটে জিতে আবেগের বশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা বললেও, বাস্তবে তাঁকেও দলের অনুশাসন মেনেই দলবদলুদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও দলবদলুদের তৃণমূলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে কি না, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি নিজেই।
ফিরে আসতে চাইলেই খুব সহজে দলে ফেরাতে চাইছেন না মমতা স্বয়ং। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর মুকুল রায় সপুত্র তৃণমূলে ফিরেছেন। মুকুলের যোগদান মঞ্চেই তৃণমূল সুপ্রিমো জানিয়েছিলেন, যাঁরা দলের সঙ্গে গদ্দারি করেছে তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। তিনি একথাও বলেন, ভোটের আগে যাঁরা দল ছেড়ে চলে গিয়েছেন, তাঁদের অনেকে চরমপন্থী ও নরমপন্থী মনোভাব নিয়েছিলেন। দলে তাই সবাইকে ঠাঁই দেওয়া হবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন তৃণমূল-এর সাংগঠনিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েই দলত্যাগী নেতানেত্রীদের দলে ফেরানো হবে।
এদিকে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে ফেরার লাইন লম্বা হচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে যেমন নেতারা হুড়মুড় করে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তারাই এখন আশাহত হয়ে পুরনো দলে ফিরতে চাইছেন। আসলে বংলার একুশের নির্বাচনে প্রচারঝড় তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতারাও। তারা বলেছিলেন, অর্ধেক বাংলা জয় তো গত লোকসভাতেই হয়ে গিয়েছে; বাকিটুকু বিধানসভায়।
নিত্যযাত্রীদের মতো দিল্লি থেকে বাংলায় আসা রথীমহারথীদের প্রচারঝড়ে তৃণমূলের স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদেরও মাথা ঘুরে যায়। বিজেপি নেতারা তাদের মধ্যে স্বপ্নের বীজ বপন করে দিতে সফল হন। সেইসব তৃণমূল নেতাদের দলে থেকে দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। তাঁরা দলে থেকে আর কাজ করতে পারছিলেন না। বিজেপি তাঁদের অক্সিজেন জোগাবে, এই আশায় তৃণমূল বহু নেতা দল ত্যাগ করে বিজেপিতে ভেড়েন। তাঁরা মনে করেছিলেন, রাজ্যে বিজেপির দিন আসছে। বিজেপিই নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছে। তাই রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাঁরা দল বেঁধে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন।
কিন্তু বিজেপির দেখা স্বপ্নবেলুন ফলাফল প্রকাশমাত্র চুপসে যায়। দারুণভাবে হতাশ হয়ে পড়েন দলত্যাগীরা। মোহ ভঙ্গ হওয়ায় তাঁরা ঘরে ফিরতে উদগ্রীব। বিজেপির অন্দরে ভাঙনের সুর যেমন বাজছে অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে আসা নেতারা ছটফট করছেন আগের দলে ফিরতে। ইতিমধ্যে অনেকেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নানাভাবে আরজি জানিয়েছেন। তবে সবাইকে দলে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সায় দেননি মমতা। অন্যদিকে দলত্যাগী সব নেতাকে ফেরানোর ব্যাপারে একই দাবি উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের তৃণমূল পর্যায় থেকেও। তৃণমূলের আঞ্চলিক নেতারাও বলছেন, যাঁরা দল ছেড়ে গেছেন, তাঁরা বিশ্বাসঘাতক। বিশ্বাসঘাতকদের আর দলে ঠাঁই দেওয়া চলবে না।
মুকুল রায় দলবদল করার পর থেকে তৃণমূলে ফেরার যে হিড়িক শুরু হয়েছে সেই তাঁদের মধ্যেই রয়েছেন নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে বিজেপিতে যাওয়া রাজ্যের প্রাক্তন বনমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যয়। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গিয়েছে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের বাড়িতেও। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতেও গিয়েছিলেন তাঁর প্রয়াত মাকে শ্রদ্ধা জানাতে। তবে রাজীবকে তৃণমূলে ফেরানোর পথে বহু বাধা রয়েছে। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে চারিদিকে পোস্টার পরা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে সলাপ, চামড়াইল প্রভৃতি অঞ্চলে। ডোমজুড় বিধানসভা কেন্দ্রে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বিক্ষোভ, অবরোধ, কুশপুতুল দাহ করেছে তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের কর্মীরা।
এরপর আছেন প্রবীর ঘোষাল, তৃণমূলের উত্তরপাড়ার বিধায়ক ছিলেন। একুশের নির্বাচনে টিকিট না পেয়ে তিনি বিজেপিতে নাম লেখান। গেরুয়া শিবির থেকে টিকিট নিশ্চিত হলেও জয়লাভের আশা পূরণ হয়নি৷ সম্প্রতি তাঁর মুখে শোনা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা৷ বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা, বিশ্বাসযোগ্যতা, ভাবমূর্তির ধারেকাছে নেই কোনও বিরোধী নেতা৷’ এরপরই তাঁর দলে ফেরা নিয়ে কানা ঘুষো শুরু হয়৷ তারই জেরে এলাকার তৃণমূলস্তরের কর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে পোস্টার সাঁটে৷
এদিকে শোভন-বৈশাখীকে নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। সর্বদা চর্চিত এই যুগলের নতুন করে তৃণমূলে ফেরার রব উঠেছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে বেড়িয়েই মমতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায় বৈশাখীকে। দলে ফেরা নিয়ে মুখে কিছু না বললেও বৈশাখী যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রশংসা করলেন, তাতে তিনি অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তৃণমূল থেকে যেসব নেতা বিজেপিতে গিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কথার ঝড় তুলেছিলেন, তাঁদের আর দলে ফিরিয়ে নেবে না বলে মমতা ঘোষণা করেছেন। তা ছাড়া এসব নেতাকে দলে না ফেরাতে মমতার ওপর তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের যথেষ্ট চাপ রয়েছে। তাদের একটাই কথা, এরা ছাড়াই দল যখন এত ভালো ফল করেছে তাহলে এদের দলে নিয়ে বোঝা বাড়িয়ে লাভ কি?
বোঝাই যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন সিদ্ধান্তে একুল ওকুল দুই যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছেন দলবদলুরা। এক তো বিজেপিতে গিয়ে স্বপ্ন পূরণ না হওয়া, অন্যদিকে তৃণমূলে ফিরে আগের অবস্থান ফেরত পাওয়ার আশাও ঝুলে গেল। তার ওপর রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলে দিয়েছেন, ‘জীর্ণ পাতা গাছের কোনো কাজে লাগে না। জীর্ণ পাতা ঝরে গেলে গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। গাছ নতুন পাতায় ভরে ওঠে। তাই বলছি, ওরা ফিরে গেলেও বিজেপির ক্ষতি হবে না। প্রকৃত বিজেপিরা বিজেপিতেই থাকবে।’ মমতাও মুকুলকে দলে ফিরিয়ে যুক্তি দিয়ে বলেন, মুকুল ভালো মানুষ। তৃণমূল ছেড়ে তিনি বিজেপিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে একটিও বেফাঁস শব্দও উচ্চারণ করেননি। তাই মুকুলকে ফিরিয়ে নেওয়া হল।
অনবদ্য বুদ্ধিদীপ্ত লেখা।এর আগে কেউ ভাবেনি কেউ বুঝেনি। সমাজ বদল আসন্ন।
তাহলে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্যসাচী দত্ত, সোনালী গুহ, বিশ্বজিৎ দাস, সুনীল সিং, প্রবীর ঘোষাল, দিব্যেন্দু বিশ্বাস,
সরলা মুর্মু, বাচ্চু হাসদা প্রমুখরা কি করবেন? আম–ছালা দুটোই যাবে…?