বিধানসভা নির্বাচনে জীবনে একবারই লড়েছিলেন, একুশ বছর আগে, কিন্তু জিততে পারেন নি। তবে নির্বাচনী ময়দানে না থেকেও তিনি দলের নির্বাচনী ম্যানজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। পদ্মশিবিড়ে নাম লেখানোর পরেও তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান নি। নির্বাচনী কমিটির প্রধান হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি ১৯-এর লোকসভায় বিজেপির জন্য ১৮-টি আসনে এনে দিয়েছিলেন। যদিও অনেকেই বলেছিলেন, মুকুল নয়, জয় এসেছে মোদী এবং অমিত শাহের জন্য। কিন্তু সেটা যে সত্যি নয় তা বোঝা গেল বিধানসভা নির্বাচনে। বঙ্গ বিজেপি’র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৭৭-টি আসনে জয়ের পেছনেও সেই মুকুলেরই বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাছাড়া মুকুল যদি নির্বাচনের আগে শুভেন্দু-রাজীব-সব্যসাচী ছাড়াও তৃণমূল থেকে বহু নেতা নেত্রীদের দলে টেনে এনে ধস না নামাতেন ওই জয়টুকুও সম্ভব হত না।
সেই মুকুলকে ঘিরেই গত কয়েকদিন ধরেই জল্পনা চলছিল যে তিনি তৃণমূলে ফিরছেন। শেষমেশ সেই জল্পনাই সত্যি হল। প্রায় চার বছর পর তৃণমূলে ফিরলেন মুকুল রায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তৃণমূল ভবনে ঘরে ফিরলেন বিজেপি হয়ে যাওয়া মুকুল। যে দলে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পদে ছিলেন তিনি। পুরনো দলে ফিরেই প্রাক্তন দল নিয়ে বিস্ফোরক মুকুল রায় বললেন, বিজেপি করতে পারছিলেন না, তাই তৃণমূলে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, কেন বিজেপি ছাড়লেন তা বিস্তারিতভাবে লিখিত জানাবেন।
মুকুল তৃণমূলের এমন একজন নেতা যিনি ২০১৬ সাল পর্যন্ত নির্বাচনী বিপর্যয় বা ব্যর্থতা থেকে দলকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়েই। সংগঠনের পাশাপাশি তিনি পুলিশ-প্রশাসনকেও দলের স্বার্থে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তাও জানতেন। তিনি যে তৃণমূলের একটি স্তম্ভ ছিলেন সেটা তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা জানেন। কিন্তু নারদা এবং সারদা কাণ্ডে ফ্রেমবন্দি মুকুল দলের ভেতরে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে উপেক্ষিত এবং অপমানিত হতে থাকেন। তবু ২০১৬ সালেও নির্বাচনী দায়িত্ব অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পালন করেও ২০১৭ সালের নভেম্বরে দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।
দল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর দলই অভিযোগ তোলে, সারদা-নারদা থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। ভোটে জেতার পরই মুকুলের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়। বিধানসভায় গিয়ে সুব্রত বক্সির সঙ্গে মুকুলের সাক্ষাৎ ঘিরে নয়া চর্চা শুরু হয়। সব জল্পনা শেষে এদিন সরকারিভাবে পদ্মশিবিরের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ফিরে আসেন জোড়াফুলে। মুকুলের তৃণমূলে ফেরার প্রথম আভাস দিয়েছিলেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। নন্দীগ্রামে শেষবেলার প্রচারে মুকুল রায়ের প্রশংসা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘মুকুল শুভেন্দুর মতো এত খারাপ নয়’।
কিন্তু মুকুলের কারণে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ২ থেকে ১৮-টি আসনে পৌঁছলেও সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির আলঙ্কারিক পদ ছাড়া আর কিছু জোটে নি। একমাত্র মুকুল রায়ই এমন একজন সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ছিলেন যিনি কোনো কক্ষেরই সাংসদ, মন্ত্রী না হয়েও রাজ্যস্তরে তাঁর কোনো পদ ছিল না। অনেকেই ভেবেছিলেন মুকুল সিবিআই-ইডি’র ভয়ে বিজেপিতে রয়েছেন। কিন্তু মুকুল রায় জানতেন, সিবিআই ও ইডিকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত বিজেপি টেনে নিয়ে যাবে। রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের কারণেই তদন্তের এসপার ওসপার তারা করবে না। অন্যদিকে মুকুল বাংলার রাজনীতি যেভাবে বোঝেন তার চার আনাও বোঝার ক্ষমতা নেই দিলীপ ঘোষ এমনকি নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ।
মুকুল বিজেপি ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি যে পুরনো দলে ফিরে এলেন তিনি কিন্তু খুব ভাল করেই জানেন, তৃণমূলে তিনি তাঁর যে অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই অবস্থানে আর ফিরতে পারবেন না। কারণ, তাঁর ছেড়ে আসা সেই জায়গাটা আর তার জন্যে খালি নেই। এখন তাঁর জন্যে সাবর্ডিনেট কর্মচারীর জায়গা খালি থাকতে পারে যেখানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তাঁকে সুরে সুর মিলিয়ে থাকতে হবে। তিনি কি পারবেন থাকতে? রাজনীতিতে অবশ্য অসম্ভব বলে কিছুই নেই।
কিন্তু মুকুল প্রত্যাবর্তনের পর তৃণমূলে কোন পদে থাকবেন? মুকুলকে কী দায়িত্ব দেওয়া হবে? চার বছর ধরে বিজেপি করার পর ফের তৃণমূলে ফিরলেন মুকুল, মমতাকে ‘সরি’ বলে। মুকুলের প্রত্যাবর্তনে মমতা বলেছেন, ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল’। তৃণমূলে ফিরে খুশি তৃণমূলের একদা সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মুকুল। কিন্তু, প্রত্যাবর্তনের পর তৃণমূলে কোন পদে থাকবেন মুকুল? এই প্রসঙ্গে সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই নিয়ে দল সিদ্ধান্ত নেবেন’। একইসঙ্গে মমতা বলেন, ‘ও আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন। কোনও সমস্যা নেই। তৃণমূল কালেক্টিভ দল’। উল্লেখ্য, তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন মুকুল। সেইসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। রেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন মুকুল।
কিন্তু মুকুলকে কি সহজে ছেরে দেবে মোদি-শাহ? তার বিরুদ্ধে সারদা-নারদা কেলেঙ্কারির যে অভিযোগ রয়েছে তার থেকে কি মুকুল রেহাই পাবেন, পেলে কিভাবে? মনে হয় না যারা প্রতিহিংসার রাজনীতি করেন, নির্বাচনে হেরে গিয়ে বাংলার ক্ষতি করার জন্য দাঁত-নখ দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করতে চান বাংলার শান্তি-শৃঙ্খলা তারা মুকুল রায়কে সহজে রেহাই দেবেন। বরং তারা সিবিআই-কে প্ররোচিত করবে নতুন করে মুকুলের বিরুদ্ধে সারদা-নারদা মামলা সাজাতে।
আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না মুকুল ভাইয়ের মতন রাজনীতিবিদ কিভাবে আবার তৃণমূলে গেলেন। এটা কি জনগণ ঠিক ভাবে নেবেন। দ্বিতীয় প্রশ্ন মুকুল রায়ের হঠাৎ কি করে এত সাহস এল মোদি অমিত শাহ কে উপেক্ষা করে নারোদা সারদা মামলা ভয় কাটিয়ে দিদির হাত ধরলেন। উনি হয়তো ভাবছেন মোদির কারিশমা এবার শেষের পথে না অন্য কিছু। নাকি মোদী দিদির গোপন আঁতাত
তৃণমূলের আস্থাভাজন হলেও জনগণের কতটা আস্থাভাজন হতে পারবেন তিনি?